দুই

অনিরুদ্ধ বসু

“দেশলাই হবে?”

সোহম ফিরে তাকাল। একজন স্বাস্থ্যবান যুবকের ঠোঁটে সিগারেট। অপেক্ষায়। রোজকার মতো মিলনের বাড়ি থেকে পিএইচডি-র কাজ করে মানিকতলা খালের ধার ঘেঁষে ফিরছিল। রাত বারোটা বেজে গেছে। সোহমের ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঝরাতে একা হাঁটার মধ্যে অন্য মজা। গাড়ির আওয়াজ নেই। লোকের চিৎকার নেই। ভিড় নেই। রাতের অন্ধকারে নির্ভেজাল হাওয়ায় চিন্তার কোষগুলো সজাগ। খালের কালো জলের ওপর স্বল্প আলোর সোডিয়াম ভেপারগুলো চিকচিক করছে।

লোকটি পাশে হাঁটছে, কথা বলার চেষ্টা করছে। ধুস শালা। নিকুচি করেছে। সোহম পিএইচডি থিসিস নিয়ে ভাবছে। কথা বলার একটুও ইচ্ছে নেই।

“সিগারেট খাই না”

সোহম আড়চোখে দেখল, অন্ধকারের বুক চিরে স্বল্প আলোয় ঝলসে উঠেছে স্টিলের ছোরা। হিস শব্দ করে গলায় ঠেকল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। তীব্র যন্ত্রণায় কয়েক ন্যানোসেকেন্ড। সমস্ত শরীরটাকে ভেদ করে পরাস্ত করে ফেলেছে। তারপর সব অন্ধকার। লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। লোকটি তার রক্তাক্ত দেহের কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের দিকে তাকিয়ে রইল। পাক্কা প্রফেশনাল কাজ। বিনা কষ্টে মৃত্যু। ছেলেটিকে চেনেও না। পকেট থেকে ছেলেটির মোবাইল বার করে খালের জলে ছুড়ে ফেলে দিল। সঙ্গে রক্তমাখা ছুরিটাও। ভালোভাবেই জানে পুলিস এগুলো দিয়েই তদন্ত শুরু করে। পারফেক্ট সুপারি কিলারের কাজ।

মানিকতলার খালের পাশে পড়ে আছে একটা লাশ। বেওয়ারিশ নিশ্চয়ই নয়। সাধারণ সাদা সার্ট, সুতির খয়রি প্যান্ট পরা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চেহারা দেখে মনে হয় মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে।

পরিতোষ সেন, এএসআই মানিকতলা বডিটার দিকে আরেকবার দেখল। স্বভাববশত মৃতর পকেটে হাত দিল। যদি কোনও হদিস মেলে। মানিব্যাগের মধ্যে একটা আইডেন্টিটি কার্ড। সায়েন্স কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি স্টুডেন্ট। বেওয়ারিশ নয়। রীতিমতো শিক্ষিত তরুণ। কিন্তু খুন করল কে?

কলকাতায় প্রতিনিয়ত যে এতগুলো খুন হচ্ছে, তার বেশিরভাগই পলিটিক্যাল। কিছু প্রোমোটারি সংত্রুান্ত। কিছু আবার প্রেমঘটিত। পরিতোষ সেন মাঝের কারণটা মন থেকে সরিয়ে দিল। নির্ঘাৎ কোনও পলিটিক্যাল বা প্রেমঘটিত হোমিসাইড। এভাবে শিক্ষিত ছেলেরা যদি খুন হতে থাকে, দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে? তারও তো, এর মতোই ছেলে আছে। ছেলের মুখটা ভেসে উঠতেই মৃতর প্রতি অনুকম্পা হল। তার ছেলের বয়সি হবে। মধ্যবিত্ত ঘরের মেধাবী ছেলে। আইডেন্টিটি কার্ডে নাম সোহম সান্যাল।

