কুড়ি

অনিরুদ্ধ বসু

রঙ্গনাথন সেত্রেুটারিকে জিজ্ঞেস করল “হোয়াই ডাস সি ওয়ান্ট টু মিট মি?”

“স্যার সি ওয়ান্টস টু মিট ইউ অ্যান্ড সিএম রিগার্ডিং এ নিউ প্রজেক্ট”

“হোয়াটস দ্য নেম অফ হার কোম্পানি?”

“দ্য নিউ এজ”

“আই হ্যাভ হার্ড দ্য নেম। আই থিঙ্ক দে আর ইনটু আইটি। গিভ দেম অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট টুমরো অ্যাট টু। আই শুড বি ফ্রি বাই দেন। সিএম ইজ কোয়াইট ইন্টারেস্টেড ইন আইটি প্রজেক্টস”

পরের দিন রঙ্গানাথনের ঘরে ইন্দ্রাক্ষি। সাদা স্ল্যকস, সাদা টপস। মুখে হাল্কা নো-মেকআপ পাউডারের প্রলেপ। পাতলা লিপস্টিকের ছোঁয়া। সানগ্লাসটা চুলের ওপরে। হাতে লেদার ব্যাগ। “প্লিজ অ্যাকসেপ্ট মাই হার্টফেল্ট কনডোলেনসেস অন ইওর রিসেন্ট বিরিভমেণ্ট”

রঙ্গনাথন উলটো দিকের চেয়ারে ইঙ্গিত করল “ওয়েল...” হাতটা হাওয়ায়। ছেলের মৃত্যু নিয়ে অচেনা অতিথির সঙ্গে কী বলার? মুহূর্তের স্তব্ধতা। বিনা বাক্যব্যায় ছেলের মৃত্যুশোকের নীরবতা।

বসতে ইঙ্গিত করে রঙ্গনাথন “ইয়েস মিস রায়চৌধুরী, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?”

ইন্দ্রাক্ষি কোনও ভণিতা না করেই বলল “ইউ প্রব্যাবলি আর অ্যাওয়ার উই আর এ ডেলহি বেইসড ফার্ম উইথ ব্রাঞ্চেস অলওভার ইন্ডিয়া। মেনলি ইনটু আইটি, মেডিক্যাল ট্রন্সত্রিুপশন অ্যান্ড ইন্টারন্যশনাল আউটসোর্সিং। নাউ উই আর থিংকিং অফ এক্সপ্যান্ডিং ইনটু প্রাইমারি প্রজেক্টস”

“লাইক?” চোখ তুলে রঙ্গানথন।

“উই ওয়ান্ট টু স্টার্ট অ্যান ইনস্টিটিউশন দ্য নিউ এজ ইনস্টিটিউট অফ ত্রিুয়েটিভিটি অ্যান্ড হিউম্যান পোটেনশিয়াল”

“গুড আইডিয়া। হোয়াট আর ইউ এমিং অ্যাট? ক্যান ইউ এনলাইটেন মি অন দ্য সাবজেক্ট”

রুমালে মুখ মুছল “উই ফিল অ্যাস এ রেস উই আর নো ওয়ে ইনফিরিয়র টু এনি আদার রেসেস। ইফ দ্য ইয়ং জেনারেশন ক্যান বি ট্রেইন্ড ইনটু অল কোয়ালিটিস অফ দিস, সুপ্রিমেসি ইন অল পসিবল র্ফমস, উই কুড ইমার্জ অ্যাস এ রুলিং নেশন”

