একুশ

অনিরুদ্ধ বসু

দিনের মতো প্যাক আপ। সারাদিনের ব্যস্ততায় একটুও অবসর মেলেনি। আউটডোরে বিরামহীন কাজ। নো ব্রেক্স। সিড্যুল বাড়লে মিটার হুড়হুড় করে চড়ে। তাই ডিরেক্টর যতটা সম্ভব খাটিয়ে নিতে চায়। মেক-আপের সময়ও ফুরসত নেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর স্ক্রিপ্ট নিয়ে নেক্সট সিকোয়েন্সের ডায়লগ কাটা রেকর্ডের মতো উগলে যাচ্ছে। অন্য কিছু ভাবার সময় নেই পৌরভির।

কয়েক কোটি টাকার প্রজেক্ট। হিট না করলে রাস্তায়। সারাদিন ধরে ড্রেস চেঞ্জ করে, নতুন মেক-আপ লাগিয়ে, কখনও হিরোকে জড়িয়ে রোমান্টিক ডায়লগ আওড়াচ্ছে, কখনও মন্দিরের ফাঁকে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাচ্ছে। পরমুহূর্তেই বিকিনিতে সমুদ্রের জল থেকে উঠে আসছে রূপ-লাবণ্যময় দেহ-সম্ভারে। ব্রা আর প্যান্টির মাঝেও ওয়াটার প্রুফ মেক আপ। দেহের সব কিছুই আবরণে জড়ান। সে ডিজাইনার জামা বা স্বল্প বসনা অনাবৃত দেহে মেক-আপের প্রলেপ। এই আর্টিফিশিয়াল ভারচুয়াল রিয়ালিটির বাইরে মন পালাতে চায়, নৈসর্গিক মহাবালিপুরমের সৈকতে। সামুদ্রিক লাবণ্যকে নিজের করে পেতে।

অত সহজ? পৌরভির মুখ কে না চেনে এই দক্ষিণে? জনপ্রিয় নায়িকাদের মধ্যে অন্যতম। সে কি শ্যামলা মুখের মিষ্টিমধুর হাসিতে? না কি কাজলকালো চোখের চাহনিতে? না কি প্লাস্টিক সার্জারি করা দেহের মনমোহিনী আকর্ষণে? দর্শকরা না জানলেও, সে জানে। অভিনয় দক্ষতায় দর্শককে মুহূর্তে কাঁদাতে পারে। সেটাই তাকে দক্ষিণী নায়িকাদের সাম্রাজ্ঞী করে রেখেছে। রেট প্রচুর। খাটনিও ততোধিক। প্রডিউসাররা ডেট পাওয়ার আশায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার বিশাল বাঙ্গালুরুর প্রাসাদের ড্রয়িং রুমে। যদি সেত্রেুটারি একটু...। পৌরভি মানেই হিট। ওরা জানে মোটা টাকা নিলেও তা উঠে আসবে।

এবার টানা এক উইকের শুটিং মহাবালিপুরমে। বে অফ বেঙ্গলের করমণ্ডল কোস্টে পল্লভা রাজত্বে সপ্তম থেকে দশম শতক, পল্লভাদের দ্বিতীয় রাজধানী, সুপ্রতিষ্ঠিত সি-পোর্ট। নামটা ইতিহাসের পাতা থেকেই। এক সময় এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ দুষ্ট রাজা মহাবালি এর অধিপতি ছিলেন। বিষ্ণুর সঙ্গে যুদ্ধে মৃত্যু। সেই থেকে নাম মহাবালিপুরম। মামাল্লাপুরমের নৃপতি, দারুণ কুস্তিবিদ নরসিংহ বর্মন জায়গার নাম পরিবর্তন করেন। গুপ্ত ডিন্যাস্টির পতনে, তৃতীয় শতাব্দী থেকে পল্লভা ডিন্যাস্টি এর অধিকার অর্জন করে। পল্লভা রাজত্বে, বিশেষ করে মধ্য-অষ্টম থেকে মধ্য-নবম শতাব্দিতে মহাবালিপুরমের বিকাশ। কবি, সাহিত্যিক, ভাস্কর, শিল্পী, বিদগ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে নতুন রেনসাঁর শুরু। তাই স্থাপত্যের কারুকার্য, সমুদ্রতটের মাধুর্য, সৃষ্টিশীল লোকেদের এখানে টেনে আনে। সে প্রকৃতি পিপাসু টুরিস্টই হোক কিংবা কম বাজেটের ফিল্ম ডিরেকটর। যাদের বাজেটে সুইজারল্যান্ড ধরাছোঁয়ার বাইরে। এহেন ইউনিটকে নিয়ে তো জনবহুল মহাবালিপুরম শহরে শুটিং করা যায় না। তাই মহাবলিপুরম থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে এই কোয়ালিটি ইন বিলাসবহুল এমজিএম বিচ রিসর্ট।

