অনিরুদ্ধ বসু
“বাঁচাও...”
নীচ থেকে নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকার কাচের জানলা ভেদ করে স্নেহাশিসের কানে পৌঁছল। মুম্বাইয়ের ভ্যাপসা হিউমিডিটির জন্য, শিরিনের তেরোতলার ফ্ল্যাটের জানলা দরজা বন্ধই ছিল। ড্রয়িং রুমে স্প্লিট এসি চলছে। কোণে ব্রাসের ফ্লোর ল্যাম্প মৃদু আলোকিত করেছে নাতিশীতোষ্ণ ঘরের একাংশ। টেবলে ছড়ানো কাবাব, স্যসেজ, চিপস্, ফিশফ্রাই। সবে তৃতীয় পেগে চুমুক দিয়েছে। শিরিন শুনতেও পায়নি। ভডকা স্প্রাইটের গ্লাস ফেলে আরও কিছু ভাজতে গেছে।
“করছ কী? এত খাওয়া যায়?”
“এতদিন পরে এলে, রান্না করে খাওয়াব না? সব হোম মেড। পেট খারাপ হবে না। আসছি...”
সেই মুহূর্তে নারীকন্ঠের আর্তনাদ।
“কারও চিৎকার শুনলাম”
“ক পেগ হল? এখনই উলটোপালটা শুনছ। একটু পরে আমাকেও চিনতে পারবে না” শিরিন ফ্রায়েড প্রনগুলো টেবলে রেখে ভডকা নিয়ে সোফায় বসল। কত বছর পর স্নেহাশিসকে পেয়েছে। সন্ধেটা মাটি করতে চায় না।
যত খাক পুলিসের কান সর্বদা সজাগ। মনে হল না ভুল শুনেছে। শিরিন সি-থ্রু সরু স্ট্র্যপের গোলাপি নাইটি পরে। তার ওপর অগোছাল হাউসকোট। শিথিল দড়ির আলগা প্যাঁচ। টেবলে ক্লাসিকের প্যাকেট এগিয়ে বলল “কিছুই তো খাচ্ছ না। তোমার জন্য সারাদিন কত কষ্ট করে রান্না করলাম”
ফ্রায়েড প্রন মুখে পুরে স্নেহাশিস বলল “এই তো খাচ্ছি। সত্যি আওয়াজ শোননি?”
“না শুনিনি”
“তোমার আতিথিয়তায় এক সপ্তাহেই ভুঁড়ি বেড়ে যাবে”
অভ্রদিতা আজকাল স্নেহাশিসের ওজন নিয়ে সজাগ। জানে স্নেহাশিস মুম্বাইতে তদন্তের জন্য। যদি জানত, শিরিনের ম্যাগনাম টাওয়ার্স র ফ্ল্যাটে সান্ধ্য আসর, কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিত। বিয়ের আগে কম কৈফিয়ত দিতে হয়নি। শিরিনের সঙ্গে সম্পর্ক কী? কদ্দূর গেছিলে? নিছকই বন্ধুত্ব না অন্য কিছু? মহিলাদের কেবলই হারানোর ভয়। আগলে রাখার মধ্যেই শান্তি। গয়না থেকে স্বামীপুত্র। সত্যি কী আগলে রাখা যায়? কে বোঝাবে অভ্রদিতাকে?