“আই ডিডন্ট কোয়াইট আন্ডারস্ট্যান্ড” এসি ঘরেও বিন্দু বিন্দু ঘাম।

নীলকান্থ মারা যাওয়ার পর থেকে ব্লাড প্রেসার হঠাৎই বেড়ে গেছে। এতদিনের কনট্রোলের ডায়েবেটিসটাও তিনশোর ঘরে, বেশ বুঝতে পারছে এই স্ট্রেস থেকে। কয়েকদিন বিশ্রাম, সুইচ অফ করে ঘুরে এলে ভালো হত। কিন্তু চিফ সেত্রেুটারির পোজিশনটা এমন যে ঝট করে রেহাই নেই। ঘুরতে গেলেও মোবাইলে অফিসের তাড়া। ছুটি তো হবেই না। উলটে পাশের লোকটাকে ডেকে যে কাজ এক মিনিটে করিয়ে নেওয়া যায়, সুদূরে বসে দশটা ফোন কল করে সে কাজ করাতে হবে। তার থেকে এখানেই ভালো। ছেলের মৃত্যুর ইনভেস্টিগেশন মনিটার করতে পারবে। এমনিতেই একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে, তার ওপর এই ছুটির নাম করে অ্যাডিশনল স্ট্রেস নেওয়া শরীরের পক্ষে আরও ক্ষতিকারক। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই ভুলিয়ে রেখেছে নিজেকে।

“ইট ইজ ভেরি টেকনিক্যাল। আই থিংক, ইফ আই অ্যাম স্পেসিফিক ইউ উড আন্ডারস্ট্যান্ড। থ্রু সাইনটিফিক ফিজিওলজি উই নো দ্যাট হিউম্যন মাইন্ড ক্যান বি কন্ডিশনড। ডিপেন্ডিং অন দ্য এনভারয়নমেন্ট দে আর নার্চারড। ইফ দ্যাট কন্ডিশনিং ক্যান বি প্রপারলি নার্চারড ইন এ সাইনটিফিক ওয়ে, ইট ক্যান প্রডিউস এ ব্রিড অফ জেনারেশন, হু উইল থিংক অ্যাহেড অফ টাইম অ্যান্ড বি দ্য আরকিটেক্ট অফ টুমরো। আই মিন, কন্ডিশনিং দ্য কন্ডিশন্ড রিফ্লেক্স ইন এ গাইডেড ওয়ে”

রঙ্গনাথন আইএএসের সেরা ছাত্র। ধরতে বিশেষ অসুবিধা হল না। ওর মনে হল ইন্দ্রাক্ষি ভবিষ্যতের কথা বলছে। কোয়াইট প্রোগ্রেসিভ থটস। ইন স্পাইট অফ আওয়ার পোটেনশিয়াল, উই আর স্টিল ল্যাকিং প্রায়রিটি ইন দ্য ইন্টারন্যাশনাল এরিনা। ইভেন টুডে, আওয়ার বয়েজ অ্যান্ড গার্লস আর কিন অন গোয়িং টু ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড মেকিং ইট দেয়ার। দো দে দেমসেলভস হ্যাভ এ হিউজ পোটেনশিয়াল। মুহূর্তের জন্য, আদরের নীলকান্থের কথা মনে পড়ল। ছেলেকে দেখে মনে হয়েছে দ্যাট পোটেনশিয়াল হ্যাসন্ট বিন ফুললি এক্সপ্লয়েটেড। নিজের ছেলেকে ধরে রাখার জন্য ওদের দুজনকে এত কসরত করতে হত না। যে ভাবেই মৃত্যু হোক, সে আর ফিরবে না। আগামী প্রজন্মের মধ্যেও তো হাজারো নীলকান্থ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাদের যদি গোলাপের পাপড়ির মতো লালন করা যায়, দেশের প্রগতির অনেক সুযোগ। পুত্রহারা বাবার বুকে হাজারও তরুণ-তরুণীর আগামীর স্বপ্ন। সত্যি যদি কিছু করা যায়, অসংখ্য গুণী ছেলেমেয়েদের জন্য...

ইন্দ্রাক্ষিকে দেখল। মহিলার চোখ ঠিকরে বেরোচ্ছে আগামীর বুকভরা স্বপ্ন।

“অফ অল প্লেসেস হোয়াই তামিলনাডু?”

