তেরো

অনিরুদ্ধ বসু

“ওঃ নমঃ শিবায়...”

বাবা আসন ছেড়ে অগণিত মহিলাভক্তকে শান্তির বাণী শুনিয়ে এবেলার মতো ঈশ্বরপ্রাপ্তির উপদেশ শেষ করলেন। এবার অপরাহ্ণের বিশ্রাম। ভক্তদের কাছ থেকে বিদায়। ভক্তদের পুষ্পবৃষ্টিতে ভরে গেল শ্বেতশুভ্র বসন সৌম্য বাবার ছ-ফিট লম্বা দেহ। ভক্তবৃন্দের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

পাহাড়ের ওপর জঙ্গলের ভেতর এই আশ্রমে সর্বত্রই শান্তির বাণী। প্রকৃতি মৌনতায় ভরিয়ে দিয়েছে কোলাহল মুখরিত মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোক দেখার এই মনোরম পটভূমিকে। দূরে সারি সারি অশ্বত্থ গাছ। নীচে নাম না জানা ফুলের শোভা। তার ফাঁকে আলো-আঁধারির লুকোচুরি। বনের মেলায় প্রকৃতির ছোঁয়া সবুজের আনাচে-কানাচে। ধ্যানগম্ভীর পৃথিবী নতুন রূপে সাজতে চাইছে মহমায়ার অন্ধকারের বাইরে। নতুন বরণডালি নিয়ে চিরযৌবনা হয়ে নতুন ছন্দে, নিঃশব্দ আনন্দে। রূপহীন মরুভূমির মধ্যে মরূদ্যানের আশায়। গীত-বর্ণ-রূপ মাখা ঈশ্বরপ্রাপ্তির অনন্ত গভীরতায়।

ভওয়ানিশঙ্করের আশ্রম ম্যাথেরনের সবুজের গভীরের বনছায়ায়। দস্তুরি নাকা থেকে হাঁটা পথে প্রায় আট মাইল। এক সময় এই সবুজের ভাণ্ডারের ঠিকনা ছিল অজানা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে থানের গভর্নর হিউগ পয়েনটিজ্ ম্যালেট সহ্যাদ্রি রেঞ্জের ওপর জায়গাটা আবিষ্কার করেন। তদানীন্তন বম্বের গভর্নর লর্ড এলফিনস্টোন সেটাকে মনোরম হিল রিসর্টে পরিণত করতে উদ্যোগী হন। তারপর বহুবছর। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তাচল। কোথায় আজও সাবেকিয়ানার ছোঁয়া। এখানে যান্ত্রিক যানবাহনের অনুপ্রবেশ নেই।

“কা হো চতুর্বেদী? ইতনে দিন খবর নেহি? কাঁহা গুম হো গেয়ে?” বাবা গোবিন্দ মহারাজ এখনও ফোনের চিৎকার ভোলেনি। দিনকে দিন হরিদ্বারের আশ্রম থেকে মুম্বাইয়ের লাইন খারাপ হচ্ছে।

রাজু চতুর্বেদী রম্ভার সঙ্গে উদ্দাম সম্ভোগ শেষ করে প্যান্ট লাগাচ্ছিল। রম্ভা - তার নবতম ধ্যান বিছনা থেকে জীবনে। তাড়াতাড়ি প্যান্ট ঠিক করল যেন বাবা সামনে দাঁড়িয়ে।

“নমস্তে বাবা। মুম্বাই মে। কৈসে হো আপ?” স্বাভাবিক আওয়াজ।

“তন্দুরস্ত। তুমহে চিন্তাকে জরুরত নেহি। থোড়ি সি মুসিবত আ পড়ি। তুমহারে সহায়তা জরুরত” অনুনয় নয়, আদেশ।

“বাবা মেরে জিন্দেগি তো আপকে চরনো মে। আদেশ কিজিয়ে”

“ফোন মে নেহি। ইধর আনা পড়েগা”

হপ্তা খানেক পর রম্ভাকে বগলদাবা করে বাবার আশ্রমে রাজু হাজির। তৎক্ষণাৎ বাবার দৃষ্টি রম্ভার দিকে। চতুর্বেদী সর্বদাই ভোগ্য নারী পরিবেষ্টিত। বাবা আপাদমস্তক রম্ভাকে মাপল। পারলে গিলে ফেলে।

“কেয়া তকলিফ বাবা?”

