বেয়াল্লিশ

অনিরুদ্ধ বসু

ইন্দ্রজিৎ কর পুরকায়স্থকে মধুসূদন ফোনে বলল “একটা কথা বলব স্যার। যদি দয়া করে চেন্নাই আর ব্যাঙ্গালুরু-মহাবালিপুরমের খুনের ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট রেকর্ড সেকশনে পাঠিয়ে দেন, আমি সাহায্য করতে পারি”

ইন্দ্রজিৎ ভাবল দিলওয়ানকে বললে, নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না। নিজের ইনভেস্টিগেশনেও প্রয়োজন “পরশুর মধ্যে পেয়ে যাবেন”

মধুসূদনের নিরুত্তাপ জীবনে পুঞ্জিভূত মেঘ আসন্ন ঝড়ের আভাস দিচ্ছে। ঝড়টা কোনদিক থেকে আসবে সেটাই বোঝা বাকি। মন বলছে, উত্তাল তরঙ্গে।

স্নেহাশিস বাড়িতে রিপোর্ট পড়ছিল। মেহুলির বুড়ি পিসিমাকে ট্যাপ করেছিল, সেটুকুই রিপোর্টে। কথোপকথনের তথ্য ভিত্তিহীন বলেই বাদ দিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, সবটা ভিত্তিহীন নয়। গাড়ি নিয়ে ছুটল কাঁথির নিউ বাস স্ট্যান্ড এলাকায় বুড়ির বাড়ি।

ঘরে ঢুকে বলল “আবার আপনাকে একটু জ্বালাতন করলাম”

বৃদ্ধা বসার ইঙ্গিত করল “বসো বাবা। বিরক্ত হব কেন? তোমরা পুলিসের লোক। তোমাদের সাহায্য করা আমাদের ধর্ম”

কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল “আপনি সেদিন বলছিলেন অতীনের কথা। শেষ কবে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“বহুকাল আগে। ঠিক মনে পড়ছে না। আমার ওকে কিছু দেওয়ার নেই। দেখা করবে কেন? এখন শুধু বসে আছে কবে স্বর্গে যাই। বাড়িটা দখল করতে পারবে”

“অতীনের সঙ্গে কী মেহুলি মানে কেল্টুসের যোগাযোগ ছিল?”

“তা তো বলতে পারব না বাবা। অতীন যা লোভী। থাকলেও আশ্চর্য হব না। ওদের তো অনেক টাকা। থাকতেও পারে। এসব প্রশ্ন আমায় কেন?”

একটা ছবি বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে বলল “একে চিনতে পারেন?”

বৃদ্ধা ছবিটা নিয়ে চৌকিতে রাখল “দাঁড়াও বাবা। চশমাটা নিয়ে আসি। বুড়ো হয়েছি, ছানি পড়েছে, ঝাপসা দেখি। ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করিয়ে নিতে। একা থাকি। এই বয়সে কে দেখবে? কে নিয়ে যাবে?” চশমার খোঁজে গেল।

প্রহর গুনছে স্নেহাশিস বৃদ্ধার চশমার অপেক্ষায়। পাঁচ মিনিট পর ঘরে ঢুকে বলল “খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খাটে, টেবিলে নেই। শেষে দেখলাম গীতার পাতায়” চৌকি থেকে ছবিটা তুলে দেখল “এই তো অতীন। তুমি পেলে কোত্থেকে?”

উত্তরটা আশাই করেছিল। বৃদ্ধার কনফার্মেশনে হিসেব মিলল। দাঁড়িয়ে বলল “সে লম্বা কাহিনি। একদিন বলব। পিসিমা, আপনাকে পিসিমা বলতে পারি? আপনার চশমাটা প্রায় ভেঙে গেছে। কালকেই লোক পাঠিয়ে দেব। আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। চোখ পরীক্ষা করিয়ে নতুন চশমা করিয়ে দেবে। তারপর যদি ছানি কাটাবার ইচ্ছে হয়, বলবেন। বন্দোবস্ত করে দেব”

“তুমি আমার জন্য কেন এত করবে বাবা?”

“ছেলে কী মায়ের জন্য এটুকুও করতে পারে না?”