সিগারেটের ধোঁয়া ছুড়ে শিরিন বলল “আরও কটা পেটে পড়ুক। তখন চিৎকারের বদলে প্রেমের গান শুনবে। এটা সিনেমাপাড়া। কোন নায়িকা মাল খেয়ে মাকে ঠেঙাচ্ছে, কোন হিরো বউকে পাশের ঘরে বন্ধ করে, কোনও উঠতি মডেলের সঙ্গে রঙিলা - এসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছ, করে যাও। ইয়ে মুম্বাই সেলিব্রিটি লোগকা নাইট লাইফ। ছোড়ো”
কানে এল গুঞ্জন। ত্রুমশ হৈ হৈ তে পৌঁছতে আর সংযত থাকতে পারল না স্নেহাশিস। ড্রয়িংরুম সংলগ্ন ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল। তেরোতলা থেকে অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। মনে হল কোনও মেয়ের বডি নীচে পড়ে। তাকে ঘিরছে ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। লক্ষ করল, কালো স্যানট্রো গাড়ি বেরিয়ে গেল।
“ভুল শুনিনি। কিছু একটা হয়েছে”
“কেন লাফড়ায় জড়াচ্ছ?” শিরিন সাজানো সন্ধে মাটি করতে চায় না। স্নেহাশিসকে বোঝাবে কী করে?
তেরোতলা থেকে লিফটে স্নেহাশিস যখন নীচে পৌঁছল ভিড় জমে গেছে। ভিড় ঠেলে বডিটার দিকে এগোতে বাধা দিল পুলিস। সাত বাংলার পুলিস চৌকির এএসআই ততক্ষণে ওখানে। সারা মুখে রক্ত। মাথা থেতলে ব্রেনের কিছু অংশ বেরিয়ে গেছে। বেশভুষা বোঝাচ্ছে মহিলার মৃতদেহ। ঘিয়ে রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা রক্তাক্ত পিণ্ড। দুটো পা-ই ফ্র্যাকচার। ডান হাতটা ওপরের দিকে। বাঁ হাত পেটের ওপর। নিশ্চয়ই বেঁচে নেই। তবুও সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য এগতেই পুলিস পথ আটকাল “থাম্বা! টিকরে জানার নাই”
অন্যান্য পুলিস ভিড় সামলাতে ব্যস্ত। ভিড়ের মধ্যে কে বলে উঠল “ইয়ে তো সুনেত্রা। কেও কুদ পড়ি?”
বেঁচে আছে কি না জানতে হবে তো। আইডি কার্ড বার করে এএসআইকে দেখাতেই স্যালুট ঠুকে সরে দাঁড়াল। পালস্ নেই। নিশ্বাস নিচ্ছে না। প্রাণের স্পন্দন পেলে সেটা প্রায়রিটি। ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল।
মোবাইলে রোশনকে ফোন “ব্যস্ত হো?”
“নেহি। সিনেমা সে লৌট রহা হুঁ বিবিকো লেকর”
“ম্যাগনাম টাওয়ার্স মে হু। অভি ইধর এক লড়কি কুদ পড়া। মুঝে হোমিসাইড লাগতা। খুন কে সিলসিলে মে আয়া। ইধর ঔর একঠো মার্ডার”
“কৈসে মালুম মার্ডার?”
“দিল বোলে”
"ঠহের। অন্ধেরি ইস্ট মে হু। বিবিকো ঘর ছোড় কর আ রহা। কৌন কমপ্লেকস মে?”
“ম্যাগনাম টাওয়ার্স । আ কর ফোন লাগানা”
“আধে ঘণ্টে মে”
শিরিন এই ফাঁকে আরও দুপেগ ভডকা গিলেছে। তাড়াতাড়ি খাওয়ায় নেশা চড়েছে। চাপা উত্তেজনাকে লাগামে আনার চেষ্টা। টেবলে পড়া মোবাইলটায় “বাত হুয়া?”
“অভি বৈঠা থে হোনে কে লিয়ে। কোন কমবক্ত ফ্ল্যাট সে কুদ পড়া। উসকো দেখনে গয়া”
“আনে সে বাত কর লেনা”
স্নেহাশিস ঘরে ঢুকতেই মোবাইল কেটে দিল। ঝুঁকতেই কোমরের দড়ি খুলে গেল। নেশার ঘোরে লক্ষ করেনি। সোফায় গা এলাতেই স্নেহাশিসের চোখ পড়ল সি থ্রু গোলাপি নাইটির তলায়। উলটো সোফায় গা এলিয়ে হুইস্কিতে চুমুক। সন্ধেটাই মাটি। খুনের কিনারা করতে এসে আরেকটা মৃত্যু। কেবলই মনে হচ্ছে, এটা আত্মহত্যা নয়, হত্যা! বেশ কিছুটা হুইস্কি গিলে বলল “কে বলল মেয়েটির নাম সুনেত্রা”
ভাবলেশহীন, চতুর্থ ভডকায় স্প্রাইট ঢেলে বলল “সুনেত্রা? আমার উলটো দিকের ফ্ল্যাটের? ... সুনেত্রা আগারওয়াল। হঠাৎ আত্মহত্যা করল কেন?”
