চৌদ্দ

অনিরুদ্ধ বসু

মধুসূদন কুঞ্জবিহারীকে বলল “আরেকটা মৃত্যু। এবার মুম্বাইতে। খবরের কাগজে নিশ্চয়ই পড়েছ?”

কুঞ্জবিহারী মাথা নাড়ল “পড়েছি। ওরা বলছে সুইসাইড?”

“আমার কাছে অন্য তথ্য আছে” মধুসূদন রহস্যকে ঘনীভূত করতে আগ্রহী। শঙ্করদয়ালের পাশে চেয়ার টেনে বসে বসল “নাটকটা বেশ জমে উঠেছে। পল্টু, চা দে”

শঙ্করদয়াল বলল “আবার নতুন কী হল?”

“মুম্বাইয়ের ম্যাগনাম টাওয়ার্স কমপ্লেক্সের তেরোতলা ফ্ল্যাট থেকে মেয়েটি ঝাঁপ দিয়েছে। কেউ ছিল না ফ্ল্যাটে। আপাতদৃষ্টিতে এটা সুইসাইড, তাই না?”

“তাছাড়া কী?”

“আমিও তাই ভেবেছিলাম। মেদিনীপুরের এসপি স্নেহাশিস চ্যাটার্জি লালবাজারে মেহুলির ইনভেস্টিগেশনে যে ছেঁড়া ছবি পাওয়া গেছিল, তার কপি চেয়েছে। ওই মডেলের কেসটা ওই ইনভেস্টিগেট করছে। স্নেহাশিসকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে”

তাপস টিপ্পনি কাটল “মেদিনীপুরের পুলিস মুম্বাইতে কী করতে?”

“জানি না। নিশ্চয়ই মেহুলি মৃত্যুর ইনভেস্টিগেশন। আফটার অল, মেহুলি মুম্বাইয়ের মেয়ে”

“যা ভাবছিলাম, তাই” শঙ্করদয়াল মাঝখানে কথা পাড়ল।

“দাঁড়াও দাড়াও, অন্য সবাই আসুক। চা আসুক। তারপর বলছি। কুঞ্জবিহারী তোমার নাতনির কত বয়েস হল?”

“এই সবে ছয়তে পড়ল”

“মেয়ে-জামাই ভালো আছে?”

মাথা নাড়ল “আর মাস দুয়েক পরে চেন্নাই থেকে কলকাতায় আসছে”

“কদ্দিন থাকবে?”

“জামাই দু-সপ্তাহের বেশি ছুটি পাবে না। হাসপাতাল আছে। মেয়ে আর নাতনি মাস খানেক থাকবে। বড় একা লাগে। ওরা এলে ঘরটা ভরে ওঠে”

“জামাই কলকাতার কোনও হাসপাতালে জয়েন করছে না কেন?”

“বিলেত থেকে ফিরে ওখানকার লেডি ফ্লোরেনসে চাকরি পায়। এখন বলে কলকাতার ওয়ার্ক কালচারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। ওখানে অনেক ভালো আছে”

“কোথায় থাকে?”

“রাজা আন্নামালাইপুরমে”

“তাহলে তো মাস খানেক পল্টুর দোকান থেকে ছুটি। কী বল?”

“একেবারেই নয়। শনিবারের সন্ধে এখানে বাঁধা। মেয়ে-জামাই আসুক, চাই না আসুক”

তড়িৎ প্রবেশ করল “দেরি হয়ে গেল। না?”

