অনিরুদ্ধ বসু
“আমার ভীষণ ভয় করছে” ঐত্রেয়ী বলল।
“কেন? এখন তো আর কোনও চিন্তা নেই” মিলনের জবাব।
“চিন্তা আরও বেড়ে গেল। আমার ট্র্যান্সফার অর্ডার এসে গেছে। হেড কোয়াটার্স দিল্লিতে নিয়ে যাচ্ছে”
“ভালোই তো। এমনিতেই তোর ব্যাঙ্গালুরুর মেকানিক্যাল লাইফ ভালো লাগছিল না। দিল্লি অনেক কসমোপলিটান। ব্যাঙ্গালুরুতে এখন রেসিয়াল ডিসত্রিুমিনেশন শুরু হয়ে গেছে। পরে ঝামেলায় পড়তিস”
আসল কথাটা বলতে পারছে না ঐত্রেয়ী। সেদিন রাতে মিলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিলনের কথা। এ রকম তো আকছারই হয়। প্রতিদিন পৃথিবীর লাখো ঘরে মিলনের যজ্ঞ হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, পরস্ত্রী, বেশ্যা থেকে পাঁচতারা এসকর্ট সার্ভিস, কর্পোরেট থেকে শো-বিজ। এমনকী বিদেশে কর্মরত স্বামীর সৌভাগ্যবতী একাকী স্ত্রী। আমাদের ভাষায়, বৌদি। লিস্টের কী শেষ আছে? যদিও সেদিনের সন্ধেতে মিলনের সঙ্গে মিলন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
উদ্বিগ্ন ঐত্রেয়ী জিজ্ঞেস করল “পুলিস তোকে আর প্রশ্ন করেনি?”
“চেষ্টা করেছিল। তুই না থাকাতে বেশিদূর এগোয়নি। সোহম মারা যাওয়ার সময় তুই তো কলকাতায় ছিলি না। আর কী করবে?”
“সোহমকে নিয়ে তোকে?”
“নাঃ। সুনেত্রাকে নিয়ে” ছ্যাঁত করে উঠল ঐত্রেয়ীর বুকটা।
“সুনেত্রাকে এখানে এল কোত্থেকে?”
“তোকে বলাই হয়নি। সুনেত্রা মুম্বাইতে ওর ফ্ল্যাট থেকে পড়ে মারা গেছে। ওরা হোমিসাইড সাসপেক্ট করছে”
ভয়ে শিউরে উঠল ঐত্রেয়ী। মনে পড়ল কলেজের দিনগুলো, যখন ওরা চারজনে প্রিন্সেপ ঘাটে ফুচকা খেত। ঐত্রেয়ী ফুচকা খুব ভালোবাসত। সুনেত্রাও ছিল গোলগাপ্পার ভক্ত। সোহম আর মিলন থেমে গেলেও, ঐত্রেয়ী ও সুনেত্রা থামত না। যেরকম করেই হোক ঐত্রেয়ীকে গোলগাপ্পার কম্পিটিশনে হারাতে হবে। কম্পিটিশনটা শুধু গোলগাপ্পার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জীবনের প্রতি পদক্ষেপে আরও প্রকট হয়ে উঠেছিল। ঐত্রেয়ীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়াটা সুনেত্রার খেলা। প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি। পরে বুঝেছিল, সোহমকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
সুনেত্রার থেকে মানিকতলার মধ্যবিত্ত পরিবারের ঐত্রেয়ী সোহমের বেশি কাছের। দুজনেই একই গোত্রের। বাবা রিটায়ার করছে। বোনের বিয়ে বাকি। সোহমের মাথায় তখন অনেক চিন্তা। কাঁধে অনেক দায়িত্ব। ভালোবাসাকে ধরে রাখতে চেয়েছিল ঐত্রেয়ীর হাত ধরে, যে নিজেকে মানাতে পারবে তার মধ্যবিত্ত পরিবারের বেষ্টনীতে।
সোহম বলত “সুনেত্রাকে ঘাড় থেকে কী করে নামাই বল দেখি?”