ইন্দ্রাক্ষি চশমা লেদার ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল “ইন ডেলহি দেয়ার ইজ নো স্পেস। ইভেন গুরগাঁও ইজ ওভারক্রাউডেড। আই হ্যাড এ ফিলিং, ইউ কুড প্রোভাইড দ্য রিকুইজিট ভ্যালু ফর মানি স্পেস ইন তামিলনাডু। আফটার অল উই আরেন্ট মাল্টি-মিলিয়নেয়ার্স। অ্যান এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন লাইক দিস ইজ টু বি বিল্ট উইথ এ স্পেসিফিক পারপাস। দ্য কমারশিয়াল আসপেক্ট ইন দ্য স্ট্রিক্টেস সেন্স উইল বি মিসিং। অ্যাট লিস্ট দ্য ইনভেস্টমেন্ট হ্যাস টু ব্রেক ইভেন। ইট উইল বি মোর অফ এ ড্রিম ফর সোশাল কস, দ্যান এ বিজনেস এস্ট্যাবলিসমেণ্ট”

রঙ্গনাথন মাথা নাড়ল “দো থিওরিটিক্যালি ইন প্রিন্সিপ্যাল আই অ্যাম উইথ ইউ, ইন রিয়েলিটি আই হ্যাভ টু ডিসকাস দিস উইথ সিএম অ্যান্ড হিস পলিটিক্যাল সেত্রেুটারি। আই হ্যাভ এ ফিলিং হি উড লাভ টু গো অ্যাহেড। কুড ইউ প্রোভাইড মি এ প্রজেক্ট সামারি অ্যাট সাম স্টেজ?”

লেদার পার্স থেকে কাগজের প্যাকেট দিল “আই হ্যাভ অলরেডি ব্রট ইট উইথ মি ব্রিফ নিটি-গ্রিটিস অফ দ্য প্রজেক্ট। অন অ্যাপ্রুভ্যাল আই উইল প্রোভাইড দ্য ডিটেলস অফ দ্য প্রোজেক্ট প্রোপোসাল”

প্রফেশনাল মহিলা। না হলে এত সাকসেসফুল? রঙ্গনাথন প্রজেক্ট সামারি ড্রয়ারে রাখল। দেখা যাক সিএম কী বলে? প্লিজ লিভ ইওর কার্ড। আই উইল গেট ব্যাক টু ইউ আফটার এ ডিসকাশন উইথ দ্য সিএম। উইল ইউ বি ইন টাউন ইন দ্য কামিং ডেইস?”

“নো। আই অ্যাম টেকিং দিস ইভিনিংস্ ফ্লাইট টু ডেলহি। শুড সিএম অ্যাপ্রুভ অর ওয়ান্ট টু ডিসকাস জাস্ট গিভ মি এ টিংকল। আই ক্যান টেক দ্য নেক্সট ফ্লাইট ব্যাক অ্যাকরডিংলি”

ইন্দ্রাক্ষি উঠে দাঁড়াল। রঙ্গানাথনের সঙ্গে হ্যান্ডসেক করে বলল “থ্যাংকস ফর ইওর টাইম”

ইন্দ্রাক্ষি বেরিয়ে যেতে মনে পড়ে গেল অক্সফোর্ড দিনের কথা। পলিটিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি করছে। শিক্ষক-গাইড ডক্টর জেফারসন বলেছিলেন “ইফ ইউ ওয়ান্ট টু সাকসিড ইন লাইফ, বি প্রফেসনাল উইথ এ ভিশন”

ইন্দ্রাক্ষিকে দেখে সেই কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। এ টোটালি প্রফেসনাল লেডি উইথ এ নিউ ভিশন। গ্রুমড ইনটু দ্য এটিকেটস অ্যান্ড প্রফেশনালিজম। অনেক স্বপ্ন দেখা লোক দেখেছে। সবাই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারে না। এই মহিলার মধ্যে দম আছে, যে করেই ছাড়বে, যদি সুযোগ পায়।

