অনিরুদ্ধ বসু
ভাবতে পারেনি ঐত্রেয়ীর বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। মিলন ঐত্রেয়ীকে দৈহিকভাবে না পেয়ে বিষণ্ণ হলেও, ঐত্রেয়ীর বাবা হাতে চাঁদ পেলেন। কতদিন ভাবছিলেন কবে মেয়েকে পার করবেন। এতদিনের মনোবাঞ্ছা হঠাৎ পূর্ণ হল। ভাগ্য লাগলে এমনি ভাবেই। গ্রহচত্রু গণনা, পাথর পরাবার আগেই মেয়ে পার হয়ে গেল। ঊষাকে কথাটা পাড়তেই খবর চলে গেল অ্যামেরিকায়। অ্যামেরিকান সিটিজেন ছেলে দু-সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এল, দেখল, বিয়ে করল। ঐত্রেয়ীকে ওপারে উড়িয়ে নিয়ে গেল। বাবা দম ফেলার সময় পায়নি। মা আগে থেকেই মেয়ের বিয়ের গয়না গড়াচ্ছিলেন। ঝট করে বিয়ের আয়োজনে আর কিছু করে উঠতে পারলেন না।
ঊষার দেওর ঐত্রেয়ীকে পছন্দ হতে সম্মতি দিয়ে বলল “গয়না দিয়ে কী করব? ওগুলো তো আর অ্যামেরিকায় নিয়ে যাব না? বরং ওর যাওয়ার বন্দোবস্ত করি। ততক্ষণে আপনারা বিয়ের বন্দোবস্ত করুন”
ঐত্রেয়ী হাতে স্বর্গ পেল। সেও জানে, বিয়ে না হলে, ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশংকা। ঝামেলাটা অবশ্যম্ভাবী। রেজিস্ট্রেশনের পর বিয়ের পিঁড়িতে বসে একটাই ভয় - চাঁপাতলায় ওদের সঙ্গমের ভিডিও দেখিয়ে, বিয়েটা ভেঙে না দেয়। সম্বন্ধ করে বিয়ে তো। বিয়ে-বাসিবিয়ে-ফুলশয্যা শেষ না হওয়া অবধি আর ভাবার অবকাশ পায়নি। পলক না ফেলতেই সব কিছু শেষ হয়ে গেল।
ঠান্ডা মাথায় পরে ভেবে দেখল ওরা বিয়েতে ঝামেলা পাকাবে কেন? ঐত্রেয়ী বিয়ে করে অ্যামেরিকা পারি দিলে ওদেরই মঙ্গল। এখানে থাকলেই চিন্তার কারণ। কবে ঐত্রেয়ীর সূত্র ধরেই ওদের পেছনে পুলিস লেগে যায়। চেন্নাই খুনের জ্বলন্ত এভিডেন্স এভাবে সসম্মানে, এত তাড়াতাড়ি দেশ থেকে বিদায় নেবে, কল্পনাও করতে পারেনি।
কল্পনা করতে পারেনি মিলনও। আর একবার যদি চাঁপাতলার স্বাদ পাওয়া যেত। একবার যদি ঐত্রেয়ীকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখা যেত, সত্যি মোটা হয়েছে কি না। কামনার উচ্ছ্বাসে ঐত্রেয়ীর গভীরে ডোবা যেত। তা আর হল না। অতৃপ্ত রয়ে গেল। মাঝে শূন্যতা। সোহম, সুনেত্রা চলে গেছে। ঐত্রেয়ীও অ্যামেরিকায় চলে যাবে। সে পড়ে রইল থিসিস শেষের প্রতীক্ষায়।
ঐত্রেয়ীর লাইপোসাকশন হল না বটে, কিন্তু আশিস বন্দ্যোপাধায়ের ওপর নজর পড়ল ডিসিডিডি ইন্দ্রিজিৎ কর পুরকায়স্থর। চেন্নাই পুলিস থেকে শুধু নয়, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর আর্জি।
কলকাতার ব্যস্ততম প্লাস্টিক সার্জেন ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের হদিস পেতে অসুবিধা হল না। ইন্দ্রজিৎ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ডানলপে চাকরি করত। কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। সে সময়, কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারদের আর চাকরির খুব বেশি সুযোগ ছিল না। বাইরে যাওয়ার ইচ্ছেও নেই। তাই আইপিএস সেরে পুলিসে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি পুলিস লাইনে সজাগ। আশিসকে জেরা করতে গেলে বুদ্ধির দৌড়ে হেরে যেতে পারে, এই ভেবে, ওর সঙ্গে কথোপকথনে গেল না।
এক শনিবার সাধারণ পোশাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই আশিসের চেম্বারে।
“উনি নেই। দিল্লি গেছেন। উইক এন্ডে রুগি দেখেন না” রিসেপশনিস্ট রচয়িতা বলল।
“কবে দেখেন?”
“মানডে টু ফ্রাইডে। নাম বলুন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লিখে রাখছি”
“প্রতি উইকেন্ডে দিল্লি যান? ইমার্জেন্সি হলে দেখে কে?”
“উনি ইর্মাজেন্সি অপারেশন করেন না। রুটিন কোনও প্রবলেম হলে জুনিয়র হ্যান্ডেল করে”
“১০ মার্চ, বুধবার উনি কোনও অপারেশন করেছিলেন?”
“এসব প্রশ্ন আমায় করছেন কেন?”
আইডি কার্ড দেখাতেই ভয় পেয়ে গেল রচয়িতা। পুলিসের উচ্চপদস্থ অফিসার বলে কথা।
“এবার বল ১০ মার্চ, বুধবার, কোনও অপারেশন করেছিলেন?”