“হত্যা না আত্মহত্যা ইনভেস্টিগেশন না করে বলা যায়? কী করত?”
“এজেন্সিতে চাকরি। ছাড়ো তো”
হাউসকোট কাঁধের ওপর। ভডকার গ্লাস হাতে টলতে টলতে উঠে স্নেহাশিসের পাশে। হাতটা কাঁধে ছড়িয়ে ওর মুখটা টেনে গালে আলতো করে চুমু “দ্য নাইট ইজ স্টিল ইয়ং। কথা দিয়েছিলে আজকের সন্ধে শুধু আমার জন্য” চুমু খেয়ে বলল “জাস্ট ফর মি”
প্রেম, যৌবন, শিরিনের ঠোঁটের স্পর্শ - সব বেসুরো এই মুহূর্তে। তানপুরাটা ঠিক সুরেই বাজছিল। হঠাৎ মেয়েটির আকস্মিক মৃত্যু কর্ডগুলো ছিঁড়ে দিয়েছে। ছন্দ নেই। রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ মিলেমিশে চিন্তায় গোলাকার। শিরিন কী পাষাণ? পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে মারা গেছে, অথচ নির্বিকার। খুপড়ির আবদ্ধতা কী অনুভুতিটাকেও গ্রাস করেছে! একে অপরকে চেনে, সম্পর্ক তৈরি হয়। পাশাপাশি চলে। পাশের মানুষটা যখন হারিয়ে যায়, একটু চোখের জল, একটু সামাজিক আতিথিয়তা। ব্যস। জীবন চলতে থাকে নিজের গতিতে... তাহলে কী সম্পর্কের মূল্যটাই স্থূল? এটাই পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু এই ব্যাপ্তি যে এত কম, ভাবতেও পারছে না।
তোমার পাশের ফ্ল্যাটের একজন মারা গেছে। ইউ সিম আনকনসার্নড?”
“হার্ডলি নিউ হার একসেপ্ট ফর হার ফেস। লিফটে দেখা হলে একটু হাসি। দ্যাটস অল” স্নেহাশিসের ওপর দেহটা ছড়িয়ে বলল “এতে কী অনুভুতি জন্মায়? তোমার কোলে শুয়েও তো অনুভুতি জাগাতে পারছি না। হাউ ডু ইউ এক্সপেক্ট মি টু বি পারটার্বড বাই হার ডেথ?”
মিথ্যে বলেনি। এবার সাড়া না দিলে মুম্বাই আসাই পণ্ড। অভ্রদিতা আর কোনওদিনও কলকাতার মুখ দেখবে না। রোশন আসার আগে হাতে মোটে আধঘণ্টা। শিরিনের উত্তেজনাকে প্রশ্রয় না দিলে মেহুলির খুনের কূল-কিনারা হবে না।
শিরিনের নাভিতে বিলি কেটে বলল “ইউ আর রাইট। দ্য নাইট ইজ স্টিল ইয়ং” মুখটা নামিয়ে শিরিনকে চুমু। ভডকার গ্লাস টেবলে রেখে ওর গলা জড়িয়ে ধরে মুখটা টেনে আনল নিজের বুকে। শিরিনের বুকে মুখ রেখে স্নেহাশিস ভাবছে - এও কী ভালোবাসা? শিরিন অতিরিক্ত ভাবেই ভালোবাসতে চাইছে? রোশন না আসা পর্যন্ত বুকে মুখ গুঁজেই ভাবতে হবে। রোশনের ফোনে শিরিনকে ছেড়ে উঠে পড়ল।
“কোথায় চললে?” জড়ানো গলায় শিরিন।
“রোশন এসেছে। মেয়েটির মৃত্যুর তদন্ত করতে। ওকে গিয়ে হেল্প করি”
চমকে উঠল শিরিন “এর মধ্যে তুমি কেন?”
