অনিরুদ্ধ বসু
মধুসূদন রোশনের রিপোর্টটা ফাইল করার আগে আরেকবার পড়ে দেখছিল। রোশন থ্রু প্রপার চ্যানেল সুনেত্রার মৃত্যু, তার পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের কপি, মুম্বাইয়ের ইনভেস্টিগেশন, পুনের ইনভেস্টিগেশন, ভওয়ানিশঙ্কর ও চতুর্বেদীর জেরার রিপোর্ট, সন্নিধির স্টেটমেন্ট সব ডিটেলসে পাঠিয়েছে। সঙ্গে সুনেত্রার হার্ড ডিস্কের শিল্ড কপি। শিবানী করঞ্জওয়ালার কথাও লেখা। ওই অজ্ঞাত লোকটির আধছেঁড়া ছবির সঙ্গে সুনেত্রার কম্পিউটারে পূর্ণ ছবির মিলের কমপিউটার এক্সপার্টের রিপোর্টটাও অ্যাটাচ করে দিয়েছে। সুনেত্রার বাড়িতে এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি যে শিরিনের সঙ্গে দেখা করবে বলেও দেখা না করে স্যানট্রোতে বেরিয়ে গেছে তার উল্লেখ আছে। ওখানকার কেয়ারটেকারের বয়ানে পুলিস আর্টিস্টের আঁকা ছবির সাদৃশ্যর কথা। ওই লোকটা সিন অফ ত্রুাইমে ছিল। কিন্তু মহারাষ্ট্র তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওকে আইডেন্টিফাই করা যায়নি। এও ইঙ্গিত করেছে এই লোকটির সঙ্গে মেহুলি ও সুনেত্রার মৃত্যুরও কোনও তালুক থাকতে পারে। কিন্তু কীভাবে?
সেকথার কোনও উল্লেখ নেই রিপোর্টে। এই উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে খুনের মোটিভ। লোকটিকে শনাক্ত করা না গেলে তো মোটিভও অস্পষ্ট। শেষে এও প্রশ্ন তুলেছে, যেহেতু সুনেত্রা ও মেহুলি অরজিন্যালি বাংলার লোক, খুনের সূত্র এখানে। এখানেই আরও বিস্তৃত তদন্ত হোক। মেহুলির মৃত্যুর ডিটেল্ড রিপোর্ট, যেহেতু সুনেত্রার সঙ্গে সোহমের যোগাযোগ, ওর মৃত্যুরও ডিটেল্ড রিপোর্ট চেয়েছে। মানিকতলা খুনের তত্ত্ব যদিও পরিতোষ সেন মধুসূদনকে দিয়েছে মুম্বাইয়ের ত্রুাইম ব্রাঞ্চে পাঠাবার আগে। রোশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে। মানিকতলার বড়বাবুকে আরেকটা ডিটেল্ড রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নোট দিয়ে ডিসিডিডি ইন্দ্রজিৎ কর পুরকায়স্থকে নোট দিয়ে চিঠি লিখল।
সে তো ফাইলিং অফিসার মাত্র। তার কী ক্ষমতা মানিকতলার বড়বাবুর সেকেন্ড রিপোর্ট চেয়ে পাঠানোর? একমাত্র বড়সাহেবই পারেন।
বাংলার দুটো খুন নিয়ে পল্টুর দোকানে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। যদিও আংশিকভাবে স্নেহাশিস আর রোশনের কথোপকথন শুনেছে, এই প্রথম সব তথ্য হাতে পেল। শিবানী করঞ্জওয়ালা মুম্বাইয়ের এলিটদের মৌসি। তার সঙ্গে অবশ্য চতুর্বেদীর সম্পর্ক থাকতে পারে। যেহেতু চতুর্বেদী সো-বিজ ওয়ার্ল্ডের ডন, কিন্তু ম্যাথেরনের সাধু ভওয়ানিশঙ্করের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিটা এখনও বোধগম্য হচ্ছে না।
সব কথাই পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ। রোশন শুধু একটাই ইচ্ছে করে উহ্য রেখেছে। ওদের কথার মধ্যে মধুসূদন ধরতে পেরেছিল, স্নেহাশিস সুনেত্রার মৃত্যুর সময় শিরিনের ফ্ল্যাটে ছিল। অবশ্য সে কথা কোথাও উল্লেখ করেনি। হাজার হোক, অনেকদিনের বন্ধু। একসঙ্গ পাশ, ট্রেনিং। স্নেহাশিস বেঙ্গল ক্যাডারে, রোশন মহারাষ্ট্র। স্নেহাশিসের নাম জড়ালে ও শুধু বিভাগীয় তদন্তেই জড়াবে না, স্ক্যামও হেডলাইনস হতে পারে। হাজার হোক, বউ-বাচ্চা আছে। আশিকির সঙ্গে যদি দু-এক রাত কাটিয়েও থাকে, ক্ষতি কী? মধুসূদন জানে না শিরিনের সঙ্গে এসপির সম্পর্ক কতদূর? স্নেহাশিসকে অপ্রীতিকর অবস্থায় ফেলতে চায়নি রিপোর্টে।
চতুর্বেদীর বয়ানটা মন দিয়ে পড়ছিল।
“আপকে সাথ ভওয়ানিশঙ্করকে কেয়া রিস্তা?”