ছবিটা ফেরত দিয়ে আঁচলে চোখের জল মুছল। এতদিন তো কেউ এমনভাবে বলেনি। ব্যথার প্লাবন আছড়ে পড়ছে, অনেক বছরের জমানো। স্বামী চলে যাওয়ার পর কারও কাছে এতটুকুও সান্ত্বনা পায়নি। তবুও বিপিন বেঁচে থাকতে খোঁজখবর নিত। এখন দিন গোনা ছাড়া আর তো কিছুই নেই। আজ মমতার ছোঁয়া নাড়িয়ে দিল। শেষ বয়সে এটুকুই বা কম কী!

স্নেহাশিস কার্ডটা এগিয়ে বলল “প্রয়োজন হলে ফোন করবেন। কালকে আমার লোক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে”

বেরিয়ে যাচ্ছিল। পেছনে শুনতে পেল বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর “দুগগা দুগগা। ইশ্বর তোমার মঙ্গল করুন”

কাঁথিতে যখন এসেছে অতীনের খোঁজ নেওয়াটাই সমীচীন। ডায়রিতে অতীনের ঠিকানা, ফোন নম্বর, যা বৃদ্ধা আগে দিয়েছিলেন। ফ্ল্যাট বাড়িটায় তালা ঝুলছে। ফোন নম্বরটা ডায়াল করতে ভেসে এল বিএসএনএল-এর রেকর্ডেড ম্যাসেজ ‘দ্য নম্বর ডাজন্ট একজিস্ট’। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, অতীন চাকরি নিয়ে মুম্বাই চলে গেছে বছর দুয়েক আগে। সেই থেকে ফ্ল্যাটে তালা। এর মধ্যে এসেছে কি না কেউ বলতে পারল না। আন্দাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে না মেহুলির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। নইলে, ওর ছবি মেহুলির ঘরে কী করে? ছবিটা ছেঁড়া কেন? তবে কী, মেহুলির মৃত্যুর দিন অতীন এসেছিল? টিকিটে সোহমের নম্বরটা নিশ্চয়ই কেউ দিয়েছিল। কে সে?

মোবাইলটা পকেটে রাখতে গিয়ে থমকাল। মানিব্যাগ থেকে মধুসূদনের চিরকূটটা বার করে নম্বর মেলাল। একই নম্বর, যা সোহমের পকেট থেকে এএসআই পেয়েছিল। অতীনেরই।

তাহলে কী অতীন শুধু মেহুলি নয়, সোহমের মৃত্যুর সঙ্গেও জড়িয়ে? সোহম কাগজে নম্বরটা লিখেছিল, মানে কেউ ওকে এই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছিল। যেমন টিকিটে লেখা সোহমের নম্বর ৯৪৩২২ ৫১২৬০। নম্বরের শূন্যগুলো আঁকাবাঁকা। চলন্ত বাসে লিখলে যেমন হয়। তাহলে কী তৃতীয় কেউ অতীনের সঙ্গে সোহমের যোগাযোগ করিয়েছিল। কে বা কারা? তারাই কী এই চত্রেুর মণি? প্রত্যেকটা মৃত্যুর সঙ্গে অতীনের অস্তিত্ব জড়িয়ে, মানে সংযোগ আছে। সেটা কী? সেখানে অতীনের ভুমিকা কী? ধোঁয়াশা কেটেও কাটছে না। অতীন বাষ্পীভূত। দীঘাতে ঢুঁ মারলে হয়। যদি অঞ্জলি রিসর্ট থেকে নতুন কোনও তথ্য পাওয়া যায়।

ম্যানেজার ডিউটি রস্টার ঘেঁটে বলল “সেদিন পুলকিতা ছিল। আজও আছে। আসুন”

রিসেপশনের ছিপছিপে শ্যামলা মেয়েটি পুলকিতা। স্নেহাশিস জিজ্ঞেস করল “সেদিন চতুর্বেদী আর মেহুলির সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছিল?”

