তিন

অনিরুদ্ধ বসু

“প্রভু... আপকে চরনো মে মুঝে জগহ দে। অন্তিম দিনোকে কে লিয়ে মে বেচহন হু” দুর্গা ষষ্টাঙ্গে বাবা ভোলেশঙ্করের পায়ে লুটিয়ে পড়ল ভোর বেলায় বারানসীর গঙ্গার পাড়ে।

বাবা সবে প্রাতঃকৃত্য সেরে গঙ্গাস্নান করে প্রার্থনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। অগোছালো, নোংরা লোকটা থেকে সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে, যাতে তার পবিত্রতায় কলুষের ছোঁয়া না লাগে।

“তুম কৌন হো বেটে? কাঁহা সে আয়ে হো?”

“ভাধোহি সে। গরিব হু। কাম ঢুন রহা হু” মিথ্যে বলল দুর্গা।

ট্যান্ডা ফলসে ঝিমলিকে খুন করে পালাবার পর, ভরণপোষণের উপায় খুঁজছিল। বারবার ছদ্মবেশে জায়গা পালটাবার ফলে, মিথ্যে বলা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। কখনও ভাধোহিতে থাকেনি।

“তুমহারা নাম কেয়া হ্যায় বেটা?”

“চন্দ্রেশ্বর মিশ্র। লোক মুঝে চান্ডু নাম সে পুকারতে” উত্তর ঠোঁটের ডগায়। মিথ্যেকথা রক্তে ঢুকে গেছে। পৈতেও লাগিয়ে নিয়েছে।

আহা রে। এক ব্রাহ্মণ সন্তান। ফাইফরমাশ খাটার জন্য একজন হলে ভালোই হয়। নিচু জাতের কেউ তার ত্রিসীমানায় আসুক সেটা বাঞ্ছনীয় নয়। তাও আবার তার পাশে থাকা। ছেলেটিকে ধার্মিক রীতি শেখালে হয়ত তার উত্তরসূরিও হতে পারে।

“ধরম শিখোগে?”

“আপকে চরনো মে জগহ মিলে তো সব কুছ শিখ লুঙ্গা” দুর্গার আশ্বাস।

বাবার কল্পনারও বাইরে চান্ডু কেয়া চিজ। মির্জাপুরে ডানকান্স কার্পেট ফ্যাক্টরিতে কিছুদিন মজদুরের কাজ করেছে। কাজের চেয়ে মহিলা সহকর্মীদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকানোই বেশি। ফ্যাক্টরির ম্যানেজার দাসবাবু তো ফ্যাক্টরির মধ্যেই কাজের শেষে একজনের সঙ্গে সঙ্গম করার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল। প্রথমবার বলে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়। এমনিতেই ফ্যাক্টরিতে কাজের লোকের অভাব। তাই দুর্গাকে তাড়ায়নি। দুর্গার শুধরাবার কোনও লক্ষণই ছিল না। সব সময়ই অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে বচসায় লিপ্ত। নৃশংস মানসিকতার প্রতিমূর্তি। একদিন দাসবাবুরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল, যখন ফ্যাক্টরির দামি কার্পেট চুরি করে মির্জাপুরের দোকানে বেচতে দেখল। পুলিস ডানকানে আসার আগেই চম্পট। এক জায়গা থেকে অন্য, এধার-ওধার ঘুরে শেষমেশ বারানসীর গঙ্গার ঘাটে। ওত পেতে কোনও মুর্গিকে টুপি পরানো। যার আশ্রয়ে টিকে থাকা যায়। বাবা ভোলেশঙ্কর দুর্গার দুর্গতিতে অনুকম্পিত।

বিতৃষ্ণা সত্ত্বেও মুণ্ডনের মাধ্যমে বাবার কাছে দুর্গার অভিষেক। প্রতিবাদ না করেই কিছু সময়ের জন্য বাবার আদেশ মেনে নিল। অপেক্ষা করে দেখা যাক জল কোথায় গড়ায়। সকাল থেকে সন্ধে কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে দুর্গা হাঁপিয়ে উঠছিল। তার ওপরে সাত্ত্বিক আহার। মদ-মাংস-মেয়ে ছাড়া জীবনটা ভাবাই যায় না। কিন্তু কিছুই করার নেই। যতক্ষণ না অন্য পথ খোলে। অন্তত ফোকটে তো থাকা খাওয়া জুটে যাচ্ছে।

