আট

অনিরুদ্ধ বসু

মধুসূদন মুখুজ্জে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ দেখল। তিনটে মৃত্যু। পশ্চিম বাংলায় নয়, সুদূর মুম্বাই থেকে ম্যাথেরনের পথে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট। মৃতের নাম সোফি চৌধুরী, অঙ্কুর করঞ্জওয়ালা, শিবানী রাওয়াল। সন্নিধি সিরিয়াসলি ইনজিওরড।

দুটো বিস্কুট পেলে ভালো হত। সে গুড়ে বালি। রিটায়ারমেন্টের এখনও তো দু-বছর বাকি। অথচ এখন থেকেই গিন্নি বাজে খরচ বন্ধ করে দিয়েছে। সকালের চায়ের সঙ্গে বরাদ্দ দুটো বিস্কুটও এখন পাত থেকে হাওয়া। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন হিসেব করে কী লাভ?

গিন্নি ঝাঁঝিয়ে “রিটায়ারমেন্টের পর সবাই কিছু না কিছু করে। সিকিউরিটি এজেন্সিতে চাকরি। কিংবা ডিটেকটিভ এজেন্সিতে। তোমার সে মুরোদও নেই। ওই পেনশনের টাকাতেই শেষ জীবন কাটাতে হবে। এখন থেকে হিসেব না করলে, দিনে দিনে আগুন ছোঁয়া বাজারে বাঁচব কী করে?”

তাই এক পেয়ালা চা-ই সম্বল। নেহাত টিভির দোহাই দিয়ে, খবরের কাগজটা এখনও ছেঁটে দেয়েনি। ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ডিউটি যাওয়ার আগে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর অভ্যাসটা তাই এখনও মুছে ফেলতে হয়নি। ডিউটি মানে ওই আর কী। ঘরে বসে না থেকে, লালবাজারের ফাইল সেকশনে বসা। পুরোনো কেসের রিপোর্টগুলো সাজানো। কেরানির চাকরি, না পুলিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের, কে জানে? বুড়ো বয়সে প্রোমোটেড হয়ে এসি হলে এর থেকে আর বেশি কী আশা করতে পারে আইপিএস বড়বাবুরা? গভর্নমেন্টের চাকরি। এতদিন সার্ভিসের পর তো কেউ চাকরি খেতে পারবে না? তাই ওই নামকা ওয়াস্তে কোথাও বসিয়ে রাখা। মধুসূদন মুখুজ্জে কোনওদিক দিয়েই সাকসেসফুল পুলিস অফিসার নয়। না পারে মন্ত্রী-আমলাদের তোষামোদ করতে। না পারে কোনও অ্যাসাইনমেন্ট পূর্ণ করতে। এ হেন লোক কেন যে পুলিসে এসেছিল, ভেবেই আশ্চর্য অফিসের লোক।

বিএসসি পাশ করে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বাবা রিটায়ার করেছেন দেখে মামার দয়া হল। মামা তখন হোম সেত্রেুটারিয়াটের কেরানি। মন্ত্রীকে বলেকয়ে পুলিসে ঢুকিয়ে দেয়। সেই থেকে চলছে।

হেঁসেল থেকে গিন্নির হাঁক “ফেরার সময় এক কিলো মুড়ি কিনে এনো। পারলে উজ্জ্বলার চানাচুর”

“সেদিন তো এত চানাচুর আনলাম। শেষ করে ফেললে?”

“উপায় কী? কিছু দিয়ে তো পেট ভরাতে হবে। নয় কী?... দুটো পাউরুটিও”

খাতা লেখো। গিন্নির ফাই-ফরমাশ খাটো। এই তো জীবন। দিনে দিনে গিন্নি আরও ফুলেফেঁপে ঢোল হচ্ছে। এমনিতেই গাঁটের ব্যামো আছে। এবার না হার্টেও ধরে। কয়েকদিন থেকেই ভাবছিল জেনারেল হেলথ চেক আপ করাবে। সরকারি খরচে হয়ে যাবে। গিন্নির ও নিজের।

