প্রাক কথন

অনিরুদ্ধ বসু

ঝিমলি আপ্রাণ জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করল। দুর্গা প্রসাদের সুদৃঢ় মরণ থাবা, পাইথনের মধ্যাংশ যেন, অনায়াসে তার গলা জড়িয়ে কাবু করে ফেলেছে। দুর্গা প্রসাদকে যে খুনের নেশায় পেয়েছে। যত দৃঢ় হচ্ছে ক্রমশ তাঁর বেষ্টনী, ভয়াবহ আতঙ্কে গোঙাচ্ছে ঝিমলি। ওর মরতে এত সময় লাগছে কেন? অনেক ঝামেলা পাকিয়েছে। মৃত্যুই একমাত্র দাওয়াই। ওর কবল থেকে বাঁচবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঝিমলি।

“ছোড় দে মুঝে” কান্না মেশানো গোঙানি।

“কৈসে ছোড় দু তুঝে? ম্যায় নে কহা থা না” লকলকিয়ে উঠল ওর কণ্ঠস্বর।

বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী শুধু ট্যান্ডা ফলস ডাকবাংলোর পাশে গাছের ওপরে বসা কিছু পায়রা। স্থানীয় লোকেরা বলে ভূত বাংলা। নামেই ওটা ডাকবাংলো। ব্রিটিশ আমলে তৈরি বাংলো কোনওদিনই বাসের উপযোগী ছিল না। এখন তো ভগ্নদশা।

সন্ধ্যার অন্ধকারে টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। মুষলধারে নামার আগেই ওকে খতম করে ফেলতে হবে। নেতিয়ে পড়া ঝিমলির কাঁপা দেহটা, পাশবিক শক্তির কাছে ক্রমশ হার মানছে। এক সময় নিস্পৃহ হয়ে চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে এল। ধূসর মিশে গেল অন্ধকারে। পায়ারাগুলোর ওড়া বুঝিয়ে দিল এই বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হতে চায় না।

মরার আগের মুহূর্তে, ঝিমলির চোখে ভেসে উঠেছিল, তার ভূমিষ্ঠ না হওয়া জারজের স্বপ্নটুকু...

দক্ষিণ মির্জাপুরের এক চিলতে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ট্যান্ডা ফলস। নির্জন। উইন্ডহ্যাম ফলসের মতো উইকেন্ডে টুরিস্টের ভিড়ে পুষ্ট নয়। এই ফলসের ঢোকার পথটাই দুর্গম। মির্জাপুর থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭ ধরে রেওয়ার দক্ষিণে ১২ কি মি ড্রাইভ করলে ভোরসার গ্রাম। তার বাঁ দিকের রুক্ষ পাথর বেয়ে উঠলেই যে বেলাভূমি, তারই পাশে ফলস। গাড়িতে পথ শুধু দুর্গম-ই নয়, ভয়াবহও বটে। তাই টুরিস্টদের এদিকে আসার কোনও স্পৃহাই নেই। বরং উইন্ডহ্যামে যাওয়া অনেক সহজ। স্থানীয়রা সাইকেল কিংবা পায় হেঁটে কোনও সময় এলেও, খুব ভালোই জানে, এটা উত্তর প্রদেশের দুর্গম অঞ্চল। তবু কারও যদি ট্যান্ডা দেখার জেদ চাপে, নির্ভেজাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাক্ষী থাকতে পারে। প্রায় একশো বছর আগে, মাটির ড্যাম তৈরির পরে একটা ছোট্ট লেক থেকে আশেপাশের গ্রামে জলের জোগান দিত। বাড়তি জল ২০০ মিটারের মতো দূরে তীব্র গতিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে ১০০০ ফিট নীচের খাদে। যার নাম ট্যান্ডা ফলস। বর্ষাকালের তীব্রতার বাইরে, অন্যান্য সময় প্রায় জলশূন্য। খাদের ধারে পরিত্যক্ত ট্যান্ডা ফলস ডাকবাংলো থেকে মনোরম প্রকৃতি।

প্রায় পঁচিশ বছর আগে, এই ডাকবাংলোতেই দুর্গা প্রসাদ ও ঝিমলি তাদের ভালোবাসার নীড় গড়ে তুলছিল। তাদের ভিটে লহংপুর আর রাজপুর থেকে সুদীর্ঘ পথ হেঁটে এই ফলসে আসার দরকার হত না। শর্টকাট পথে মেন রোডের ধারের গ্রাম থেকে অনায়াসেই ফলসে আসা যায়। লোকচক্ষুর আড়ালে, এখানেই ছিল ওদের লীলার বৃন্দাবন। ঝিমলির তখন কতই বা বয়স? ষোলো হবে। মাজা রঙের এই গ্রাম্য তরুণী লাবণ্যে ভরপুর। তন্বী ঝিমলির মধ্যে অফুরন্ত প্রাণ, ঠিকরানো যৌবন। লম্বা, সুপেশি দুর্গা সেই আকর্ষণ থেকে পালায় কোথায়? দুর্গা তখন গ্রামের ললনাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের মধ্যে ঝিমলির দিকে যে ওর চোখ পড়বে, ভাবতেও পারেনি। সবাইকে বাদ দিয়ে দুর্গার প্রতি আকর্ষণ। এতো তার পরম সৌভাগ্য।

ছোটবেলায় বাবা-মার মৃত্যুর পর, অনিচ্ছাকৃত মামা দুর্গার ভরণপোষণ নিয়ে ফুঁসছিল। আরেকটা মুখের অন্ন সংস্থান! যার প্রকোপ দুর্গার প্রতি অহরহ। ফলে ক্রমশ জন্ম নিল এক বিদ্রোহী দুর্গা। সবসময় কোনও না কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে। মুক্তি শুধু, ডাকবাংলোর পাশে, গাছের নীচে, ঝিমলির সঙ্গে প্রেমের স্বর্গে। দেহের মিলনে। যৌবনের তৃপ্তির দীপ্তিতে। একদিন হঠাৎ স্বপ্ন আছড়ে পড়ল রূঢ় বাস্তবে।

