উনিশ

অনিরুদ্ধ বসু

“আবার একটা খুন” শঙ্করদয়াল পল্টুর দোকানের কাঠের চেয়ার টেনে বসল “দেশটা যে কোথায় যাচ্ছে?”

তাপস টিপ্পনি কাটল “কবে খুন হয়নি? রামরাজত্ব, মহাভারত থেকে আমাদের ছোটোবেলা। সেই ট্র্যডিশন আজও চলিয়া আসিতেছে”

লেটলতিফ তড়িৎ আজকে লেট করেনি। জমজমাট ডিসকাশনের রিপ্লে সর্টে শুনবে না।

“ইনসুলিন দিয়ে খুন। এ তো ভাবাই যায় না। রামায়ণ মহাভারত থেকে আজ পর্যন্ত। এরকম কখনও শুনেছ?”

মাথা নাড়ল কুঞ্জবিহারী “না ভায়া, আগে শুনিনি। আগে পিস্তল, ছুরি, বোমা দিয়ে খুন হত। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সজারুর কাঁটা দিয়ে খুন দেখিয়েছিলেন। হারকুল পায়রোঁ সাইকোলজিক্যাল ব্ল্যাকমেলিং। অ্যালফ্রেড হিচকক হাইট ফোবিয়া। এই প্রথম শুনলাম ডাক্তারি পদ্ধতিতে খুন। যুগ এগিয়ে চলেছে। প্রগতির পথে”

“প্রগতিটা কোনদিকে?”

তাপস টিপ্পনি কাটল “সায়েন্টিফিক প্রগ্রেস। শুধু চাঁদে যাওয়া নয়। সুপারসোনিক জেটে ওড়া নয়। খুনের মেকানিজমগুলো অনেক বেশি সায়েন্টিফিক হচ্ছে”

মধুসূদনের অস্বস্তি লাগছিল। গিন্নি বাপের বাড়ি। বাবা মারা গেছে। মায়ের বয়স পঁচাশি। যাওয়ার আগে বলে গেছে “তোমার তো শনি-রোব্বার তেমন কোনও কাজ থাকে না। রান্না করে ফ্রিজে রেখে গেলাম। গরম করে নিও। ভাতটা করে নিও”

শুধু ভাত নয়। চা থেকে বাড়ির সব কাজ তাকেই এখন করতে হবে। চারদিন আগে খবরটা টিভিতে দেখেছে। চেন্নাইয়ে চিফ সেত্রেুটারির ছেলে লেডি ফ্লোরেন্স হাসপাতালে রুটিন চেক করাতে গিয়ে মারা যায়। সেই নিয়ে হাসপাতালে তুমুল হট্টগোল। হোম সেত্রেুটারির বিবৃতিও টিভিতে শুনেছে ‘উই আর ক্যারিং দ্য নেসেসারি ইনভেস্টিগেশনস’ করবেই তো। চিফ সেত্রেুটারির ছেলে বলে কথা। কোনও ত্রুটি থাকতে পারে না। দায়সারা ভাবেও হতে পারে না। ওরা সকলেই জানে।

পরের দিন গিন্নির চিনি ছাড়া চা খেতে গিয়ে খবরের কাগজেও রোমহর্ষক খবর পড়েছে। আজকের খবরের কাগজে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টটাও। তাই এই চাঞ্চল্যকর আলোচনা। অস্বস্তি ঠিক পুরোপুরি মৃত্যু নিয়ে নয়। গিন্নি থাকলে হাজারও গঞ্জনার মধ্যেও কিছুই করতে হয় না। এখন না থাকাতে গিন্নির অভাবটা স্পষ্ট। আড্ডা শেষে রাতের ভাতটা নিজে হাতেই করতে হবে। সেটাই সব থেকে বেশি বিরক্তিকর। সে নীরব শ্রোতা।

তাপস কথাটা ঘোরাচ্ছে দেখে তড়িৎ ডিসকাশনের টপিকে ফিরিয়ে আনল “ইনসুলিন দিয়ে খুন। নিশ্চয়ই একজন ডাক্তার ইনভলভড”

শুভঙ্কর মাথা নাড়ল “সেটা অবভিয়াস। কিন্তু কে? খবরে যা লিখেছে, ওর ট্রিটিং ফিজিশিয়ান ডাঃ স্বামীনাথন বলেছে ও কিছুই জানে না”