কিছু হতে পারেনি বলে একদিন দুঃখ ছিল। তখন আকাঙ্ক্ষাও ছিল। এখন আর নেই। অনেকের কিছু হয় না। অনেক হতভাগ্য বাঙালির মতো মধুসূদনেরও কিছু হবে না। সবাই তো ইন্দ্রজিৎ হতে পারে না। অমল-বিমল-কমলরাও পৃথিবীতে থাকবে। ক্ষতি নেই। আর পাঁচটা বাঙালির মতো, জীবনের অন্যান্য কর্তব্য তো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছে। বিস্কুট না দিলেও সে কথা গিন্নি ভালো করেই জানে। গিন্নির থেকেও দ্বিগুণ সাইজের মেয়ে, টেপিকে সসম্মানে পার করতে পেরেছে। সে কী কম কৃতিত্বের?

পুবের জানলাটা কোনওদিনই খুলতে দেয় না গিন্নি “ঘরে ধুলো ঢুকবে। তোমাকে তো পরিষ্কার করতে হয় না। গাঁটের ব্যামোতে মরছি। অত খাটাখাটনি সইবে না”

তাই পশ্চিমের রোদটুকুকে সম্বল করে খবরের কাগজের পাতা ওলটানো। মৃত্যুর সংবাদ পড়ে, স্নান সেরে অফিসের গাড়িতে লালবাজার।

একরাশ খুন রাহাজানি রেপের রিপোর্ট জমা পড়েছে। সেগুলো পড়ে, অনাদিকে দিয়ে বিভিন্ন তাকে সাজাতে হবে। যেগুলো ক্লোজড বা কারও সুপারিশে এগনো যাবে না, সেগুলোকে আলাদা করে, তকমা দিয়ে, অন্য কোণায় তুলে রাখতে হবে। যেগুলোর ইনভেস্টিগেশন চলছে সেগুলো অ্যাকটিভ হিসাবে অন্যধারে সাজিয়ে রাখতে হবে। কে কোনও কেস নিয়ে ইনভেস্টিগেশনে কদ্দূর এগিয়েছে, রিপোর্ট লিখে সেই সংক্রান্ত সবকিছু ওপরওয়ালার কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। একঘেয়ে কাজ। এই কাজের জন্য সরকার থেকে মাসিক মুনাফা, আকাশছোঁয়া বাজারে পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ জোগায়।

মেদিনীপুরের রিসর্ট দ্য হেভেনে মুম্বাইয়ের মডেলের মৃত্যুর প্রাথমিক রিপোর্ট ও পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট সামনে। মন দিয়ে স্নেহাশিসের প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট পড়ল। আইপিএস অফিসারের চোস্ত ইংরেজিতে ডিটেলিং। ইয়ং আইপিএস। তদন্ত ঠিকভাবেই করবে। মধুসূদনের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, কেন মুম্বাইয়ের মডেল মেদিনীপুরে ছুটি কাটাতে গেছিল? কার প্ররোচনায়? কোন স্বার্থে? অতীন কী মেহুলির সঙ্গে দেখা করেছিল? কে ওই ধুতি-ফতুয়া পরা? বোতলটা গেল কোথায়? অকেজো মাথা কাজ করছে। ইনভেস্টিগেশন নিয়ে নয়। লিঙ্ক নিয়ে।

খুব অবাক লাগছে। ড্রাউনিং-এ মারা গেছে। সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মরল কী করে? সাঁতার না জানলে সুইমিং পুলে গেছিল কেন? ভিসেরা রিপোর্টে তিনটে ওষুধ গ্যাস্ট্রিক কন্টেন্টে - টলবিউটামাইড, গ্লেনেসারাইড আর অ্যালজোলাম। এই তিনটের সঙ্গে নিশ্চয়ই মৃত্যুর সম্পর্ক আছে। কোনও ডাক্তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করতে হবে। রিপোর্ট বলছে ‘ড্রাগস ফাউন্ড ইন দ্য ভিসেরা বাট কস অফ ডেথ ডিউ টু অ্যাসফেকশিয়া অ্যাস এ রেসাল্ট অফ ড্রাউনিং’ মানে সুইমিং পুলে ডুবে মৃত্যু। ওয়াইনের মধ্যে ওষুধগুলো মেশানো ছিল না তো? যদি থেকেই থাকে, সিন অফ ত্রুাইম থেকে বোতলটা উধাও হল কী করে? কে কেন সরাল? বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই চিন্তা। মেদিনীপুরে কেন? কার ডাকে? ছেঁড়া ছবি, হারিয়ে যাওয়া ওয়াইনের বোতল, মোবাইল নম্বর সূত্র।