ইউনিটের বেশিরভাগ নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। কেউবা সারাদিনের ক্লান্তির পর ইউনিটের ভাড়া গাড়ি নিয়ে শহর ঘুরছে। কাল সকাল থেকে আবার হাড়ভাঙা খাটুনি।

সব থেকে বিলাসবহুল স্যুটের বেল টিপতেই বেয়ারা “মেমসাহাব?”

“স্ক্রুড্রাইভার ককটেল”

কী বুঝল কে জানে? সেলাম ঠুকে বেরিয়ে গেল। বিবস্ত্র পৌরভি ঘাগরা চোলি ফেলে, প্যান্টি-ব্রা ছুড়ে বাথরুমে। বাথটবের ফেনার সাবানে মুছতে মেকি দুনিয়াকে। সারাদিন তার পেশা। এখন নিজের নেশায় সন্ধে। নাতিশীতোষ্ণ বাথটবের জলে নিজেকে ডুবিয়ে রিল্যাক্সেশনের স্বাদ। শুটিং শেষে তার নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস। গা মুছে ঝাপসা হওয়া বাথরুমের আয়নায় দেহটাকে দেখল। স্তনের উচ্চতার পরিমাপ। পশ্চাতের গাঢ়ত্ব, কোমরের মেদ। স্যালাড আর পিলে দেহকে আটুট রাখা। সামান্য মেদ জমেছে। আরেকবার লাইপোসাকশন কারাতে হবে। ক্যামেরায় ধরা না পড়লেও, ক্লোজ-আপে প্রকট। বিশেষ করে, বিকিনিতে বা রাজস্থানি ড্রেসে। এই টুকরো মেদগুলো দর্শকদের যৌন পিপাসার পরিপন্থী। তার সাম্রাজ্ঞীর আসনকে যে কোনও মুহূর্তে ধসিয়ে দিতে পারে, তা পৌরভির থেকে ভালো কেউ জানে না।

ভাবছিল মধুস্করার পরিচিত ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবার ফিরে যাবে কি না। বেলটা বাজতেই, বাথরোব জড়িয়ে ঘরে। সোফার সেন্টার টেবলের দিকে ইঙ্গিত “কিপ ইট দেয়ার”

“এনি ফুড ম্যাডাম?”

“নো”

হিরোইনদের খাওয়া সবসময় সংযমের মধ্যে রাখতে হয়। বেয়ারাকে কটাক্ষ “হোয়াই ওয়ান গ্লাস? ব্রিং এ বিগ জার অ্যান্ড লিভ ইট হিয়ার। অ্যান্ড আনাদার গ্লাস প্লিজ”

“ইয়েস ম্যাম” বেয়ারা বেরিয়ে গেল।

হিরোইন হওয়ার অনেক সুবিধে। প্রডিউসার দেখভালের কার্পণ্য করে না। আতিথেয়তায়ও লাগাম নেই। যা চাও, তাই পাবে। একটাই কামনা - ছবিকে হিট করাও। অর্থের বন্যা।

মাত্র এক চুমুক দিয়েছে, ফোন বেজে উঠল “আর ইউ ফ্রি, অ্যালোন?”

“ইয়েস। কাম অ্যালং”

হেয়ার ড্রেসার মধুস্করা। ছোটবেলার বন্ধুও। দুজনের সাকসেস সমসাময়িক। মধুস্করা খুব কম-ই আউটডোর শুটিঙে যায়। চেন্নাইয়ের মাউন্ট রোডের বিউটি পার্লার নিয়ে ব্যস্ত। পৌরভির ব্যাপারে স্বতন্ত্র।

মধুস্করা স্ক্রুড্রাইভারে চুমুক দিল “ইট হ্যাস বিন এ হেকটিক ডে টুডে”

“ট্রু” সায় দিল পৌরভি “ওয়াজ দ্য বিকিনি সট ওকে? ইউ স্য ইট ইন দ্য মনিটর?”

