অনিরুদ্ধ বসু
“চাকরিটা ছেড়ে দিলি?”
তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে ঐত্রেয়ী বলল “ব্যাঙ্গালুরুতে একা একা ভালো লাগছিল না। এখন আবার দিল্লিতে গিয়ে থাকতে হবে”
“এখন কী করবি ঠিক করলি?” বাবা জিজ্ঞেস করল।
“একমাস ঘুমোব। তারপর ভাবব”
এই ফাঁকে মেয়েকে বিয়েতে রাজি করাতে হবে। পিসতুতো বোন ঊষার দেওরের ছেলের সঙ্গে আগেই সম্বন্ধ এনেছিল। ছেলে আইআইটি থেকে পাশ। অ্যামেরিকায় এমএস, এখন গ্রিন কার্ড হোল্ডার। মেয়েই এতদিন ‘এখন বিয়ে করব না’ বলে এড়িয়ে গেছে। এখন তো সোহম বেঁচে নেই। বিয়েতে বোধহয় এখন না করবে না। রাজি হয়ে যেতে পারে। সোহমকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। তাই সোহমের পিএইচডি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা। যখন সোহম আর নেই, ঊষার দেওরের ছেলের সঙ্গে কথাটা আবার তুললেই হয়।
ডেকে বলল “এখানে আয় মা, বোস” বাবার উলটো খাটে বসল “জানি তোর মনের অবস্থা ভালো নয়। তবুও বয়েস তো হচ্ছে। সোহমও আর নেই। চাকরিটা ছেড়ে দিলি। ঊষার দেওরের ছেলে অ্যামেরিকায়। ওর সঙ্গে কথা পাড়ি?”
কয়েক মিনিট। ঐত্রেয়ী ভাবছিল। যে ঝামেলায় জড়িয়েছে, তার থেকে পরিত্রাণ বিদেশে পাড়ি দেওয়া। নয়ত এই চত্রেুর নাগপাশে জড়িয়ে পড়তে পারে। এই চত্রু কোথায় নিয়ে যাবে, কে জানে? ভয় হচ্ছে। দিব্যচক্ষে দেখছে জাহান্নাম খুব দূরে নয়। দেশ থেকে পালানোই শ্রেয়।
মাথা নেড়ে, খাট থেকে উঠে বলল “তুমি যা ভালো বোঝ”
সুনেত্রার মৃত্যুর খবরে প্রচণ্ড ভয় ধরে গেছে। মনে হচ্ছে শুধু কলকাতার চত্রু নয়, ভারত জুড়ে বিস্তার। সুনেত্রার মোবাইল থেকে মিলনের নামটাও অলরেডি জড়িয়ে। সুনেত্রার সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা জানলে, পুলিস আবার তার ওপর চড়াও হতে পারে। চাকরিতে রেজিগনেশনটা সহজেই হয়ে গেল। দিল্লির ট্র্যান্সফার নিয়ে এমনিতেই দো-টানা। মন সায় দিচ্ছিল না।
ভাবতেই পারেনি, চাঁপাতলায় মিলনের সঙ্গে সঙ্গম ক্যামেরাবন্দি হয়ে যাবে। ভাগ্যিস সে কথা বাবা জানে না। জানলে বিয়ে তো দূর, হার্টফেল করত। প্রতি মুহূর্তে এরকম কতই দৈহিক মিলন হচ্ছে। কে খবর রাখে? তার এমনই পোড়া কপাল, মিলনের সঙ্গে মিলনটাই ভিডিওবন্দি হল। আগে আঁচ করতে পারলে, সে পথ মাড়াত? কী করে বুঝবে কেউ ওদের ফলো করছে? যখন ভিডিওটা দেখাচ্ছিল, রাগে, দুঃখে ঘৃণায়, মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। ভাবা যায় না। সায়েন্স কলেজের স্নাতকোত্তরদের ওরা পর্নস্টার করে ফেলেছে। ভাবতেও গা শিরশির করছে। মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য কী না করতে পারে? বেশ বুঝছে, দেশ থেকে না পালালে হাজতবাস নিশ্চিত।
বেরিয়ে যাচ্ছিল। ফিরে বাবার কথায় সায় দিল “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্দোবস্ত করো। একা ভালো লাগছে না”
কলকাতায় আসার পর ব্যাঙ্গালুরুর মোবাইলটা সারেন্ডার করে কলকাতার নতুন কনেকশন নিয়েছে। এখনও কেউ নম্বরটা জানে না। ভাবছিল মিলনকে জানাবে কি না? যদি সুনেত্রার ইনভেস্টিগেশনে ওর নামটা বলে দেয় সর্বনাশ হবে। ওর নামটা সরিয়ে রাখতে বলতে হবে। নম্বর না দিলে পুলিস অনায়াসেই বাড়িতে হাজির হতে পারে। সেটা আরও বেশি মারাত্মক।
পাশের ঘরে মিলনকে ফোন “আমি এখন কলকাতায়”
“দিল্লি কবে যাবি?”