তড়িৎ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল “কী বলবে? আমি জানি। আমি ইনসুলিন পুশ করেছি। আমিই খুনি। কী যে বল না? ডাঃ স্বামীনাথন জড়িত কি না জানি না। তবে ডেফিনেটলি হাসপাতালের কোনও ডাক্তার জড়িয়ে”

“কে হতে পারে?” শুভঙ্করের সিঙারায় কামড়।

এতক্ষণ শঙ্করদয়াল চুপ করেছিল। পকেটের নস্যির ডিবে থেকে এক চিমটে নাকে গুঁজে বলল “বলা মুস্কিল। তবে যেই করে খাকুক না কেন, সে পেশেন্টের চিকিৎসায় ডিরেক্টলি ইনভলভড নয়। তা হলে, সে জানে ধরা পড়বে। হয়ত হাসপাতালের অন্য কোনও ডাক্তার যার সঙ্গে পেশেন্টের সম্পর্ক নেই বা তখন ডিউটিতে ছিল না”

তড়িৎ বলল “সেটা হওয়া মোস্ট লাইকলি। এত বড় হাসপাতালে কত ডাক্তার-নার্স...”

তড়িৎকে থামিয়ে শুভঙ্কর বলল “ঠিক বলেছ তড়িৎ। ডাক্তারের বদলে নার্সও তো হতে পারে?”

শঙ্করদয়াল বলল “হতে পারে। কিন্তু বুদ্ধি কোনও ডাক্তারের”

কথাটা টেনে তড়িৎ বলল “ঠিক বলেছ। ডাক্তারি থেকে ছোটো এরিয়া। হাসপাতালের ডাক্তার বুঝলে কী করে?”

“নইলে ভিজিটিং আওয়ারসের বাইরে পেশেন্টের কেবিনে সিকিউরিটি ভেদ করে কী করে ঢুকবে?”

“এও তো হতে পারে ডাক্তার বাইরের। যাকে দিয়ে করিয়েছে সে হাসপাতালের নার্স?”

“তাও হতে পারে। যে খুন করাবে, সে নার্সের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে বাইরে থাকবে না। যদি নার্স ঠিকমতো দিতে না পারে বা ঠিক ডোজে না দেয়। নার্সিং সিস্টেম এত এফিসিয়েন্ট ভাবাটা অন্যায়”

“হাসপাতালের কোনও জুনিয়র ডাক্তার। সেদিন হয়ত ডিউটি ছিল না”

“যে কেউ হতে পারে”

মধুসূদন এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার বলল “খুনটা কে করেছে, কীভাবে করেছে, সেটা সেকেন্ডারি। যেই হোক না কেন, মোটিভ না জানলে ক্লোজ-ইন করা যাবে না। কোনও মোটিভই দেখতে পাচ্ছি না। সূত্র চিফ সেত্রেুটারির ছেলে, হাসপাতাল নয়। হাসপাতাল শুধু মোটিভকে এক্সিকিউশন করার ক্ষেত্র মাত্র”

সত্যি তো। মধুসূদন ঠিক কথাই বলছে। এমন কিছু যা চিফ সেত্রেুটারি মিঃ রঙ্গনাথন ছেলে সম্বন্ধে জানে না। চিফ সেত্রেুটারি কত কাজে ব্যস্ত। শিক্ষিত রুচিবান চাকুরে ছেলের সব গতিবিধির ঠিকানা রাখা সম্ভব?

আশাও করে না দিলওয়ান সিং। নীলকান্থের কলেজ জীবন ছানবিন করেছিল আইআইটি থেকে আহমেদাবাদ। কোনও উপরি তথ্য পায়নি। ভালো ছেলে, পড়াশোনায় ভালো। আর পাঁচটা ছেলের মতো পড়াশোনা, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা - এই নিয়ে কাটিয়েছে। সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে। আইআইএমে বৈচিত্রহীন অধ্যবসায়। তিরুপতি ইনকরপোরেশনের কর্মীরা জানাল, নীলকান্থ কর্মসচেতন, ভালো কর্মী। তবে কাজের বাইরে অফিসের লোকের সঙ্গে মিশত না। বাবা চিফ সেত্রেুটারি বলেই দূরত্ব। যদিও অহং বা দুর্ব্যবহার ছিল না। এও জানতে পারল রাজাপ্পা বলে ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা। বি ভি রাজাপ্পা। ব্যাঙ্গালোর ভেঙ্কটেশ রাজাপ্পা। দক্ষিণী নামকরণ - ব্যাঙ্গালুরু থেকে আসা ভেঙ্কটেশের ছেলে রাজাপ্পা। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল রাজাপ্পা ‘দ্য হেরাল্ড অফ ইন্ডিয়া’ র সাদার্ন জোনের চিফ।