“চাকরিতে ঢুকতে যেও না। পিএইচডি কর”
“চার বছর কিংবা আরও বেশি”
“হোক না। ক্ষতি কী? আমি অপেক্ষা করব”
“রিটায়ার্ড বাবা টানতে পারবে? প্রিয়ানার বিয়েও তো বাকি”
“দেরি আছে। সবে তো উচ্চ-মাধ্যমিক পড়ছে। কলেজ ইউনিভার্সিটি শেষ করবার আগে তোমার পিএইচডি হয়ে যাবে। আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্য”
“এতদিন কী করবে?” সোহম প্রশ্ন করেছিল।
“কোথাও চাকরি নিয়ে নেব” ঐত্রেয়ী উৎসাহ দিত।
“বাবা বিয়ের চাপ দিলে?”
“বলব কেরিয়ার করতে চাই। ও নিয়ে ভেবো না। ম্যানেজ হয়ে যাবে”
তাই দ্য নিউ এজে চাকরি। সোহমকে কাজে মন দেওয়ানোর জন্যই ব্যাঙ্গালুরুতে।
পরিতোষ সেনের জেরাকে বন্ধু হিসেবে ওড়ালেও, ভেতরে গভীর ব্যথা। জীবনের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ওকে ধরেই। বেঁচে ছিল ওর মুখের দিকে চেয়ে। যেদিন মারা যায়, সেদিনও কত কথা। কে মারল? কেন মারল মধ্যবিত্ত ব্রিলিয়েন্ট ছেলেটিকে? ভেবে পায়নি ঐত্রেয়ী। পরে ভেবে দেখেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই সোহমকে উদাস দেখাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলে বলত “ও কিছু না। থিসিস নিয়ে নানা চিন্তা...”
ঐত্রেয়ী সোহমকে চেনে। এড়িয়ে যাচ্ছিল সোহম। কিছু একটা... কী? সুনেত্রা? মনে হয় না ওর সোহমকে বিচলিত করার এত ক্ষমতা। তবে কী অন্য কিছু? যা সোহম বলতে পারছিল না। ব্যক্তিগত আবেগকে পেছনে ফেলে ঐত্রেয়ীর মাথায় বেরোবে কী করে?
সোহমের মৃত্যুর পর ছুটি নিয়ে ছুটেছিল কলকাতায়। মিলনের সঙ্গে দেখা করতে। পরিতোষ সেন জানে না।
“ব্যাপারটা কী রে? পুলিস তোকে কতবার জেরা করেছে?” মিলনের পিজি অ্যাকমোডেশনে বসে প্রশ্ন।
“বেশ কয়েকবার। প্রথমবার সোহমের সঙ্গে কার চেনা জিজ্ঞেস করতে তোর নামটা বলতে বাধ্য হলাম। তোকে ফোন করেছিল?”
“হ্যাঁ। নন-স্পেসিফিক ভাবে উড়িয়ে দিয়েছি। তোকে?”
“বেশ কয়েকবার”
“এতবার কেন?”
“কী জানি। প্রথমবারের পর ধামাচাপা পড়লেও পরে বেশ কয়েকবার জেরা করে। বোধহয় ওপর-মহল থেকে চাপ এসেছে”
“আমার ভীষণ ভয় করছে রে” ঐত্রেয়ী ভীত হয়েই বলেছিল।
“কেন?” মিলনের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
ঐত্রেয়ী মিলনের পাশে বসল। মিলনের হাত চেপে কাঁপা গলায় বলল “আমাদের কিছু হবে না তো রে? খুনের মামলা। বড্ড ভয় করছে”
ঐত্রেয়ীর স্পর্শে মিলনের শরীরে ইলেকট্রিক কারেন্ট। আগেও তো ওর সঙ্গে কত আড্ডা-গল্প-সিনেমায় কাটিয়েছে। এমন তরঙ্গ তো আগে খেলেনি। এখন কী সোহম নেই বলে? নাকি, দুর্বলতম মুহূর্তে একে অপরের সঙ্গী। মনের নয়। ছ্যাঁক করা কারেন্ট মিলনের সুপ্ত চাওয়াকে অন্য মাত্রা দিচ্ছে। বহুদিন আগে ইচ্ছে হয়েছিল সুনেত্রাকে চুমু খেতে। দূরে সরিয়ে দিয়েছিল তখন, সোহমের প্রেমে হাবুডুবু। পথের কাঁটা ঐত্রেয়ীকে কী করে সোহমের মন থেকে মুছে ফেলা যায়, সেই চিন্তায় মগ্ন।
“আমারও” মিলনও ভীত।
আবেগে ঐত্রেয়ীকে জড়িয়ে চুমু খেল। ভয় একে অপরের উষ্ণতায় আশ্রয় খুঁজছে। শ্যামলা মুখ ফ্যাকাশে থেকে বেগুনি।