“সাধু-সন্তকে সাথ কেয়া রিস্তা হো সকতে? মনকে, শান্তিকে রিস্তা”
“উসকে আশ্রম মে যাতে থে?”
“জরুর। উসকে বাণী মেরে লিয়ে ঈশ্বর মাফিক। সিরফ মেরে লিয়ে কেও, সবকে লিয়ে”
“আপ শো-বিজ দুনিয়েকে বড়ে আদমি। সভি আপকো পহেচানতে। ইধরকে কিসিকো আশ্রম মে লে গয়ে?”
“হাঁ। ইস দুনিয়া মে বহত ইনসিকিওরিটি। হর কোই লড়কি ইনসিকিওরিটিকে কিরদার। কিসিকো শান্তি কা আবশ্যকতা হো, উসে হম উসকে পতা দে দেতা থা। সিরফ শান্তিকে লিয়ে”
“উসদিন উনলোগ ম্যাথেরন যা রহে থে, আপ জানতে?”
“হাঁ। উসমে সে এক লড়কি সোফি, পহলে কইবার আশ্রমমে গিয়ে থে। ও ফোন মে বতায়া কোই দোস্তকো লেকর ভওয়ানিশঙ্করকে পাস যা রহে হ্যায়। গুরুদেবকো থোরা ম্যায় বোল দু”
“দিয়া?”
“হাঁ। কেও নেহি? লোগ শান্তিকে লিয়ে উসকে পাস যানে মাঙ্গতা তো ম্যায় কৌন হু উসে রোখনে?”
“শিবানী করঞ্জওয়ালকো জানতা?”
“নেহি তো। কৌন হ্যায়?”
“ওহ ভি উস গাড়ি মে থে”
“সয়দ সোফিকে পহেচান। মুঝে মালুম নেহি”
“সন্নিধি বোলা ও ঐসে অ্যাকসিডেন্ট নেহি থে। ইট ওয়াজ এ ডেলিবারেট অ্যাকসিডেন্ট। আপকা কুছ কহেনা হ্যায়?”
“কেয়া বলু? ম্যায় ওঁহা নেহি থা। সন্নিধিকে আপনা সোচ ভি হো সকতা। ইয়ে ভি হো সকতা, গাড়ি মে জো থে উসকে সাথ দুশমনি। হোনে তো বহত কুছ সকতা। আপ পুলিস। ইয়ে দেখনা আপকে কাম। মুঝে সিরফ অপনে ধন্দে চলানা হ্যায়। ইয়ে মত বোলিয়ে আপ নেহি জানতে ম্যায় কেয়া করতা?”
