সাত

অনিরুদ্ধ বসু

তীব্র গতিতে ছুটে আসছে ট্রাকটা। সোফির মনে হল, ট্রাকটা রাস্তার ডান দিক না ঘেঁষে, ওর গাড়ির মুখ বরাবর এগিয়ে আসছে। ভয়ে শিউরে উঠল। স্টিয়ারিংটা বাঁ দিকে কাটাল। পাশে অনেকটা খাদ। বেশি ঘোরানো যাবে না। তবুও যতটা সম্ভব, বাঁ দিকে কাটিয়ে ট্রাকের গতিপথ থেকে সরে দাঁড়াবার চেষ্টা।

পাশের সিটে অঙ্কুর ভয়ে শিউরে উঠল “ঔর বাঁয়ে ঘুমাও”

“কৈসে? দেখ নেহি রহে হ? পাস মে গেহরাই”

অঙ্কুরের-ই চালাবার কথা ছিল। বেশি হুইস্কি খেয়েছে বলে সোফি দেয়নি “দেখ রহে হো অপনে আপকো? কিতনা পিয়া। ঐসে দারু পি কর গাড়ি চলানে হাম সব উপর চলে যায়েঙ্গে। লো, পাস মে বৈঠো। ম্যায় চালাতি হুঁ”

পেছন থেকে শিবানী করঞ্জোয়ালা “হাঁ সোফিকো হি চলানে দো। ইয়ে শালি কমবক্ত সন্নিধি ভি বহত বিয়ার পিয়া। সারে রাস্তে পিসাব করতে করতে জায়েগি। শালি ইধর ইতনা পিসাবখানে কাঁহা?”

পাশ থেকে সন্নিধির প্রতিবাদ “কেঁও মৌসি? সারে হাইওয়ে তো এক পিসাবখানা”

"লো বাত শুন। ইয়ে কমবক্ত ভি দারু পিকর উলটি সিধি বোলতি হ্যায়। কিতনি বার কহা দারু পিকর উলটি-সিধি বোলনেকা নহি, করনেকা হ্যায়। ইসে মরদ লোক খুশ হোতা। উলটি-সিধি বোলে তো মরদকা দিমাক চড় যাতা। মস্তিকা মুড বিগড় যাতা”

সোফি গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে বসে বলেছিল “চলো। ম্যায় হি চলা লেতি। বৈঠ মৌসি। ... সন্নিধি পিসাব করনা হ্যায় তো অভি কর লে। রাস্তে মে ঝোপড়ি ভি নেহি মিলেগা”

“পিসাব কী তেরা বাপকা মাল? যব চাও নিকল আয়েগা?” সন্নিধি খেঁকিয়ে উঠল।

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে সোফি বলল “লে ফির চল্। পিসাব কো তেরা বাপকে পিঞ্জরে মে বন্ধ কর। নভিন ভোরা জব বোলে নিকল না”

পেছনের দরজাটা সন্নিধি বন্ধ করল “নিকলনে তো পড়েগাহি। নেহি তো শালি রোটি কমাতে কমাতে জিন্দেগি গুজর জায়গা। হমে ভি তো অনসূয়া বাসু বননা হ্যায়” অন্ধকারে হেড-লাইটটা অন করে সন্তর্পণে গাড়ি চালাতে লাগল। মাঝরাত হলেও ম্যাথেরন পৌঁছতে হবে। অঙ্কুর, সোফি আর সন্নিধি, রাত নটায় মুম্বাইয়ের নাইটক্লাব ‘ইনসমনিয়া’ থেকে বেরিয়েছে। মাঝে মৌসিকে তুলেছে। উইকেন্ডে উপরি কামানোর সুযোগ। ছাড়ে কে?

অন্ধকার রাত। বেশিদূর দেখা যাচ্ছে না। হেড লাইটের আলোয় যতটা। তারপর ঘন অন্ধকার। মুম্বাইয়ের উষ্ণতা কুয়াশায় ম্রিয়মাণ।

“ফগ লাইট জলা দে সোফি” হুইস্কির নেশা জেঁকে বসলেও অঙ্কুরের স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পায়নি।

