অনিরুদ্ধ বসু
মধুসূদন মুখুজ্জে পুবের জানলটা খুলে দিল। দক্ষিণের জানলাটা তো রোজই খোলা হয়। দক্ষিণা বাতাস, আলো আসে। জানলার পাশে বেতের আরাম কেদারা রাখা বলে পুবের জানলা খোলার প্রয়োজন হয়নি। সকালে, গিন্নি হেঁসেলের কাজে ব্যস্ত থাকে বলে, সেও গা করে না। কাল রাতে দিল্লির ফ্লাইট পৌঁছেছে। উদগ্রীব গিন্নির সঙ্গে গল্প করে শুতে রাতই হয়ে গেছিল। সকালে উঠতেও দেরি হয়েছে। অনেকদিন না খোলাতে জানলাটা খুলতে অসুবিধে হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ধাক্কা দিয়ে কসরত করতে খুলে গেল। ভেসে এল দিনের প্রথম মার্জিত সূর্যকিরণ।
প্রতিদিন ভোরে রিটায়ারমেন্টের কথা ভেবে, জীবনের পশ্চিমই ভেসে উঠত এতকাল। বহুবছর পর পুবের আলোর আমেজ সুখদায়ক। কেন যে এতদিন জানলাটা খোলেনি? খুললে বুঝতে পারত, জীবনের পুবটা বদ্ধ জানলার মতো নিজেই রুদ্ধ করে রেখেছিল। সারা জীবনের ব্যর্থতার নাগপাশ, শিথিল আকাঙ্ক্ষায় অজান্তে সূর্যগ্রহণ ঘটিয়েছে। ত্রুমশ গ্রাস করছিল চাওয়া-পাওয়া, দেখা-অদেখার সূক্ষ্ম কণাগুলোকে। রিপোর্ট সাজাতে গিয়ে নিজেও পুরনো পাণ্ডুলিপি।
শনিবারে পল্টুর দোকানের আড্ডা বৈচিত্র্যহীনতায় একফালি আকাশ। সেখানে সন্তর্পণে মেঘের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছিল। মুক্তিহীন নিষ্পৃহ জীবন। অর্থহীন জীবনে মন রসদ খুঁজছিল। জানত না, এই অর্থহীনতার মধ্যেই সার্থকতা। কার জীবন অর্থহীন, কারটা অর্থপূর্ণ, বোকার মতো হিসেব কষার চেষ্টা। চোখ চাই দেখার। দৃষ্টিটা ঈশ্বরেরই দান। কাকে, কখন, কীভাবে, কীরূপে দেখায়। অজান্তে আগুনের ফুলকিটা ইশ্বরই জ্বালিয়ে দেন। কখন তার প্রকাশ একমাত্র জীবনের স্ক্রিপ্ট রাইটারই জানেন।
গিন্নিকে হাঁক দিল “চা হবে?”
“দিচ্ছি” হেঁসেল থেকে উত্তর।
শুধু চা নয়, বহুদিন পর বিস্কুটও। অবাক, আজ এক্সট্রা খাতির। অনেকদিন পায়নি। কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ মোবাইল “আমার নাম তমোনাশ দাশগুপ্ত। ইউরো টিভি থেকে বলছি। যদি দয়া করে আজ বিকেলে টিভিতে লাইভ ইন্টারভিউত দেন”
“ক’টায়?”
“সন্ধে সাতটায়। সাড়ে ছটার মধ্যে স্টুডিওতে চলে আসবেন। গাড়ি পাঠিয়ে দেব”
“ঠিক আছে” ফোন কেটে দিল।
গিন্নি জিজ্ঞেস করল “কে গা?”