“যাব না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি”
“ব্যাপারটা কী?”
“তোর সঙ্গে আজকে দেখা করা যাবে? ধর সাড়ে পাঁচটায় দিলখুসাতে। কথা আছে। এটা আমার নতুন নম্বর। সেভ করে রাখ”
ইচ্ছে করেই কফি হাউসটা বাদ দিল। ওখানে অনেকে আড্ডা মারে। কে দেখছে হদিস রাখা যায় না। মিলনের পিজি অ্যাকোমোডেশন নিশ্চয়ই স্ক্যানারে।
“ঠিক আছে”
ওর মনেও বিরাট সংশয়। মৃত্যুর আগে ওর ফোনটাই নাকি সুনেত্রাকে শেষ ফোন। তাই পুলিসের সন্দেহ ওর দিকেই। ও একটা আশ্রয় খুঁজছিল। সেই আশ্রয়, এই মুহূর্তে, ঐত্রেয়ী ছাড়া আর কে? স্নেহাশিস ওকে ডেকে জেরা করেছে।
“সুনেত্রাকে কদ্দিন চেনেন?”
“একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। আমি পিইচডি করতে থাকি। ও চাকরি নিয়ে মুম্বাই চলে যায়”
“তারপর যোগাযোগ ছিল?”
“হ্যাঁ। ই-মেল কিংবা ফোনে”
“যেদিন ও মারা যায়, ফোন করেছিলেন?”
“হ্যাঁ। পরে পেপারে পড়লাম ও মারা গেছে”
“ফোনে কথার সময় কিছু অস্বাভাবিক দেখেছিলেন?”
“না। এক গল্প। চাকরি ভালো লাগছে না। মুম্বাইয়ের জীবন পোষাচ্ছে না”
“সেদিন কেন ফোন করেছিলেন?”
“বিশেষ কোনও কারণে নয়। প্রায়ই তো করি, সেদিনও করেছিলাম। ভাবিনি এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটবে”
“যখন ফোন করেছিলেন, কেউ ছিল?”
“কী করে জানব? আমার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলল। তবে কথার মধ্যে অসংলগ্নতা ছিল। বলল চাকরি ছেড়ে দেবে। পরমুহূর্তেই বলল কোন এক সাধুবাবা বলেছে মুম্বাইতে থাকা ওর পক্ষে ভালো। তাই চাকরি ছাড়বে না”
“আর কিছু?”
“কলেজ জীবনের অনেক ঘটনা মনে করতে পারছিল না। যেমন, বন্ধের সময় কী করে হেঁটে মামিসে চাউ-মিন খেতে গেছিলাম, এক বৃষ্টির দিনে মেট্রো থেকে বেরিয়ে পা পিছলে পড়ে, বাড়ি যাওয়ার বদলে ইডেনে যেতে চেয়েছিল -এই সব”
“মানসিকভাবে কী ভারসাম্যহীন ছিল?”
“একদমই নয়। বরং সজাগ। বেশিক্ষণ কথা হয়নি। বলল, গা গুলোচ্ছে, পরে কথা বলবে”
“আপনার কী মনে হয় সুসাইড করতে পারে?”