“রোশন অনেক দিনের বন্ধু। সকালে যাকে এয়ারপোর্টে দেখলে। যখন আছি, দেখি বুদ্ধি দিয়ে যদি সাহায্য করতে পারি”
বিমর্ষ শিরিন হাউসকোট পেঁচিয়ে কোমরের দড়ি বাঁধল “কোথায় ভাবলাম এতদিন পর জমিয়ে আড্ডা দেব। তা না, উনি চললেন অন্য কে মরেছে, তার তদন্ত করতে। তোমাদের পুলিস অফিসারদের বলিহারি। খুন রাহাজানি আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পার না?”
“রাতে তো এখানেই। দ্য নাইট ইস স্টিল ইয়ং মাই বিউটিফুল লেডি”
জানে আপত্তি জানিয়েও লাভ নেই। তবুও আবদারের সুর “না গেলেই নয়?”
“তুমি ডিনার রেডি করো। এই এলাম...” কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেল স্নেহাশিস।
ওসিওয়ারা থানার ওসি যখন বডিটার সদগতি নিয়ে ব্যস্ত, কেয়ারটেকারের কাছ থেকে সুনেত্রার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে দরজা খুলে ঢুকল। স্নেহাশিস লক্ষ করল দরজায় নেমপ্লেট নেই। সাজানো না হলেও, ছিমছাম। একই কমপ্লেক্সে হলেও ইনটিরিয়ারের তারতম্য দেখে বোঝা যায়, শিরিনের সঙ্গে আর্থিক পার্থক্য। ড্রয়িং রুমে বেতের সোফা। এক কোণায় বাঁকুড়ার কিছু মূর্তি। দেওয়ালে ব্যুটিকের চিত্রপট, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। সাধারণ টিভি। বেতের দুটো মোড়া। সোফার ওধারে ডিভান। ডায়নিং সাইডে কাচের টেবল। ওপরে খালি কাচের গ্লাস। চারটে রট আয়রনের চেয়ার। সবের মধ্যে বাংলার পরিচ্ছন্ন ছাপ। মেয়েটি নিশ্চয়ই কলকাতার। বাংলার সঙ্গে কোথাও বন্ধন। ফ্ল্যাটে কী এমন হল, মেয়েটাকে তেরোতলা থেকে লাফ দিতে হল?
কাচের টেবলে চোখ পড়তেই স্নেহাশিস ওদিকে। মোবাইল ফোন। স্বভাবসিদ্ধ পুলিসি কায়দায় স্যামসাং মোবাইলে কল হিস্ট্রিতে চোখ। প্রচুর কল। ইনকামিং-আউটগোয়িং নিয়ে প্রায় খান তিরিশ। শেষ কল মিলন চ্যাটার্জির। মারা যাওয়ার আগে শেষ কলটা ওর থেকে। কলের টাইম নোট করল। কে এই মিলন চ্যাটার্জি? শুধু ঘরের আসবাব নয়, ফোনেও বাংলার সঙ্গে লিঙ্ক।
কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করল “কেয়া নাম উসকা?”
“সুনেত্রা আগারওয়াল”
“বাঙ্গাল কা?”
“মালুম নেহি সাহাব”
“উনকা আপনা ফ্ল্যাট?”
“কিরায়া মে। ইয়ে ফ্ল্যাট কোই কোম্পানি কা”
“কৌন কোম্পানি?”