অন্যদের শ্রবণের বাইরে রাজুকে গোপন ঘরে নিয়ে গেল। দীপার মৃত্যুর কয়েক বছর পর জল ঘোলা হয়েছে।

“ইয়াদ হ্যায় কোই বরষ পহেলে আশ্রমকে এক ছোকরি পানি মে ডুব কর খুদকুশি কি” মিথ্যে গল্পটাই দীপার মৃত্যুর পর বাবা প্রচার করেছিল। পুলিসকেও। ঘটা করে দীপার শ্রাদ্ধ চোখের জলের মধ্যে। এক সপ্তাহ নিজেকে মন্দিরের গোপনে মৌনী হয়ে দীপার মৃত্যুতে কুম্ভীরাশ্রু ঝরিয়ে সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল দীপার অকাল প্রয়াণের গভীর বেদনা। লোকে জানত, বাবা দীপার আত্মার শান্তি কামানায় ধ্যানে। আসল কাহিনি অজানা। চতুর্বেদী, যে মুম্বাই থেকে নারী ভেটে বাবার আশ্রম প্রোজ্জ্বল করত সেও নয়।

“হাঁ বাবা। ইয়াদ হ্যায় আপ উসকে আত্মাকে শান্তিকে লিয়ে কিতনে প্রার্থনা কি”

“ইয়ে পুলিসকে চক্কর মেরা নিরাশা কে কারণ। জিত্নে ভি উনহে খুস করো, চাহনা দিনকে দিন জাদাহি বড় রহি হ্যায়। ইতনে দিন বাদ দীপাকে কেস মে কুছ জাদাহি দিলচস লে থা হ্যায়”

“ইয়ে তো চিন্তাকে বিষয়। কেয়া করু?” রাজু বুঝে উঠতে পারছে না।

“কুছ তো সোচো... ম্যায় কেয়া তুমহে অ্যায়সে হি মুম্বাই সে বুলায়া। ইসসে নিকল নে কে লিয়ে...”

“জরুর। থোড়া ওয়াক্ত দিজিয়ে”

সেই সন্ধেয় রম্ভা বলল “ইয়ে আশ্রম শান্তিকে বাতাবরণ। কই দিন ইহা রহে সকু?”

“জরুর। বাবাকে কামকে সিলসিলে মে হমে মুম্বাই লৌটনা হ্যায়। লৌট আ কর লে জাউঙ্গা” চতুর্বেদীর সায়।

রম্ভার তো বটেই, বাবাও খুশি। আরেক সুন্দরী আশ্রম আলোকিত করল।

কয়েক বছর আগে, দীপার মৃত্যুর পর আশ্রমের আবাসিকদের অনেককেই ছেঁটে বাদ দিয়েছিল। নিজেও গুটিয়ে নিয়েছিল। বিশ্বস্ত কয়েকজন ছাড়া সবাইকেই বিদায় দিয়ে। যারা ছিল, বাবাকে হাড়েহাড়ে চিনত। জানত বেগরবাই করলে ভয়াবহ পরিণতির কথা। পেয়ারের অনুস্কা তো ছিলই। হারেমে যোগ হল রম্ভা। তাছাড়া প্রীতি, রীতা আরও দুজন নিয়ে মোট ছয়।

মাসখানেক পর রাজু চতুর্বেদী ফেরত এল নতুন অভিসন্ধি সাজিয়ে। তার অগণিত অর্থবান ক্লায়েন্ট, যাদের বাবার সংস্পর্শে নিয়ে ধন্য করেছে, পবিত্র করেছে, তাদেরই মধ্যে একজনের ম্যাথেরনে বাগানবাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থব্যয়ের জন্য সে বাবাকে দান করতে প্রস্তুত। বাবা তাকে ঈশ্বরের পথ দেখিয়েছে। ছেলে অ্যামেরিকায় পাকাপাকিভাবে। নিজেও বাগানবাড়িতে বড় একটা যায় না। এহেন মহাপুরুষের জন্য সে বাগানবাড়ি দান করতে প্রস্তুত। আসন্ন বিপদ আন্দাজ করে বাবাও স্থান পরিবর্তনের কথা ভাবছে। হাতে স্বর্গ পেল, খবরটা জেনে।

