চৌত্রিশ

অনিরুদ্ধ বসু

দমদম এয়ারপোর্টের বাইরে ট্যাক্সিতে উঠে শিরিন ভাবছিল, এ ছাড়া তার অন্য কোনও উপায় ছিল না। মুম্বাইয়ের তেরো তলার ঘরে হাঁপিয়ে উঠছিল। ভয় ভেতরকে তোলপাড় করছে। মেহুলি গেছে, সুনেত্রাও। কবে তার সে হাল হয়। ওখানে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। কোথা থেকে কোথায় কথা ছড়িয়ে পড়ে। ভীষণ অসহায় লাগছিল। যে দুনিয়াকে বিজয়িনীর মতো এনজয় করেছে, আজ সেই পৃথিবী অচেনা। মেকি মুখোশে স্বার্থের সাগরে ভেসে বেরানো। ঝড় উঠলেই টালমাটাল, বেশি হলে ডুবে যেতে পারে। টাকা, গাড়ি, বাড়ি, রূপ যৌবন সব থাকা সত্ত্বেও খোলা হাটে বিকিকিনির পসরা। সাফল্যের চূড়া থেকে আরব সাগরে ভেসে যেতে সময় লাগবে না।

চতুর্বেদীর সঙ্গে ভওয়ানিশঙ্করের সংযোগে চিন্তা দ্বিগুণ। ভওয়ানিশঙ্কর ডেকে পাঠাল কেন? উপদেশের আড়ালে প্রচ্ছন্ন হুমকি। ভওয়ানিশঙ্করের উপস্থিতিতে অন্তর্মুখী ভাবনা। সংযোগ না বুঝলেও, গুরুত্ব স্পষ্ট। অজান্তেই কোনও অজানা চত্রেু জড়িয়ে পড়েছে। চত্রুটা কী বা সে কোথায় দাঁড়িয়ে। বোঝার বাইরে। তাই কলকাতায় পরামর্শ, মুক্তির উপায়ের সন্ধানে। স্নেহাশিস ছাড়া আর কারও কথা ভাবতে পারছে না। গতকাল শুট শেষে ঠিক করল, ইমিডিয়েটলি কলকাতায় স্নেহাশিসের থেকে পরামর্শ নেওয়া দরকার। পুলিসের লোক, অঙ্কটা আন্দাজ করতে পারবে। ওদের স্ক্যানারে থেকে কাজটাও সুস্থিরভাবে করতে পারছে না।

“মেমসাব কোথায় যাবেন?” অনেকদিন পর বাংলা কথায় ধড়ে প্রাণ এল।

“হায়াত রিজেন্সি”

হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে। ঠিক করেনি কোথায় উঠবে। দরগা রোডের বাড়িতে উঠতেই পারত। সেখানে নিজের মতো করে সবকিছু করা যাবে না। হাজার চোখের দৃষ্টি। সে আজ মুম্বাইয়ের সেলিব্রিটি। মুম্বাইয়ের সেলিব্রিটিদের মায়ের কোমর পেঁচিয়ে ঝগড়া, মধ্যরাতে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে হাতাহাতি, দিনে পাঁচতারা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া। রাস্তায়-ঘাটে পাশের গাড়িটা যখন রেড লাইটে দাঁড়ায়, ফিরে দেখা। মুম্বাইয়ের লোকেরা সেলিব্রিটিদের গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে কেচ্ছা শুনতেই ব্যস্ত। কলকাতায় মুম্বাইয়ের সেলিব্রিটি। পাড়ার একজন। তাই দরগা রোড নয়। লোকচক্ষের আড়ালে, হোটেলের নিশ্চিন্ত এসি ঘরে লুকিয়ে উত্তাল মনের উত্তর খোঁজা। চতুর্বেদীর হাত এত লম্বা নয় যে কলকাতা চত্বরে পৌঁছতে পারে। জানতেও পারবে না। যদিও ভওয়ানিশঙ্কর বলেছিল কাউকে না বলতে, একা একা চাপা ভয় কদ্দিন বইবে? শেষে না মেন্টাল ব্রেকডাউন হয়।

“আমি কলকাতায়”

“কোথায়, কখন?” স্নেহাশিস হাতে চাঁদ পেল।

“হায়াতে। রুম নম্বর ২০৬”

“আমি এখন খড়গপুরে”

“চলে এস”

“কাল ঋজুর পরীক্ষা”

“অভ্রদিতা সামলাতে পারবে না? আমার ভীষণ দরকার”