“মালুম নেহি। সেত্রেুটারি সে পুছনা”
এখানে শিরিনের এসির সোয়াস্তি নেই। মুম্বাইয়ের ভ্যাপসা গরমে দরদর করে ঘামছে।
“রোশন ফ্যান চলা দে ভাই”
ফ্যানের হাওয়ায় কিছুটা সোয়াস্তি। ফিরে গেল দরজায় ডবল চেক করতে। সেলফ লকিং তো? হ্যাঁ। মনে পড়ল শিরিনের ফ্ল্যাট ছেড়ে বারান্দায় আসতে একটা কালো স্যানট্রো বেরতে দেখেছিল। মৃত্যুর পরমুহূর্তে কে বেরিয়ে গেল? রোশন যখন বারানদায় ক্লু খুঁজছে, স্নেহাশিস সুনেত্রার মোবাইলের ফোনবুক স্ক্রোল করছে। সন্নিধি নামে এসে থমকাল। কিছুদিন আগেই না সন্নিধি বলে একটা মেয়ে গুরুতর যখম হয়েছিল মাথেরানের পথে। এ সে নয়ত?
“রোশন কুছদিন পহলে ম্যাথেরনকা সড়ক মে এক অ্যাক্সিডেন্ট হুয়া থা?”
বারান্দা থেকে রোশনের জবাব “হাঁ। কেঁও?”
“ও কেস কৌন ইনভেস্টিগেট কর রাহা?”
“কেয়া মালুম। ডিজি বোল সাকেগা। ও তো মুম্বাইকে বাহার কা”
আবার স্ক্রোল করতে ভওয়ানিশঙ্করের নাম। নামটা চেনা। বহুবছর আগে মেয়েঘটিত ব্যাপারে হেডলাইনসে। সময়ের গতিতে যেমন সব সেনসেশনাল খবর চাপা পড়ে যায়, সেই খবরও অতীত।
বেডরুমে ডবল বেডেড খাট, ড্রেসিং টেবল, আলমারি। সাদামাটা আসবাব। জানলার কোণার টেবলে নোটবুক প্লাগ লাগানো কম্পিউটার। সুইচ অন করতেই স্ক্রিনে ‘লোডিং উইন্ডোস এক্স পি হোম এডিশন’ দেখে স্বস্তি। পাসওয়ার্ড ছাড়া কম্পিউটারে ঢুকতে পারবে। কম্পিউটারে কিছু প্রকৃতির ছবি। মাই পিকচার্স-এ অনেক মনোরম দৃশ্য। দার্জিলিং, কুতুব মিনার থেকে ব্যান্ড্রা বিচের পানিপুরি ডাবওয়ালা। মেয়েটার ছবি তোলার শখ ছিল। পরপর কয়েকটা ছবির ওপর চোখ থামল। সাধুবাবাদের ছবি। মেয়েটার বয়স তো বেশি নয়। সাধু সন্ন্যাসীদের ছবি কেন? আউটলুক খুলতেই অনেক চিঠি। বেশিরভাগ কাজের অ্যাপ্লিকেশন। সুনেত্রা কী অন্য কাজ খুঁজছিল? খুঁজতেই পারে। কে না উন্নতি চায়? আজকালকার যুগে কেউ স্ট্যাটিক থাকতে চায় না। এগোতে চায়।
টাচপ্যাড স্ক্রোল করে একটা নামের সঙ্গে অনেক করেসপনডেন্স। সোহম সান্যাল।