তার ছেলে সুরজিতের বয়স সোহমের মতোই। একবার এক হতচ্ছাড়া মেয়ের পাল্লায় পড়েছিল। প্রাণের টুকরো সুরজিৎকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল পাড়ার রকবাজ ডানপিটে মেয়ে অহনা। সুরজিৎ পড়াশোনায় ভালো। সে জন্যেই ওর প্রতি ছিল অহনার অমোঘ আকর্ষণ। অহনার হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে, শেষমেশ ধার দেনা করে, ছেলেকে ব্যাঙ্গালুরুতে ভর্তি করে, তবেই মুক্তি। শুধু ছেলে কেন, এই মেয়ে, ছেলের বাপকেও ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিতে পারত। যে মেয়ে পাড়ার রকে বসে বিড়ি খায়, সে কি না হবে তার পুত্রবধূ? এত পাপ করেনি। নয় নগণ্য পুলিসের চাকরি করে। তা বলে এখনও মান ইজ্জত খুইয়ে ফেলেনি। ছেলেটা নয় ব্যাঙ্গালুরু গিয়ে বিড়ি-ফোঁকা অহনার হাত থেকে বেঁচেছে। কিন্তু এই তরতাজা প্রাণ কার হাতে বলি হল?

গলার বাঁ দিকে কাটা দাগ। কাটার পেছনের দিকের অংশ একটু বেশি গভীর। মনে হয়, পেছন থেকে কেউ অ্যাটাক করেছে। ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে বড্ড মায়া হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এনআরএস মর্গে পাঠাতে হবে পোস্ট-মর্টেমের জন্য। তার আগে বাড়ির লোককে একটা খবর দিতে হবে। সোহম সান্যালের আই ডি কার্ডে কোনও ফোন নম্বর নেই। ঠিকানা আছে। পাইকপাড়ার ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের। কাগজে কনস্টেবলকে ঠিকানাটা লিখে, প্রসেসে দিতে বলল।

আশপাশে ঘুরে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া গেল না। মানিব্যাগে ন্যাশেনাল লাইব্রেরির কার্ড, ৩০০ টাকা আর চিরকুটে লেখা একটা ফোন নম্বর। নম্বরটা ডায়রি বার করে নোট করল। কার? কে জানে? পকেট ঘাঁটল, যদি মোবাইলটা পাওয়া যায়? নেই। আজকালকার ছেলের পকেটে মোবাইল ফোন নেই, ভাবতে পারে না পরিতোষ। মোবাইলের সূত্র ধরে কেস শুরু করার একটা দিশা মিলত।

আর একটু এগিয়ে গেল, ঝুপড়ির গা ঘেঁসে খালের পার ধরে। যদি কোথাও মোবাইল ফোনের কোনও হদিস পাওয়া যায়। নাঃ... বৃথা। এক যদি খালের মধ্যে ফেলে দিয়ে থাকে। সে তো আর সোহম ফেলবে না। নিশ্চয়ই আততায়ী ইচ্ছাকৃত ফেলেছে প্রমাণ লোপের চেষ্টায়। পরিতোষ ভাবল, কে ওই ময়লা খালে গিয়ে খুঁজবে? তার থেকে বডিটাকে মর্গে পাঠানো জরুরি।

হাবিলদার সুকল্যাণ ভট্টাচার্যকে বলল “বডিটা মর্গে পাঠাবার বন্দোবস্ত কর”

সুকল্যাণ জিজ্ঞেস করল “কী মনে হচ্ছে স্যার? পলিটিক্যাল?”

হঠাৎ অহনার মুখটা ভেসে উঠতেই সুকল্যাণকে বলল “মেয়ে সংত্রুান্তও হতে পারে”

সোহম সান্যালের গতিবিধি ছানবিন করতে হবে। তার সূত্র সায়েন্স কলেজ আর পাইকপাড়া। তারপর কেস রুজু কর। সেই কেস চলতেই থাকবে। যেমন আরও হাজারটা কেস চলতে থাকে। বছরের পর বছর যার কোনও কিনারা হয় না। সোহমের পরিবার, বিচারের আশায় আদালত চত্বর ঘুরে ঘুরে, একদিন হতাশ হয়ে, আশা ছেড়ে, বীতশ্রদ্ধ হয়ে আবার ফিরে যাবে, তাদের পরিবর্তিত জীবনে। সোহম স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। যার ছবিতে, প্রতি বছর জন্ম বা মৃত্যুদিনে হতভাগ্য বাবা-মা চোখের জল মুছে মালা দেবে। সোহম কিন্তু ফিরে আসবে না।