স্নেহাশিস মেহুলির মোবাইলের অসংখ্য নম্বর লিস্ট করেছে। হাজার চারেককে তো আর জেরা করা যায় না। সেদিন যারা ফোন করেছিল, তাদের ট্যাপ করেছে। কে এক ভওয়ানিশঙ্কর মহারাষ্ট্রের ম্যাথেরন থেকে। খোঁজ নিয়ে স্নেহাশিস জেনেছে ভওয়ানিশঙ্করের ওখানে আশ্রম। মধুসূদনের মাথায় ঢুকছে না, মুম্বাইয়ের মডেলের সঙ্গে আশ্রমের কী সর্ম্পক? স্বল্প অভিজ্ঞতায় দেখেছে সো-বিজরা ভাগ্য, জ্যোতিষ, আশ্রম এসবে বিশ্বাস করে। এই আপাত দুনিয়ায় ভাগ্যের চাকা ঘুরতে কতক্ষণ? খ্যাতির চূড়া থেকে মাটিতে পড়তে সময় লাগে না। বাকি দুটো ওয়েস্ট বেঙ্গলের - দুটোই সুইচড্ অফ। একটি নম্বর থেকে বেশ কটা ফোন। মেহুলিও দুবার ফোন করেছিল। কাকে?

কে বলে মধুসূদন মুখুজ্জের বুদ্ধি নেই? কপালটাই মন্দ। বড়সাহেবরা বুঝল না। ভাবনা চিন্তা যাই থাকলেও বাস্তবে রূপয়িত করতে পারেনি। তাই সার্ভিস রেকর্ডে কোনও কৃতিত্বের চিহ্ন নেই। চিন্তার জন্য প্রমোশন হয় না। কাজের জন্য হয়। দুঃখটা সেখানেই। বড়সাহেবরাও বুঝল না। সহধর্মিণীও নয়। মাঝেমাঝে ভীষণ অসহায় লাগে। টেপিটা যদি কলকাতায় থাকত, নিয়মিত দেখতে পেত। বারোডায় থাকে। কালে-ভদ্রে আসে।

আবার চোখ বোলাল রিপোর্টে। দ্বিতীয় খুন ইয়ং ছেলে। মানিকতলা খালের ধারে। সঙ্গে পোস্ট-মর্টেমের ইতিবৃত্ত। স্ট্রেট ফরওয়ার্ড। পেছন থেকে ছুরি দিয়ে গলা কাটা। পরিতোষ সেনের রিপোর্টে স্পষ্ট। পোস্ট-মর্টেমেও। মধুসূদন ভাবছে সোহমের ফোন নম্বরটা মেহুলির ডেডবডির কাছে বাস টিকিটে কী করে এল? একটা যোগসূত্র আছে। দুটো ক্যারেক্টার সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই রিপোর্টে নেই। ঐত্রেয়ী আর সুনেত্রা। পরিতোষ সেন বোধহয় সন্ধান করেনি। আরও খোঁজ প্রয়োজন। নোটে লিখতে হবে ‘ফর ফারদার ইনভেস্টিগেশন’। এএসআই আর আইপিএস-এর মধ্যে এখানেই তফাত।

মানিকতলা থানার বড়বাবুকে ফোন “অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিস মধুসূদন মুখুজ্জে”

“বলুন” গুরুগম্ভীর আওয়াজ।

“আপনাদের ওখানে সোহম সান্যাল বলে একটি ছেলে খুন হয়েছিল”

“রিপোর্ট চলে গেছে” নির্বিকার ওসি।

খুন খারাপি নিয়ে সময় নষ্ট করে ফায়দা নেই। অযথা ঝুটঝামেলা। এর থেকে প্রমোটার, মানিকতলা বাজারের তোলাবাজদের সময় দিলে কিছু আসবে।