ট্যাক্স পেয়ারের টাকায় ইনস্টিটিটিউটের জমি। তাই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে চিফ মিনিস্টারকে প্রোপোজাল দেওয়া যায় না। কোম্পানি সম্বন্ধেও আরও জানতে হবে। প্রজেক্টের ভায়াবিলিটি, কত রিসোর্সেস আছে। এই পলিটিক্যাল ডিসিশন বিধানসভায় আলোড়ন তুলবে। টেকনিক্যাল টিম অফ এক্সপার্টস্ দিয়ে ভায়াবিলিটি স্টাডি করাতে হবে। চিফ মিনিস্টারের অত সময় নেই ডিটেলসে যাওয়ার। কম্প্রিহেনসিভলি সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে চিফ মিনিস্টারের পলিটিক্যাল সেত্রেুটারি, ফাইন্যান্স সেত্রেুটারিকে দেখিয়ে ফাইনাল স্টেজে সকলকে নিয়ে সিএম, ফাইন্যান্স মিনিস্টার, হায়ার এডুকেশন মিনিস্টার মিটিং করে ফাইনালি জাজমেন্ট আসবে। প্রজেক্টকে লাল সুতোর ঘেরাটোপ পাস করাতে গেলে অনেক তথ্য লাগে। শেষে সিএমকে বিধানসভায় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। শেষ বিচারটাও তারই।

রঙ্গনাথন সেত্রেুটারিকে বলল “গেট মি অল দ্য ডিটেলস অফ দিস কোম্পানি দ্য নিউ এজ”

স্বপ্ন অনেকদিনের!

নতুন প্রজন্মের ব্যুৎপত্তির জন্য অনেক পড়াশোনা - বই, ইন্টারনেট, আরও কত কী। শব্দগুলো বারবার বুকের মধ্যে তোলপাড় করে। ছোটবেলার স্বপ্নহারা জীবনটাকে নতুন রঙে সাজাতে চাইছে। নতুন ছন্দে। মানুষের মধ্যে নিজেকে উজাড় করে দিতে। নব্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। অরক্ষিত জীবনের বলয়ে কোনওদিন স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়নি। চাকরির সময়ও নয়। যখন দ্য নিউ এজ প্রতিষ্ঠার পথে, মনে হয়েছিল কিছু একটা করা দরকার। অতীতকে মুছে আগামী প্রজন্মের জন্য। কালের স্রোতে সেও হারিয়ে যাবে। স্বপ্নের বাস্তব থেকে যাবে যুগ-যুগান্ত ধরে। কোনও পাগল যদি এভাবে স্বপ্ন না দেখে, পৃথিবীতে নতুন কিছু হবে না। সোশাল ইনটেলিজেন্ট কোসেন্ট, ইমোশনল কোসেন্ট, কমিউনিকেশন স্কিলস অ্যান্ড রিলেটেড পারফরম্যান্স। সেক্সচুয়াল পারফরম্যান্স কোসেন্টকেও অস্বীকার করা যায় না। আগামী প্রজন্ম যাতে ভালোবাসার আচ্ছাদনে প্রস্ফুটিত হতে পারে ন্যূনতম স্বাভাবিক পরিবেশে, যা সে কোনওদিনও পায়নি। এই স্বপ্ন নিয়েই একটা প্রতিষ্ঠান - আগামীর পথপ্রদর্শক। এসব গুরুগম্ভীর শব্দের জৈবিক রূপায়ণে গড়ে উঠবে আগামীর সুর, নতুন পৃথিবীর না-শোনা গান, না-দেখা সভ্যতার বুনিয়াদ। যা কোনও ঈশ্বর সৃষ্ট ভিত নয়। তার কাঠামো মানুষের মধ্যে, ঈশ্বরদত্ত। গান না শিখলে যেমন গাওয়া যায় না, লেখাপড়া না করলে বুদ্ধির বিকাশ হয় না, তেমনি এই জন্মগত ক্ষমতাকে ভালোবাসা দিয়ে ঠিকপথে চালিত না করতে পারলে, যথাযথ আগামী প্রজন্ম তৈরি হয় না, ইন্দ্রাক্ষি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে।

আশিস ঠাট্টা করে বলেছিল “তোমার এটা অদ্ভুত ক্ষমতা। হাওয়ার মধ্যেও স্বপ্ন দেখ”