“মনে পড়ছে না। কদ্দিন আগে” ওপাশের সোফায় বসা ছেলেটিকে বলল “এই পদা, বিশুকে ডেকে আন তো।... বিশুই ভালো বলতে পারবে। ওই তো সব ভিআইপিদের দেখাশোনা করে”

বিশু ভাবার চেষ্টা করল। কতদিন আগের কথা। মেমসাহেব নজর কেড়েছিল বলে এখনও ভোলেনি। যাবার আগে চতুর্বেদী সাহেব এক হাজার টাকা বকশিসও দিয়েছিল। সারা জীবনে যা পায়নি। তাই ওদের মনে আছে। কত ভিআইপি-ই আসে। সবার কথা কী মনে থাকে?

“হ্যাঁ, মনে পড়ছে। একজন প্রৌঢ় এসেছিল”

অতীনের ছবি দেখিয়ে বলল “এ কী?”

“হ্যাঁ, এই তো”

মানে মেহুলির মৃত্যুর সময় অতীনও চত্বরে ছিল। চতুর্বেদীর সঙ্গে অতীনের যোগাযোগ, এখানে কেন? তাহলে কী, চতুর্বেদী মেহুলিকে মুম্বাই থেকে এনেছিল, অতীনকে দিয়ে খুন করাতে? চতুর্বেদীর মতো ডাকসাইটে, দ্য হেভেনে না উঠে এই থ্রি-স্টার রিসর্টে কেন?

“ওরা কী একসঙ্গে বেরিয়ে গেছিল?”

ফোটোয় ইঙ্গিত করে বলল “না। উনি আগের দিন দেখা করে চলে যান। সাহেব আর মেমসাহেব একসঙ্গেই টাটা ইন্ডিকা করে বেরিয়ে গেলেন। কাগজে মোড়া কিছু একটা সঙ্গে এনেছিলেন। বোধহয় মদের বোতল”

চিত্রটা আরও পরিষ্কার। এই কী সেই বোতল যা মেহুলি সে রাতে পান করছিল? বোতলটা পাওয়া যায়নি। গ্লাসে টলবিউটামাইড, গ্লেনেসারাইড আর অ্যালজোলামের ট্রেস পাওয়া গেলেও বোতলটা পাওয়া যায়নি। হিসেবটা মিলতে শুরু করেছে। নিশ্চয়ই ওষুধ মেশানো ওয়াইনের বোতলটা অতীন মেহুলির জন্য উপহার এনেছিল। অসিতের কথামতো ধুতি-ফতুয়া পরা মাঝবয়সি লোক এসেছিল। সে নিশ্চয়ই অতীন। কিন্তু মেহুলি কাকার সঙ্গে দেখা করেনি, অসিতের বয়ানে স্পষ্ট। পরে হয়ত এসেছিল মেহুলির মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। বোতলটাও সরিয়ে ফেলা দরকার ছিল। বুঝতে পারেনি, ওয়াইনের গ্লাসে কেমিক্যালের ট্রেস থেকে যেতে পারে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘ত্রুাইম অলওয়েজ লিভস ইটস ট্রেসেস বিহাইন্ড’

এখনও যেটা ধোঁয়াশা, চতুর্বেদী কোথায় হাওয়া হল এই রিসর্ট থেকে টাটা ইন্ডিকায়? কেনই বা? তবে কী এটা চতুর্বেদীর পূর্বপরিকল্পিত? অতীনকে দিয়ে খুন, যা মেহুলি জানত না। সে-ই বা একা কেন দ্য হেভেনে থেকে গেল চতুর্বেদীর যাওয়ার পর? অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। এখন অতীন ছাড়া গতি নেই।

চতুর্বেদীকে প্রশ্ন করলে একটা বানানো গল্প বলবে। বৃথাই চেষ্টা। এই চতুর্বেদী-অতীন-মেহুলির কাহিনিতে ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায়? একমাত্র ড্রাগের কম্বিনেশন ছাড়া। অথবা ইনসুলিন দিয়ে মারা যায় জানানো ছাড়া। তাহলে কী ডাক্তারও এই চত্রেু? এখন তো মনে হচ্ছে চতুর্বেদী-অতীন-মেহুলির সঙ্গে ডাক্তারও জড়িয়ে। থাকতেই পারে। প্লাস্টিক সার্জেনের সঙ্গে মুম্বাইয়ের শো-বিজ ডন চতুর্বেদীর যোগসাজস আশ্চর্য নয়। অতীন ছাড়া আর যে সঠিক জবাব দিতে পারে, সে এখন পরলোকে, কাঁথির কেল্টুস, মুম্বাইয়ের নামি মডেল মেহুলি।