পাইকপাড়ার ইন্দ্র বিশ্বাস রোডের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দরজার বাইরের লেটার বক্সটা দেখল পরিতোষ সেন। শ্রী রজত স্যান্যাল ডব্লিউবিসিএস (রিটায়ার্ড)। নিশ্চয়ই সোহমের বাবা।

কড়া নাড়তেই দরজা খুললেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। পরণে ধুতি। খালি গা। মাথা ভর্তি টাক। পরিতোষ সেনকে দেখে চমকে উঠল। জিজ্ঞাসু চাহনি।

পরিতোষ বলল “আপনি সোহম সান্যালের...”

“বাবা। কী ব্যাপার?”

“ভেতরে আসতে পারি?”

একটু লজ্জিত হয়ে বলল “হ্যাঁ... হ্যাঁ... আসুন”

মধ্যবিত্ত পরিবেশ। সরকারি চাকরিজীবীর রিটায়ারমেন্টের পর অনাড়ম্বর গন্তব্য। কোনও এসি নেই। পাখাটা চালিয়ে বেতের সোফাটার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন “বসুন”

সোফায় বসে পরিতোষ বলল “সোহমের কোনও খোঁজ রাখেন?”

“কাল রাতে তো এখানেই ছিল। খেয়ে বলল রাতে ফিরবে না। বন্ধু মিলনের বাড়িতে থেকে রাতে থিসিসের কাজ অনেকটা এগিয়ে আনবে। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তো। তাই খাটাখাটনি বেড়েছে। আমিও রিটায়ার করেছি। বলল, তাড়াতাড়ি শেষ করে আমার বোঝা একটু হাল্কা করতে চায়” উদগ্রীব হয়ে বলল “কী হয়েছে?”

পরিতোষ সেন ওনার কথা যেন শোনেনি। ঘরের অন্য দিকে তাকিয়ে বলল “বাড়িতে আর কে কে আছে?”

“ওর মা। আর বোন প্রিয়ানা। কিন্তু প্রিয়া তো এখন বাড়ি নেই। ও তো কলেজে গেছে”

পরিতোষ সেন অস্বস্তিতে বলল “ওর মা আছেন?”

মাথা নাড়ল বৃদ্ধ। উঠে রান্নাঘরে উঁকি মেরে বলল “এখানে একবার এস তো। পুলিস এসেছে। সোহমের ব্যাপারে কিছু বলতে। তোমাকে ডাকছে”

সবুজ পাড়ের সাদা শাড়িতে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন বৃদ্ধা। এক পলক তাকিয়ে কেঁপে উঠল পরিতোষ সেনের বুক। আহা, তার নিজের স্ত্রীকে যদি একথা বলতে হত।

“কী হয়েছে সোহমের?”

পরিতোষ সেন এবার আরও অস্বস্তিতে উশখুশ করতে লাগল। আর তো হেঁয়ালি করা যায় না। কথাটা এবার পাড়তে হবে। উলটো দিকের সোফার দিকে ইঙ্গিত করল “আপনারা বসুন”

ভয় মেশানো আশঙ্কা দুজনের। শান্ত স্বরে বলল “আপনাদের জন্য একটা খারাপ খবর আছে”

মা উদ্বিগ্ন “কেন? কী হয়েছে সোহমের?”

পরিতোষ সেন মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বলল “সোহম আর নেই”

“মানে?” চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ।

“আজ সকালে মানিকতলা খালের পাশে ওর বডি পাওয়া গেছে। ইট ইস প্রব্যাবলি হোমিসাইড”

“খুন হয়ছে?”