“বাস্তবের মধ্যে স্বপ্ন নেই, একঘেয়েমি। গতিময় হাওয়ার মধ্যেই স্বপ্ন লুকিয়ে। না-দেখাকে নতুন করে দেখা, না-পাওয়াকে পাওয়া। তারই যুগলবন্দি যখন পদক্ষেপ রাখে, সেটাই বিকাশ। তাকে দেখতে হয় মনের জানলায়”

আশিসের মনে হয়েছিল, যতই পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্ত করে সে স্বনামধন্য ডাক্তার হোক না কেন, চিন্তাশীলতার দিক দিয়ে ইন্দ্রাক্ষি তার থেকে অনেকটাই এগিয়ে। তাই তো ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের ছোট্ট ফ্ল্যাট থেকে দ্য নিউ এজের বিশাল সাম্রাজ্য। আশিস দাবার গুটি ঠিকভাবে খেলে প্র্যাকটিস গুছিয়ে নিতে পেরেছে। ইন্দ্রাক্ষি শুধু স্বপ্নই দেখেনি। বাস্তবে কার্যকর করতেও সক্ষম। যত ইন্দ্রাক্ষির কাছে এসেছে, তত বুঝতে পেরেছে, অসম্ভব জেদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। লক্ষ করেছে এই ক’বছরে জেদটা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। ভালো না মন্দ? সময়ই বলবে। আশিস সব-সময়ই তার পাশে, সব কাজে, শুধু তার জন্য।

এয়ারপোর্টে যেতে আশিসকে ফোন করল “প্রজেক্ট দিয়ে এলাম। দেখি কী হয়?”

“দেখ এটাও হয়ে যাবে। তোমার কোনও কিছুই আটকায় না। কপাল নিয়ে এসেছ”

এই জন্যেই ওকে এত ভালো লাগে। যা করছে, না-বুঝলেও পাশে ভরসা। হাজার হোক মানুষ তো। মন চায় কাউকে আঁকড়ে রাখতে সর্বক্ষণ। ভেতরের মানুষটার জীবনে এত অসম্পূর্ণতা বলেই পরিপূর্ণতার স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। ছোটবেলার ধোঁয়াশা ভরা জীবনটা এখনও জ্বলছে তুষের আগুনের মতো। আশিস সেই তুষাগ্নির দাবানলে নিশ্চিন্ত নিস্তেজ প্রলেপ। ভেতরের মানুষ একটা নীড় খোঁজে। স্বপ্নের নীড় না হলেও সান্ত্বনার আশ্রয়। তার জীবনে সম্পর্কহীন আশ্রয়। সারা জীবন ধরে নীড়টাই সে খুঁজেছে। ঘরেও পায়নি, বাইরে তো নয়ই।

“তুমি কী দিল্লি ফেরত যাচ্ছ?”

“হ্যাঁ। উইকেন্ডে আসছ তো? তখন সব কথা হবে” ফোন কেটে দিল ইন্দ্রাক্ষি।

এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি কাউন্টার পার হয়ে প্লেন বোর্ড করার জন্য লাউঞ্জে বসে আছে। হঠাৎ আবার মোবাইল বেজে উঠল “ম্যাডাম সব কিছু প্ল্যান মতো চলছে। দিল্লি গিয়েই খবর পাবেন” মুচকি হেসে, ফোনটা কেটে দিল ইন্দ্রাক্ষি।