চেয়ারে বসে। নামটা ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথায় শুনেছে, ঠাহর করতে পারছে না। পড়ছে চিঠিগুলো। একটা চিঠিতে সব চিঠির সার ‘সোহম ইউ নিউ দ্যাট আই হ্যাভ লাভড্ ইউ অলওয়েজ। বাট অল দ্য টাইম ইউ ওয়ার থিংকিং অফ ইওর সোশাল পজিশন। আই মাইট কাম ফ্রম এ মারোয়ারি ব্যাকগ্রাউন্ড, বাট লাভ ইজ বিয়ন্ড অল বেরিয়ার্স অফ রেস কালচার অ্যান্ড সিভিলাইজেশন। ইউ কুড নট অ্যাকসেপ্ট মি। ইউ ওয়ার অল দ্য টাইম থিংকিং অফ কেরিয়ার অ্যান্ড ইওর ফ্যামিলি। আই হ্যাভ কাম টু নো ফ্রম মিলন দ্যাট ইউ আর নাউ ইনভলভড উইথ আওয়ার ফ্রেন্ড ঐত্রেয়ী। ইফ ইউ কুড নট অ্যাকসেপ্ট মি হাউ কুড ইউ অ্যাকসেপ্ট ঐত্রেয়ী”
স্নেহাশিস থামল। পাশের ফ্ল্যাটের নাইটি পরা শিরিনও একই প্রশ্ন করতে পারে। মনে মনে হয়ত বহুবার করেছে। এখনও করছে। এই মিলন কী শেষ ফোনটা করেছিল? মিলন এদের মধ্যে কীভাবে আসছে? খুঁজতে লাগল মিলনের কোনও চিঠি। নাঃ নেই। তবে কলকাতা থেকে আরও কয়েকটা ছেলের চিঠি আছে। বেশিভাগ সোহমের গতিবিধি সম্পর্কে ইনফরমেশন।
রোশন ঘরে ঢুকে বলল “ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট কো বুলায়া। আনে মে থোড়া টাইম লাগেগা। ও তো ওসিওয়ারা পুলিস চৌকি মে নেহি”
রোশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল “কুছ মিলা?”
“কুছ নেহি। কেয়া কোই আদমি আয়া? ইয়ে লড়কি খুদকুশি কর লি কৌন জানে?”
“খুদকুশি ভি হো সাকতা। গ্লাসকো ফরেনসিক এক্সামিনেশন মে ভেজ। ইস কম্পিউটার মে ক্যই চিঠি হ্যায়। ওহি পড় রাহা থা। কোই বাঙ্গালকা লড়কা সোহম সান্যলকে সাথ উসকা মোহাব্বত থা। ম্যায় ইয়ে কম্পিউটার দেখতা। তুম পতা করো ইয়ে লড়কি কাঁহা কাম করতি? ফ্ল্যাট কিসকে নামপে? তুমহারে আনে সে পহেলে এক কালা স্যানট্রো গাড়ি নিকল গয়া। ও গাড়ি কেয়া ইয়ে কমপ্লেক্সকা কিসিকা?”
“ম্যায় পতা লাগাতি। তু ইধর ছানবিন কর। ওসিওয়ারা পুলিস স্টেশন মে ভি জানা হ্যায়”
“ওহ কাঁহা?”
"ইহা হি। জুহু-মালাড লিঙ্ক রোডকে বগল মে” রোশন বেরিয়ে গেল। স্নেহাশিস চিঠিগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করতে যাচ্ছিল। ফোনটা বেজে উঠল। শিরিন।
“আর কতক্ষণ একা বসে ভডকা খাব? তোমার জন্য ছুটি নিলাম। তুমি এখানকার কোন লাফড়ায় ভিড়ে গেলে। ছাড়ো না। এটা ওদের ব্যাপার। তুমি জড়াচ্ছ কেন?”