ফগ লাইট জ্বালিয়ে যতদূর দেখা যায়। আলোর কণা কুয়াশার মধ্যে মুক্তোর মতো রিফ্লেক্ট করে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। নেশার ঘোরে তারই ফাঁক দিয়ে রাস্তা ফলো করার চেষ্টা। গাড়ি যাতে বেপথে না যায়। অঙ্কুরের ভেতর চাপা উত্তেজনা। প্রেম-ভালোবাসা। তাও অন্যের মত-মতো? সন্নিধিকে ডাম্প করে মেহুলিকে বিয়ে? হোক না সে নামী-দামি মডেল। অঙ্কুরের কী? ভালোবাসা তো বাজারে বিত্রিুর নয়। নামের ওপর দাঁওতে চড়াতে হবে।

সন্নিধির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে আলাপ। একদিন বিকেলে ব্যান্ডারা বিচে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছে। হঠাৎ পানিপুরি খাওয়ার শখ। সেখানে আরও একটি মেয়ে। আটটা পানিপুরি শেষ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে। ছিপছিপে কুঁড়ি। নীল জিনস্, সাদা মিনি টপস্। সরু নাভির সাড়ম্বর শোভায় চিকচিকে দুল ঝুলছে। সরু নিতম্ব। এদের গোলগাপ্পা খেলেও ওজন বাড়ে না।

“ব্যাস আঠ মে খতম?” মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে।

“বহত হো গয়া। ইসসে জাদা খানে পর রাতকে খানা ভি বন্ধ”

“আরাম সে খাও। চলো ম্যায় আজ তুমহে খিলাতি। জি ভরকে খাও। ইয়েহি আজকা ডিনার। ... আরে ভাই, উসকো ঔর চার দো। মেরে তরফ সে”

“আপকা শুভনাম?”

“সন্নিধি”

“অঙ্কুর”

“জনম তো বহত পহলে। ফির ভি অভি তক অঙ্কুর? কিসকে?”

“ইঞ্জিনিয়ারিং কা অঙ্কুর। আইআইটি মে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং”

“তব তো শিরফ অঙ্কুর নেহি অসলি দিমাক কে মালিক”

পানিপুরির তেঁতুল জলটা গিলে বলেছিল “আপ?”

“কোম্পানি মে পিআরও”

সেই আলাপ। সেদিন মোবাইল নম্বর বিনিময় আর পানিপুরিতে ইতি। দুটো তরতাজা প্রাণের আবেগ সেখানে থামেনি। ম্যারিন ড্রাইভে হাঁটা। কোলাবার বাড়িতে সামোসা। ইরসে সিনেমা। অঙ্কুরের জীবনে শুধু ছন্দ নয়, অর্থের রূপও। সন্নিধির অর্থ। দ্য নিউ এজে পিআরও। পার্ট টাইম মডেলিং। হিরোইন হওয়ার শখ। ওর কোলাবায় বাড়ি। বাবার মুম্বাইতে একটা ফুড চেনের ব্যবসা। বাবা বলে “এক টাইম ম্যায় সবজি লে কর রাস্তে মে ঘুমতা থা। উঁহা সে ইঁহা। রূপয়ে লুটানে কা নেহি। রখনে কা”

বিচক্ষণ বাবা হাতখরচের জন্য মাসে বিশ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। তাতে কী চলে? এক একটা উইকেন্ডে অনায়সেই পাঁচ হাজার টাকা উড়ে যায়। চাকরি থেকেও মাস গেলে হাজার তিরিশ। তাও যথেষ্ট নয়। অগতির গতি, জীবনের আরেক ছন্দের আলোকিত দূত মৌসি। সন্নিধির হাত ধরেই অঙ্কুরের রঙিন দুনিয়ায় প্রবেশ। নট জাস্ট জ্যঝ বাই দ্য বে, ফ্রে অ্যান্ড আইস, প্রাইভ, ইনসমনিয়া, ব্লিঙ্গ-এর মতো মুম্বাইয়ের নাইট ক্লাবে বিচরণ। মধ্যবিত্ত অঙ্কুরকে নতুন স্বপ্নে ভরে দিয়েছিল। মধ্যরাতের মাদকতা তো ফোকটে আসে না? টাকা চাই। সন্নিধির মাস মাইনেয় পূর্ণ হওয়ার নয়। শর্ত একটাই - মন অঙ্কুরের কাছে, দেহ মৌসির জিম্মায়। অঙ্কুর মানতে না পারলেও, আবেগের কাছে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে কুরবান করেছিল। সন্নিধির তালে। ওকে যে সে ভালোবাসে।