“পার্ফেক্ট। ইউ লুকড গরজিয়াস”

“ডোন্ট ফ্ল্যাটার মি। ইটজ অল ইওর গুড ওয়ার্ক”

“ইফ ইউ ডিডন্ট হ্যাভ এ লাভলি বডি, হাউ কুড আই ব্রিং আউট দ্য বেস্ট ইন ইউ?”

“দ্য বেস্ট ইজ ইন এভরিওয়ান। ইট জাস্ট হ্যপেনস আই অ্যাম দ্য হিরোইন”

“মি টু? ইওর পুওর হেয়ার-ড্রেসার?”

“পুওর? ইউ মাস্ট বি জোকিং। হু নোস হু ইজ পুওর? হু নোস হু ইজ দ্য বেস্ট?”

পৌরভি সোফা ছেড়ে উঠে দরজাটায় ছিটকিনি লগিয়ে বলল “হ্যাভেন্ট উই এঞ্জয়েড ইচ আদার্স পভার্টি অ্যান্ড দ্য বেস্ট টুগেদার? স্ট্রিপ অফ। ইউ হ্যাভ গিভেন মি মাই বেস্ট ইন দ্য সটস। নাউ আই উইল সো ইউ ইওর বেস্ট”

মধুস্করা বুঝল পৌরভি কী চাইছে। এ তো প্রথম নয়। প্রথম জীবনে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, দেহের ঘনিষ্ঠতার ছোঁয়া তখনও পায়নি। পৌরভি তখন হিরোইন নয়, শুধুই বান্ধবী। আর পাঁচটা বান্ধবীর মতো। যতই খ্যাতির শিখর চূড়ায় উঠেছে, বান্ধবীর সংখ্যা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। মধুস্করা রেগুলার হেয়ার ড্রেসার নয়। শুধু পৌরভি ছাড়া কয়েকজন বাদে কাজ করে না। সময় কোথায়? মাউন্ট রোডে নিজের বিউটি পারলার চালাতে হয়।

পৌরভি হিরোদের সঙ্গে প্রফেশনাল দূরত্ব বজায় রাখে। বিশেষ করে আউটডোরে। গসিপে জড়াতে চায় না। হিরোরা গুণে অনেকটাই নিকৃষ্ট, সম্পর্কে জড়িয়ে সাম্রজ্ঞীর পোজিশন নষ্ট করতে চায় না।

তবুও মানুষ তো।

খ্যাতির স্বর্ণশিখরে সব মানুষই একা। সারাদিনের ক্লান্তির ফাঁকে এমনি কোনও নিরালা বনাঞ্চল খুঁজে পেয়েছিল পাড়ার বন্ধু মধুস্করার মধ্যে। অন্য রূপে। তন্বী, যৌবনা। মুখশ্রী অপরূপা না হলেও দেহে যৌবনের আহ্বান। শরীর পুরুষের বুকে হিল্লোল তুলতে পারে।

ডোর লক করে ফিরে দেখল, মধুস্করার ঢিলেঢালা পায়জামা-কুর্তা মাটিতে। অন্তর্বাসহীন ঘন অরণ্যের দিকে চেয়ে সুপ্ত কামনা পেখম মেলছে।

মনে পড়ে গেল চেন্নাইয়ের ঝুপড়ির দিনগুলো। অভাবের তাড়নায় কার্ড-রাইস জোটে না। বাবা মারা গেছেন। মায়ের রোজগার করার ক্ষমতা নেই। ছোটভাইটার স্কুলের ফিস দেওয়াও স্বপ্নের অতীত। পাড়ার রকবাজ মুনিয়া এসে বলেছিল “কামানে মাঙ্গতি?”

“কৈসে?”

“ফিল্ম করকে”

কী ফিল্ম? কী করতে হবে? কিছুই জিজ্ঞেস করার অবকাশ হয়নি। টাকা চাই। খাওয়ার জোগাড় চাই। দেহ, বস্ত্র, আচ্ছাদনের ন্যূনতম সংস্থান। সংসার বাঁচাতে হবে।

মুনিয়া নিয়ে গেছিল ভিলেজ রোডের এক সাধারণ বাড়িতে। পৌরভি জানত শুটিং স্টুডিওতে হয়। বাড়িতে আবার কীসের শুটিং?