এক সকালে হঠাৎ বাবা হরিদ্বার থেকে উধাও। যেমন উধাও হয়েছিল মির্জাপুর বা বারানসী থেকে। সঙ্গে ছয় মহিলা। ভক্তরা জানল বাবা হিমালয়ে বনবাসে গেছেন জ্ঞান আহরণ করতে, আরও নিবিড়ভাবে ঈশ্বরকে পেতে, তাঁর কাছাকাছি থাকতে।

“তথাস্তু মহারাজ” ভক্তদের বিনম্র সায়।

রাজেন্দ্র চতুর্বেদীর মতো সর্বকালীন দালালের সহায়তায় বাবা গোবিন্দ মহারাজের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু সম্পূর্ণ সন্ন্যাসী রূপে শান্ত, নিবিড় ম্যাথেরন লেকের ধারে অবস্থিত বাগানবাড়িতে নতুন আশ্রম সাজিয়ে। এখন আর সে গোবিন্দ মহারাজ নয়, ঈশ্বরের নয়া অবতার স্বামী ভওয়ানিশঙ্কর।

কুড়ি বছরের লহংপুর গ্রামের দুর্গা প্রসাদ ঝিমলির মৃত্যুর পর অনেক দূর এসেছে। ভওয়ানিশঙ্করজির আত্মিক উন্নতির মন্ত্র যে লোকমুখে ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, এই আশ্রমের মধ্যে না দাঁড়ালে বোঝা যায় না।

“ঈশ্বর লেনে সে নেহি মিলতা। দেনে মে হি আত্মাকা শান্তি প্রাপ্ত হোতা”

সেই দিতেই হাজারও ভক্তবৃন্দ এখানে জড়ো হয়। যদি বা ভওয়ানিশঙ্করের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরদর্শন হয়। ঈশ্বর দূরে অজানা রহস্যে ঢাকা, না-দেখা বিগ্রহ হলেও, ভওয়ানিশঙ্কর সেই সুদূরের পার্থিব রূপ। তার চরণকমলে নিজেকে সঁপার মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শনের পথ। ভওয়ানিশঙ্কর তাই বড় কাছের মানুষ। আরও কাছে পাওয়ার মধ্যেই ঈশ্বরপ্রাপ্তির সম্ভাবনা।

বাবা অপরাহ্ণের বিশ্রামের জন্য নিজ কক্ষে প্রস্থান করলেন। কক্ষের সংলগ্ন ডাইনিং সুইটে বাবার অপরাহ্ণ ভোজের বিশাল সমারোহ। এখানে শিষ্যদের প্রবেশ নিষধ। চারজন সুন্দরী বাদে - রীতা, অনুস্কা, প্রীতি আর রম্ভা। এদের মধ্যে দুজন অপরাহ্ণে বাবার সেবায়, দুজন নিশিভোজের সময় ও পরে। বিরিয়ানি, মটন চাঁপ, লস্যি। বাবা অপরাহ্ণে স্বল্পাহারী। কে বলেছে ঈশ্বর পেতে শাকাহারি হতে হবে? ভোগের মধ্যেই ত্যাগের মন্ত্র। ভোগ না করলে কী ত্যাগ করা যায়? খাওয়া শেষে এক ঘণ্টা নিদ্রা। পাহারায় দুজন সুন্দরী। নিদ্রা শেষে বাবা খাটের পাশে বেল টিপবেন। এবার সময় সুন্দরী দর্শন। ভিআইপি চতুর্বেদী বা কোনও মন্ত্রী এলে তা স্থগিত। ভিআইপিদের সুন্দরী ভেটে অপরাহ্ণের সাধনা পূর্ণ।

ঘুম থেকে উঠে, বেল টেপার আগেই ফোন।

“থোরা তকলিফ মে হুঁ” চতুর্বেদী।

“কেঁও?”

“বাঙ্গালকে ছোকরি মেহুলি, জিসে আপকে চরণওমে এক সময় অর্পণ কিয়া, বাঙ্গাল মে মরনেকে বাদ উহাকা পুলিস ইনভেস্টিগেশন কে চক্কর মে অভি মুম্বাই”

“তো কেয়া?” বাবা নিষ্পৃহ।

“হামলোগকে নাম জানে তো?”

“ইতনা পরিসান কেও? উসকে ফোনলিস্টসে মুঝে ভি ফোন কিয়া”

“আপকো ভি?”

“ক্রস ভেরিফাই তো করেগি”

“জান জায় তো?” চতুর্বেদীর সংশয়।

“কাঁহা ঠৈরা?”