“যেটুকু চিনি কখনই নয়। তবে, কার মনে কী থাকে, কী চলে, বলব কী করে? এতটা অন্তরঙ্গতা ছিল না”
“সোহম আর ঐত্রেয়ী সম্বন্ধে কিছু জানাতেন?”
“বারবার জানতে চাইত। তাই কিছু খবর জানাতাম”
“সোহমের মৃত্যুর খবর?”
“জানিয়েছিলাম”
“কী রিঅ্যাকশন?”
“প্রথমে চুপ। ফোন কাটার আগে বলেছিল পরে কথা বলবে”
“বলেছিল?”
“না। আমিও আর ঘাঁটাইনি। সোহমের প্রতি ওর দুর্বলতা জানতাম বলেই”
বুঝতে পারছিল না, মিলনকে জেরা করে লাভ হচ্ছে কি না? কিছুই তো বেরল না। অথচ অদ্ভুতভাবে দুটো মৃত্যুর সঙ্গেই জড়িয়ে। কিছু না পেলেও, স্ক্যানার থেকে ছাঁটতে পারছে না।
মিলন মটন কবিরাজিতে কামড় দিল “এখন কী করবি?”
ঐত্রেয়ী কবিরাজিটা কাটার চেষ্টা করছিল “বিয়ে”
বিষমের জোরে, কবিরাজিটা মুখে ঢুকল না। কী বলছে? ঐত্রেয়ী বিয়ে করবে? মুচড়ে উঠল বুকটা। চাঁপাতলার স্মৃতিটা এখনও বুকে। ওর দেহের নমনীয় ছোঁয়া এখনও আলোড়ন তোলে। সকালে ফোন পেয়ে ভেবেছিল, ঐত্রেয়ী যখন কলকাতায়, তখন আরকবার ওর ফল্গুসাগরে ভাসা যেতেই পারে। যদি জানত ওর পেছনে আরেক আলোড়নের কথা, দিলখুশা কেবিনে আড্ডা মারত না। ওর ত্রিসীমানা থেকে পালাত।
“আর ভালো লাগছে না। সোহমের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যখন ও নেই অপেক্ষা করে কী হবে?”
“কাকে করবি ঠিক করেছিস?”
“অনেকদিন থেকেই বাবা, পিসির দেওরের ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধের কথা বলছিল। গা করিনি। এখন মত দিলাম”
“পাত্র কী করে?”
“অ্যামেরিকায় ইঞ্জিনিয়ার”
মিলন চুপ। ঐত্রেয়ীকে তো বিয়ে করতে চায়নি। পিএইচডি শেষ করার আগে সম্ভবও নয়। দেহকে কদ্দিন সংযমে রাখবে? চাঁপাতলার দিনটা যদি ফিরে আসত।
হঠাৎ ঐত্রেয়ী বলল “ভীষণ মোটা হয়ে গেছি। তাই না রে?”
“কে বলল?”
“কেউ বলেনি। সেদিন আয়নায় দেখছিলাম। মনে হল”
মনে পড়ল, যখন এমএসসি পাশ করে ঘরে বসে থাকত, এমনি আয়নায় রোজ দেখত। মনে হয়েছিল, মোটা হয়ে গেছে। খোঁজখবর নিয়ে হাজির হয়েছিল ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেম্বারে।
ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় পরীক্ষা করে বলেছিল “লাইপোসাকশন”
তখন কি ছাই জানত, লাইপোসাকশন দিয়ে রোগা হওয়া যায় না।
“কত খরচ লাগবে?”
“আশি হাজার টাকা”
মুষড়ে বলেছিল “এখন তো চাকরি করি না। বাবার অত টাকা নেই। চাকরি পেলে করিয়ে নেব”
“কী চাকরি খুঁজছ?”
“যে কোনও চাকরি”
“তোমার কোয়ালিফিকেশন?”