“টিভি থেকে ফোন। সাতটায় লাইভ ইন্টারভিউ”
ত্রুমশ বর্ধিত গিন্নির উজ্জ্বল মুখে হাসি। স্বামীর জন্য গর্ব হচ্ছে। পাড়ার ক’টা বউ-এর স্বামীকে টিভিতে দেখা গেছে? তার গর্ব হবে না, তো কার হবে? তার স্বামী এখন যে সে লোক নয়। রীতিমতো সেলিব্রিটি।
শাড়িটা ঠিক করে বলল “সত্যি!” বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। সারাজীবন দেখল না লোকটাকে কিছু করতে। শেষে ওস্তাদের মতো সবাইকে ছাপিয়ে বাজিমাত। ওকে আরামে চা-বিস্কুট খেতে দিয়ে বেরবার আগে একগাল হেসে বলল “এখন থেকে আর সিরিয়াল দেখব না গো। তোমাকেই দেখব”
হাওয়াহীন পুরনো পাখার ক্যাঁচক্যাঁচে আওয়াজে ঘামও লুঙ্গি দিয়ে মুছতে হচ্ছে না। সকালের মিস্টি রোদ উপভোগ করছে। সঙ্গে বউ-এর হাতের চা-বিস্কুট। যেমন আদর করে বিয়ের পর চা এনে দিত। স্বাদ যাই হোক, গিন্নির স্পর্শে অমৃত হয়ে উঠত। আজও একই অমৃতের স্বাদ। পালটে গেছে অস্তিত্বের স্বীকৃতি। সেখানেই শান্তি, পরিতৃপ্তি।
আশ্চর্য লাগছে, কাল বোর্ডরুমে একটানা ইংরেজি গণ্যমান্যদের সামনে কীভাবে বলল। ভয় থাকলেও ইশ্বর স্নেহাশিসের হাত ধরে তরী পার করিয়ে দিল। চা শেষ করে বেতের টেবল থেকে খবরের কাগজ দেখল। প্রথম পাতায় ইন্দ্রাক্ষি আর আশিসের ছবির সঙ্গে ক্যাপশন ‘অভিনব খুন চত্রু ধরিয়ে দিল কলকাতার পুলিস’। পরে সব ঘটনার বিবরণ। মধুসূদন মুখুজ্জের নামও, কান্ডারি হিসেবে। কখনও ভেবেছিল, পল্টুর দোকানের শনিবারের আড্ডা একদিন পৌঁছবে দিল্লির মসনদে? তার নাম কাগজের প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করবে। খুঁটিয়ে দুবার নিজের কীর্তির বিবরণ পড়ল।
টিভি খুলতেই ‘ব্রেকিং নিউজ’, রাতে দিল্লির মিন্টু রোড অঞ্চলে উঠতি মডেলের বোমা ফেটে মৃত্যু। চ্যানেলে সার্ফ করছে। সব চ্যানেলের ওবি ভ্যান মিন্টু রোডের বাড়িতে। বীভৎস ছিন্নভিন্ন হওয়া তরুণী। গা ঘিনঘিন করে উঠল। পুলিসে কত মৃত্যু দেখেছে। তবুও এই মৃত্যু ভয়াবহ, বীভৎস, মর্মস্পর্শী।
কাল যখন ইন্দ্রাক্ষির মানসিকতা উন্মোচন করছে, তখন ও দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিল ‘ইফ দ্য নিউ এজ ইনস্টিটিউট অফ ত্রিুয়েটিভিটি অ্যান্ড হিউম্যান পোটেনশিয়াল ডস নট সি দ্য ডে লাইট, মাই ফিলসফি উইল। ইভেন ইফ, আই অ্যাম ইন ইওর কাস্টডি। ইউ ওয়ান্ট টু সি? আই উইল সো ইউ’। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল ‘জাস্ট দিস মোমেন্ট। এ মার্ডার হ্যাস বিন কমিটেড সামহোয়ার ইন ইন্ডিয়া। ইফ ইউ হ্যাভ অল দ্য পাওয়ার, ট্রাই টু প্রিভেন্ট ইট। আই অ্যাম সিটিং হিয়ার। আই উইল ডু নো হার্ম টু মাইসেলফ অর এনি অফ ইউ। গো অ্যাহেড। স্টপ ইট। দিস ইজ মাই চ্যালেঞ্জ’