সোফির বাবার হীরের ব্যাবসা। বেশিরভাগ সময় বাইরে। ছোটবেলায় মা মারা গেছে। মালাবার হিলসের বাড়িতে সোফি সাম্রাজ্ঞি। বাপের অঢেল টাকা। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট। পড়াশোনার ইচ্ছে নেই। করে কী হবে? ক্লাব, পার্টি, নাচ, ছেলেবন্ধু নিয়ে মশগুল। এখন সেটাও একঘেয়ে। ইয়ং ছেলেদের দেখলে আর উত্তেজনা জাগে না। চাওয়ার থেকে পাওয়াটা বেশি হলে আকাঙ্ক্ষা ক্ষীণ হয়ে আসে। ওর মনে হয় উত্তেজনার পদ্ধতিগুলোও গতে বাঁধা।

“সেক্স তো চার কিসম কা হ্যায়। অভিতক পাঁচওয়া নেহি হুয়া। ইয়ে প্রগ্রেস? জিন্দগি ঘুম-ফির কর দেখনে মেঁ। কেয়া বোলা কিতাব মে? ভ্যারাইটি ইজ দ্য স্পাইস অফ লাইফ”

তাই তো মৌসি ভালো। মাঝে-মাঝে বয়স্ক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মুম্বাইয়ের বাইরে নিয়ে যায়। মন্দ লাগে না। এরা ভেটারান। অনেক শেখা যায়। সঙ্গে ফাইভ স্টার খাওয়া থাকা ফ্রি। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। সেবার যখন চতুর্বেদীর সঙ্গে বেরিয়েছিল, ওর টয়োটা ক্যামরি হাইওয়ের ধারে হঠাৎ দাঁড় করিয়ে দেয়।

“কেয়া হুয়া?” সানগ্লাস খুলে। সোফির চেহারার মধ্যে এমন পুষ্ট মাদকতা আছে যা চতুর্বেদী কেন, মৌসির অন্যান্য ক্লায়েন্টদেরও আচ্ছন্ন করে। দেহটাকে ভোগ করতে চায়।

“পিসাব করনেকা” সান্নিধির কথা ‘সারে হাইওয়ে এক পিসাবখানা’ মনে হতেই হাসি।

“কেয়া হুয়া?” অঙ্কুরের চোখ এড়ায়নি “ঠিক হো?”

“তুমসে জাদা। একঠো সিগারেট জ্বালা দে না”

নেশার সঙ্গে ধোঁয়ার একটা সামঞ্জস্য আছে। নেশাটা ধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে যায়। কিংবা ধোঁয়ার বাষ্প নেশার আবছায়ায় লুকোচুরি খেলে। যেমন কায়ার সঙ্গে মায়া। স্বপ্নলোকের ছায়াকে জীবন্ত করতে চায় রঙের ফুলঝুরিতে।

পেচ্ছাপ সেরে রাজু চতুর্বেদী গাড়িতে “রাস্তে মে রুকনা হ্যায়”

“কাঁহা?” অবাক।

“ভওয়ানিশঙ্করকে আশ্রম মে”

“ইয়ে কোই বাত হুয়া? মস্তি করনে আয়ে। আশ্রম মে কেয়া জরুরত?”

“কভি উহা গয়া?”

“নেহি। আশ্রম জানে কে উমর অভি বহত বাকি”

“ফির ওহা চলো। মস্তি হি মস্তি”

“আশ্রম মে মস্তি কা কেয়া?” বুঝতে পারছিল না।

“বহত কুছ। জিন্দেগি কিতনা দেখা? দেখনে সে শিখেগা” সত্যি তো।

শিখনা বহত কুছ। জিন্দেগি দেখনে আভি ভি বাকি। বহত, বহত কুছ। বাঙ্গাল কি ছোকরি শিরিন, মুম্বাই মডেলিং ওয়ার্ল্ড মে অভি তক ঘুসনে নেহি দিয়া। শালি বহত হুঁশিয়ার। ইন বাঙ্গালি লড়কি লোগ দিমাক সে খেলতা। নঙ্গে হোনে পর ভি উনলোগকে দিমাক অ্যাক্টিভ। শোনে সে করনে দেনা - সব ওয়াক্ত দিমাক। কব সটকনা। সিনেমা মে ভি ওহি বাত। অনসূয়া বাসু কৈসে সুপারস্টার? শালি সন্নিধি জাদা পিতি ঔর পিসাব করতি। ধন্দে কে বাত্ কর্। ধন্ধে সিরিফ নীচে মুরতি। উপর নেহি উগলতি। দিমাক সে কাম লো। দিমাককে নীচে সব চক্কর কে বাত। সোফি বকোয়াস কে লিয়ে জিন্দেগি নেহি জিনে মাঙতা। জিন্দেগি আগে বড়নে। স্টার হোনে পর। পৈসে ফেকনে কে লিয়ে নেহি। জিন্দেগি কা নয়ে রঙ মে।

সন্নিধিকো বোলা থা “দ্য নিউ এজ মে কুছ কর দে”

“কেয়া? এক নই লড়কি সুনেত্রা শালি হামকো ভি হঠা দেগি”

“কৌন হ্যায় ইয়ে ছোকরি?”

