ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করছ সেই কাজের জন্য কে কি বলেছে জানি না। বিশেষ করে যারা তোমার হিতাকাঙ্খী তাদের কথা তুমি শুনেছ কি না জানি না। তাদের কথা না শুনে তুমি হয়তো তোমার শুভাকাঙ্খীদের হারাচ্ছ। এই প্রসঙ্গে তোমাকে আমি প্রদীপ নামে এক রাজকুমারের কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনলে হয়তো তোমার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বেতাল তার কাহিনি শুরু করল
সুবর্ণগিরি দেশের যুবরাজের নাম ছিল প্রদীপ। তার সৌন্দর্যবোধ ছিল অপরিসীম। কারুকার্য ও কলার প্রতি টান ছিল গভীর। তার কাছে প্রমোদ নামে এক শিল্পী ছিল। সেকালের শিল্পীরা যে ধরনের ছবি আঁকত প্রমোদ সেই ধরনের ছবি আঁকত না। তার ছবি ছিল বাস্তবধর্মী। তার ছবির বিষয়বস্তুর আধার ছিল জীবন থেকে নেয়া। প্রমোদের সঙ্গে প্রদীপের বন্ধুত্ব ছিল।
একবার প্রদীপ প্রমোদকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কল্পনার ভিত্তিতে ছবি আঁক না কেন? তোমার অসুবিধা কোথায়?'
'আমি যা চোখে দেখি না তা আঁকতে পারি না।' বলল প্রমোদ।
তারপর প্রমোদ পাহাড়ের কাছে গিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখল সেই দৃশ্য আঁকল। সেইসব ছবিগুলো যুবরাজ প্রদীপকে দেখাত। প্রদীপ ভাবত তার বন্ধু প্রমোদ কিছুটা কল্পনাবিলাসী হয়তো হয়েছে। একবার সে একটা ছবি দেখে বলল, 'এই ছবি দেখে মনে হচ্ছে এই ধরনের দৃশ্য তুমি কখনো দেখনি।'
সেই ছবিতে একটা পাহাড়ের শিখর থেকে একটি গাছ গজিয়ে নীচের দিকে বাড়ছিল। গাছের মাথা পাহাড়ের নীচের দিকে বাড়া অসম্ভব। প্রমোদ প্রদীপকে সোজা সেই অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে সেই দৃশ্য দেখাল। সেই গাছে ঝুলে কয়েকটি বাঁদর নদীর জল খাচ্ছিল।
আরও কিছুদিন পরে প্রদীপের বিয়ের চিন্তা জাগল। উপযুক্ত কন্যা খোঁজা অত সহজ নয় তাই প্রদীপ প্রমোদকেই তাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করল। বিভিন্ন দেশের রাজকুমারীদের প্রমোদ দেখতে লাগল। প্রত্যেকটি রাজকুমারীর ছবি এঁকে প্রমোদ প্রদীপকে পাঠাত। ফেরাপথে প্রমোদ একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখল।
সেদিন সে যখন বনপথে তখনই রাত্রি নেমে গেল। জ্যোৎস্না রাত হওয়ায় প্রমোদ সেখানে থেমে না গিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। পূর্ণ চন্দ্রের রাত্রে তার হাঁটতে ভালোই লাগছিল। সে পথের পাশ থেকে গান শুনতে পেল। শুধু গান নয় সে শুনতে পেল নূপুরধ্বনি। নাচের মিষ্টি আওয়াজ।
প্রমোদ অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে কান খাড়া করে সেই রিনিঝিনি ধ্বনি শুনতে লাগল। যেদিক থেকে শব্দ ভেসে আসছিল সেইদিকে এগিয়ে এল। অপূর্ব সে দৃশ্য। একটি মেয়ে নাচছিল। সেই নাচ দেখতে দেখতে প্রমোদ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। প্রমোদ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেই নাচ দেখতে দেখতে কখন যে নৃত্যশিল্পীর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল তা সে নিজেই টের পেল না। নাচতে নাচতে সেই শিল্পী একসময় প্রমোদের গায়ে ঢলে পড়ল। হঠাৎ মহিলা বলল, 'ক্ষমা করবেন, ক্লান্ত হয়ে এদিকে পড়ে গেছি।'
'তাতে কী হয়েছে। আমি ভাবছি, তোমার মতো সুন্দরী নৃত্য পটিয়সী এখানে এভাবে পড়ে আছে কেন? কী তোমার অভাব, কী তোমার ইচ্ছা? এখানে একা এভাবে কেন পড়ে আছ?'