ওরা বিশ্বাস করেনি। যদিও রেড অ্যালার্ট দিয়ে ভারতের পুলিসকে সতর্ক করেছিল। মন বলছিল ও পারে। কীভাবে কেউ কী করে জানবে? জানলেই বা কতটুকু করতে পারত? বলবার চেষ্টাও করেছিল, ইন্দ্রাক্ষিকে চেনে। তোমরা আমায় ধরতে পার। আমার দর্শন, ভাবনাকে রুখতে পারবে না। যা আগামীর ছবি আঁকবে। ভারতের এক শহরে খুন হবে। আমি এখানে বসে খুনটা করব। ক্ষমতা থাকে তো রোকো। পারেনি। মধুসূদনের আন্দাজ তাহলে সত্য প্রমাণ হল। ওরা রুখতে পারবে না জানত। কীভাবে হবে, অনুমান করতে পারেনি। পুলিস হেফাজতে ইন্দ্রাক্ষির বেপরোয়া দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা, নিরুদ্বিগ্ন প্রত্যয়। হেরেও হার না মানা। টিভির খবর তারই পরিণাম।
মাথা ধর থেকে আলাদা হয়ে আলমারির কোণে। অঙ্গের অংশ খাটের ওপর। আরেকটা জানলার কাঁচ ভেঙে বাইরে। অন্যাটা বাথরুমের বেসিনের নীচে। ধড়টা ঝাঁঝরা হওয়া পোড়া মাংসপিণ্ড। এও দেখাতে হয় টিভিতে? সত্যি খবরের চাক্ষুষ দৃশ্যায়ন? না বাড়তি মাইলেজের বিকারগ্রস্ত বিবরণ? নীচের পর্দায় ‘লাইভ’ কথাটা। পৃথিবী কোন দিকে এগোচ্ছে। খুন যে করে, সেই কি উর্বর বিকৃতির আদর্শ উদাহরণ? না যারা সে খুন দেখায়? তারা একই মানসিকতার অন্য নিদর্শন।
একটা চ্যানেলে রিপোর্টার বলছে “আমরা জানতে পেরেছি, যে মেয়েটির ক্ষতবিক্ষত দেহটা আপনারা দেখছেন তার নাম আন্দ্রেয়া। মডেলিং দুনিয়ার নতুন মুখ। সে আর নেই। কী করে যে এমন তরতাজা প্রাণের মৃত্যু ঘটল, সবার মনে একটাই জিজ্ঞাসা। এ কি কালকের চত্রেুর নায়িকার নতুন প্রলয়?”
আরেকটা চ্যানেলে “যদি এই মৃত্যু ওই চত্রেুর অংশ হয়ে থাকে, তার কান্ডারিরা পুলিস হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও কী করে ঘটল এই মৃত্যু? আমাদের পুলিসি ব্যবস্থা কী কোনও সুরক্ষা দিতে পারল না এই সুন্দরীকে? কার ওপর আমরা ভরসা করব?”
টিভি বন্ধ করে দিল। এরপর অনেক গল্প জুড়ে চ্যানেল স্লট ভরবে। অনেক তত্ত্ববিদ, জ্ঞানীগুণী টিভিতে বসে পড়বে। লাইভ চ্যাটে স্পেকুলেশন চলবে। কারও বা শ্রাদ্ধ, নীতি-দুর্নীতির গালভরা তত্ত্ব। দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য। সারাদিনের চ্যানেল চালাতে মশলা না থাকলেও, ঢালতে হবে। রঙিন করে বিত্রিু করতে হবে চাঞ্চল্যকর নতুন খবরের পশরা। পেছনে স্পন্সরসিপের বিজ্ঞাপনী বাহার। অনেক প্রশ্ন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা হবে। আসলটা চাপা পড়ে যাবে স্বল্পজ্ঞানীদের জ্ঞানগম্ভীর স্পেকুলেটিভ প্রলাপে। আজকের চাঞ্চল্য মুছে যাবে। যদি কখনও আসল উন্মোচিত হয়, আবার শুশুকের মতো উঁকি মারবে টিভির পর্দায় আরেকটা ব্রেকিং নিউজ হয়ে। অ্যাডের লক্ষ্মী চ্যানেলে ঢুকবে সেনসেশনকে কেন্দ্র করে। কোটি কোটি টাকা খেলবে আরও সুন্দরীর মৃত্যুর হাটে। মারা গেছে আন্দ্রেয়া। আর ফিরবে না এই বিকিকিনির হাটে। তার হতভাগ্য পরিবার তামাশার ক্লান্তিতে, টিভি বন্ধ করে, নিঃশব্দ চোখের জল ফেলবে। ফিরবে না তাদের ফুটফুটে মেয়েটা, হারানো স্বপ্নের পৃথিবীটা।
মধুসূদন ফোন করল ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রিসেপশনে “মধুসূদন মুখুজ্জে, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিস”
“বলুন স্যার” রোজগারহীন মেয়েটির করুণ কণ্ঠস্বর।
“আন্দ্রেয়া গুলাটি কী কখনও ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে অপারেশন করিয়েছিল?”