“সুনেত্রা আগারওয়াল”

“রাজস্থান সে?”

“নেহি নেহি। ইয়ে শালি ভি বাঙ্গাল কি”

“সব শালি বাঙ্গালি ছোকরি মুম্বাই মে একাঠ্যা। হম মারাঠি লোগ যায় কাঁহা?”

“গুজরাট” সন্নিধি নির্বিকার। সন্নিধি ছোটখাটো ব্যাপারেই খুশি। বাইরে ভাবতে পারে না।

সেই প্রথম ভওয়ানিশঙ্করের নাম শুনেছিল সোফি। পরে বেশ কয়েকবার একলা এসেছে। ট্রেনে মুম্বাই থেকে নেরাল। তারপর টয় ট্রেনে ম্যাথেরনে। কারও ল্যাজ নয়। মস্তি হবে না।

ভওয়ানিশঙ্কর অদ্ভুত সাধু। ধবধবে ফর্সা রং। মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফ। সাদা সিল্কের আলখাল্লা। বিরাট হলঘরে উচ্চ বেদিতে আসীন, মুচকি হাসি। চারজন সুন্দরী যুবতী ঘেরা। একজন পা টিপছে। আরেকজন হাঁটুর ওপর হাত রেখে বসে। ফাই-ফরমাস খাটার জন্য আরেকজন। ভক্তদের আশীর্বাদ কুড়োবার জন্য অন্যজন। বেদির নীচে বিশাল ভক্ত মহিলাবাহিনী। সোফি ওদের মধ্যে বসল। বাবা ওদের দিকে চেয়ে মিটমিট হাসছেন। পরে জ্ঞান আর প্রসাদ বিতরণ। প্রসাদ আর জ্ঞানের পালা শেষ করে বাবা দেখবেন। যে মহিলার দিকে চোখ পড়বে ডেকে তার হাতে ফুল ধরাবেন। সে রাতের মেহমান। ঈশ্বর পাওয়ার উপযুক্ত।

ফুল পেয়ে সোফির সেই ঈশ্বরের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য একবার হয়েছিল। সে রাতের কথা আজও ভোলেনি। ঈশ্বরের নানা রূপে আত্মপ্রকাশ। ভওয়ানিশঙ্কর আত্মপ্রকাশ করেছিল তার আধ্যাত্মিক মহিমায়। আন্তরিক আলোকে। নিজস্ব আঙ্গিক। উদ্ধত লিঙ্গ। দেহ ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি। দেহের মধ্যে ঈশ্বরের অবস্থান, প্রকাশ। পরিতৃপ্তিতে লৌকিক ক্লান্তির অবসান। ইহলোক থেকে স্বর্গলোক। ঈশ্বরের উদ্ধত লিঙ্গকে শিবের আসনে বসিয়ে অচেনা পৃথিবীর অদেখা অনেক রং খুঁজে পেয়েছিল সোফি। সেই দেবতাকে লিঙ্গের ঊর্ধ্বে বসিয়ে, নিজেকে খুঁজতে। আত্মা না দেহ? জানা নেই। খুঁজতে চেয়েছিল দেহের রোম-রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ-ছন্দকে। নিজের দেহের অজানা অমৃত। পার্থিব স্বর্গলোক। দীক্ষা শুধু মনের নয়। হাতেখড়ি, দেহের ঝলকে। নিজেকে ভুলে রাতের অজানা স্বপ্নালোক থেকে স্বর্গালোক। আসল পাওয়ার মন্ত্র শিখিয়েছিল ভাওয়ানিশঙ্করজি। অলক্ষ্যে। নিভৃত অন্ধকারে।

কিছুক্ষণ আগে মৌসির মোবাইল বাজে “নেহি নেহি বহত রাত হুয়া”

ওপাশের কণ্ঠস্বর জানা নেই। সোফি বুঝতে পারছিল মৌসি কেউকেটা কারও সঙ্গে কথা বলছে “কল সুবে লড়কি লোগ লেকর হাজির”

কোন মক্কেল রে বাবা? রাতে নয়, দিনে মেয়ে চায়! ফোনটা রাখতে নেশার ঘোরে অঙ্কুর বলেছিল “ফির ম্যায় কাঁহা যাউ?”