“ম্যাগনাম টাওয়ার্স পর মডেল শিরিনকে ফ্ল্যাট মে”

“ওঁহা কেও?”

“দোনো ছোটে উমরকে দোস্ত”

“ইয়ে লড়কি কভি ইধর আয়া?”

“নেহি”

“একদিন লে আও। উসে ভি কুছ জীবনকে ধর্ম শিখানা হ্যায়”

“আপ জো সহি সমঝে। কোশিশ করুঙ্গা। ডর, পুলিস জাদা হি জান যায়”

“ঘাবরাও মত। সব ঠিক হো জায়েগা। উস লড়কি পর কড়ি নজর রখো”

“জো আজ্ঞা”

ফোন কেটে, বেল টিপল। গেরুয়া আলখাল্লা পরা সুন্দরী বাবার সেবক রম্ভা হাজির। দেহে যৌবনের উদ্ভাস। চলার ছন্দে প্রকাশ। নিতম্বের কম্পনে ছন্দের আভাস। বাবার দিকে ঝুঁকলে প্রশস্ত অর্ধ-উদভাসিত স্তন।

“কেয়া সেবা করু বাবা?”

“পহেলি রো মে লাল সালোয়ার পহেনে বৈঠনেওয়ালিকো লানা। ঈশ্বরকে পথ শিখানা হ্যায়”

রম্ভা নিতম্বের ছন্দের হিল্লোলে শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। রম্ভার বুকের দোলা পাছার মেলা বাবার ঈশ্বরকে জাগিয়ে তোলে। দেহই ঈশ্বরের ব্যাপ্তি, তার মধ্যে তাঁর মর্ত্য প্রকাশ। সন্তুষ্টিতে পূর্ণতা। কিছু সময় পর মেয়েটিকে খুঁজে পেল আশ্রমের ক্যান্টিন থেকে বেরচ্ছে। ফিসফিস করে রম্ভা বলল “বাবা আপকো ইয়াদ কিয়া”

প্রশস্তির দ্যুতি মেয়েটির মুখে। কতদিন আশ্রমে এসে বিফল মনে ফিরে গেছে। যদি বা বাবার চোখ পড়ে। কিন্তু হাজারও ভক্তদের মতো সে থেকে গেছে কেবলই তার বাণীর করুণায়। ভাবেনি কখনও বাবা তাকে ‘বিশেষ ভক্তের’ তালিকায় ফেলবে। এ যে ঈশ্বরকে পাওয়া।

আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। বাবার শয়নকক্ষে ঢুকতে দরজা বন্ধ করে রম্ভার প্রস্থান। বাবা বিছানায়। পা ঝোলানো। পায়ের কাছে বসে প্রণাম করল।

“কেয়া নাম বেটি?”

“মেনকা”

“স্বর্গ কে অপ্সরা”

“উধর অপ্সরা লোগ কেয়া করতে?” বাবা মাথায় হাত রাখল।

“দেওতাকে মনোরঞ্জন”

“তুম দে সকোগে?”

“আপকে আজ্ঞা”

“ঈশ্বর বাদ দিখাউঙ্গা। পহলে তুমহারে আসলি রূপ দেখে”

বুঝতে অসুবিধা হল না ভওয়ানিশঙ্করের ইচ্ছে। বস্ত্রহীন উন্মুক্ত যৌবন। বাবা উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওপাশে লেক ম্যাথেরন। চারধারে বনাঞ্চল। তার মাঝে শান্ত স্নিগ্ধ নীল জলরাশি। অপরাহ্ণের আলো-আঁধারি লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। ‘জয় জগদীশ হরে’ - মনকে জাগতিক মায়া থেকে মুক্তি দিতে তৎপর ইন্দ্রলোকের সুখে। নীলা জলরাশির মৃদু তরঙ্গে প্রকৃতির ডাক। রুক্ষ মানব কলুষতার বাইরে। দূরে ডানা মেলা সাদা বলাকার মধ্যে সেই সুর। স্থান-কালের প্রবাহ ভেদ করে প্রকৃতি, আত্মা, মানুষ মিশে যায় সমবেত আনন্দ মূর্ছনা। মনে হয় জাগতিক পৃথিবী, কতই না গৌণ, কত তুচ্ছ। বাবা লেক ম্যাথেরনের দিকে নিষ্পলক চেয়ে। মেনকা বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