“কী করছিস? ছাড়” ইচ্ছা-অনিচ্ছা মেশানো ঐত্রেয়ীর দেহ কেঁপে উঠল। সুপ্ত কামনা সোহমের অনুপস্থিতিতে মিলনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও... মধ্যবিত্ত সংস্কারে বিবেকের দংশন। দৈহিক আবেগ ফুলশয্যার রাতের জন্য। এটাই প্রথা, মধ্যবিত্ত রীতি। আজ ভয় সব রীতিকে চুরমার করতে চাইছে।
ঐত্রেয়ীকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে বলল “ভীষণ ভয় করছে রে। কোন চত্রেু ফাঁসলাম। তুই আমার পাশে থাক”
ঐত্রেয়ীও উষ্ণ আলিঙ্গনের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজছিল। সোহমের মৃত্যুর পর পুলিশি জেরায় নিজেও অসহায়। সম্বল খুঁজছিল। এখন মনে হচ্ছে মিলন সেই সম্বল। বাবাকে বললে হার্ট ফেল করবে। গোঁড়া ব্রাহ্মণ রক্ষণশীল পরিবার। নিতে পারবে মনে হয় না। ঐত্রেয়ী বিয়েতে সম্মতি দেয়নি বলে মনে দুঃখ। এখন যদি সোহমের মৃত্যুতে পুলিশি জেরায় পড়েছে শোনে, যেটুকু বিয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাও নিভে যাবে।
মিলন আঁকড়ে ঐত্রেয়ীকে। দেহে বয়ে চলেছে নিঃশব্দ লহরা। বুকে বাজছে ভয় মিশ্রিত চেনা না-জানা আশ্রয়ের স্পন্দন। কয়েক মুহূর্ত। মিলনকে সরিয়ে বলল “কী করি বল তো?”
“চল, কয়েকদিন কলকাতার বাইরে কেটে পড়ি। ভুলিস না, পুলিস কিন্তু আমাদের ওপর নজর রাখছে”
“কোথায় যাবি?”
“একটু ভাবি” ঐত্রেয়ীকে ছেড়ে মিলন ভাবছে। কোথায়? ঐত্রেয়ী ঘরের কোণে স্টোভ জ্বালিয়ে বলল “চা খাবি? করছি”
“বেশ কর” মিলনের মাথায় তখন অন্য চিন্তা।
ঐত্রেয়ীর থেকে চায়ের কাপ নিয়ে বলল “কাঁথিতে”
“হঠাৎ কাঁথি কেন?”
“ওখানে ছোটবেলার বন্ধু তরুণের পৈতৃক বাড়ি। ওরা কলকাতায় থাকে। মাসে একবার যায়। ওখানে বসে ছক কষে নিতে পারব, কীভাবে পুলিসকে ঘাড় থেকে নামানো যায়। হোটেলে গেলে পুলিস ট্রেস করতে পারে। ভাবিস না। একদিন থেকেই চলে আসব”
চিন্তা থেকে মুক্তি। যেখানে কোথাও। ঐত্রেয়ী পুলিস থেকে পালাতে চাইছে। যদি জানতে পারে কলকাতায় এসেছে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দেবে। তার আগে ছকটা তৈরি করা দরকার। এই দোলাচলে কলকাতায় সম্ভব নয়, তাই কাঁথি।
নন্দকুমারের ডানদিকে হলদিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ছেড়ে বাস যখন রামনগরের রাস্তা ধরল, মুহূর্তের জন্য হলেও, বাঁ দিকের সবুজ ঘাসের গালিচায় তাকিয়ে অতীত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান ভুলে গেছিল ঐত্রেয়ী। এই সবুজটা ব্যাঙ্গালুরুতে নেই। কাজের ফাঁকে শহর ছেড়ে বেরবার সুযোগ হয়নি। একাকিত্বে আশ্রয় খুঁজছিল দিল্লি যাওয়ার আগে। নিজের ভিটেমাটিতে। মিলনের ঠোঁটের উত্তাপে তার স্পর্শ। ওকে ঠিকভাবে চালাতে পারলে, পুলিস তাকে নাড়াচাড়া করবে না। এটা কাঁথি শহরে নয়। স্ট্যান্ডে নেমে জানল গ্রামটার নাম চাঁপাতলা। ট্রেকারে আট-দশ কিলোমিটার। ঐত্রেয়ী আগে ট্রেকার চাপেনি। ইতস্তত করছিল। অতটা ধকল। এখন কিছু করার নেই, যেতেই হবে। না হলে রাতে মাথা গুঁজবে কোথায়?