বুঝতে পারছে না, কী করবে? সত্যি তো। সারাদিন কত খেটে শিরিন তার জন্য রান্না করেছে। সে কি না মুম্বাইয়ের কোন মেয়ের মৃত্যু নিয়ে ভিড়ে। কম্পিউটারের চিঠিগুলো তো কালকেও পড়া যেতে পারে।
“এখুনি আসছি” উঠে পড়ল। কেয়ারটেকারকে বলল “চাবি হামারে পাস রহেগা”
নীচে নেমে রোশনকে ফোন “ওহ লড়কি বুলা রহি। ম্যায় ঘর লক কর দিয়া। ওসিকে পাস চাবি রখ দেতা। তু অপনে ঢঙ্গ সে প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশন কর লে। সিরিফ মেরে লিয়ে কম্পিউটার ঔর মোবাইল রখনা। সায়েদ বাঙ্গাল সে কুছ রিস্তা হ্যায়। কল দেখ লুঙ্গা। অগর ম্যায় কুছ কাম আ সকু”
শেষ পর্যন্ত হুইস্কি নিয়ে বসতে দেখে নাইটির দড়িতে ফাঁস লাগিয়ে শিরিন বলল “ওগুলো খেয়ো না। ঠান্ডা হয়ে গেছে। গরম গরম আরও কয়েকটা ভেজে আনি। ভাবলাম সারা রাত বুঝি ওই মেয়েটার ফ্ল্যাটেই কাটিয়ে দেবে”
চুমুক দিয়ে বলল “বরফ দেবে? গলে জল। আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। মৃতা মেয়ের ফ্ল্যাটে সারা রাত কাটাব। সামনে যখন জীবিত বর্তমান মজুত”
বরফগুলো আইস কিউবের ড্রামে ঢেলে কিচেন থেকে উত্তর “আমিও কোনদিন ছবি হয়ে যাব। যে ভাবে সব মারা যাচ্ছে” শিরিনের কথায় জড়তা। বেশ কয়েক পেগ গিলেছে। ভাজাটা টেবলের ওপর রেখে কোলের ওপর ছড়িয়ে বলল “শ্যাল ইউ স্টার্ট হোয়ার উই লেফট?”
ডান হাতে হুইস্কি বাঁ হাতের তালু দিয়ে শিরিনের স্তনের চারপাশে বুলিয়ে বলল “তুমি ওকে চিনতে?”
“কাকে?” স্নেহাশিসের হাত “এখন আমি কাউকে চিনি না। শুধু তোমাকে ছাড়া”
“তাই তো ফিরে এলাম”
আধশোয়া শিরিন স্নেহাশিসের গলা জড়িয়ে চুমু খেল।
“হ্যঙ্গ অন। তাড়া কীসের? দ্য নাইট ইজ স্টিল ইয়ং”
“এ নিয়ে তিনবার। নেশায় গুনতে গিয়ে দেখব ইয়ংটা ওল্ড হয়ে গেছে”
“তুমি বরং কোলে শুয়ে থাক। অন্তত হুইস্কিটা খেতে দাও। বরফ গললে হুইস্কির স্বাদই মাটি। ... মেয়েটাকে চিনতে?”
“সুনেত্রা। জাস্ট মুখচেনা। সুবিধের মেয়ে ছিল না”
“কেন?”
“বেসিক্যালি কলকাতার। এখানে যে ক্রাউডের সঙ্গে মিশত, ডুবিয়াস। শুনেছি এখানে যে এজেন্সিতে কাজ করত, সেটা কোনও ফ্যাশন এজেন্সি। এসব এজেন্সিতে লাইনে ঢোকার জন্য অনেক উলটোপালটা লোক আসে” স্নেহাশিসের সিগারেটে দুটান “এসব লোকেদের সঙ্গে মিশলে আমাদের ইমেজের ক্ষতি”
ভুলেই গেছিল। উরুতে শুয়ে থাকলেও বাইরের দুনিয়ায় সুপরিচিত নামী মডেল। এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালকিনের দাম অনেক। শুট প্রতি কয়েক লাখ। কেনই বা মিশতে যাবে এজেন্সির সাধারণ চাকুরের সঙ্গে? পাশের ফ্ল্যাটের চিত্র দেখে তারতম্য স্পষ্ট।
শিরিনের প্যান্টির নিম্নাংশের মাঝে সুড়সুড়ি দিয়ে বলল “তোমার কী মনে হয়? সুইসাইড না হোমিসাইড?”
আরামে শিরিনের উচ্ছ্বাস “আহঃ... কদ্দিন পর... ক্যারি অন... থেমো না...”