দৈহিক প্রয়োজন হতে পারে। এই মুহূর্তে সেটা গৌণ। দেহের স্বাদ মিশেছে চিন্তার বিস্বাদে, অসমাপ্ত কাজের চিন্তায়। নয়া মোড় খোঁজা উদ্দেশ্য। ডিজির চাপ। রোশনের কথায় সে শিরিনকে নতুন করে দেখছে। এবার দেহ নয়, মনকে স্ক্যান করার সময়।

“দেখি, তোমায় জানাচ্ছি” ফোনটা কেটে দিল।

ফ্রেশ হওয়ার জন্য স্নান করতে যাবে ভাবছিল। দশ মিনিটে ফোন “আসছি। পৌঁছতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগবে। অভ্রদিতা ম্যানেজ করে নেবে”

“এখানে লাঞ্চ আমার সঙ্গে”

ফোন কেটে বাথরুমে শিরিন। বাথটবের কল চালিয়ে, বিজেটে ব্ল্যাডারের পরিত্রাণ। ফ্লাইট থেকে নেমে শুধু জমা পেচ্ছাপ নয়, অদৃশ্য চক্র থেকেও নিষ্কৃতি চাইছিল।

দুপুর একটা। “কলকাতায় ঢুকে পড়েছি”

“নীচের লা কুচিনিয়াতে চলে এস। খুব ভালো ইটালিয়ান ফুড করে”

ফোন কেটে ভাবল কতটা বলবে? সব, না রেখেঢেকে? মন দোটানায়। পুরোটা না বললে তো স্নেহাশিস সদুত্তর দিতে পারবে না। কোনও কিছু না ঢেকে সব কথা বললেই মুক্তি। নইলে নিষ্কৃতি নেই।

সানগ্লাসটা খুলে উলটো দিকে বসে স্নেহাশিস বলল “ভীষণ খিদে পেয়েছে”

“কী খাবে?” চিন্তায় খিদে উধাও।

“তুমি তো জান আমি কী ভালোবাসি”

মনে পড়ল কলেজ জীবনে স্নেহাশিস সামন খেতে ভীষণ ভালোবাসত। তখন টাকা ছিল না। আজও সরকারি চাকরিতে হায়াত রিজেন্সির সামন খাওয়ার ক্ষমতা নেই। ওর প্রিয় সামন-ই অর্ডার দেওয়া যাক। মাছের রাজা। আর্থিক দিক থেকেও বলের রাজা। আজ তো মনের রাজাকে মাছের রাজকোষ দেখাবার ক্ষমতা আছে। শুধু ক্ষমতা নেই বলার, সেদিন কেন অনেক কথা চেপে গেছিল।

“হঠাৎ কলকাতায় কিছু না বলে?”

“কাল রাতে ঠিক করেছি”

“জরুরি তলব কেন?”

“তোমায় কাছে পরামর্শ চাই”

“গ্রামের পুলিস মুম্বাইয়ের নামজাদা মডেলকে কী পরামর্শ দিতে পারে?”

“বাঁচার পরামর্শ”

চমকে উঠল! এ কী বলছে। সারা পথ ভেবেছে শিরিন আবার কোন রঙিন প্রস্তাব নিয়ে হাজির। কীভাবে তাকে এড়াবে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত।

“আই অ্যাম ইন বিগ ট্রবল”

“কী হল?”

“আগে খেয়ে নিই। পরে বলব”

সামনটা দারুণ। বেকড মাশরুম স্যালাড। বয়েল্ড ভেজিটেবলস, মেয়নিজ দিয়ে খেতে ভয় করছিল। গরমকাল। পুরনো হলে পেট না খারাপ হয়।

শিরিনকে উদ্বিগ্ন দেখে বলল “খাবার নিয়ে চিন্তিত কেন?”

“মেয়নিজে বড় ভয়। পেট খারাপ হবে না তো?”

“পেটে খেলে পিঠে সয়” সামনের টুকরো মুখে পুরে বলল “চালিয়ে যাও। ভেবে কাজ নেই। কে সারা সারা। যা হবার তা হবে”

ঘরে বসে শিরিন বলল “বড্ড ঝামেলায় পড়েছি। সেদিন তোমাকে অনেক কথা বলা হয়নি।... ধীরে ধীরে বলছি”

স্নেহাশিসও রোশনের সঙ্গে কথা, সুনেত্রার কম্পিউটারে ওর ছবির কথা চেপে গেল। আগে ও বলুক। তারপর যা প্রশ্ন করার করবে।

“তোমাকে বলেছিলাম সুনেত্রার সঙ্গে আমার ‘হায় হ্যালো’ সর্ম্পক। ঠিক তা ছিল না। আমার মতো সুনেত্রাও কলকাতার। বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। ওর দ্য নিউ এজের কলিগ সন্নিধিও। ওদের ম্যাথেরনের কাছে কার অ্যাকসিডেন্ট হয়। অন্যরা মারা গেলেও, সন্নিধি বেঁচে। এখন লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি...”