“কেমেস্ট্রিতে এমএসসি”
“দেখি কিছু করতে পারি কি না”
ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেষ্টাতেই দ্য নিউ এজে আইটির চাকরি ব্যাঙ্গালুরুতে।
“বহুদিন আগে এক প্লাস্টিক সার্জেনকে দেখিয়েছিলাম। ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন লাইপোসাকশন করিয়ে নিতে। ভাবছি আবার দেখাব কি না?”
মিলন ঐত্রেয়ীর দিকে তাকাল। সেদিন মালের নেশায় কাফতান তোলা ঐত্রেয়ীকে সেভাবে দেখা হয়নি। শুয়ে থাকলে দেহের মেদ বোঝা যায় না। ওর উত্তেজনামুলক অংশগুলো নিয়ে খেলায় এতই ব্যস্ত, যে দৈহিক ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবার সময় ছিল না। রোগা না মোটা, না দাঁড়ালে বোঝা যায়? সেদিন শোয়া ঐত্রেয়ীকে উপভোগ করেছিল। আজ ইচ্ছে করছে দাঁড়ানো ঐত্রেয়ীকে দেখতে। ঐত্রেয়ী এমনিতেই ঢিলেঢালা পোশাক পরে। তাই দেহের মাপটা আঁচ করা যায় না। মোটাই মনে হয়।
মুচকি হেসে বলল “না দেখলে বুঝব কী করে?”
“ইয়ার্কি মারিস না। আরেকবার যাব ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে? তুই যাবি আমার সঙ্গে?”
“তোর কী চর্বি বেশি? না কার্ভগুলো ঠিক নেই?”
“মনে হয় কার্ভ”
জীবন্ত মটন কবিরাজির শেষ রেশ নেওয়ার ইচ্ছে বিলীন হয়নি। ওর স্তনের দিকে তাকিয়ে বলল “চল না। উনিই ভালো বলতে পারবেন। মাঝে তো দু-বছর পার হয়ে গেল”
ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় ঐত্রেয়ীকে একজামিন করে বললেন “আগেই তো বলেছিলাম লাইপোসাকশন। এখনও তাই বলছি। তবে, কারণটা অন্য। পেটের ফ্যাট অনেক কমে গেছে। তবে ট্রোক্যানট্যারিক ফ্যাট, থাই-এর ফ্যাটের জন্য সেপ ঠিক লাগছে না। ব্রেস্টটাও ঝুলে পড়েছে। দু-বছরে টাকা জমেছে?"
মাথা নাড়ল ঐত্রেয়ী।
“তাহলে করিয়ে ফেল”
“দেখি। ভেবে জানাব”
ওরা বেরিয়ে এল চেম্বার থেকে। এখানেও যা ভেবেছিল কিছুই তা হল না। ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় একা ঘরে সিস্টারের সঙ্গে একজামিন করলেন। দেখা হল না ঐত্রেয়ীর দাঁড়ানো যৌবন।
ওরা বেরিয়ে যেতেই আশিস মোবাইলে “তোমার ব্যাঙ্গালুরুর মেয়েটা এসেছিল লাইপোসাকশন করাতে”
“কোন মেয়ে?” ইন্দ্রাক্ষির প্রশ্ন।
“আমার কথায় যে মেয়েটার চাকরির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলে”
“কী নাম?”
“ঐত্রেয়ী মুখার্জি”
"শুনেছি চাকরি ছেড়ে দিয়েছে” ইন্দ্রাক্ষির আপটুডেট।
“তাই নাকি” আশিস অবাক।
“পরে কথা বলব। এখন মিটিং-এ”
ফোন কেটে আশিসের খেয়াল হল - ছেলেটার কথা তো ইন্দ্রাক্ষিকে বলা হল না। যাক-গে। হয়ত ওকেই বিয়ে করবে।
বিয়ের আগে শেষবারের মতো চাইছিল জীবন্ত মটন কবিরাজি। কিন্তু ঐত্রেয়ীর সায় নেই। এ কদিনে এমন কী ঘটল, যে ওর যৌন স্পৃহা, নিস্পৃহ হয়ে গেল? নিছক বিয়ের স্বপ্ন?
বুঝে উঠতে পারল না মিলন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।