“সেটাই তো পড়ছি। ঐত্রেয়ী আর সুনেত্রা সম্বন্ধে আরও ডিটেল্ড রিপোর্ট চাই”

অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশানারের আদেশ। করতেই হবে। “দেখি খোঁজ-খবর নিয়ে। আরেকটা রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব স্যার”

ফোন কেটে দিল বড়বাবু।

এই গা-ছাড়া ভাবটা বেদনাদায়ক। যুগ পালটে গেছে। আজকের দিনে পুলিসের চাকরি অন্যান্য আর পাঁচটা চাকরির মতোই, গুছিয়ে নেওয়ার কাজ। সেটাই করতে পারল না মধুসূদন। তাই গিন্নির গঞ্জনা। আজকের কাগজের তিনটে মৃত্যুর ডিটেলস পেলে ভালো ছিল। লরির ধাক্কা। মধুসূদনের মনে হল এটা অ্যাক্সিডেন্ট না অন্য কিছু? অন্য কিছু থাকতেও তো পারে। পল্টুর চায়ের দোকানের আড্ডায় বসে ধাঁধার খেলাটা ভালোই জমবে।

নয় জীবনে কিছু করেনি। এ লাইনে তো বহুদিন। অস্বাভাবিকতার গন্ধ দূর থেকেই পায়। তার কিছু করণীয় নেই। ঘটনাটা ঘটেছে মুম্বাই-ম্যাথেরনের পথে। অনাদি ক্লোজড ফাইলগুলো সাজাচ্ছিল। রিপোর্টগুলো গুছিয়ে বলল “বুঝলি অনাদি। খুনগুলো আইসোলেটেড ইনসিডেন্ট নয়। কোথাও যোগসূত্র থাকতে পারে” জানে না কেন বলল। মন বলছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ।

অনাদি ঠিক বুঝতে পারেনি। ফাইলের সিঁড়ির ওপর থেকে নীচে স্যারের দিকে তাকাল “কোন খুন স্যার?”

“মেদিনীপুর রিসর্টের খুন, মানিকতলা খালের খুন। আজকের লরি অ্যাক্সিডেন্ট”

অনাদি কোনও খুনের ব্যাপারেই জানে না। স্যারের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে “কী স্যার?”

মধুসূদন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল “মেদিনীপুরে মডেল খুন। মানিকতালা খালে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। লরি অ্যাক্সিডেন্টেও দুই সুন্দরী আর মেধাবী ছেলে” নিজের মনেই আওড়াল বিউটি অ্যান্ড ব্রিলিয়ান্স”

যাই ভাবুক এ মনগড়া। জানে বাস্তবে কোনও সম্পর্ক নেই। নিছক কল্পনা।

সিআইডির ডেপুটি কমিশনারকে ফোন “বিরক্ত করলাম স্যার”

আবার মধুসূদন। লোকটা এমনিতেই কাজের নয়। কাজের সময় ফোন কেন? অন্য কেউ হলে পাত্তাই দিত না। ‘ব্যস্ত আছি’ বলে ফোনটা রেখে দিত। অনঙ্গ দত্ত অতটা নির্দয় হতে পারে না। লোকটা পুলিশি কাজে অপদার্থ হলেও, বহুবছর আগে ওরা যখন শিলিগুড়িতে পোস্টেড, কমব্যাটে একবার গুরুতর জখম হয়েছিল। তখন দিন-রাত লোকটা বেডের পাশে বসে সেবা করেছে। সেকথা ভুলতে পারে না।

“বলো মধুসূদন”

“স্যার, আজকের পেপারে, মুম্বাই থেকে মেথেরন যাওয়ার পথে লরি অ্যাক্সিডেন্টে তিনজন মারা গেছে। তার রিপোর্ট পাওয়া যাবে?”

“তা দিয়ে তোমার কী?”

“যদি জোগাড় করে দিতে পারেন...” মধুসূদনের বিনম্র আবদার।

“ওটা তো মহারাষ্ট্র পুলিসের এক্তিয়ার। আমাদের নয়। কেন দেবে?”