শিরিন বলে চলেছে। এসব তো স্নেহাশিসের জানা।

“সুনেত্রা, সন্নিধি আর আমি অনেক জায়গায় একসঙ্গে বেড়াতে গেছি। সন্নিধি অঙ্কুর বলে একজনকে ভালোবাসত। শুনেছি সেই রাতে অ্যাক্সিডেন্টের সময় ওর সঙ্গে ছিল। শুনলাম সে-ও মারা গেছে”

সেন্ট্রাল এসিতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম শিরিনের কপালে। স্নেহাশিসেকে বলল “একটা সিগারেট দাও তো। ... সুনেত্রার বেশিরকম সাধুপ্রীতি ছিল। কেন, বলতে পারব না। সাধু দেখলেই তার পেছনে ছুটত। গোঁড়া মারোয়ারি ফ্যামিলির মেয়ে কি না। সন্নিধি হাসপাতালে, সুনেত্রা মারা গেছে, এবার কী আমার পালা? ভীষণ ভয় করছে”

“বন্ধুত্ব থাকতেই পারে। ভয় কীসের?”

“আসল কথাটা ভয়ে বলিনি। শো-বীজ দুনিয়ার অলিখিত ডন চতুর্বেদী। আমাদের সবাইকে ওর ইশারায় নাচতে হয়। নইলে ইন্ডাস্ট্রিতে টেকা মুস্কিল। তোমাকে বলিনি কারণ তুমি বা তোমার মুম্বাইয়ের কলিগ ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চতুর্বেদী মুহূর্তে ধরে ফেলত আমার কাছ থেকে জেনেছ। আমাকে আর মুম্বাইতে করে খেতে হত না”

সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে বালিশে দেহটা এলিয়ে দিল। ওর স্তনের খাঁজ প্রকাশিত। এখন আর স্নেহাশিস দেখছে না, শুনছে।

“চতুর্বেদীকে বরাবরই গুড হিউমারে রাখি। আমাদের লাইনে অনেক মেয়ে। সবাই বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে। আমি আল্লার দিব্যি দিয়ে বলছি, ওর সঙ্গে শুইনি”

“তাহলে খুশি রাখলে কী করে?” স্নেহাশিস শিরিনের সেক্স লাইফ নিয়ে ইন্টারেস্টেড নয়।

“পার্টিতে ঢলাঢলি। তেল দিয়ে কথা বলে। ব্যাস ওটুকুই। মেহুলি মারা যাওয়ার পর চতুর্বেদী আমায় ঘন ঘন ফোন করতে থাকে”

“মেহুলির সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক?”

“ওর একটাই প্রশ্ন, তুমি ওর সম্বন্ধে জান কি না। তুমি আমার ফ্ল্যাটে থাকার সময়ও বেশ কয়েকবার ফোন করে। বারবার বোঝাবার চেষ্টা করি তুমি কিছুই জান না”

“চতুর্বেদী মেহুলি সম্বন্ধে জানতে চাইছিল কেন? মেহুলির সঙ্গে কী ওর কোনও সম্পর্ক ছিল? ওর মৃত্যুর সঙ্গে কী কোনওভাবে জড়িয়ে?”

“বলতে পারব না। মেহুলির সঙ্গে সম্পর্ক তো ছিলই। আমাদের মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে ওর সবার সঙ্গে সম্পর্ক। মেহুলির সঙ্গে না থাকার কোনও কারণ নেই। তবে কদ্দুর, জানি না। ইন্ডাস্ট্রিতে ডান কানও বাঁ কানকে কিছু বলে না। সবাই ইকোয়েশন কষতে ব্যস্ত”

“আন্ডারস্টুড”

বালিশটাকে জড়িয়ে, পায়ের ফাঁকে রেখে বলল “মেহুলির সঙ্গে ওর ব্যাপার কী, আমি কিছুই জানি না। তবে সেদিন হঠাৎ আমায় নিয়ে গেছিল ম্যাথেরনে, ভওয়ানিশঙ্করের আশ্রমে”

“হঠাৎ আশ্রমে কেন?”