লোকেশের অ্যাক্সিডেন্টের পর হরিদ্বার পুলিসে অতীন এফআইআর করেছিল। জলের স্রোতে ভেসে গেছে। তখন বডিটা পাওয়া যায়নি। পরের দিন পাওয়া গেছিল লকগেটে। দেহারাদুনে ফিরেছিল লোকেশের দেহ নিয়ে। বাকি কটা দিন কেটে গেছে লোকেশের বাবা-মা আর নীতাকে সান্ত্বনা দিতে।

বিনোদ রাঠোডকে খবর দিয়েছিল হরিদ্বার থানার ওসি।

“বডি পোস্ট-মর্টেম মে ভেজা?”

“হাঁ সাব। ইধর ইনভেস্টিগেশন কে লিয়ে। ইটজ এ প্লেন কেস অফ অ্যাকসিডেন্ট। সিন অফ ত্রুাইম মে গয়া থা এফআইআরকে বাদ। এভিডেন্স কুছ নেহি মিলা। সিরিফ কই সিগারেট বাটস। উসে ভি ফরেনসিক এক্সামিনেশন মে ভেজা। ফাইল ক্লোজ করনেকে পহলে দেহরাদুন মে ছানবিন কর লে তো বড়ি মেহেরবানি হোগি”

মানে অতীনকে জেরা।

অতীন খুব স্বাভাবিকভাবে বলল “উইকেন্ড থা। লোকেশ ভি কই দিন সে বোল রহা থা কহি ঘুম আয়। ম্যায় ভি সোচা ঘুম আউ। ঐসে তো নীতাকে সাথ উসকে সাদি হোনেওয়ালা থা। পরন্তু উসকে সাথ সাদিকে পহলে দেহরাদুনকে বাহার আকেলে নেহি যা সকতা। ইসলিয়ে”

“কেয়া হুয়া থা?”

হরিদ্বার যাওয়া থেকে হর-কি-পৌরিতে বসা, ব্রিজ ত্রুস করে উলটো দিকের কালভার্ট দিয়ে হাঁটার কথা হুবহু বলে গেল অতীন।

“দোনো পেড়কে নিচে বৈঠে থে। বড়িয়া হাওয়া দে রহা থা। লোকেশ বোলা পানি মে পায়ের ভিগা লে। দোনো পানি মে উতরে। ও মেরে আগে চলা গয়া। নদীকে কারেন্ট উসে ভসা লিয়া। উস তরফ জাদা আদমি নেহি থে। ফির ভি কই আদমিকো বুলায়া। বডি ইস সময় পর পানি মে বহত দূর চল গয়া”

“দুসরা দিন বডি লকগেট সে মিলা”

“ফির পুলিস চৌকি মে এফআইআর কিয়া”

কথায় কোথাও অসমাঞ্জস্য নেই। বিনোদ রাঠোড, হরিদ্বারের ওসির এফআইআর-এর রিপোর্টের কপি পড়েছে। ন্যাচারাল অ্যাকসিডেন্ট। জলে নেমে স্রোতের টানে ভেসে যেতেই পারে।

“গয়া থা দোনো ঘুমনে, লৌট আয়া আকেলে। নেহি যাতা, তো ইয়ে কঠিনাই কা মোকাবিলা নেহি করনা পড়তা” অতীন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ম্যায় আপ ঔর উনকে পরিবারকে দুখ কো সমঝতা হুঁ। আপনে তরফ সে আপ সবকো মেরা সিম্প্যাথি”

অতীন বেরিয়ে গেল। বিনোদ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পরের দিন দুপুরে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট দেখে সমবেদনাটা ধোঁয়াশার রূপ নিল। লোকটা এফআইআরে আর বয়ানে যা বলেছে সবটা কী সত্যি?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%