বৃদ্ধের কথা বেশিদূর গড়াবার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন সোহমের মা। পুত্রহারা মায়ের বুকফাটা কান্না। হাহাকার। সব হারিয়ে যাওয়ার আর্তনাদ। সোহম আর নেই। আর ফিরে আসবে না। কাল রাতে খাওয়ার পর তো শেষ দেখেছিল সোহমকে। আর দেখা হবে না? নির্বাক দুটো প্রাণ একে অপরকে নিঃশব্দে সান্ত্বনা জানাচ্ছে। জীবনের বেঁচে থাকার শেষ আলোটা দমকা হাওয়ার ঝাপটে, নিস্তব্ধ সীমাহীন অন্ধকারের কোলে ঢলে পড়েছে। সে অন্ধকার চিরস্থায়ী। শেষ বয়েসের একটুকরো আলোর মধ্যে চিরায়িত অনন্ত অশ্রুশিক্ত হতাশার বালুচর।

এরকম পরিস্থিতির সামনে অন্তত তিরিশটা বসন্ত পার হয়ে গেছে পরিতোষ সেনের। এ মুহূর্তে কোনও কথা চলে না। নিঃশব্দে বসে থাকা ছাড়া।

একটু আত্মস্থ হতে রজত সান্যালকে বলল “ওকে নীলরতন মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনারা চাইলে আমার গাড়িতে আসতে পারেন”

বৃদ্ধ একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন “না থাক। আপনি চলে যান। আমরা একটু পরে যাব। ... যদি কিছু মনে না করেন, আপনার মোবাইল নম্বরটা দেবেন? ওখানে গিয়ে নয় আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব”

প্যাডে নিজের নম্বরটা লিখে মাথা নিচু করেই বলল “সোহমের কোনও মোবাইল ছিল?”

“হ্যাঁ ছিল। লিখে নিন ওর নম্বরটা ৯৪৩২২ ৫১২৬০”

ডায়রিতে নোট করল “মোবাইলটা কিন্তু কোথাও পেলাম না। কাল রাতে কি নিয়েছিল?”

একটু ইতস্তত করে বৃদ্ধ বললেন “ঠিক মনে নেই। সব-সময় তো ওটা নিয়েই যায়। নিশ্চয়ই নিয়ে গেছিল। তবুও যখন বলছেন, পরে আরেকবার খুঁজে দেখব”

পরিতোষ উঠে পড়ল। এখন এর বেশি আর প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

“কাল কতক্ষণ পর্যন্ত সোহম ছিল?” মিলনকে সরাসরি প্রশ্ন।

“রাত বারোটা। বলেছিলাম থেকে যেতে। প্রথমে একটু হেজিটেট করছিল। পরে বলল বাড়ি চলে যাবে”

“এত রাতে?”

“বলল মানিকতলা থেকে শেষ বাসটা ধরতে পারবে। কোনও অসুবিধা হবে না। ... তার মানে এখান থেকে যাওয়ার পরই ঘটনাটা ঘটেছে”

“সেরকমই তো মনে হচ্ছে। অবশ্য পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টটা পেলে টাইম অফ ডেথ সম্বন্ধে আরও স্যাঙ্গুইন হওয়া যাবে”

মিলনের মানিকতলার পিজি অ্যাকোমোডেশনের দিকে দেখল। টিপিক্যাল ব্যাচেলারের ঘর। দড়ির ওপর প্যান্ট, সার্ট, আন্ডারওয়ার ঝুলছে। এখানে-ওখানে ছড়ানো বই। খাটে নোটবুক কম্পিউটার। জানলার পাশে তোয়ালে।

খাটের পাশের চেয়ারটায় বসে বলল “কালকে রাতে ওকে ডিস্টার্বড দেখেছিলেন?”

“মনে হল ডিস্টার্বড”

“কেন?”

“ঠিক বলতে পারব না। অস্থির ভাব। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। নোটবুকে থিসিসের কাজ করছিলাম। মাঝে মাঝেই বলে উঠছিল ‘তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে রে। বাবা রিটায়ার করেছে। প্রিয়া তো এখনও কলেজে পড়ে। একটা চাকরি না জোগাড় করলে বাবা আর টানতে পারবে না। প্রিয়ার বিয়েও তো দিতে হবে’ আমরা মধ্যেবিত্ত ঘরের ছেলে। চাকরিই আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অস্ত্র। আমাদের কী পিএইচডির শৌখিনতা চলে?”