“যদি কোনওভাবে পারেন”

“এখানকার সঙ্গে লিঙ্ক থাকলে দিতে পারে। লিঙ্ক দেখাতে পারলে চেষ্টা করতে পারি”

ফোনটা কেটে দিল অনঙ্গ দত্ত।

শনিবারের সান্ধ্য আড্ডা ভালোই জমে। গিন্নিরা টিভি সিরিয়ালে ব্যস্ত। ঘরে টিভির গাঁকগাঁক চিৎকারের চেয়ে পল্টুর চায়ের দোকানের গরম চা-সিঙারা বেশি মনোরঞ্জক। জমাটি আড্ডা।

কুঞ্জবিহারীবাবু বছরদুয়েক রিটায়ার করেছেন। শঙ্করদয়াল এবছর। মধুসূদনের দু-বছর এখনও বাকি। তড়িৎ, তাপস আর শুভঙ্করও ষাটের দিকে এগোচ্ছে।

“পল্টু গরম গরম চা বানা” মধুসূদন ঢুকেই হাঁক ছাড়ল। চা আর সিঙারা নিয়ে পল্টু হাজির হওয়ার আগে কুঞ্জবিহারী ও শঙ্করদয়ালও এসে পড়ল।

শঙ্করদয়াল বসে বলল “বিকেলে চা দিয়ে গিন্নি টিভি নিয়ে বসেছে। রাত সাড়ে নটার আগে উঠবে না"

কুঞ্জবিহারী শঙ্করদয়ালের দিকে তাকাল “সদ্য রিটায়ার করেছ তো, এখনও চা পাচ্ছ। গিন্নি বলে, সারাদিন নাকি কিছুই করি না। রিটায়ারের দু-বছর তো হল। বিকেলের সব কাজ আমারই করার। ... এমনকী ওর চা-ও”

শঙ্করদয়াল ওর দিকে তাকাল “যাই বল, পল্টুর চায়ের টেস্ট-ই আলাদা”

মধুসূদন বলল “চা তো তোমার সামনে। আমার রসে গুড় ঢাল তো বাবা”

চায়ে চুমুক দিয়ে মধুসূদন দুটি মার্ডারের বিবরণ দিতে বসল। রসকষহীন ভাবে রিপোর্টের ইতিবৃত্ত শুনিয়ে বলল “কী মনে হচ্ছে ভায়া? লিঙ্ক আছে?”

নীরবতা। চায়ে চুমুক। মচমচে সিঙারা খাওয়ার আওয়াজ। মধুসূদন নতুন ধাঁধার অঙ্ক নিয়ে। ওরা বোঝে। অনাদি ছাড়া কেউ শোনার নেই অফিসে। বাড়িতেও তাই। সিরিয়ালের দৌলতে বাড়ির গিন্নিরা সন্ধেবেলা থেকে মৌনব্রত অবলম্বন করে। নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগাবার একমাত্র জায়গা পল্টুর এই চায়ের দোকান। পাখা চললেও তেমন হাওয়া দিচ্ছে না। মান্ধাতা আমলের লম্বা রডের কালো সিলিং ফ্যান। এখনকার গ্লোবাল হিটিং-এ অনুপযুক্ত। পৃথিবী পলটালেও পল্টুর চায়ের দোকান আগের মতোই।

রুমাল দিয়ে টাকে জমা ঘাম মুছে শঙ্করদয়াল বলল “আছে”

“কী ভাবে?”

“মেদিনীপুরের রিসর্টে যে গেছিল তাকে কেউ ইনসট্রাকশন দিয়েছিল সোহমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাই নম্বরটা কাগজে লেখা”

“সোহম ফোন করেনি তো?” মধুসূদন ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

“না। সোহম ফোন করলে নম্বরটা লেখার প্রয়োজন হত না। সিএলআইতে উঠে আসত। করেও থাকতে পারে। কে জানে? তুমি বললে সোহমের পকেট থেকে কগজে লেখা ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। এটা কী ওই ভদ্রলোকের? না অন্য কারও? একটু থেমে কুঞ্জবিহারী বলল “মোবাইলটা পাওয়া গেছে?”