মৌসির ঘাড় বেঁকিয়ে জবাব “মেরে সাথ তু ভি জায়েগা। তুঝে ভি ঈশ্বরপ্রাপ্তিকে রাস্তে দেখনা হ্যায়। ভওয়ানিশঙ্করজিকে আশ্রম মে”

সোফির কান সজাগ। এখানেও ভওয়ানিশঙ্করজি! চতুর্বেদী থেকে মৌসি। সবাই ভওয়ানিশঙ্করের শরণাপন্ন। সোফিও। ওরা সেকথা জানে না। ভওয়ানিশঙ্করও জানাবে না। গুরুদেব কী রাতের লীলামাহাত্ম্য দিনের বাণীতে শোনায়? সেখানে শুধু ঈশ্বরের নাম।

সেদিন চতুর্বেদী শুধু বাবার পা ছুঁয়ে প্রণামই করেনি। বাবাকে রক্ত-মাংসের ভেটও চড়িয়েছিল। দুপুরে বাবার সঙ্গে বিনিদ্র বিশ্রাম ভুলতে পারেনি সোফি। এ তো নির্বাণ থেকে মহানির্বাণের পথে অনন্ত যাত্রা। আনন্দ,পাওয়া, কামনার অন্তিম পরিতৃপ্তি। অন্য পুরুষ যা দিতে পারে না, বাবাজি পারে। তাই তো তিনি সবার গুরুর গুরু মহাগুরু।

মৌসির কথা টেনে অঙ্কুর বলল “উধর জো চাহা মিলেগা?”

“কেও নেহি? ইস লিয়ে তো হামারে ভগোয়ান”

কথা বাড়ায়নি অঙ্কুর। সে সাধারণ ঘরের। মাহেমে বাবার ছোট্ট ফ্ল্যাট। মেধাবী অঙ্কুরের উদ্দেশ্য আইআইটি থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিদেশে পাড়ি। যদি বাবাজি সম্ভাবনা বাতলায়। স্বপ্ন ছোট্ট চাকরির মধ্যেই সীমিত থাকত, যদি না সন্নিধির আর্বিভাব হত। সন্নিধি অঙ্কুরকে দেখিয়েছিল জীবনের রঙের অন্য এক রূপ। রূপয়ে রহনে সে দুনিয়া মুটঠি মে। দ্য নিউ এজে নগণ্য চাকরি করতে পারে। ফুডচেন মালিকের মেয়ের চাওয়াটা মোটেই নগণ্য নয়। উচ্ছল পাথেয়গুলো চিনতে কার্পণ্য নেই সন্নিধির। তার উষ্ণ নরম ছোঁয়ায় মধ্যবিত্ত অঙ্কুর দেখেছিল অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন। সন্নিধির হাত ধরে, বুক ছুঁয়ে, সম্ভোগের শিখরে দোদুল্যমান সরু নিতম্বের নিষ্পেষণে। শুধু সন্নিধি নয়, দ্য নিউ এজের মালকিনও বরণ করে নিয়েছিল বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার তাকে।

ওদের পিসাব করা হল না। মনে হল ট্রাকটা গতিপথ ছেড়ে ওদের দিকে ধেয়ে আসছে।

ভয়ে শিউরে উঠল অঙ্কুর “ইয়ে তো হামারে তরফ আ রহা”

“কাঁহা যাউ? বাঁয়ে তরফ জগহ জাদা নেহি” সোফি স্টিয়ারিং আরও ঘোরাল।

পেছন থেকে সন্নিধি চেঁচিয়ে উঠল “মর গয়া। হামে মারনে কা কৌশিস কর রহা!”