স্বপ্ন তো দেখেছিল রাজীবকেও নিয়ে। বিয়ের রাতে সম্ভোগের থেকে পাঁচ বছর। আর আনন্দ বন্যায় ভাসায়নি। দেখতে কী এতই খারাপ? তবে ঠাঁই কেন নেই ওর যৌবনে? বিষণ্ণতা, নারীর খিদেতে নিম্নাংশের চাওয়া দ্বিগুণ। বাড়িয়ে দিয়েছে না-পাওয়া সুপ্ত বাসনা। পুনের সুসজ্জিত কল্যাণীনগরের বাংলোর সামগ্রী মাত্র। লোক নিন্দার ভয় দাঁড়াতে পারেনি অন্য কোনও পুরুষের সামনে। বলতে পারেনি ‘ম্যায় তুমহারে লিয়ে। সব কুছ দেনে তৈয়ার। মুঝে আপনাওগে?’

পূর্ণতা খুঁজতে পুনে থেকে ট্রেনে। করজাতে নেমে সিএসটির লোকাল ট্রেন ধরে নেরাল। সেখান থেকে টয়ট্রেনে ম্যাথেরন বাজার। টুকটুক করে হারদার হিলসে জনমপট্টি স্টেশনে আরোহণ, ট্রেন আর রাস্তার প্রথম মিলন। রাস্তা হারায় প্রকৃতিতে। আবার মেলে ভেখরা কুণ্ডে। এই মিলন বিচ্ছেদের যুগলবন্দিতে হারনোর মধ্যে পাওয়ার ছন্দ। মাউন্ট ব্যারি পার হতেই মনোরম দৃশ্য হারিয়ে যায় সরু অন্ধকার সুড়ঙ্গে। প্যানোরমা পয়েন্টের দৃশ্য দেখে মনে হয় রাজীবের বাইরেও পৃথিবী বর্তমান। বারবার হাতছানি দেয় পুনে থেকে ম্যাথেরন বাজারে। জীবন যেখানে নিঃসাড়, স্তব্ধ, প্রকৃতির কোলেই শান্তির বাণী বাবার চরণকমলে। যৌবন থাকতেও, অপূর্ণ জৈবিক চাওয়া পূর্ণতার খোঁজে।

ঘরের আলো-আঁধারিতে ধীরে ধীরে খসে পড়ছে মেনকার আভরণ। বাবা জানলার পরদা টেনে দিল। লাল সালোয়ার, গোলাপি ব্রা, প্যান্টি লুটিয়ে পড়ল লেদার সোফায়।

“অব কেয়া কর সঁকু আপকে লিয়ে?”

বস্ত্রহীন মেনকা আদেশের অপেক্ষায়। বাবার শ্যেনদৃষ্টির মোহে আচ্ছন্ন। সাদা আলখাল্লাটা গা থেকে সরাতেই সুপুরুষ বাবার বিবস্ত্র শিব। তার এতদিনের স্বপ্ন। আজ স্বপ্ন পুরুষের পুরুষাঙ্গের আহ্বান প্রতীক্ষিত কামনার মজলিসে। নতুন আলিঙ্গনে।

“শিউজি লিঙ্গকে পূজা মাঙ্গতে”

পুজই তো দিতে এসেছে। শিউজির পুজো। হাঁটু গেড়ে বসল। ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে শিবকে বরণ। জাগানো আকাঙ্খিত মুক্তির অভিলাষে।

সান্ধ্য ভজন-সংকীর্তন শেষে ভক্তদের আশীর্বাদ দিয়ে বাবা আশ্রমের অন্দরমহলে এলে অনুস্কা জানাল “থানেকে ওসি আপ সে একেলে মে বাতচিত করনে মাংতা”

“কেঁও? আজকে ভাষণ সমাপ্ত হো চুকা”

“দুসরে কুছ...”

বাইরের ঘরে দেহ বিছিয়ে বললেন “ঠিক হ্যায়। ভেজ দো”

ম্যাথেরনের ওসি অজিত পান্ডে ঢুকতেই বেতের সোফার দিকে ইঙ্গিত “কেয়া পিয়গে? চায় ইয়া কফি?”

“কুছ নেহি”

“বোলো পান্ডে কিস সিলসিলে মে?”