ওর কী মাথায় ঢুকছে প্রশ্নগুলো “বললে না তো?”
“তোমরা পুলিসের লোকেরা প্রেম করতেও জান না। আহঃ... ক্যারি অন... লাভলি... হেভেনলি... গোলি মার সুনেত্রাকে.... মরল না বাঁচল জেনে কী লাভ?”
ছুটে চলা উত্তরণের নেশায় মানুষগুলো মরবার আগেই মৃত। সুনেত্রা মারা গেছে। শিরিন কী বেঁচে? জীবন্ত প্রাণ আর মৃত জীবন এক বৃন্তে দাঁড়িপাল্লার দুই প্রান্তে। স্বপ্ন বাস্তবের আলোকে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর ধূসরতায় নিয়ে যাচ্ছে। কোনটা জীবন, কোনটা মৃত্যু, কে বলবে? পুলিসের কারবার দৈহিক। মন থাকুক অভ্রদিতার দিনান্তের আফসোসে। বা শিরিনের উত্তেজনায়।
নিস্পৃহভাবে বলল “তুমি কত পালটে গেছ”
শিরিন প্যান্টির ওপর স্নেহাশিসের হাতে চাপ দিল “কত বছর পার হয়ে গেল। জীবনের কত জল ঘোলা হল। তুমি বিয়ে করে বউ বাচ্চা নিয়ে সংসারী হলে। সব পালটে গেল। আমি পড়ে রইলাম মমতা ছাড়া পৃথিবীর সঙ্গে যুঝতে। কদ্দিন পর এলে। এই তাসের দেশের পৃথিবীতে প্রাণ পেলাম। সেটুকুও ভোগ করতে দেবে না? কী আছে আমার জীবনে?” চোখে জল। কাঁদছে। মানুষ শিরিনকে নতুনভাবে চিনছে স্নেহাশিস। কিছুই মারা যায়নি। জীবনের হতাশার প্রকাশ স্নেহাশিসের স্পর্শে। ভিক্টোরিয়ার দিনের অতীত করাঘাত করছে নারী সত্তাকে।
চোখের জল না মুছেই বলল “বারবার স্বপ্ন ভেঙেছে। তোমার ফোন পাওয়ার পর থেকেই আজকের প্রতীক্ষায় ছিলাম। সকালে উঠেই মনে পড়ল কলেজ পিকনিকের দিনগুলো। ম্যাসাঞ্জরে ময়ূরাক্ষী ভবনের বারান্দায় তুমি আমি দিনের প্রথম সূর্য দেখেছিলাম। প্রাণভরে উপভোগ করেছি। না না স্নেহাশিস, সে অনুভূতি আজও ভুলিনি” নেশায় মনের জমে থাকা দুঃখ উজাড় করে দিচ্ছে কাঁপা স্বরে। স্নেহাশিসের উরুর ফাঁকে মুখ গুঁজে কাঁদছে।
স্নেহাশিসেরই ভুল। ভুল সময়ে, ভুল কথা বলে ফেলেছে। থাক না। আজ রাতটা ওকে কাটাতে দিক ওর মতো করে। তদন্তের জন্য তো বহুদিন পড়ে। শিরিনকে পাঁজাকোলা করে তুলে বেডরুমে। সারা গাল চুমুতে ভরিয়ে দিল। নাইটিটা সরিয়ে দিল গা থেকে। ব্রায়ের হুক আলগা করে ছুড়ে দিল খাটের ওপাশে। দেরি না করে প্যান্টিটা খুলে ফেলে দিল। শিরিনের জঙ্গলের দৃশ্যে স্নেহাশিসের বিদ্রোহ। মুক্তি খুঁজছে। শিরিনের গভীরে। বিদ্রোহীর আত্মপ্রকাশ।
সার্টের বোতামগুলো খুলে বলল “আজকে না বলতে পারবে না। শুধু এই কয়েকটা দিন দাও। তোমার কাছে কিছু চাইব না। দেবে না?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।