মধ্যবিত্ত ছেলেদের কী করা উচিত, কী নয়, বিশ্লেষণ করে কী লাভ? সেও তো নিজের ছেলেকে ব্যাঙ্গালুরুতে পড়তে পাঠিয়েছে। মধ্যবিত্তদের তো শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনও অস্ত্র নেই। সেটাই একমাত্র পুঁজি।

“নতুন কী? ওর বাবা তো রিটায়ার করেছে বেশ কিছুদিন। হঠাৎ কালকে ডিস্টার্বড কেন? চাকরির তাড়া তো নতুন নয়?”

“হতে পারে ঐত্রেয়ীর সঙ্গে মনোমালিন্য বা অন্য কোনও কিছু”

“ঐত্রেয়ী কে?”

“সোহমের প্রেমিকা। আমাদের ব্যাচমেট”

“কোথায় থাকে?”

“আগে এখানেই থাকত। এমএসসি পাশ করার পর অনেকদিন ঘরে বসে ছিল। আমরা পিএইচডি শুরু করলাম। অনেকদিন ঘরে বসে হাঁপিয়ে উঠে, চাকরি নিয়ে শেষমেশ ব্যাঙ্গালুরু চলে গেল”

“কোথায়?”

“দ্য নিউ এজ বলে একটা কোম্পানিতে”

“কীসের কোম্পানি?”

"অত বলতে পারব না। একজন বাঙালি মহিলার কম্পিউটার ফার্ম। বোধহয় আউটসোর্সিং-এর কাজ করে”

“ঐত্রেয়ীর ফোন নম্বর আছে?”

মোবাইলটা থেকে বলল “লিখে নিন”

নম্বরটা লিখতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল সোহমের মোবাইলের কথা। মানিকতালার খালের ধারে ওটা পায়নি। বাড়িতেও রজত সান্যালও ওটা খুঁজে পাননি।

“আপনার সঙ্গে থিসিস আলোচনার সময় মোবাইল ছিল?”

দ্বিধা না করেই মিলনের উত্তর “হ্যাঁ ছিল। ... একটা ফোনও এসেছিল। বোধহয় ঐত্রেয়ী”

পরিতোষ সেন ছোট পুলিস অফিসার হতে পারে, কিন্তু এ লাইনে বহুদিন। কোনও যদি, মনে হয়, এসবের মধ্যে নেই।

“কেন মনে হল?”

“সোহমের ঐত্রেয়ীর সঙ্গে কথা বলার একটা টিপিক্যাল ম্যানারিজম আছে। তুই-তুকারির মধ্যেও বিশেষ আন্তরিকতা। যেমন হয়ে থাকে বন্ধুত্বের মধ্যে প্রেম থাকলে। প্রকাশটা অন্যদের থেকে একটু আলাদা”

“কিছু বলেছিল ঐত্রেয়ী সম্বন্ধে?”

“হ্যাঁ। বলেছিল ‘শালা কবে থিসিস শেষ করে চাকরি নিয়ে ঐত্রেয়ীকে বিয়ে করব, তা না, সেখানেও ঝামেলা’ আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘কী হয়েছে?’ বলেছিল ‘ছাড় তো। চল্ কাজটা আগে নামাই’”

“কেন বলতে পারেন?”

“না। কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিলাম। এমনিতে ওদের কথায় আড়ি পাতি না। তবে শুনলাম সোহম বলছে ‘বিয়ে করেতে দেবে না। মামদোবাজি’। ভাবলাম আবার হয়ত সুনেত্রা কিছু ঝামেলা পাকাচ্ছে”

“সুনেত্রা কে?”

“আমাদের একই ব্যাচের ছাত্রী। ঐত্রেয়ীর মতো এমএসসি পাশ করে শেষে মুম্বাই চলে গেল”

“সুনেত্রা ঝামেলা করতে যাবে কেন?”

“সুনেত্রাও সোহমকে ভালোবাসে। সোহম কিন্তু ঐত্রেয়ীকেই। লাভ ট্রায়াঙ্গেল। আর তো কোনও কারণ নেই”

পরিতোষ সেন পকেট থেকে ডায়রিটা বার করে বলল “এই নম্বরটা কার বলতে পারেন?”

মিলন ডায়রিতে লেখা নম্বরটা দেখে মাথা নাড়ল “জানি না। আমাদের চেনা-জানা কারও নয়”

“সুনেত্রার নম্বরটা আপনার কাছে আছে?”