সে হো হো করে হেসে উঠে বলল, 'একা থাকতে আমার ভয় করে না। যে গভীর অরণ্য দেখে আপনি ভয় পাচ্ছেন তা আমার কাছে মোটেই ভয়ের কিছু নয়। আসুন, আমাদের ঘরে নিয়ে যাই।' বলে প্রমোদকে নিয়ে এগিয়ে গেল। প্রমোদ কৌতূহলী হয়ে সেই নটীর সঙ্গে গেল। তার বাড়ির চারদিকে ছিল উদ্যান। সেই উদ্যানে ছিল বিচিত্র সব গাছ। শেয়ালগুলো ডাকছিল। সেই গাছ দেখে এবং শেয়ালের ডাক শুনে প্রমোদের গা ছমছম করতে লাগল।
নটী যে ঘরে ছিল সেখানে আর কেউ ছিল না। তাকে একটি আসনে বসতে দিয়ে কয়েকটি ফল সাজিয়ে এনে খেতে দিল। তারপর নটী তাকে নিয়ে গেল অন্য এক ঘরে। সেই ঘরে ফুলের বিছানায় তাকে ঘুমোতে বলল।
ঘুমের ঘোরে সে পাখির স্বপ্ন দেখল। পাখির মিষ্টি ডাক কলরবে রূপান্তরিত হল এবং সেই কলরবেই প্রমোদের ঘুম ভেঙে গেল। প্রমোদ চোখ কচলে দেখল পাখি নেই, সুন্দরী নটীও নেই। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কঙ্কাল। ভাঙা হাঁড়ির টুকরো। প্রমোদ পরিষ্কার বুঝতে পারল যে সেটা শ্মশান।

ভয়ে প্রমোদের গা হিম হয়ে গেল। সে যা দেখেছে তা স্বপ্ন না বাস্তব কিছুই প্রথমে বুঝতে পারল না। পরে তার মনে হল সুন্দরী নটী পিশাচিনী হতে পারে। কিন্তু সেই সুন্দরীর রূপ তার চোখের পাতায় লেগে রইল।
প্রমোদের আঁকা ছবিগুলো প্রদীপ গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখতে লাগল। কিন্তু সেই ছবিগুলোর একটিও প্রদীপের পছন্দ হল না। সে প্রমোদকে বলল, 'রাজকুমারীদের রূপ যে এত নিকৃষ্ট ধরনেরও হতে পারে তা আমি আগে ভাবিনি। আমার কল্পনায় ছিল যে রাজকুমারীরা আরও অনেক বেশি সুন্দরী। আজ তোমার ছবি দেখে হতাশ হয়েছি। আমার কল্পনার সঙ্গে তোমার ছবির কোনো মিল খুঁজে পাইনি।'
এই ঘটনার কিছুদিন পরে প্রদীপ প্রমোদকে বলল, 'মনমেজাজ ভালো নেই। তোমার মনের মতো একটা ভালো ছবি এঁকে দেখাও তো।'
প্রমোদ ছবি আঁকল। একটি মেয়ের ছবি। সেই ছবির জন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকে তাকাতে হল না। কীভাবে যেন তুলির ডগায় সেই মেয়ের ছবি এসে গেল। পটে আঁকা হয়ে গেল।
আশ্চর্য যে সুন্দরী নটীকে সে অরণ্যে দেখেছিল কোনো অজানা কারণে তারই ছবি আঁকা হয়ে গেল। কারণ তার চোখের পাতায় সেই নটীর ছবি এঁটেছিল, আঁকার আগে শিল্পীর মনে সেই সুন্দরী নটীর ছবি বহু বার আঁকা হয়ে গেছে।
সেই ছবি দেখে প্রদীপ অবাক হয়ে গেল। তার আগে যত রাজকুমারীদের ছবি সে দেখেছিল তাদের প্রত্যেকটির চেয়ে সেই ছবি ছিল সুন্দর। আনন্দে সে প্রমোদকে বলল, 'এমন সুন্দর রূপবতী থাকতে তুমি আজেবাজে রাজকুমারীদের ছবি এঁকে দেখালে কেন? এটা নিশ্চয় কোনো রাজকুমারীর ছবি? নিশ্চয় এটা লুকিয়ে রেখেছিলে? কেন রেখেছিলে?'