ইন্ডিগো বিমান তখন চেন্নাইয়ের মাটি থেকে ডিভোর্স নিয়ে শূন্যে। সন্ধে গড়াচ্ছে রাতে। অন্ধকার পৃথিবীটাকে জানলা দিয়ে দেখছিল ইন্দ্রাক্ষি। কোথায় ছোটোবেলার না-পাওয়া সাধারণ সংসার? কোথায় তার রসদপূর্ণ যৌবনের সার্বিক দৈহিক স্ফুরণ? তার যৌনাঙ্গে মিশে পৌরুষের শ্রেষ্ঠত্বর শেষ আস্ফালন। তবুও নিজেকে সংযত করে, গড়তে চেয়েছিল নতুন বুনিয়াদ। অতীত ভুলে ‘বিউটি অ্যাট ইটস বেস্ট’-এ চাকরির সময় আত্মসমর্পণ করেছিল সৌভিকের কাছে। ঘর, সংসার, বহুদিনের না-পাওয়ার স্বপ্নের হাতছানি। গলদটা কোথায় আজও জানে না ইন্দ্রাক্ষি। সৌভিকও আর পাঁচটা বাঙালির মতো বক্তব্য সমৃদ্ধ সত্তা, যে ইন্দ্রাক্ষিকে অন্য পাঁচটা গৃহবধূর মতো ইচ্ছের লক্ষ্মণরেখায় বাঁধতে চেয়েছিল। রুদ্ধ করতে চেয়েছিল বহুমুখী ইন্দ্রাক্ষির মানসিক বৈচিত্র্যের ধারা, নিজের সীমিত চিন্তাধারায়। সামাজিক সংকীর্ণতার নিরাপদ বেষ্টনীতে। সম্পর্কটা টিকল না। ইন্দ্রাক্ষি চাইলেও, সৌভিক একদিন তাকে ছেড়ে চলে গেল নিজের পৌরুষের আস্ফালনে ব্যর্থ খোঁজে। ফেলে গেল তাকে, একাকী। সীমাহীন অনির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যাকর্ষণহীন শূন্য পরিমণ্ডলে। লিভিং টুগেদার সৌভিকের আশ্রয় থেকে বিতাড়িত। মাথা গোঁজার জায়গা নেই। প্রথম কয়েকদিন কোম্পানির গেস্ট হাউসে। তারপর ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে উঠে এল ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের ফ্ল্যাটে।

চিনি শেষ হওয়া থেকে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু।

এয়ারহস্টেসের দেওয়া সুগন্ধি নাতিশীতোষ্ণ তোয়ালেটা মুছে দিল ফেলে আসা শূন্যতাকে। সেদিন থেকেই রেড রাইডিং হুডের মতো অশ্রুসিক্ত একাকিত্বকে মুছে দিতে পেরেছিল উলটো ফ্ল্যাটের ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। আশিস সৌভিকের থেকে কত আলাদা। বলতে ভালোবাসে না, শুনতে চায়। এই নিঃশব্দ শ্রোতার মধ্যে ইন্দ্রাক্ষি খুঁজে পেয়েছিল শান্তি ও পূর্ণতার নীরব আচ্ছাদন। অজান্তে তার আত্মার সারকে অলক্ষ্যে গ্রাস করেছে ওই মানুষটা। অবচেতনে তার নারীত্বের, আত্মার, সমস্ত সত্ত্বার সুরকে চেনা হারমনিতে বেঁধে দিয়েছে। কলরবের মধ্যে এক না-পাওয়া ছন্দের তরঙ্গে।

আশিস যখন দ্বিতীয়বার মেখলাকে বিয়ে করছে, ইন্দ্রাক্ষির মন বলেছিল - এ বিয়ে তো হওয়ার নয়। তবে কেন করছে? ইজিপশিয়ান মিথলজিতে পড়া ‘কসমিক পার্টনারশিপ’-এর অঙ্কটা আদি অনন্তকালের, সময়হীন সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে গেছে। তার থেকে পালাবে কোথায়? তারই প্রমাণ মেখলার চলে যাওয়া থেকে আজ পর্যন্ত ইন্দ্রাক্ষির সঙ্গে আশিসের কসমিক বিটস। প্রতিটা মুহূর্তে মানুষটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।

ঘোর কাটল এয়ারহস্টেসের গলায় “প্লিজ ফাস্টেন ইওর সিট বেল্টস। উই উইল বি সর্টলি ল্যান্ডিং অ্যাট দ্য ডেলহি এয়ারপোর্ট। দ্য গ্রাউন্ড টেম্পারেচর ইজ...”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%