রচয়িতা ইন্দ্রজিৎকে ভেতরের লাউঞ্জে বসিয়ে বলল “কফি বলি স্যার? আমি রস্টারটা নিয়ে আসছি”
ইন্দ্রজিৎ কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। রচয়িতা রস্টারে আঙুল বোলাল “১০ মার্চ, তাই না? ইউসুয়ালি বুধবার ওনার অপারেটিং ডে। বুধবার চারটে অপারেশন ছিল। মঙ্গলবার চেম্বারের পর উনি সেগুলো ক্যানসেল করে দেন”
“কেন?”
“তা বলতে পারব না” হঠাৎ বলল “মনে পড়ছে। ক্যানসেল করে বলেছিলেন, রাতের ফ্লাইটে দিল্লি যেতে হবে”
“কেন বলেছিলেন?”
“না, তা তো বললেনি”
“কবে ফিরেছিলেন?”
“ঠিক মনে পড়ছে না। বোধহয় বৃহস্পতিবার”
কফি শেষ করে উঠে পড়ল। আর ওকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। এর বেশি উত্তর দিতে পারবে না। গাড়িতে উঠে দিলওয়ান সিংকে মোবাইলে ফোন “হোয়েন ওয়াজ দ্য প্রেসক্রিপশন এক্সিকিউটেড? আই মিন, হোয়েন ওয়াজ দ্য ড্রাগ বট?”
“ডোন্ট হ্যাভ দ্য প্রেসক্রিপশন উইথ মি। লেট মি চেক। উইল কল ইউ ব্যাক”
ইন্দ্রজিৎ ভাবছিল প্লাস্টিক সার্জেন ইনসুলিন লিখতে গেল কেন? তাও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যাঙ্গালুরুর মহিলা শঙ্খমালা মুখার্জির নামে। যুক্তিতে মিলছে না। অঙ্কটা স্বাভাবিক নয়। প্লাস্টিক সার্জেন, ইনসুলিন, মাঝসপ্তাহে অপারেশন ক্যানসেল করে দিল্লি। এগুলোও চেক করতে হবে। সত্যি দিল্লি গেছিল? না কি ব্যাঙ্গালুরু? উত্তর লুকিয়ে আছে প্রেসক্রিপশনে। দেরি লাগল না উত্তর পেতে। পনেরো মিনিটের মধ্যে দিলওয়ান জানাল, প্রেসক্রিপশনটা শনিবার সকালে, মানে ১৩ মার্চ এক্সিকিউটেড। ওইদিন ক্যাশ ফার্মেসি থেকে ওষুধটা কেনা। সেদিনের দুপুরের ফ্লাইটেই শঙ্খমালা চেন্নাই পৌঁছয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে শনিবারের মধ্যে প্রেসক্রিপশনটা ব্যাঙ্গালুরু গেল কী করে? এত সিওর গ্যারান্টিড সার্ভিস কে দিতে পারে? একমাত্র ডিএইচএল ছাড়া। ইন্দ্রজিতের মাথা খুলছে। নেক্সট গন্তব্য ডিএইচএল। জানা যেতে পারে কুরিয়ার পোস্ট করা হয়েছিল কি না? যদি হয়ে থাকে, মহিলার আসল ঠিকানা পাওয়া যেতে পারে.... না হলে, ডাক্তার সাহেব নিজেই দিল্লির নাম করে ব্যাঙ্গালুরু গিয়েছিল। ডিএইচএলের স্টাফ ওই চারদিনের রেকর্ডস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও চিঠি পোস্টের রেকর্ড পেল না।
যারা এত কেয়ারফুলি প্ল্যান করে এ কাজ করেছে, তারা কী কুরিয়রে ট্রেস রাখবে? ঠিকানাটা তো ভুল দেওয়া যাবে না। নামটা ভুয়ো হলেও। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারকে দমদম এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দিল। ১১ মার্চের সব কলকাতা-দিল্লি ও কলকাতা-ব্যাঙ্গালুরু ফ্লাইটের বুকিং-বোর্ডিং লিস্ট চেক করতে।
দিনের শেষ উত্তর “পেয়েছি স্যার”
“কোন ফ্লাইট? কোথায়?”
“রাত আটটার ইন্ডিগো ফ্লাইট। কলকাতা-দিল্লি”
সত্যি সত্যি তাহলে ডাক্তার সাহেব দিল্লি গেছিল। রিসেপশনের মেয়েটি মিথ্যে বলেনি। হঠাৎ অপারেশন সেডিউল ক্যানসেল করে মিড উইকে দিল্লি?
সেটা পরের কথা।
এখন মুখ্য কলকাতার প্রেসক্রিপশন ব্যাঙ্গালুরু গেল কী করে? মানে, এর মধ্যে আর কোন তৃতীয় ব্যক্তি জড়িয়ে। ভাবতেই সব পরিষ্কার। যারা এত প্ল্যান করে ব্যাঙ্গালুরু-চেন্নাইয়ের রির্টান ফ্লাইট শঙ্খমালার নামে বুক করেছে দিল্লির ইন্টারনেট কাফে থেকে মৃত মহিলার ত্রেুডিট কার্ড দিয়ে, তারা কী কুরিয়ারের ওপর ভরসা করবে? এখানে কোনও তৃতীয় ব্যক্তি কাজ করেছে। কে সে? সে-ই প্রেসক্রিপশনটা কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালুরু পৌঁছে দিয়েছে শঙ্খমালার হাতে?
ইনভেস্টিগেশনের বিবরণ সহ নোট লিখে মধুসূদনকে পাঠিয়ে দিল। যদি রেকর্ড ঘেঁটে বার করতে পারে সন্দেহজনক এই ব্যক্তিটিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।