বাবা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করল “চান্ডু, থোরা আরাম কর লে। কাল সে তেরা ধরম শিক্ষা শুরু হোগা”

ভয়, বিরক্তিতে দুর্গা শিউরে উঠল। পরের দিন থেকে দিনের পর দিন এই হৃদয়বিদারক যন্ত্রণা, ধর্মের অনুশীলন। মানসিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। গ্রীষ্ম শীত নির্বিশেষে ভোর চারটেয় উঠে গঙ্গাস্নান। তারপর জ্ঞানের ফুলঝুরি। ভজন। সহজ সংস্কৃত মন্ত্র শেখা ও মানে বোঝা। অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতা। দাঁত কামড়ে হজম করতে হচ্ছে এই অত্যাচার। এই মুহূর্তে খুনির বাঁচার একমাত্র উপায়। ধার্মিক কাজের বাইরে, বাবার ফাইফরমাশ খাটা। এসবের মধ্যে বাবার ফাইফরমাশ। হাঁপিয়ে উঠছিল দুর্গা। সময়-অসময়ে, কারণে অকারণে কাজে পাঠানো। বয়সের ভারে গুছিয়ে কাজের তালিকা দিতে অপারগ। সেই সুযোগে প্রণামি পকেটস্থ করা দুর্গার পক্ষে শাপে বর। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে চুরিয়ে জিতুর ধাবায় গিয়ে দেদার কাবাব, চিকেন রোস্ট সাঁটানো। সাত্ত্বিক খাবার যে আর সয় না। জিতুর সঙ্গে বন্ধুত্ব। ফাঁক পেলে দুজনে গঙ্গার ধারে ঘুরে বেরানো আর স্নানরত অর্ধনগ্ন মহিলাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা। পুণ্যার্থী মহিলারাদেরও শ্যেনদৃষ্টি থেকে রেহাই নেই। আশ্রম জীবনে জৈবিক বাসনা পূরণের যখন কোনও অবকাশই নেই।

“কেয়া সোচ রহে হো? কেয়া করোগে কুছ সোচা?” জিতু জিজ্ঞেস করল।

“অভিতক তো নেহি। ইয়ে বাবাকা চক্কর মে তো জিন্দেগি বরবাদ হো রহা”

চিন্তায় আচ্ছন্ন। কী করে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ক্রমে ভ্রূণের মতো একটা উপায় দানা বাঁধছে। যদি ‘বাবা’ পেশা শুরু করে? চারপাশে অগণিত ভক্তবৃন্দ। কিছু সংস্কৃত শ্লোক আওরিয়ে মাত করে দেওয়া। তারপর আর পায় কে? চোখে ঠুলি পরা শিষ্যরা টাকা ভেটে ছেয়ে দেবে। কয়েকজন বাবা তো শ্রাদ্ধের মন্ত্র বিয়েতে উচ্চারণ করেও পার পেয়ে যায়। মহিলা ভক্তবৃন্দরা তো আছেই জৈবিক কামনা পূরণের জন্য। বরাবরই দেখেছে তার মধ্যে এমন এক আকর্ষণ আছে, যা মহিলাবৃন্দকে সহজেই কাবু করে ফেলতে পারে। রুপায়া, ছোকরি একসাথ। কামিনী কাঞ্চন থাকলে কীসের অভাব? শুধু খেয়াল রাখতে হবে দাসবাবুর পুলিস রিপোর্ট যাতে প্রকাশ্য না আসে। এখনও মির্জাপুরের খাতায় লিপিবদ্ধ। পুলিস হদিস পেলে কেটে পড়া মুস্কিল। নিজের আসল পরিচয় এখন পর্যন্ত গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছে। দাসবাবু, বাবা, জিতু কেউই এখন পর্যন্ত তার আসল রূপ জানে না।