“কবে বাবা ঠিক সময় এসেছ?” ব্যঙ্গ করল তাপস “নাও, আবার ওনাকে শুরু থেকে গল্প শোনাও”

মধুসূদন বিরক্ত হল “আমি কী স্ক্র্যাচ পড়া রেকর্ড নাকি? বারবার এক জিনিস শোনাতে হবে? এই শেষবার। এরপর দেরি করলে আর রিপিট করতে পারব না বলে রাখলাম”

তড়িৎ চায়ে চুমুক দিয়ে আগের কাহিনি শুনল। মধুসূদন বলে চলেছে “লিঙ্ক আছে। স্নেহাশিস ফোন করেছিল। মেহুলি কেসের ইনভেস্টিগেশনে ওখানে। বলল মুম্বাইতেও যখন মৃত্যু হয়েছে, যার কথা একটু আগে বলছিলাম, ওই বিল্ডিংয়ে সে সময় ও ছিল। মেয়েটির নাম সুনেত্রা আগারওয়াল। খবরের কাগজে বেরিয়েছে। সে নাকি কলকাতারই মেয়ে। মুম্বাইতে চাকরি করতে গেছিল”

“লিঙ্কটা কোথায়?”

“সুনেত্রা আগারওয়ালের কম্পিউটার, মোবাইল থেকে অনেক কিছু পেয়েছে। ডিটেল্ড রিপোর্ট কলকাতায় এসে পাঠাবে। যা বলল তার সার সুনেত্রা সোহমকে ভালোবাসত। মানে মানিকতলার খালের ডেড বডি। সোহম আর ঐত্রেয়ী, যার কথা তুমি সেদিন বলছিলে তড়িৎ, ওদের মধ্যেও প্রেম ছিল। এই নিয়ে একটা লাভ ট্রাইঙ্গেল”

“ও কী জানে সোহমকে মার্ডার করা হয়েছে?” তড়িৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

“জানত না। আমিই বললাম। ওই আধা ছেঁড়া ছবি মেহুলির মেদিনীপুরের সুইট থেকে পাওয়া গেছে, ওটা ই-মেলে পাঠানো সম্ভব কি না”

“কেন?” শঙ্করদয়ালের প্রশ্ন।

“ও নাকি, সুনত্রো আগারওয়ালের কম্পিউটারে একজনের ছবি দেখেছে, যার সঙ্গে হয়ত এই ছেঁড়া ছবিটার মিল থাকতে পারে। ভায়া আমরা তো আগের যুগের। ছবিটা কী করে ই-মেলে পাঠাব?”

শুভঙ্কর কম্পিউটার সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল “তেমন কিছু নয়। স্ক্যান করে পাঠিয়ে দাও”

“আমি কী ছাই কম্পিউটার জানি? কাউকে ধরতে হবে স্ক্যান করাতে। ই-মেল করতে” মধুসূদন চিন্তায় ঘাম মুছল।

এমনিতেই ডিপার্টমেন্টে কেউ পাত্তা দেয় না। কাজ করানো যে কত মুস্কিল, সেই জানে। হাজারো প্রশ্ন। বাবা-বাছা করে করিয়ে নিতে হয়। আবারও কার হাতে পায়ে ধরতে হবে।

“পাঠাতে তো হবেই, না হলে লিঙ্কটা বেরোবে না। দেখি কী করি”

“আরেকটা কথা বলতেই ভুলে গেছিলাম। সুনেত্রার মোবাইলে অনেক ফোনের মধ্যে শেষের ফোন সোহমের বন্ধু মিলনের। রিপোর্টগুলো আবার ওল্টালাম। মানিকতলার এএসআই পরিতোষ সেন যে এটা ইনভেস্টিগেট করেছে, সে নাকি সোহমের বন্ধু মিলনকেও জেরা করেছিল। জেরার রিপোর্ট আছে”

“ঐত্রেয়ীর কোনও খোঁজ পেলে?”

"পরিতোষ সেন ইনভেস্টিগেট করছে। এখনও কোনও রিপোর্ট হাতে পাইনি। সোমবার পরিতোষ সেনকে আবার ফোন করে দেখব নতুন কিছু পেল কী না?”

কুঞ্জবিহারী এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিল। এবার আলোচনার রেশ টেনে বলল “তার মানে মেহুলির ডেথ, সোহমের ডেথ আর এই কলকাতার মেয়েটার কথা বললে, কী যেন নাম...?”