শঙ্কর পিল্লাই পৌরভিকে বলেছিল “টেক অফ ইওর ক্লোদস। মেক লাভ টু দিস গার্ল” চমকে উঠেছিল। এ যে ব্লু-ফিল্ম। ইতস্তত করতে দেখে শঙ্কর বলেছিল “উই উইল নট শো ইওর প্রাইভেট পার্টস। ইট ইজ সফটকোর”

তবুও দ্বিধা। বাঁচার জন্য এও করতে হবে? টাকা না হলে বাঁচা সমস্যা।

শঙ্কর পিল্লাইয়ের প্রলোভন “টেন থাউজেন্ড। টেক ইট অর লিভ ইট”

মন বলছে না। সামনে দশ হাজারের কড়কড়ে বান্ডেল। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেছিল। উলঙ্গ হয়ে তো স্নান করে। কেউ টাকা দেয় না তার জন্য। ভিডিওতে এক-আধবার হলে ক্ষতি কী?

টেন থাউজেন্ড। সেই শুরু। জীবনের একমাত্র নগ্ন দৃশ্যের রুপালি চিত্রায়ন। যার একমাত্র কপি পৌরভির সিন্দুকে। অনেক টাকার বিনিময়ে কিনেছে বিগত ইতিহাসের নগ্ন সত্য মুম্বাইয়ের চতুর্বেদী বলে এক শো-বিজ ডনের কাছ থেকে। বিত্রিু করতে চায়নি চতুর্বেদী। শেষে পৌরভির কন্ট্যাক্টসের চাপে নতি স্বীকার। সে নিয়ে ওর এখনও রাগ। সরিয়ে দিয়েছে সাম্রাজ্ঞী হওয়ার শেষ কাঁটা।

দশ হাজার টাকা নিয়ে ফিরেছিল বটে। সঙ্গে বুকভরা স্বপ্ন। ঝুপড়িতে শুয়ে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের নয়, বাস্তব আঙিনার। যদি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই দশ হাজার, হিরোইন হলে না জানি কত? তাকে বাস্তবে পেয়েছে তিলতিল করে এতদিন ধরে। পরিণতি আজ মহাবালিপুরমের ডিলাক্স সুটের উন্মুক্ত টেরেস। তবু স্বপ্ন অন্তহীন।

জড়িয়ে ধরে চুমু খেল মধুস্করাকে। তন্বী দেহকে গ্রাস করল লাখো ফ্যানের মাদকতা। মধুস্করার মধ্যে এমন জাদু, যা সুপ্ত কামনাকে বাইরে আনতে পারে। কাঁপিয়ে দিতে পারে দেহের অণু-পরমাণু। ছন্দের আবেগে নারীর পুরুষহীনতার অভাব ভরিয়ে দিতে পারে। স্ক্রু ড্রাইভার মাথায় চড়েছে। চাই, শুধু চাই, দৈহিক মুক্তি। এখানে। এই মুহূর্তে... দেহ মিশে গেল দেহে। আবেগ মিশে গেল আবেগে। উচ্চাঙ্গ দীর্ঘশ্বাস নিম্নাঙ্গ জলপ্রপাতে। কাজের সিড্যুলের ফাঁকে সুপ্ত কামনা বহুদিন পরে সজাগ। মুক্তি দুজনের তৃষ্ণার। বাকি স্ক্রু ড্রাইভারের জার ভাগাভাগি করে শেষ করতে উদ্যত।

“হোয়াট সট হ্যাভ ইউ টুমরো?”

“আই অলমোস্ট ফরগট। ডান্সিং সিকোয়েন্স উইথ অফ এ সং। ফরগট টু লিসেন টু দ্য সং। থ্যঙ্কস ফর রিমাইন্ডিং”

নগ্ন পৌরভিকে মধুস্করা বাধা দিল “পুট অন ইওর পাজামাস। উই উইল গো টু দ্য বিচ ফর এ স্ট্রল”

“অ্যাট দিস আওয়ার?”