“না”

“পাওয়া গেলে অনেক কিছু জানা যেত। এই দুটো খুনের পেছনে থার্ড ওয়ান ইনভলভড সেটা বোঝা যাচ্ছে”

“কে?”

“বলা মুস্কিল। ডিটেল্ড ইনভেস্টিগেশন হলে বোঝা যাবে। একটা জিনিস অদ্ভুত লাগছে। ওই যে মুম্বাইয়ের মডেলটা, কী যেন নাম বললে...”

“মেহুলি”

“কেন বাংলায় এসেছিল? রহস্যটা ওখানেই”

“কাঁথিতে ওর আদিবাড়ি”

“সেখানে তো যায়নি?”

“মাঝের দুদিন ছিল কোথায়? শেষ দুদিন তো দ্য হেভেনে। বাড়ির সঙ্গে তো কোনও সম্পর্ক দেখছি না”

কুঞ্জবিহারী, শঙ্করদয়ালের কথা টেনে বলল “কলকাতাতেই বা কোথায় উঠেছিল, সেটাও তো জানা নেই। খালি জানা থিয়েটার রোডের ক্যাশ টিল থেকে টাকা তুলেছিল”

তড়িৎ বেজার মুখে ঢুকল “দেরি হয়ে গেল। ভিড়ের জন্য দুটো বাস মিস”

“এখন সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে। তুমি চা খাও”

“বাদ দিও না ভাই” মধুসূদনকে আবার কেঁচেগণ্ডূষ করতে হল ঘটনাগুলো।

তড়িৎ এক লাফে বলল “জানি না তোমাদের আগে কী কথা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে লিঙ্কটা ঐত্রেয়ী কিংবা সুনেত্রা”

“মনে হওয়ার কারণ?”

“ঐত্রেয়ী অ্যান্ড সুনেত্রা আর দ্য আনডেফাইনড ফ্যাক্টরস। এটা স্পষ্ট সোহম রিটইয়ার্ড সরকারি চাকুরের ছেলে। পিএইচডি করছিল। মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড। মুম্বাইয়ের মডেলের সঙ্গে লিঙ্ক হওয়া অস্বাভাবিক। মারা যাওয়ার আগে ঐত্রেয়ী ফোন করেছিল। তারপর আর যোগাযোগ করেছিল কি না, জানা নেই। আপাত দৃষ্টিতে সোহম যে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসে, মেহুলির সঙ্গে লিঙ্ক অস্বাভাবিক। সম্ভব, যদি সুনেত্রা থেকে কোনও লিঙ্ক পাওয়া যায়। ও তো মুম্বাইতে থাকে”

“মোবাইল ফোনটা?” মধুসূদনের প্রশ্ন।

“সোহমের ইনভেস্টিগেশনে অনেক কিছু বাকি”

“মানিকতলা থানার ওসির কোনও আগ্রহই নেই”

“দেখ গিয়ে, টাকা খেয়েছে। যারা খুনে ইনভলভড তারাই খাইয়েছে। মধু তুমি ওসিকে বাদ দাও। ওই এএসআইয়ের পেছনে লেগে থাক। যদি করে তো ওই করবে”

“তাই করতে হবে দেখছি। সবাই এত দায়সারা ভাবে কাজ করে, কাউকে বলেও কিছু হবে কি না কে জানে?”

“তুমি তো অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার”

মধুসূদন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল “নামেই। পল্টু, আরেক রাউন্ড চা দে। ... সত্যি লিঙ্ক আছে তো? না জোর করে লিঙ্ক করার চেষ্টা করছি?”

“লিঙ্ক আছে বলেই মনে হচ্ছে” কুঞ্জবিহারী মধুসূদনকে আশ্বস্ত করল।

“মুম্বাই-ম্যাথেরনের অ্যাক্সিডেন্ট?”

“অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে। কোনও লিঙ্ক দেখছি না” তড়িৎ দাঁড়ি টেনে দিল।

পল্টুর চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে মধুসূদন ঠিক করল, মানিকতলার বড়বাবু নয়। এএসআই পরিতোষ সেনকে কালকে ফোন করে বলতে হবে ঐত্রেয়ী আর সুনেত্রা সম্বন্ধে আরও খোঁজখবর নিতে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%