“সুনেত্রা আগারওয়াল”

“হ্যাঁ সুনেত্রা আগারওয়ালের ডেথ, তিনটেরই একটা লিঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে”

“লিঙ্কটা কী?”

“পশ্চিমবাংলা”

তাপসের প্রশ্ন “অন্য দুটো তো হোমিসাইড। সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু সুনেত্রার মৃত্যুটা কী সুইসাইড না হোমিসাইড? কিছু বলল?”

“এখন পর্যন্ত কোনও খুনের এভিডেন্স পায়নি । তবে সব লিঙ্কগুলো ট্রেস না করে কিছু বলতে পারছে না। তাছাড়া পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট না পেলে, ওই বা কী করে সঠিক বলবে?”

“মেহুলির মৃত্যু হোমিসাইড জানলে কী করে? ডুবেও তো মারা যেতে পারে?”

“আমার এক পরিচিত ডাক্তার, চয়ন ছেত্রিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ভিসেরা রিপোর্টে টলবিউটামাইড, গ্লেনেসারাইড আর অ্যালজোলাম পাওয়া গেছে। উনি বললেন এই তিনটে ওয়াইনের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে প্রথমে একটা ঝিমুনি আসে, তারপর স্থান-কাল-পাত্র সব গুলিয়ে যায়। বেহোশ হয়ে পড়ে”

“ওয়াইনের সঙ্গে মিশিয়ে খেয়েছিল কী করে জানলে?”

“স্নেহাশিসের রিপোর্টে ওখানকার কাজের লোক অসিত মেহুলিকে ওয়াইন খেতে দেখেছে”

“ওয়াইনের বোতলটা পাওয়া গেছিল?” তড়িতের প্রশ্নে নড়ে-চড়ে বসল মধুসূদন।

“নাঃ। সেটাই তো সন্দেহ বেশি করে বাড়াচ্ছে। বোতলটা গেল কোথায়? আর কেনই বা হাওয়া হয়ে গেল? তার মানে কী কেউ ওই বোতলে ওষুধগুলো মিশিয়েছিল? যদি মিশিয়েই থাকে তো মেহুলির কাছে বোতলটা পৌঁছল কী করে?”

“মেহুলি কী বোতলটা সঙ্গে করেই এনেছিল?”

“স্নেহাশিসের রিপোর্ট অনুযায়ী মেহুলি সঙ্গে করে এনেছিল। রিসর্টে কোনও ওয়াইনের অর্ডার দেয়নি”

“মানে আততায়ীর সঙ্গে মেহুলির কোথাও দেখা হয়েছিল”

“তাই তো মনে হচ্ছে। কোথায়? কে সে?”

মধুসূদন শঙ্করদয়ালের কথায় মুচকি হাসল “যদি জানা যেত গল্পের যবনিকাও পড়ে যেত। সেটাই তো আসল প্রশ্ন। নয় কী?”

“তবে কী ওদিন যে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা লোকটা এসেছিল, সেই ওটা সরিয়েছে? না হলে ও ওখানে কী করছিল?”

“এর মধ্যে ধুতি-পাঞ্জাবি এল কোত্থেকে?” তাপস প্রশ্ন করল।

“কাজের ছেলেটি ওই রকম একটা লোককে রিসর্টে দেখেছিল। সে নাকি মেহুলির সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিল। মেহুলি সম্মতি দেয়নি”

শঙ্করদয়াল সিঙারাতে কামড় দিল “ওই লোকটাই তাহলে খুনি। এখনও মাথায় ঢুকছে না, ওই লোকটিকে যদি মেহুলি এনট্রি না দিয়ে থাকে, তো মেহুলির ঘরে ঢুকল কী করে?”

মধুসূদন সায় দিল “সেটা তো আমারও প্রশ্ন। এক যদি, ওই ছেলেটিকে দিয়ে পাঠিয়ে থাকে”

তাপস বলল “সে কাজ ছেলেটি করবে না। কারণ ওর চাকরি যাওয়ার ভয় আছে। ওই লোকটি কী মেহুলির পরিচিত? নিজেই গেছিল মেহুলির সঙ্গে দেখা করতে?”