“তোহার বাচ্চা হমারে পেট মা পল রহা হ্যাঁয়” ঝিমলির আনন্দ, মাথায় বজ্রাঘাত।

“গিরা দে” চেঁচিয়ে উঠল দুর্গা।

“কটেই নাহি। সামঝে কা?” ঝিমলির সরব প্রতিবাদ।

রাগে মাথাটা ঝিমঝিম করছে দুর্গার “সোচ লে ঝিমলি” কথার মধ্যে স্পষ্ট হুংকার।

“ইস মা সোচন কী কা বাত হ্যাঁয়?” ঝিমলি রেগে চলে গেল। যদি সময়ের সঙ্গে দুর্গার মন বদলায়। জানাজানি হলে সামাজিক বহিষ্কার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র পথ, তাড়াতাড়ি বিয়ে। খসানো গেলেও, মন সায় দেয় না। হাজার হোক নিজের সন্তান তো। সময়ের সঙ্গে দুর্গাও ঠান্ডা হবে, এই আশা। চিনতে পারেনি দুর্গার অন্ধকার দিক। ভেতরে জমা সীমাহীন রাগ।

দুর্গা ঝিমলির অগোছালো নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ঘনঘন শ্বাস ফেলে। অন্ধকারে বর্ষার জলপ্রপাতে এদিকওদিক তাকাল। কেউ নেই। টানতে টানতে ঝিমলির দেহটাকে ফলসের ধারে নিয়ে গেল। নীচে গভীর খাদের দিকে তাকাল। নীচে তীব্র স্রোতে আছড়ে পড়ছে ঝর্নার। ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল ঝিমলির লাশ। চেয়ে রইল নিষ্পলক। যতক্ষণ না দৃষ্টির বাইরে হারিয়ে যায়। বর্ষার জলছবি নিমেষে মুছে দিল নৃশংস মৃত্যুর শেষ চিহ্নটুকু। বুঝতে পারছে স্বাভাবিক জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেছে। অন্ধকারের বুক চিরে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭-এর দিকে দ্রুত বেগে ছুটছে।

করণপুর পুলিস চৌকির হেড কনস্টেবল ছোটে লাল দিনের শেষে সবে বিড়ি জ্বালিয়ে সোয়াস্তির সুখটান দিয়েছে। নির্বিঘ্নে দিনটা কেটেছে। রাতের খাওয়া শেষ করে যখন সুখের ঘুমে মগ্ন, জানেও না, দুর্গা তখন পালাচ্ছে। বর্ষা রাতের আমেজে, লহংপুর আর রাজপুর গভীর ঘুমে মগ্ন।

আচমকা ভোর রাতের সুখনিদ্রা ভাঙিয়ে দিল রাজপুরের কিছু বাসিন্দা। ঝিমলি রাতভর গ্রামে ফেরেনি। করণপুর পুলিস চৌকি বলতে কুঁড়েঘর। পাশে একটা চায়ের দোকান। এ অঞ্চলে এরকম অসংখ্য ছোটখাটো পুলিস চৌকি গ্রামগুলোর কুঁড়ের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কদাচিৎ কোনও অভিযোগ আসে। ক্রাইমও সময় বিশেষে কয়েকটা ছাড়া বড় একটা হয় না। এর জন্য তাই ছোটে প্রস্তুত ছিল না।

প্রথমেই ভাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা “লৌট আয়েগা”

কিন্তু গ্রামবাসীদের পিড়াপিড়িতে শেষমেশ কেস লিখতে বাধ্য হল। দিন দুয়েক পরেও যখন ঝিমলি ফিরল না, ছোটে লালের চিন্তার পারদ চড়তে শুরু করল। গ্রামবাসীদের চেষ্টা সত্ত্বেও যখন সুরাহা হল না, বাধ্য হয়েই মির্জাপুর সিভিল লাইন্সের এস পি-র কাছে রিপোর্ট করল। তৃতীয় দিনে, ঝাপসা আকাশে ট্যান্ডা ফলসের ওপর শকুনের চক্রাকার বিচরণ দেখে, গণ্ডগোলের আঁচ পেল। ক্ষতবিক্ষত গলা পচা ঝিমলির দেহটা অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল। পেয়ারের লোকেরা জানত, ঝিমলি প্রায়শই ওদিকে ঘুরতে যায়। আচমকা খাদে পড়ে মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। গ্রামবাসীরা অন্ত্যেষ্টির সঙ্গে দু-ফোঁটা চোখের জলও ফেলল। হারিয়ে গেল ঝিমলি। মুছে গেল করণপুর পুলিস চৌকি আর এস পি সাহেবের কাছে ছোটে লালের রিপোর্ট।

কয়েকদিন মির্জাপুর শহরের আলিতে গলিতে দুর্গা প্রসাদকে দেখা গেলেও, হঠাত কর্পূরের মতো উবে গেল। কেউ জানতে পারল না, কোথায়? মামা আর পাড়াপড়শিদেরও গরজ নেই। দুর্গার মতো বদরাগী, ঝগড়ুটে, থাকা আর না-থাকা সমান। নতুন নয়। আগেও বহুবার এরকম হারিয়ে গিয়ে, পয়সা ফুরলে, আবার ফিরে এসেছে। ভালোই তো। আপদ বিদায় হয়েছে।

দুর্গাকে ভুলতে লহংপুরের বেশিদিন লাগল না।

অধ্যায় ১ / ৫১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%