“কেন থাকবে না? লিখে নিন”

ডায়েরিতে সুনেত্রার নম্বরটা লিখে নিল “সুনেত্রার কী অন্য কোনও অ্যাসোসিয়েশন ছিল?”

“কী করে বলব? গোঁড়া মারোয়ারি ফ্যামিলির মেয়ে। দেব-দেবীর প্রতি বেশি আসক্তি। আমাদের বয়েসে সহজে দেখা যায় না”

উঠে পড়ল পরিতোষ। এই মুহূর্তে এর বেশি কথা বলে লাভ নেই। বরং ঐত্রেয়ী কিংবা সুনেত্রার সঙ্গে কথা বলে যদি কোনও ক্লু পাওয়া যায়। কী মনে হতে দরজা থেকে মুখ ঘুরিয়ে বলল “কোনো পলিটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন?”

“নাঃ। সময় কোথায়? আমাদের জেনারেশনের পলিটিক্সে ইন্টারেস্ট নেই। যে যায় লঙ্কায় সেই তো রাবণ” কথার সত্যতাটা পরে খাতিয়ে দেখবে পরিতোষ।

“খুন হল কেন?”

“কী করে বলব? সেটা তো আপনাদের কাজ। লাভ ট্রায়াঙ্গেল হতে পারে। কিন্তু তার জন্য খুন! ভাবা কঠিন”

পরিতোষ সেন চলে যাচ্ছিল। মিলন দরজায় এগিয়ে এসে বলল “ওই যে জিজ্ঞেস করলেন সোহমকে ওইদিন অন্যরকম লাগছিল কি না? শুধু ওদিন নয়। বেশ কয়েকদিন থেকেই ওকে বেশ অন্যমনস্ক লাগছিল”

“কেন?”

“বলা কঠিন। এই বিয়ের ব্যাপার নিয়ে ঝামেলা হতেও পারে। চাপা ছেলে। সব কথা বলত না। আমিও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করব। যদি কিছু পাই, আপনাকে জানাব। আপাতত মেসোমশায়ের কাছে যাই। ওনারা নিশ্চয়ই বড্ড অসহায় এখন”

পিজি অ্যাকমডেশনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পরিতোষ। যা জেনেছে, সেগুলো আরও একটু খাতিয়ে দেখতে হবে। ঐত্রেয়ীর সঙ্গে কাল সকালেই একবার কথাও বলতে হবে। সুনেত্রার সঙ্গেও।

এই দৃশ্যটা যে বারবার কেন দেখতে হয়? তবুও চাকরি। করতেই হবে। বাবাকে দিয়ে ছেলের বডি আইডেন্টিফাই করানো। মা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। পাড়া-পড়শি বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন সান্ত্বনা দিচ্ছে। গা-সওয়া হলেও বুকে বাজে। কারও তো ছেলে। নিজের ছেলে হলে কী এরকম নির্লিপ্ত হতে পারত? সুরজিতের কথা মনে হতেই ভাবল এবার ওর জন্য পাত্রী দেখতে হবে। ছেলেটা ব্যাঙ্গালুরুতে একা পড়ে। কখন কী হয়ে যায়। ওখানে তো কেউ দেখার নেই।

ভিড়ের মধ্যে থেকে মিলন এগিয়ে এল “ঐত্রেয়ীর সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না। সময় পাইনি। তবে বলব”

“দেখবেন স্যার এই কেসটার যাতে একটা সুরাহা হয়। আমরা যা হারালাম তা তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু মাসিমা মেসোমশায়ের মুখ চেয়ে একটু দেখবেন। আমাদের তো কোনও ক্যাচ নেই। আপনারাই যা একটু ভরসা”

সেদিন বোঝেনি। আজ বুঝছে। সোহমের মৃত্যুটা মিলনকে কীভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ভরসা করা আর ভরসার যোগ্য মর্যাদার মধ্যে অনেক তফাত। পরিতোষ সেন তো সামান্য একজন সাব-ইন্সপেক্টর। এরপর বড়বাবুর কাছে কেস যাবে। তারপর লালবাজার। তদন্ত চলবে। কোর্ট-কাছারি।

পথ অনেক অনেক অনেক দূর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%