বুঝতে পেরে মিলন বলল “অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? গান গাইতে গাইতে সময় পার করে দেব”
পিচরাস্তা মিশে গেল গ্রামের মেঠ পথে। মোটরবাইকে নয়। এই পথ যদি না শেষ হয় গলা থেকে বেরচ্ছে না। আর কদ্দূর? কখন শেষ? একসময় থামল। ছিমছাম নীল রঙের একতলা তরুণদের বাড়ি। সামনে ছোট্ট বাগান। আগাছার সমারোহ। বোঝাই যায়, দেখভাল ঠিক মতো হয় না। দূরে মাঠ পেরিয়ে কয়েকটা মাটির বাড়ি। আসবার সময় দু-একটা পাকা বাড়ি চোখে পড়েছিল। চারদিকে ধু ধু মাঠ। জায়গাটা রোম্যান্টিক। তবে ভ্যানরিক্সার ধকলে ঐত্রেয়ীর রোম্যান্স ক্লান্তিতে। খাট আছে তো? না মাটিতে শুতে হবে? নীল দরজার তালা খুলল। ঢুকতেই বসার ঘর। বেতের সোফা। গদিগুলো বেশ পুরনো। পাশে ছোট্ট ডাইনিং স্পেস - প্লাস্টিকের টেবল, চারটে চেয়ার। পেছনের ঘরটা বোধহয় কিচেন। দু-পাশে দুটো ঘরে খাট, ড্রেসিং টেবল, আলনা। সংলগ্ন বাথরুম।
ঐত্রেয়ী বাথরুমে উকি মেরে আঁতকে উঠল “উফঃ”
“কী হল?” মিলন পেছন থেকে উঁকি মারল।
“আরশোলা”
“বুড়ো হতে চললি, এখনও আরশোলার ভয় গেল না?”
“খারাপ নয়” ঐত্রেয়ী খাটে পা দুলিয়ে বলল “একটু ডেসার্টেড। আশেপাশে বাড়ি ঘরদোর নেই” বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সাড়ে চার ঘণ্টা বাস জার্নি। আরও ঘণ্টাখানেক ভ্যানরিক্সায়। পিঠে ব্যথা ধরে গেছে।
জানলা খুলে মিলন অবাক “দেখ দেখ। এদিকে আয়”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠল। পেছনে ছোট বাগান। ছোট ছোট ঘাস। বড় না হলেও ঘরের তুলনায় পরিষ্কার। কোণে একটা কুয়ো। ওপাশে পুকুর। চারদিকে নিচু নামকে ওয়াস্তে পাঁচিল। পাঁচিল ঘেঁষে ফুলগাছের সারি। এই অজানা সবুজ মরুভূমিতে কেই বা ঢুকবে?
“লাভলি। মাল খেতে খেতে ছক করে নেব। চল তো। খাবার হোটেল আছে কি না দেখি”
“তোর মাথা খারাপ? এই গ্রামে হোটেল খুঁজতে বেরচ্ছিস?”
“খেতে তো হবে। মালও কিনতে হবে”
ভুলেই গেছিল মফসসলের গ্রামে খাবারের বন্দোবস্ত থাকা স্বপ্নাতীত। যেখানে খাবার দোকান নেই, সেখানে মাল। মিলন কি রোম্যান্টিক স্বপ্ন দেখছে?