দিলওয়ান সিং রাজাপ্পার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেখা করতে গেল।

“সরি টু বদার ইউ। সিন্স নীলকান্থ ওয়াজ ইওর ফ্রেন্ড, থট ইউ মাইট থ্রো সাম লাইট অন দ্য সাবজেক্ট” বন্ধুত্বের আবেগে নাড়া দিতে চাইছে।

“আই ওয়াজ সকড। হাউ কুড এনিওয়ান কিল সাচ এ নাইস সোল লাইক নীলকান্থ? উই হ্যাভ গ্রোন-আপ টুগেদার। আই ওয়াজ এক্সপেক্টিং ইউ এনিওয়ে। আদারওয়াইজ আই উড হ্যাভ গন টু ইউ। নীলকান্থ ওয়াজ ভেরি ক্লোজ অ্যান্ড ডিয়ার টু মি”

“দ্যাটজ দ্য রিজন আই কেম টু ইউ। আই হ্যাভ ডান দ্য প্রিলিমিনারি ইনভেস্টিগেশনস। সো উই নিড নট গেট ইনটু দোজ ডিটেলস। ডিড হি হ্যাভ এ গার্লফ্রেন্ড? ওয়াজ হি ইনভলভড উইথ সামবডি?”

“আই ডু নট নো হোয়েদার দ্যাট ওয়াজ এন ইনভলভমেন্ট। ইয়েস, হি ওয়াজ সিইং এ গার্ল নেমড সোফি ফ্রম মুম্বাই”

“হোয়াট ডস সি ডু?”

“নথিং মাচ। অকেশনল মডেলিং নাউ অ্যান্ড দেন। হি মেনশন্ড হার ফাদার ওয়াজ এ ডায়েমন্ড মার্চেন্ট”

“মাস্ট বি রিচ?”

“অবভিয়াসলি”

“হাউ ডিড হি নো হার?”

"হোয়েন ইন আহমেদাবাদ হি ওয়েন্ট অন এ এডুকেশনাল লেকচার টু মুম্বাই। হি মেট হার অ্যাট দ্য পার্টি। আই হ্যাভ এ ফিলিং সোফি প্রকিওরড দ্য মডেলিং অ্যাসাইনমেন্ট থ্রু হিম ইউটিলাইজিং দেয়ার রিলেশনসিপ। আফটার অল, নীলকান্থ ওয়াজ দ্য মার্কেটিং ডিরেক্টর”

“হাউ মাচ ইমোশনলি ওয়াজ হি ইনভলভড?”

“কোয়াইট এ বিট। নাথিং টু ডু উইথ হার ফাদার্স প্রপার্টি অর দ্য অ্যাফ্লুয়েন্ট ব্যাকগ্রাউন্ড। আই ডু নট নো হোয়াই"। আই সাপোস লাভ অর লাইকিং ইজ বিয়ন্ড অল রিজন্স অ্যান্ড থটস”

“লাভ অর লাইকিং?”

“হনেস্টলি আই ডু নট নো দ্য ডিফারেন্স। আই সাপোস, উই ট্রাই টু ব্রিং ইট টু এ স্পিয়ার অফ নোন ডেফিনিশনস। লাভ, লাইকিং, লিভিং টুগেদার, ম্যারেজ আর অল সোশাল ফর্মস অফ দ্য সেম ইকোয়েশন। প্রব্যাবলি ম্যারেজ ইজ নট। দেন এগেন দিস আর আরবিটারি থিংস”

“হাউ ফার?”

রাজাপ্পা হাসল “ইফ এ ইয়ং ম্যান টেকস্ এ গার্ল টু বেড, ডস হি লেট দ্য ওয়ার্ল্ড নো? হাউ ডু আই নো? ফ্রম আউটসাইড ইট সিমড দে ওয়ার প্রিটি ক্লোজ”

“হোয়াটজ হার ব্যাকগ্রাউন্ড?”