প্রচণ্ড আওয়াজ। লরিটা হু হু করে বেরিয়ে গেল। তারপর সবকিছু অন্ধকার।

রাত তিনটে। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। অজিত পান্ডে দাগরুশেঠ হাওয়াই গণপতি মন্দিরে পূজা দিয়ে ভাবছিল ভুডওয়ারপেটে রাত কাটাবে। মন সায় দেয়েনি। মন পড়ে সহেলির আখড়ায়। ম্যাথেরনের নিভৃত কোণে। দু-ঘণ্টা ড্রাইভ করে ফিরে এসেছিল সহেলির বাহুডোরে।

কাজকম্ম শেষে সহেলির সঙ্গে যখন ঘুমিয়ে পড়েছে। দূরভাষে কনট্রোলরুমের বাজপেয়ীর গলা “সাহাব এক গাড়িকা অ্যাক্সিডেন্ট হুয়া। অভি ভি কোই জিন্দা হো সকতা। জলদি আইয়ে”

শালে ভোসরি কা। কমবক্ত ইস টাইম মে কিসিকো অ্যাক্সিডেন্ট হোনা থা। অজিত পান্ডে সহেলির বাহুডোর শিথিল করে জামা-প্যান্ট পরল। কর্তব্য আগে। বিবস্ত্র সহেলি তখন গভীর ঘুমে। ওকে ঘুমোতে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

পাহাড়ের খাড়ায় বোল্ডারের পাশে গাড়িটা ঝুলছে। গাড়ি থেকে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ। মানে কেউ বেঁচে আছে। অজিত পান্ডে তৎপর। বাঁচা প্রাণ নেশার থেকে দামি। মোবাইলে হাঁকডাক শুরু করে দিল। এখনও এখানে প্রাণের স্পন্দন।

অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, পুলিস ফোর্স, ফরেনসিক এক্সপার্ট। মাঝরাতে ম্যাথেরনের পথে ভাঙা গাড়ি সহ কতগুলো মানুষকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছে অজিত পান্ডে। নেশা কেটে গেছে। কর্ত্যব্যের দামামা। সহেলির উল্কি থেকে বিপরীত। বাঁচানোর স্পৃহা। যেটুকু করার তাকে করতেই হবে। অজিত ঠাওর করার চেষ্টা করল কজন আছে। কজন-ই বা বেঁচে? অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। টর্চ মারল। একটি তরুণী। একটি তরুণ। রক্তে ঢাকা মুখগুলো অস্পষ্ট। এছাড়াও একজন মধ্যবয়স্কা। গাড়ির জানলার ফ্রেমটা পেটে ঢুকে গেছে। কেয়া মালুম ইসমে কোই জিন্দা হ্যায় ইয়া নেহি। কাটার নেহি লানে সে ঔর কিসিকো নিকল নেহি সকেগা। অন্যান্যদের সহায়তায় একঘণ্টা লাগল বডিগুলো কাটার দিয়ে ফ্রেম কেটে বার করতে। ডাক্তার পালসে হাত দিয়ে বলল “কোই জিন্দা নেহি। শিরফ ও লড়কি ছোড় কর”

তবুও... চারটে বডি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে ওদের আইডেন্টিফাই করার কাজে মন লাগাল। রাতে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

দিন যতই দাবদাহ হিউমিড হোক, পাহাড়ের বুকে ভোরের কুয়াশার নিজস্ব মাধুর্য অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জন্যই মুম্বাইয়ে ট্র্যান্সফার চায় না। জনবহুল মুম্বাইয়ের তোলাবাজদের সঙ্গে সামঝোতার মধ্যে জীবন অনেক দুর্বিষহ। মস্তি করনে কে টাইম মে ভি সোচনা পড়তা হ্যায় ইয়ে রেন্ডি কিসকা রাখেল? পাহাড়কে কিনারে মৌজ করনে কা বহত ফুরসত। থোড়া কামাও। থোরা জিও।

ফুটে ওঠা ভোরের আলোর দিকে দেখল। নেশা কেটে গেছে। সহেলির মাদকতাও হারিয়ে গেছে দিনের আলোয়। দূরে পাহাড়ের বুকে কুয়াশা ভেদ করে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে দিনের প্রথম আলো। ঢেউ খেলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তে। কেয়া মস্ত দিন হ্যায়। লেকিন দেখনেকা ফুরসত কাহাঁ? এক টুটি গাড়ি ঔর চার বডি হাসপাতাল মে। কৈসে হুয়া? ইনলোগ কেয়া দারু পি কর গাড়ি চলা রহে থে? জরুর কোই লরিকে সাথ টক্কর। এটা স্বাভাবিক অ্যাক্সিডেন্ট মনে হচ্ছে। ফির ভি। জিন্দা লড়কি জিয়ে তো উসসে বহত কুছ পতা চলেগা। অভি তো ইন আদমিকা পতা মালুম করনা হ্যায়। কৌন হ্যায় ইনলোগ? কাঁহা সে আয়ে? কাঁহা যা রহে থে?

দিবালোকে তালাশ শুরু করে দিল অজিত পান্ডে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%