“জানি না। মনে হল ভওয়ানিশঙ্কর চতুর্বেদীর গাইড, গুরু। গোঁড়া মুসলমান পরিবার থেকে এলেও ধম্ম-কম্ম বিশেষ করি না। আশ্চর্যই হয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেন?”

স্নেহাশিসের মনে পড়ল রোশনের কথা। সন্নিধি বয়ান দিয়েছে ‘ইট ওয়াজ এ ডেলিবারেট অ্যাকসিডেন্ট’ এও মনে পড়ল রোশন বলেছিল সন্নিধির সঙ্গে অঙ্কুরের ভাব-ভালোবাসা। ডবল কনফার্মড শিরিনের কথায়। এও বলেছিল ওরা যে ম্যাথেরন যাচ্ছিল, চতুর্বেদী আর ভওয়ানিশঙ্কর ছাড়া কেউ জানত না। রহস্যের কিনারাটা কি ওখানেই? দেখা যাক শিরিন আর কী বলে। শিরিন বালিশটা পায়ের ফাঁক থেকে কোলের ওপর তুলে উঠে বসল।

“ভওয়ানিশঙ্কর সৌম্য সুপুরুষ”

“চতুর্বেদী তোমায় ওখানে কেন নিয়ে গেছিল?”

“ভওয়ানিশঙ্করের স্পষ্ট ভদ্র ভাষায় ওয়ার্নিং, আমি যদি তোমায় কিছু জানাই, পরিণাম ভালো হবে না”

“আমার নাম জানে?”

“নাম শুধু নয়, সম্পর্কটাও। আমার তো কাউকে বলার নেই। মুম্বাইতে ওদের চর সব জায়গায়। নিশ্চয়ই আমার ওপরও চোখ রাখছে। ওরা জানবার আগেই কাল রাতে হঠাৎ ঠিক করে চলে এলাম”

“দরগা রোডের বাড়ি যাবে না?”

“মাথা খারাপ! বাড়ি গেলে কলকাতায় আসা জানাজানি হয়ে যাবে”

“ভুলেই গেছিলাম। তুমি তো সেলিব্রিটি”

“সেলিব্রিটি না ছাই। তুমি সাহায্য না করলে ছবি হয়ে দেওয়ালে ঝুলতে সময় লাগবে না। বাবাঃ, যে চক্করে পড়েছি। বুঝতে পারছি না এর থেকে কী করে উদ্ধার পাব?”

স্নেহাশিস সিগারেট ধরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। শিরিন বাধা দিয়ে বলল “আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। ভওয়ানিশঙ্করকে দেখে মনে হল, কোথায় যেন আগে দেখেছি। প্রথমে মনে করতে পারছিলাম না। পরে মনে পড়ল সুনেত্রার কম্পিউটারে। ওকে দেখেছিলাম সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্স করা কিছু ব্লু ফিল্মের ভিডিওতে”

স্নেহাশিসেরও মনে পড়ে গেল। সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্স ও কামসূত্রের বিভিন্ন লীলার ভিডিওগুলো সুনেত্রার কম্পিউটারে। জানত না সেই পুরুষ ভওয়ানিশঙ্কর। এখন জানল, ওর নাম ভওয়ানিশঙ্কর।

রোশনের কথা মনে পড়তেই জিজ্ঞেস করল “সুনেত্রা কী সেক্সচুয়ালি খুব অ্যাকটিভ ছিল?”

“কখনও বাড়িতে বয়ফ্রেন্ডকে দেখিনি। রাত কাটানো দূরের কথা”

“পার্টি-ড্রাগ এসবে ছিল?”

“তাও দেখিনি কখনও। খালি চাকরি নিয়ে মাঝে-মধ্যে আক্ষেপ। বলত চাকরিটা ভালো লাগছে না। আরেকটা পেলে ছেড়ে দেবে”

যদি শিরিনের কথা সত্যি হয়, তবে তেরো তলা থেকে লাফ দেওয়ার আগে, পার্টি ড্রাগস খেয়েছিল কেন? তাহলে কী সুনেত্রার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়? হত্যা! কে ওই লোকটি, যে সেদিন স্যানট্রো নিয়ে বেরিয়ে গেছিল? সেই কি ওই ড্রাগগুলো ওকে খাওয়ায়? একটা কথা স্পষ্ট, যদি ওই লোকটা সুনেত্রাকে পার্টি ড্রাগস দিয়ে থাকে, সে নিশ্চয়ই ওর চেনা। নইলে ঘরে ঢুকতে দেবে কেন? অনেক প্রশ্ন। উত্তর জানা নেই, শিরিনও দিতে পারবে না।

তবুও বাজাবার জন্য বলল “তুমি কী সিওর, সুনেত্রা সেক্স-ড্রাগসে জড়িয়ে ছিল না?”