“ফির ভি আপ সে শুনে”
“জো আপ জানে ওহি। মেরা এক এজেন্সি হ্যায়। যব ভি কোই প্রডিউসার ইয়া ডিরেক্টর অ্যাড এজেন্সি সে কোই হিরোইন ইয়া মডেল মাঙ্গে তো উসে ম্যায় সহি আদমি দেতা। আচ্ছে কমিশন মিলতা। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট”
রোশন বয়ানের শেষে লিখেছে ‘হি ওনস অ্যান এজেন্সি নিয়ার ব্যান্ড্রা রিক্লেমেশন। দ্য নেম অফ দ্য কোম্পানি ইজ ‘এন্টারটেনমেন্ট আনলিমিটেড’। হি অলসো হ্যাস এ ব্রাঞ্চ ইন মাহেম অ্যান্ড ওয়ান ইন চেম্বুর। ইট ইজ এ রেজিস্টার্ড কোম্পানি। আই অ্যাম আনেবেল টু ফাইন্ড এনি ইরেলেভ্যান্স ইন হিস স্টেটমেন্ট’
হয়ত এই মৃত্যুর চত্রেুর সঙ্গে ওরা জড়িয়ে। কিন্তু মোটিভ এখনও বোঝা যাচ্ছে না। ওদের এগেনস্টে কোনও ডিরেক্ট এভিডেন্সও নেই। মধুসূদনের মনে হল, এভিডেন্স না থাকলেও ওরা গভীর জলের মাছ।
গিন্নির চেয়ে দ্বিগুণ সাইজের মেয়ে টেপির বিয়ে হচ্ছিল না। মেয়ের মানসিক বিষাদ কাটাতে মধুসূদন তাকে নিয়ে গিয়েছিল সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ অনঙ্গ দত্তর কাছে। কিছুদিনের চিকিৎসায় টেপিকে ভালো করে তোলে অনঙ্গ দত্ত। টেপির বিয়ের নেমতন্ন খেতেও এসেছিল। কি জানি এতদিন পরে মনে আছে কি না? সাহস সঞ্চয় করে ফোন করল। টেপির রেফারেন্স দিতে চিনতেও পারল ডাঃ অনঙ্গ দত্ত।
“একটু দেখা করার দরকার”
“কাল বিকেল সাতটায় আসুন”
মধুসূদনকে দেখে একগাল হেসে ডাঃ অনঙ্গ দত্ত বলল “মেয়ে কেমন আছে?”
কাঁচুমাচু করে বলল “আপনাদের আশীর্বাদে ভালোই। বছর দুয়েক হল ছেলে হয়েছে”
“আপনি এখন দাদু। মিষ্টি কই?”
“ভুল হয়ে গেছে স্যার”
মুচকি হাসলেন অনঙ্গ দত্ত। পেশেন্ট ভালো হয়ে সুখে-শান্তিতে ঘর করছে এ কথা শুনলে কোন ডাক্তারের ভালো না লাগে?
“এখন কী করছেন?”
“লালবাজারে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার”
“প্রমোশন হয়েছে। খুব ভালো কথা”
“সবই আপনাদের আশীর্বাদে। এবার অন্য কারণে এসেছি” পকেট থেকে চিরকূট বার করে বলল “রোহিপনল আর মেটামফেটামাইন-এর কম্বিনেশনে কী হতে পারে?”
অবাক অনঙ্গ দত্ত তাকাল মধুসূদনের দিকে “নামগুলো জানলেন কী করে?”
আমতা আমতা করে বলল “একটা মৃত্যুর ইনভেস্টিগেশন করছিলাম। সেখানে পোস্ট মর্টেমে মৃতের ভিসেরা থেকে ওই দুটো ড্রাগের ট্রেস পাওয়া গেছে”
“রোহিপনল নিলে ভুলে যায় সেই মুহূর্তে কী ঘটছে। ব্লাড প্রেসার কমিয়ে দিতে পারে। ঘুম ঘুম ভাব আসতে পারে। মাথাও ঘুরতে পারে। কনফিউশনও হতে পারে। আবার পেটের গন্ডগোলও”
“সেই মুহূর্তে তাহলে স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান থাকবে না?”
“নাও থাকতে পারে”
“আর মেটামফেটামাইন?”
“সেটাও মানসিক ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। অ্যাগ্রেশন সাইকোটিক বিহেভিয়ার। অনেক সময় হার্টেও প্রবলেম করে। কেসটা কী বলুন তো?”
“একটি মেয়ে মুম্বাইতে চাকরি করত। মেয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যদ্দুর জেনেছি ঈশ্বরভক্ত, গোঁড়া মারোয়ারি ফ্যমিলির। এক সন্ধেতে তেরো তলার ফ্ল্যাট থেকে লাফ দিল। ওরা বলছে আত্মহত্যা। ভিসেরা রিপোর্টে দুটো ড্রাগ পাওয়া গেছে। আমার মন মানছে না। রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা সাধুভক্ত মেয়ে এসব ওষুধ খেয়ে হঠাৎ আত্মহত্যা করতে যাবে কেন? এসব ওষুধের নামই বা জানবে কী করে?”