“হ্যাভেন্ট এ ক্লু। বাট নীলকান্থ ডিড মেনশন দিস ওয়াজ দ্য ওনলি গার্ল হি হ্যাড এভার ফ্যনসিড ইন হিজ লাইফটাইম”

কে এই সোফি? মুম্বাইতে খোঁজ নিতে হবে। সোফির চরিত্রটা অস্পষ্ট, ধোঁয়াশা। তবে কী নীলকান্থের মৃত্যুর সঙ্গে সোফির কোনও যোগসূত্র আছে? পরে খুঁটিয়ে দেখা যাবে।

“মে আই আস্ক ইউ এ ভেরি পার্সন্যাল কোয়েশ্চেন?”

“বাই অল মিন্স। গো অ্যাহেড”

“ডিড হি এভার হ্যাভ এন অ্যাফেয়ার উইথ এনি আদার গার্ল?”

“নট টু মাই নলেজ। রিসেন্টলি হি ওয়াজ গেটিং লট অফ ফোন কলস ফ্রম এ গার্ল নেমড আন্দ্রেয়া”

“হু ইজ সি?”

“সাম মডেল ফ্রম ডেলহি। হি টোল্ড মি সি হ্যাড কাম টু ডু সাম মডেলিং অ্যাসাইনমেন্ট ফর দেয়ার কোম্পানি তিরুপতি ইনকরপোরেশন। জাস্ট এ পাবলিসিটি শুট। ইভেন আফটার দ্য শুট ওয়াজ ওভার সি কনটিনিউড কলিং হিম”

এই মেয়েটার সম্বন্ধেই রঙ্গনাথন বলছিল। কেন লাইন মারত চিফ সেত্রেুটারির ছেলেকে? কোন ধান্দায়? নাকি, ব্যাঙ্গালুরু থেকে ফ্লাইটে আসা জয়ন্ত রাজার মেয়েটাই আন্দ্রেয়া?

“ডিড হি টেল হোয়াই?”

“নট কোয়াইট। বাট হি ডিড মেনশন সি ওয়াজ রিঙ্গিং হিম উইথ ইন এ টোন অফ লাভ। ইট ওয়াজ অ্যান এমব্যারাসমেন্ট ফর হিম অ্যাজ হি ওয়াজ মেন্টালি ইনভলভড উইথ সোফি”

“ডোন্ট কোয়াইট আন্ডারস্ট্যান্ড” দিলওয়ান দ্বিধাগ্রস্ত।

“হোয়াট আই গট ফ্রম হিম, সি র‍্যাং অ্যাট অড হাওয়ার্স কনফেসিং হার লাভ। বাট দ্য ইউসুয়াল ওয়ারমথ অফ লাভ ওয়াজ ল্যাকিং... আই ফরগট টু টেল। হি কনফেসড হি ওয়াজ আন্ডার প্রেশার টু ম্যারি অ্যান অ্যাকট্রেস অফ চেন্নাই। ডিডন্ট সে। হি ডিড সে দ্যাট ওয়াজন্ট পসিবল আফটার ইনভলভমেন্ট উইথ সোফি। নাইদার দিস গার্ল আন্দ্রেয়া নর দ্য অ্যাকট্রেস”

“হু ওয়াজ প্রেসারাইজিং হিম?”

“হি সেড হি উড টক টু মি ইন ডিটেইল ওভার এ ড্রিংক অ্যাট উইকএন্ড। বাট হি ডায়েড বিফোর দ্যাট”

“স্ট্রেঞ্জ”

“স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। বাট দ্যাট ইজ দ্য ফ্যাক্ট”

এতগুলো নাম ঘুরপাক খাচ্ছে। সোফি, আন্দ্রেয়া, অ্যাকট্রেস। কে-ই বা ওরা?

জয়ন্ত রাজার কথায় ব্যাঙ্গালুরু থেকে মেয়েটাকে লেডি ফ্লোরেন্সে ঢুকতে দেখেছে। সেই মেয়েটা কী এদের দুজনের মধ্যে কেউ? লাভ ট্রায়াঙ্গেল? এখন বুঝতে পারছে, এটা ব্যাঙ্গালুরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাই থেকে দিল্লি। সূত্রগুলো ব্যাপ্ত চক্রজালে। এটা আর নিছক চেন্নাইয়ের ঘটনা নয়। আরও অনেক সূত্র লুকিয়ে। সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।

এই তদন্তের সামাধান তাড়াহুড়ো করে করা যাবে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%