খাটে গা এলিয়ে ঐত্রেয়ী বলল “মাথা খারাপ। তোকে কাঁথিতে ফিরতে হবে। খাবার, মাল যা পারিস কিনে আন। বড্ড টায়ার্ড লাগছে। একটু স্নান করে ফ্রেস হয়ে নিই। আমার বেরতে ইচ্ছে করছে না। যাবার আগে কুয়ো থেকে দু-বালতি জল তুলে দিয়ে যাস”
ভর্তি বালতিগুলো কলঘরে রাখল “খাটিয়ে নিচ্ছিস। সুদে আসলে শোধ দিতে হবে বলে রাখলাম”
মিলন বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজা বন্ধ করবার আগে ঐত্রেয়ী বলল “হুইস্কি কিন্তু খাব না। ভডকা, না হলে বাকার্ডি। ট্যাঙ্গোর বোতলও আনতে ভুলিস না”
“দেখি কী পাওয়া যায়। নইলে কালিমার্কা তিন। আর খাবার?”
“যা পাবি। এখানে কি কোনও চয়েস আছে? তুই এখনও কলকাতায় পড়ে আছিস। আসার আগে তরুণকে জিজ্ঞেস করে নিলে পারতিস। কাঁথিতে নেমে কিনেই একবারে ঢুকতাম”
সত্যি তো। ভুল হয়ে গেছে। ঐত্রেয়ীকে নিয়ে আসার আনন্দে ভাবেনি। ঐত্রেয়ী দরজা বন্ধ করে ব্যাগ থেকে তোয়ালে কাফতান বার করে কলঘরে ঢুকল। সালোয়ার-প্যান্টি-ব্রা ছেড়ে ফেলেছিল। খেয়াল হল, সাবান আনতে ভুলে গেছে। নগ্ন অবস্থাতেই ঘরে থেকে সোপ-কেস নিয়ে কলঘরে। এখানে তো দেখার কেউ নেই। ঘুণাক্ষরেও আঁচ করেনি দু-জোড়া চোখ ওর ওপর নজর রাখছে।
“তুই আমার নামটা বলতে গেলি কেন?”
“না বললেও ওরা খুঁজে বের করত। কথায় বলে বাঘে মারলে দশ ঘা, পুলিসে মারলে একশো। তোর ফোন নম্বর না দিলেও ওরা ঠিক খুঁজে বার করে তোর বাড়িতে ধাওয়া করত। মেসোমশাইয়ের কথা ভেবেই দিয়ে দিলাম। পুলিস তোর বাড়িতে জেরা করতে এসেছে জানলে, তোর কী হত বল দেখি?”
ঐত্রেয়ী মাথা নাড়ল। ঠিকই বলছে মিলন। পাড়াপড়শি আছে। ওরা দুজনে ছাড়া তো আর কেউই কিছু জানে না। বৃহত্তর স্ক্যান্ডল থেকে ওদের দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্লাস্টিকের চেয়ার দুটো টেনে পেছনের বাগানে কথা বলছিল। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। দক্ষিণ দিক বোধহয়। সূর্য পশ্চিমে আলো-আবছায়ার লুকোচুরি খেলছে। পাঁচিলের ওপারে বিস্তৃত ধু ধু মাঠ। বসতি খুবই কম, নেই বললেই চলে। একা প্রকৃতিকে উপভোগ করার জনহীন নৈসর্গিক নীরবতা। কোলাহল থেকে দূরে এই নীরব প্রকৃতির মধ্যে প্রাণভরে শ্বাস নিতে চাইছিল। মিলনের আনা সিঙাড়া আর পেঁয়াজি সম্বল।
“চা আনলাম না। ফ্লাস্ক নেই। ঠান্ডা হয়ে যাবে। একটু পরেই তো ভডকা। এখন পেঁয়াজি খা”
স্টিলের থালা এগিয়ে বলল “তোর চুলটা এখনও ভিজে”