ঠিক করে ফেলেছে। তবে বারানসীতে বেশিদিন নয়। মির্জাপুরের খুবই কাছে। যে কোনও সময় পুলিস ছানবিন করতে পারে। যদি ধরা পড়ে, কেউ না কেউ ঠিক ঝিমলির মৃত্যুর সঙ্গে সূত্র খুঁজে বার করতে পারে। মন বলছে ‘দুর্গা ইহা সে ভাগ। জিতনা জলদি। নেহি তো গয়া’

এক বছর পার হল বাবার ছত্রছায়ায়। এবার পালাবার পালা। কিন্তু কোথায়? কী ভাবে? মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এতদিনে বাবা ভোলেশঙ্করের পেয়ারের পাত্র হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি শিখে ফেলতে ওস্তাদ। ধর্মের প্রক্রিয়াগুলো বেশ রপ্ত করে ফেলেছে। সেও বাবার অনুপস্থিতিতে মাঝেমধ্যে ধর্মের লেকচার দেয়। যদিও মোক্ষ বহুদূর, বাবা খুশি। সময় হয়েছে চান্ডুর উত্তরণের। বাবা ডেকে পাঠাল এক সকালে।

“জয় শ্রী রাম। চান্ডু ষষ্টাঙ্গে বাবার পা ছুঁয়ে মাটিতে বসল।

“আয়ুষ্মান ভব” বাবার আশীর্বাদ।

চান্ডু উদগ্রীব হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে।

“সময় হুয়া হ্যাঁয় জীবন মে তুমকো আগে বড়না। তুম হরদোয়ার যাও। উধর কই জ্ঞানী কে পাস অধ্যায়ন করো। ও তুমহে ধরম কে বারে জাদা শিখায়গা আগে বড়নে কে লিয়ে”

আকাশ থেকে পড়ল চান্ডু। না চাইতেই আকাশ থেকে আপেলপাত। এই পালাবার সুযোগ।

“জো আপকে মর্জি, ওহি মেরা ধরম” চান্ডুর করজোড়ে সমর্পণ।

“ম্যায়ে বন্দোবস্ত কর দুঙ্গা। তুম তৈয়ার হো”

বাবা ভোলেশঙ্করই ব্যাবস্থা করে দিল তার চেনা হরিদ্বারের গুরুদের সঙ্গে শিষ্য চান্ডুর জ্ঞানলাভের জন্য। দু-মাস। তারপর আবার বারানসীতে বাবার কাছে প্রত্যাবর্তন। ফিরছে কে? চান্ডু মনে মনে হাসল।

ঠিক দুপুর দুটোয় দেড় ঘণ্টা লেটে ডুন এক্সপ্রেস ছাড়ল। চান্ডু এখন পুরদস্তুর সন্ন্যাসী। গেরুয়া আলখাল্লা, হাতে ভাঙাচোরা ব্রিফকেসের মধ্যে তার জাগতিক সঞ্চয়। বাবার দেওয়া ৪০০ টাকা। এই প্রথম ট্রেনে চড়ায় সব ঠাহর করতে পারছিল না। সৌম্য চেহারা, পরনে গেরুয়া বসন দেখে সবাই সাহায্যে আগ্রহী। স্লিপার ক্লাসে একটা সিট খুঁজে পেল। ডুন এক্সপ্রেস পুরনো ট্রেন। হাওড়া থেকে দেরাদুন। আগেকার তুফান এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য এখন আর তুফান নয়। সাধারণ প্যাসেঞ্জার ট্রেন। যাদের গন্তব্যে পৌঁছনোর তাড়া নেই। তুফানের মতোই ডুন আজ জরাজীর্ণ অতীত। টাইমের মা-বাপ নেই।

চান্ডুর তাড়া নেই। সে এখন নতুন দুনিয়ার খোঁজে। ফেরবার কোনও অভিপ্রায়ই নেই। ডুন এক্সপ্রেস ধীর গতিতে বারানসী জাংশন ছেড়ে বেরতে শুরু করল। কোলাহলে প্যাসেঞ্জারদের সার্ডিনের মতো টিনে ভরে স্লিপার ক্লাসে নিয়ে যেতেও বিরক্তি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%