“কী করে বলব? সারাদিন কাজের ধান্দায় ব্যস্ত। সময় কোথায় অত ডিটেলস জানার? যতটুকু জানি, মনে হয়নি। তবে কার মনে কী, বলব কী করে?”

সত্যি তো। আমরা শুধু বাইরেটাই দেখি। কজনের সময় আছে ভেতরকে পরখ করার, বোঝার, চেনার? দ্রুতগতি আধুনিক মুম্বাই শহরে নিজের বাইরে পৃথিবীটাকে দেখার সময় কোথায়? থাকলেও, ইচ্ছেই বা ক’জনের। ওরা বলবে, ইনফিলট্রেটিং অন প্রাইভেসি। মেকি সভ্যতা বিচ্ছিন্ন আত্মকেন্দ্রিক করে দিচ্ছে।

এখন মনে হচ্ছে, ভওয়ানিশঙ্কর নিছক সাধু নয়। এই চত্রেুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে চতুর্বেদীর মতো সেডি ক্যারেক্টারদের সঙ্গে যার ওঠাবসা। মহিলা পরিবেষ্টিত ভওয়ানিশঙ্কর দেহতত্ত্ব আর ঈশ্বরতত্ত্বের যুগলবন্দি চালিয়ে যাচ্ছে, না দেখলেও অনুমান করা যায়। কিন্তু চতুর্বেদী ও মেহুলি খুনের যোগসাজস বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত বা, সুনেত্রা বা লরি অ্যাক্সিডেন্টের সঙ্গেও। এভিডেন্স নেই। তবুও মন বলছে মিল থাকলেও থাকতেও পারে। যদি তাই হয়, মোটিভ কী?

সাধু মহিলা নিয়ে ফুর্তি করতেই পারে। অনেক সাধুই করে। নতুন কিছু নয়। কম বয়েসে ব্রহ্মচর্যে বেঁধে দিলেও জৈবিক কামনা মরে যায় না। আত্মপ্রকাশের পথ খোঁজে। প্রচলিত ঈশ্বর সাধনায় করাঘাত করে। ভোগের মধ্যেই ত্যাগ। ভোগ না করলে কি ত্যাগ করা যায়? আর্থিক, দৈহিক লোভ সুন্দরীদের শয়নকক্ষে আনার চ্যানেল হিসেবে চতুর্বেদীর সঙ্গে ভওয়ানিশঙ্করের সর্ম্পক অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু খুন করতে যাবে কেন?

দিন দুপুরে মাল না খেয়ে মাথাটা ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে খুনের কিনারায় নামেনি। সেও শিরিনের মতো এক বিশাল চত্রেুর নাগপাশে জড়িয়ে। অভিমন্যুর মতো হায়াত রিজেন্সির ২০৬ নম্বর ঘরে বসে মনে হল তার আর শিরিনের মধ্যে কার্যত অনেক ব্যবধান থাকলেও, দু-জনে একই নাগপাশে বন্দি। শিরিন মুখ বন্ধ রাখার জন্য, স্নেহাশিস বুঝেও। আসল সত্যটা ফাঁস না-করার জন্য। মুখ খুললে তার পরিণাম যে কী হবে, নিজেও জানে না। তবে এটা বুঝতে পারছে, পেছনে এক বিরাট চত্রু। এই চত্রেুর নাগপাশ লুকিয়ে মেহুলির খুনের অভ্যন্তরে। যে লুপহোলসগুলো সেদিন মধুসূদন মুখুজ্জে মনে করিয়ে দিয়েছিল, এবার সেই সূত্রগুলোই ছানবিন করতে হবে। ওখানেই আসল মোটিভ। শিরিনের কাছে নয়।

শিরিনেকে বলল “অত ভেব না। আমরা দুজনেই একই চত্রেু বন্দি। যদি মুক্তি হয়, দুজনেরই একসঙ্গে হবে”

শিরিন জবাব দিল না। বালিশ সরিয়ে, মাথাটা এলিয়ে দিল স্নেহাশিসের বুকে। একটু সান্ত্বনা খুঁজছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%