মধুসূদন বলল “রিপোর্টে তার কোনও উল্লেখ নেই”

আলোচনাটা হঠাৎ থেমে গেছে দেখে কুঞ্জবিহারী বলল “পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট বলছে ডেথ ডিউ টু ড্রাউনিং, ডাক্তারবাবু কী বললেন?”

“রিপোর্ট পড়ে মনে হল মেহুলি ওয়াইন খাওয়ার ফাঁকে নাইটি পরে, বোতল আর গ্লাস নিয়ে সুইমিং পুলে গেছিল। সেখানেই আরও ওয়াইন খেয়ে নাইটি খুলে স্নান করতে নামে। রাতে কে দেখবে অন্ধকারে?”

“যে দেখার সে ঠিক দেখছিল। যে বোতলটা উধাও করেছে”

শঙ্করদয়াল বলল “হয়ত যখন স্নান করতে গেছিল তখন ঝিমুনি আসেনি। সাঁতার কাটতে কাটতে স্থান-কাল-পাত্র গুলিয়ে ফেলে। শেষে বেহোশ হয়ে ডুবে যায়। তাই ওরা বলেছে ডেথ ডিউ টু ড্রাউনিং”

মধুসূদন মাথা নাড়ল “হতেই পারে। তার মানে এটা হোমিসাইড?”

শঙ্করদয়াল মাথা নাড়ল “তাই তো মনে হচ্ছে”

তড়িৎ অনেকক্ষণ নীরব দর্শক। এবার আলোচনায় যোগ দিল “যদি আগের দুটো হোমিসাইড হয়, তবে মুম্বাইয়ের তেরো তলা থেকে ঝাঁপটা সুইসাইড হবে কেন? আমরা যখন বলছি লিঙ্ক আছে”

শুভঙ্কর এমনিতেই কম কথা বলে। সব শুনে বলল “যতক্ষণ না মুম্বাইয়ের মেয়েটির পোস্ট মর্টেম ও পুরো ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট পাবে, কনফার্মড্ হওয়া যাবে না। তিন জায়গায় তিনটে খুন। মোটিভ না জানলে আমরা সেই অকূলে”

ঠিকই তো বলছে শুভঙ্কর। কতগুলো আনভেরিফায়েড এভিডেন্সের ভিত্তিতে তো আর কনক্লুশনে আসা যায় না। প্রমাণ চাই। নিশ্চিত প্রমাণ।

কুঞ্জবিহারী সায় দিল “হ্যাঁ প্রমাণ চাই। ... পল্টু,এই পল্টু, আরও দু প্লেট সিঙারা দে তো”

শঙ্করদয়াল কুঞ্জবিহারীর দিকে তাকাল “আজকে কী গিন্নি বাড়িতে মিল অফ্ করে দিয়েছে? বয়স হচ্ছে ভায়া। রয়ে সয়ে খাও। নেহাত তোমার ডায়েবেটিস নেই। না হলে গিন্নি আলু খাওয়াও বন্ধ করে দিত”

কুঞ্জবিহারী হাসল “আরে, মরতে তো সাবাইকেই একদিন হবে। মরার আগে খাওয়াটাই বা বাদ দিই বা কেন?”

শুভঙ্কর খাওয়ার কথা না ভেবে বলল “লিঙ্ক আছে। এটা কনফার্মড্। কোথায় কী ভাবে সেগুলো ভাবতে হবে। অবশ্য মোটিভটাও”

ওরা যখন দ্বিতীয় রাউন্ড সিঙারা সমেত চায়ে হাত দিয়েছে, মধুসূদন ভেবে চলেছে মোটিভ কী হতে পারে?

এভিডেন্স নিয়ে ওরা ভাবুক। ও ভাবছে চরিত্রগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%