“কুছদিন পহলে নেরাল সে দস্তুরি নাকাকে রাস্তে মে একঠো কার অ্যাক্সিডেন্ট হুয়া”

“শুনা থা। ঈশ্বর উন আত্মাও কো শান্তি দে”

“উন আত্মাকে কেয়া হোগা ইয়ে হম নেহি জানে। লেকিন আপকে সামনে আশান্তিকে বাতাবরণ দেখ রহা হুঁ”

“কেঁও?”

“অ্যাক্সিডেন্টকে তিনকে দেহান্ত হো চুকা। ঔর চৌঠি সন্নিধি অভিতক জিন্দা”

“কাঁহা?”

“পহলে ইধরকে ম্যাথেরন মিউনিসিপল হসপিটাল। উসকে বাপ ব্যান্ড্রাকে লীলাবতী হাসপাতাল লে গয়া। ইতনে তক বেহোশ থি আইটিইউ মে। দো-দিন পহলে হোশ আয়া। পুলিস পুছতাছ করনে পর আপকা নাম বোলা”

“তো কেয়া? আশ্রম মে হাজারো ভক্ত আতে। ও ভি সয়েদ আ রহি থি” ভওয়ানিশঙ্কর নির্বিকার।

“বাত ওহ নেহি। আপকে নাম কে সাথ ইয়ে ভি মালুম কিয়া সুনেত্রা আগারওয়ালকে সাথ আপকে তালুক। ওহ ভি কই বার আ চুকে। উসকে ভি দেহান্ত হো গয়া। খবর উসকে কম্পিউটারমে আপকা বহত সারি তসভির মিলা”

“মেরে হাজারো ভক্ত। কিসিকে কম্পিউটার মে কুছ তসভির হো সকতা। ইনলোগকে দেহান্ত কে সাথ মেরা কেয়া তালুক?”

“ইনভেস্টিগেশনকে সিলসিলে ইধর আয়ে তো আপকে ধন্দে কে পতা লাগ যায়...”

“আশ্রম সে কেয়া তুমহে কম মিলতি? গভর্নমেন্ট জো দেতি, উসসে জাদা। বহত জাদা। তুম কিসলিয়ে হো?”

“ও সব ঠিক হ্যায় বাবা। পরন্তু মুম্বাইকে উপরওয়ালা ইধর ছানবিন করে, তো ম্যায় কেয়া করু?”

“রোকো। জইসে ভি উসে রোকো” বাবা কঠোর।

“কৈসে? আপ হি বোল দিজিয়ে?”

“কৌন হ্যায় ইয়ে মুম্বাইকে অফিসার?”

“জয়েন্ট কমিশনার রোশন, রোশন শেঠ”

“জয়েন্ট কমিশনার। উসে তো সিরিফ মুম্বাই মে ছানবিনকে হক হ্যায়, বাহার নেহি। তুমি ঐসি রিপোর্ট সাজাও, মহারাষ্ট্রকে ডিজি তুমহারে রিপোর্টকে ভরোসে উসে ছানবিনকে পারমিশন না দে”

“উসকে সাথ বঙ্গালকে একঠো পুলিস অফিসার ভি”

“বাঙ্গাল সে ইধর কেও?”

"বাঙ্গাল মে মেহুলি মার্ডারকে সিলসিলে মে। ইনভেস্টিগেশন মে আয়ে তো সুনেত্রা ফ্ল্যাট সে কুদ পড়ি”

“হমে ফোন কিয়া। জো বোল না বোল দিয়া। ফিকর মত করো”

বাবা নড়েচড়ে বসল। দুফের কো চতুর্বেদী ভি ইয়ে বাঙ্গালকে পুলিস অফিসারকে বারে বোল রহা থা। ফির তো, শোচনে কা বাত। ইয়ে সালে বাঙ্গালকে অফিসার অপনে ঢঙ সে পারমিশন মাঙ্গ লেতা। ফির ভি। কুছ করনে পরেঙ্গা।

“কেয়া নাম হ্যায় উসকা?”

“শুনা হ্যায় স্নেহাশিস চ্যাটার্জি”

বাবার মুখে উদ্বেগের ছায়া। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অজিত পান্ডের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। যদি বা রোশন শেঠকে পলিটিক্যাল লেভেল থেকে থামানো যায়, এই বাঙালিকে থামাবে কী করে? কোথাকার জল কোথায় গড়ায় কে বলতে পারে?