ডাঃ অনঙ্গ দত্ত চশমা খুলে বলল “এগুলোকে বলে পার্টি ড্রাগস। যারা ক্লাব পার্টি করে, তারা ব্যাবহার করে। উইসুয়ালি কোকে মিশিয়ে খায়”
“সারকামস্টেন্সিয়াল এভিডেন্সে কোনও প্রুফ পাওয়া যায়নি। যদিও ডাইনিং টেবলে খালি গ্লাস ছিল”
“ওটার কেমিক্যাল এক্সামিনেশন হয়েছে?”
“হ্যাঁ। কিছু পাওয়া যায়নি। দুটোকে মেশালে কী সাইকোটিক কনফিউশনে বারান্দা থেকে লাফিয়ে পড়া সম্ভব?”
“সম্ভব”
চমকে উঠল মধুসূদন “কতক্ষণ লাগে এফেক্ট হতে?”
“ওরাল ড্রাগ তো। পনেরো মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা কিংবা একটু বেশি”
“তার মানে কেউ যদি ওকে খাইয়ে চলে যায়, সে সিন অফ ত্রুাইমে নাও থাকতে পারে সেই মুহূর্তে?”
“যদি এই টাইমের মধ্যে বেরিয়ে যেতে পারে। আপনারা অবশ্য ভালো বুঝবেন। যে ত্রুাইম করে, তার রেজাল্ট না দেখে ইউসুয়ালি যায় না”
ফিস দিতে যাচ্ছিল। জিভ কেটে ডাঃ দত্ত বলল “এ মা, ছিঃ ছিঃ। মেয়েকে দেখাতে এনেছিলেন, তখন ফিস নিয়েছি। ভালো কাজের জন্য ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছেন। ফিস নেব কেন? সবই কী ব্যবসা?”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে মনে হল, স্নেহাশিস আর রোশন সুনেত্রার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলছে। এটা আত্মহত্যা নয়, হত্যা! আততায়ী সুনেত্রাকে ড্রাগ খাইয়ে চলে যাওয়ার পর সে বারান্দা থেকে ঝাঁপ দেয়। কে এই আততায়ী? কেনই বা সুনেত্রাকে হত্যা করল? সুনেত্রা কি তবে ভওয়ানিশঙ্কর আর চতুর্বেদী চত্রেু জড়িয়ে? তাই বেঘোরে প্রাণ দিতে হল। সেই লোকটি, যে শিরিনের নাম লিখে কমপ্লেক্সে ঢুকেছিল অথচ শিরিনের কাছে যায়নি, সে কি তবে সুনেত্রাকে ওই ড্রাগ খাওয়াতে এসেছিল? নিশ্চয়ই সুনেত্রার পরিচিত, তাই ঘরে ঢুকতে দিয়েছিল। ভওয়ানিশঙ্করের সঙ্গে সুনেত্রার আধ্যাত্মিক সংযোগ। তবে কী ভওয়ানিশঙ্কর ওকে পাঠিয়েছিল? মাথায় ঢুকছে না শিরিনের নাম লিখল কেন? শিরিনকে অ্যালিবি রাখতে চেয়েছে। শিরিন হয়ত এই চত্রেু নেই। হায় রে মধুসূদন। যদি একবার জানত, সেই মুহূর্তে স্নেহাশিস শিরিনের ফ্ল্যাটে তাহলে চিত্রপট সম্পূর্ণ হত। ওবভিয়াস অ্যালিবি পুলিস অফিসার স্বয়ং। নিঃসন্দেহ সুনেত্রার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, হত্যা। কে এই লোক যার ছবি নিয়ে এত খোঁজাখুজি?
সে কী ভওয়ানিশঙ্করের লোক? মনে তো হচ্ছে। তাই সুনেত্রার ফ্ল্যাটে তার অবাধ প্রবেশ। প্রশ্নটা অন্য। তবে কী ওই লোকটি কোক খায়নি? যদি সুনেত্রাই কোক খেয়ে থাকে, সে অতিথি হয়েও কোক না খেয়ে, চলে গেল কী করে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।