শ্যামলা ঐত্রেয়ী কোনওকালেই সুন্দর ছিল না। সায়েন্স স্ট্রিমের মেয়েরা তেমন সুন্দর হয় না। হিউম্যানিটিজের মেয়েরা ইন জেনারেল অনেক বেশি সুন্দরী। সালোয়ার বা শাড়িতে ঐত্রেয়ীর শ্যামলা মাধুর্য আগে চোখে পড়েনি। বাংলার এই ছোট্ট গ্রামের একতালা বাড়ির বাগানে, কাফতান পরা ঐত্রেয়ীকে মধুময় লাগছে। সেটা কী ওর রূপের বাহার? না গোধূলির পড়ন্ত আলোয় ঔজ্জ্বল্য? শেষ প্রহরের রশ্মির মাখামাখিতে দেখতে পাচ্ছে ঐত্রেয়ীর আরেক রূপ। সুপ্ত কামনার অপূর্ণতায় লুকিয়ে থাকা পৌরুষকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, জাগিয়ে দিচ্ছে, সুপ্ত রুদ্ধ চাওয়ার অভিলাষে। মিলন উঠে পড়ল।
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“দাঁড়া আসছি”
ভডকা ট্যাঙ্গোয় মিশিয়ে বলল “পেঁয়াজি উইথ ভডকা ইন রুর্যাল বেঙ্গল। এ সুযোগ আর আসবে না। কাল নয় ভাবা যাবে, কী করব? আজকে এই মুহূর্তকে উপভোগ করি”
তখনও সূর্যের শেষ রশ্মি বিদায় নেয়েনি। দালানের পেছনের বাতি পড়ন্ত আলোয় ছন্দ মিলিয়ে প্রকট। মাঠের নির্জনতা আর ভডকার রেশ সুপ্ত পৌরুষকে বারবার নাড়া দিচ্ছে। উঠে ঐত্রেয়ীকে জড়িয়ে ধরে চুমু। ঐত্রেয়ীর মাথায় ভডকার কিক। সেও বহুদিন আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজছিল। মিলনকে জড়িয়ে চুমু খেল। ওর স্তন নিয়ে খেলছে। খেলুক। এই মুহূর্তে সে এটাই চায়। উন্মাদনায় ধরাশায়ী করে দিল। না... না... না। এভাবে নয়। কাফতানটা ঐত্রেয়ীর কাঁধের ওপরে তুলে ফেলে দিল ঘাসের ওপর। জিনসের বেল্ট খুলে বিবস্ত্র।
“কেউ যদি দেখে ফেলে?”
“এখানে কেউ নেই। শুধু তুই আর আমি”
সবুজ ঘাসের নরম গালিচায় বিবস্ত্র শুয়ে গোধূলির নেভা সূর্য, জ্বলা তারার দিকে তাকিয়ে, কজনেরই বা সৌভাগ্য হয়েছে প্রাকৃতিক ছন্দে সম্ভোগের আনন্দ? ঐত্রেয়ী মিলনকে আঁকড়ে ভাসতে চাইল গাঙচিলের মতো, সবুজ ঘাসের দেশে। নিম্নাঙ্গে কে যেন দামামা বাজাচ্ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে। জ্বলন্ত অঙ্গের অন্তরে লিখে দিতে চাইছে পৌরুষের রূপ। নগ্ন অঙ্গীকারে ঢেলে দিচ্ছে পুঞ্জীভূত আবেগ।
উন্মাদনায় বুঝতেও পারেনি, দু-জোড়া চোখ শুধু নয়, লেন্সের ঝুমও কাজ করছে যৌবনের উচ্ছ্বাসের আড়ালে।
সুনেত্রার মৃত্যুর সংবাদ বারবার কড়া নাড়ছে বুকে। কেঁপে উঠল ঐত্রেয়ী। কোথায় চলেছে সে?
মিলনকে ফোনে বলল “সুনেত্রা মারা গেল কী করে?”
“জানি না। তবে শেষ ফোনটা আমি করেছিলাম। তাই পুলিস আমায় বারবার জেরা করছে। আরও একটা জালে জড়িয়ে পড়লাম” মিলনের চিন্তিত স্বর বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে এখনও পুলিসের স্ক্যানারে।
দম নিয়ে বলল “দিল্লি যাওয়ার আগে একবার কলকাতায় ঘুরে যা”
ফোন কেটে দিল ঐত্রেয়ী। বেশ বুঝতে পারছে তাকে কী করতে হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।