“হোয়াই নট? লাভলি ওয়েদার আউটসাইড”

অন্তর্বাসের প্রয়োজন নেই। ঢিলেঢালা পাজামা ফতুয়া পরে পৌরভি বলল “লেট মি টেক দ্য মোবাইল” মোবাইলটা বার করতে গিয়ে হাতে ঠেকল এমপিথ্রি প্লেয়ার “হিয়ার ইজ দ্য রেকর্ডেড সং হুইচ গোস উইথ দ্য ডান্স সিকোয়েন্স টুমরো”

মধুস্করাও ততক্ষণে জামাকাপড় পরে ফেলেছে। আয়নায় চুল আঁচড়াতে দেখে পৌরভি এমপিথ্রি প্লেয়ারটা পাজামার পকেটে গুঁজে বলল “হেয়ার ড্রেসার্স ক্যান নেভার ইভেন লিভ দেয়ার হেয়ার অ্যালোন। লেট অ্যালোন প্রফেশনালি। কাম, লেটস গো টু সি দ্য মুন”

কোয়ালিটি ইন এমজিএম রিসর্টের প্রাইভেট বিচটা রাতে সত্যিই মনোরম। স্ক্রু ড্রাইভারের নেশার মাদকতায় ঘরে বসে গান শোনার মানেই হয় না। মধুস্করা ঠিকই বলেছে। বাইরেটা অনেক আকর্ষণীয়। দু-পাশে নারকেল গাছের নীচে সবুজের সমারোহ। দিনের বেলায় ফুলের গালিচার ফাঁকে অনেক প্রজাপতি উড়তে দেখেছিল। এখন সন্ধের অন্ধকারে ফিরে গেছে আশ্রয়ে। মৃদু চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতায় সমুদ্রের ঘুমপাড়ানি গান। কিনারে হাল্কা ঢেউ আছড়ে পড়ায় চাঁদের আলোয় জোনাকির ঝিলিক। সাগরের দখিনা বাতাসের স্পর্শ। নেশাগ্রস্ত, পরিতৃপ্ত, দুজন। মন খুলে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সময়। ঝুপড়ির স্মৃতি মুছে প্রকৃতির কোলে ভাসিয়ে দেওয়া। অনেক হারনোর মধ্যেই মুহূর্তটুকু নিজের করে পাওয়া।

পৌরভি মধুস্করাকে বলল “লাভলি। ইজন্ট ইট?”

চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে মধুস্করা “লাভলি। বিউটি ইজ এভরিহোয়ার। ওনলি নিডস দ্য রাইট মুড টু হিয়ার ইটস মেলডি”

মুড মানে গান। মুড মানে ছন্দ। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ওরা দুজনে। দূর থেকে পৌরভি শুনতে পেল মধুস্করার মোবাইলের আওয়াজ। কারও সঙ্গে কথা বলছে। হঠাৎ মনে পড়ল এমপিথ্রি প্লেয়ারের গানটা এখনও শোনা হয়নি। কালকে সট ভোর ছটায়। একবার শুনে রাখলে ভালো। সুরের সঙ্গে মুড আর পোজগুলো ঠিক করে নিতে পারলে বেস্টটা দিতে পারবে। স্ক্রুড্রাইভারের নেশা শিথিল হচ্ছে। পৌরভি প্রফেশনাল। কাজের ব্যাপারে একশো ভাগ। কালকের সটের সিকোয়েন্সগুলো আন্দাজ করতে অসুবিধা হবে না। যতক্ষণ না ঘুম চিন্তাকে ঢেকে ফেলে। ফতুয়া থেকে প্লেয়ার বার করে ইয়ারফোনটা কানে লাগাল।

সুইচ অন করতেই... সব অন্ধকার!

মোবাইল অফ করে পকেটে রাখতে গিয়ে মধুস্করার কানে এল প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। দেখল পৌরভির দেহ জ্বলছে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চারদিকে ছিটকে পড়ছে। ছিন্নভিন্ন দেহের অংশগুলো। লুটিয়ে পড়েছে জ্যোৎস্নাভেজা বালুকাবেলায়। ছুটে গেল ওর দিকে। কাছে যাওয়ার আগেই বুঝতে পারল সব শেষ। বালুচরে পৌরভির দেহ ভস্মীভূত। রক্তমাংসের টুকরো। কোনও অংশ ইন্ট্যাক্ট নেই।

সমুদ্রের মৃদু জলরাশির শব্দ, চাঁদের স্নিগ্ধতার মৃদু আলোক স্বশব্দে ঘোষণা করছে নৈসর্গিকের সঙ্গে জৈবিকের তফাত। প্রকৃতির কোলে ডোবা পৌরভিকে নিজের কোলে টেনে নিয়েছে।

হল কী করে? মধুস্করার স্বপ্নেরও বাইরে...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%