চতুর্বেদীর কথা মনে পড়ল ‘ম্যাগনাম টাওয়ার্স পর মডেল শিরিনকে ফ্ল্যাট মে’ ইয়ে বাঙ্গালকে পুলিসকো রোকনে পড়েগা। শিরিন সে মুলাকাত জরুরি হ্যায়। শিরিন হি ইসকো রৌক সকেগি। পান্ডেকে বলল “ইনভেস্টিগেশনকে রিপোর্ট আচ্ছে সে বনানা। ভেজনেকে পহলে হমকো দিখা লেনা। কেয়া নাম বতায়া? হাঁ রোশন। উসকো বোলো তুম সব সমহাল লোগে”

বাবা দরজা খুলতেই অনুস্কা ঘরে। ওকে ইঙ্গিত করল “দশ”

দশ হাজার টাকার বান্ডল অজিত পান্ডের দিকে বাড়িয়ে দিল। পকেটে গুঁজে অজিত পান্ডে উঠে দাঁড়াল “জি বাবা। আপ জো আচ্ছা সমঝে” প্রণাম করে বেরিয়ে গেল।

চিন্তিত ফাইভ-স্টার অন্দরমহলে ঢুকে অনুস্কাকে ইঙ্গিত “সিঙ্গল মল্ট অন দ্য রকস্”

গ্লেনমর‍্যাঙ্গিতে চুমুক দিয়ে, অনুস্কাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হাত নাড়ল। ফোন চতুর্বেদীকে “মামলা থোড়া বহত গম্ভীর”

“আপকো ওহি বোল রহা থা দুফেরকো”

“শিরিনকো জিতনা জলদি মেরে পাস লাও। নেহি তো ভান্ডা চৌপট”

“জরুর। কোশিশ করুঙ্গা”

“কোশিশ নেহি। মুঝে উনহে চাহিয়ে। অ্যাট এনি কস্ট। জইসে ভি হো”

“দেখে কেয়া কর সকে। বঙ্গালকে পুলিস উসকে সাথ জিতনা তক রহেগা, লে আনা মুস্কিল। সমঝ রহি হো?”

“পুলিসকো দুসরে চক্কর মে লগা দো”

“দেখে। কেয়া কর সকু”

ফোন কেটে, এক ঢোঁকে দুপেগ হুইস্কি গলায়। বেলে অনুস্কাকে তলব “আজ বাহারকে মেহমান নেহি। তুমহারে সেবা চাহিয়ে”

অনুস্কা দরজা বন্ধ করে গৈরিক বসন পরিত্যাগ করল। বিবস্ত্র ভওয়ানিশঙ্করের কোলে নগ্ন দেহ বিছিয়ে বলল “কুছ উদাস লগ রহে হো?”

বাঁ হাতে হুইস্কি। ডান হাত দিয়ে অনুস্কার ঘন কেশাবৃত নিম্নাঙ্গে হাত বোলাল “থোড়া বহত”

চাপা দাড়িতে হাত বুলিয়ে অনুস্কা “ভুল যাও। তুমহারে পরিসানি দূর করনে কে লিয়ে তো ম্যায় হু। আরাম সে হুইস্কি পিও। দেখো হম কেয়া করে...”

বাইরে লেক ম্যাথেরনের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। স্নিগ্ধ কিরণ ছড়িয়ে দিয়েছে কালো জলরাশিতে। মুক্তর মতো চিকচিক করছে। আলো-আঁধারির লুকোচুরিতে মায়াময় স্বপ্নালোকের আহ্বান। ভাসতে চায় সুখের স্বর্গে। অনুস্কার ছন্দময় আবাহনে। মাদকতার তন্দ্রালোকে। আনন্দি কল্যাণের মিঠে কোমল সুরে। সপ্তম মার্গে বাবার উচ্ছ্বাসের ঝালায়।

অজিত পান্ডে সহেলির বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে ভাবছে আজ বহত মস্তি। পকেট মে ইতনা রূপয়ে।

আনন্দের মধ্যেও বুকটা কেঁপে উঠল। ভয় করছে। বাবা কেন কেসটা ধামাচাপা দিতে চাইছে? সে কী শুধু লীলাভূমির আসল মাহাত্ম্য লুকতে? না অন্য কিছু? ভওয়ানিশঙ্কর এই চত্রেুর সঙ্গে জড়িয়ে নেই তো? কোন মৌচাকে ঢুকেছে, নিজেও জানে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%