“এক মিনিট স্যার। কম্পিউটার দেখে বলছি”
কয়েক মিনিটের স্তব্ধতা। মনের চিত্রপটের সায়েনটিফিক ব্যাখ্যার শেষ ভেরিফিকেশন করছে।
“হ্যাঁ স্যার। গত বছর আগস্ট মাসে”
“কী অপারেশন?”
“বাইল্যাটারাল ব্রেস্ট অগমেন্টেশন উইথ লাইপোসাকশন। পরে চেম্বারে লিপ অগমেন্টেশনও করিয়েছিল”
“ধন্যবাদ” ফোন কেটে দিল।
ধূসর চিত্রপটে আন্দ্রেয়ার মৃত্যুর ছবি আঁকা হয়ে গেছে। ওরা আন্দ্রেয়ার মৃত্যুর কথা বলছে। ও দেখতে পাচ্ছে কী করে মৃত্যু হল।
এতদিন পুবের জানলাটা খোলা হয়নি। আজই প্রথম। অঙ্কটা সোনালি সূর্যের মতো ঝরঝরে পরিষ্কার। বাইল্যটারাল ব্রেস্ট অগমেনটেশন করার সময় একটি রিমোট কনট্রোল বোমা ব্রেস্টে ইমপ্ল্যান্ট করে দিয়েছিল। ইন্দ্রাক্ষির শেষ তুরুপের তাশ। বোর্ডরুমে ওর সঙ্গে কিছুই ছিল না। তাসটা খেলল কী করে? ওর পরনে সালোয়ার-কামিজ, গলায় সোনার লকেট, হাতঘড়ি। এ বিস্ফোরণ সম্ভব রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে। সব বাদ দিলে যে ইলেকট্রনিক ডেভাইস ওর কাছে ছিল তা হাতঘড়ি। এই ঘড়ির মধ্যে দিয়ে সে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ওই ঘড়িতেই ছিল রিমোটটা।
ঠিক সাতটায় ইউরো টিভির লাইভ ইন্টারভিউ শুরু হল। অনেকদিন পর আবার ইউনিফর্মে। দেখছে বহু দর্শক। শুনছে অজস্র। গিন্নি পাড়ার অন্যান্য মহিলাদের নিয়ে টিভির সামনে। আজ শুধু মধুসূদনই তারকা নয়। গিন্নিও নিজের গণ্ডিতে।
কম্পেয়ারার জিজ্ঞেস করল “আপনি এসব করলেন কী করে?”
কথাটা এড়িয়ে মধুসূদন উলটো প্রশ্ন করল “পুরনো কথাই বলাবেন? না নতুন কিছু শুনতে চান?”
মেয়েটি বলল “আপনার কথা বলুন। দর্শক আপনার কথা শুনতে চায়”
“যে খুন নিয়ে আপনারা পর্যবেক্ষণ করছেন, তার বীজ পোঁতা অনেক আগে”
“কী করে?”
“মেয়েটি ব্রেস্ট অগমেন্টেশন করায় ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে। সেই সময় রিমোট কন্ট্রোল বোমা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওর বুকে”
“বিস্ফোরণটা কী করে হল?”
“কালকে দিল্লিতে যখন আমি বিশ্লেষণ করছিলাম, ইন্দ্রাক্ষি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল একটা মৃত্যু হবে ভারতের কোথাও। খবর দেখে মনে হল ওর হাতের ঘড়ির বোতাম ছাড়া আর কীভাবে হতে পারে?”
“বোতামে রিমোট কন্ট্রোল!”
“ঠিক তাই। স্বপ্নেও ভেবেছেন আততায়ীর সূক্ষ্মবুদ্ধির কথা?”
গর্বে গিন্নির বুক ভরে যাচ্ছে। স্বামী যে এত চিন্তাশীল এত বছরের বিবাহিত জীবনেও জানেনি। আজ বহু বছর পর স্বামীকে নতুন করে চিনছে। নিজেরই লজ্জা লাগছে। এত বছর পার করে দিল হাতে হাত ধরে। তবুও তাকে চেনা বাকি ছিল।
বাপিকে টিভিতে দেখে মধুসূদনের মেয়ে টেপি বারোডায় হাততালিতে মুখরিত। অবশেষে বাবা তার যোগ্য সম্মান পেয়েছে। ওর দু-বছরের ছেলে, না বুঝে, অবাক চেয়ে মার দিকে। ভাবছে মার আবার হঠাৎ কী হল?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।