'এই ধরনের সুন্দরী বাস্তব জগতে কিন্তু কেউ নেই। এটা আমার কল্পনার ছবি।' প্রমোদ বলল।
'মিথ্যা কথা বল না। যা তুমি দেখ না তা তুমি আঁক না। আমি তোমাকে ভালোভাবেই চিনি, জানি।' বলল যুবরাজ।
'যা বাস্তব নয় এমন অনেক দৃশ্যও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে।' হাসতে হাসতে প্রমোদ বলল।
'তার মানে তুমি বলতে চাইছ যে এই ধরনের মেয়ে কোনো-না-কোনো সময়ে তোমার চোখে পড়েছিল? কিন্তু এখন তুমি সেই মেয়েকে দেখতে পাচ্ছ না। এই তো?' প্রদীপ বলল।
'সততার খাতিরে তোমার কথা স্বীকার করতেই হয়।' প্রমোদ বলল।
'তাহলে আমাকেও দেখাও। কে সে? কোথায় থাকে? আমি তাকেই বিয়ে করব।' যুবরাজ বলল।
'যুবরাজ প্রদীপকুমার, অত ব্যস্ত হয়ো না। আমি তোমার হিতাকাঙ্খী হিসাবেই বলছি, এই সুন্দরী নটীকে বিয়ে করা অসম্ভব। কারণ এই মেয়ে মানবী নয়। আমি যেখানে দেখেছিলাম সেখানেই যে এই সুন্দরীকে দেখতে পাব এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যাকে দেখা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, তার সম্পর্কে তোমাকে বলেই বা কী লাভ। সেইজন্যেই আমি বলিনি।' প্রমোদ বলল।
'সে যেই হোক, সে পিশাচ হোক, রাক্ষসী হোক, আমি তাকেই বিয়ে করব। তুমি যেখানে তাকে দেখেছিলে সেখানেই আমাকে নিয়ে যাও। আর এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না। এই মুহূর্তে চল।' প্রদীপ বলল।
নিরুপায় হয়ে প্রমোদকে রাজি হতে হল। দু-জনে মিলে ঘোড়ায় চড়ে সেই অরণ্যের দিকে রওনা হল। সে রাত্রেও জ্যোৎস্না ছিল। প্রমোদ যেখানে সেই নটীকে দেখেছিল সেখানে ঘোড়া থেকে নেমে দু-জনে অপেক্ষা করতে লাগল। মাঝরাত্রে ওরা শুনতে পেল সুমধুর গান ও নূপুরের রিনিঝিনি। অদূরে দাঁড়িয়ে প্রদীপ ও প্রমোদ নটীর গান শুনল ও নাচ দেখল। বেশিক্ষণ প্রদীপ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। প্রদীপ ছুটে গেল সেই নটীর কাছে। নাচতে নাচতে হঠাৎ একসময় নটী প্রদীপের উপর ঢলে পড়ল। পরক্ষণেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রদীপের কাছে ক্ষমা চাইল। প্রদীপ অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'সুন্দরী, তোমার জন্যই আমি এসেছি। তোমাকে দেখে আমি ধন্য হয়েছি। তোমাকে আমি গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমাকে আমি বিয়ে করতে চাই।' বলতে বলতে যুবরাজ দু-হাত বাড়িয়ে নটীর হাত ধরে ফেলল।

সুন্দরী নটী খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, 'আপনার যদি ইচ্ছা জাগে বিয়ে করার করুন।'
তারপর নটী তাকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাল।
'কী দরকার? আমার অনেক বড়ো বড়ো ভবন আছে। তোমার বাড়িতে গিয়ে এখন সময় নষ্ট করার কী দরকার? তুমিই বরং আমার সঙ্গে এসো।' প্রদীপ এই কথা বলে প্রমোদের দিকে এগোতে লাগল। নটীও প্রদীপের পাশাপাশি হেঁটে প্রমোদের কাছে এল।
প্রমোদ বলল, 'যুবরাজ প্রদীপকুমার, তুমি কাকে সঙ্গে নিয়ে চললে? মনে রেখো এ মানবী নয়, রাক্ষসী। তোমার ভালোর জন্যই, তোমার হিতাকাঙ্খী হিসাবেই তোমাকে বলছি, ওকে সঙ্গে নিও না। ওকে এখানেই ছেড়ে দাও।'
প্রদীপ তার কথার গুরুত্ব না দিয়ে বলল, 'কি আজেবাজে কথা বলছ? এই সুন্দরী নটীকে কি এখানে ছেড়ে যাওয়ার জন্যই এসেছি। কতকাল পরে আমি মনের মতো এক বউ পেলাম। একে দেখে তোমার নিশ্চয় মতিভ্রম হয়েছে। তোমার মাথায় এখন বুদ্ধি বলতে কিচ্ছু নেই।'
প্রমোদ যখন দেখল যে যুবরাজ প্রদীপকে ফেরানোর কোনো উপায় নেই তখন সে চরম কথা বলল, 'তুমি যদি তোমার প্রতিজ্ঞায় অটল থাক, তাহলে আমাকে এই মুহূর্তে এখানেই ছেড়ে দাও।'
'তোমার যা ইচ্ছা তুমি কর। আমার যা ইচ্ছা আমাকে করতে দাও। মনে রেখ, শুধু তুমি কেন, সমস্ত জগৎ সংসারও যদি আমাকে এর জন্য ছাড়তে হয় আমি ছাড়ব। কিন্তু এই সুন্দরী নটীকে ছাড়ব না।' প্রদীপ বলল।
'তাহলে তোমার যা ইচ্ছা তাই কর।' বলে প্রমোদ ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল।
ওর চলে যাওয়ার পর প্রদীপ রাতটা সেখানেই কাটাল নটীকে নিয়ে। সকালে প্রদীপ দেখল যে তার কোলে পড়ে রয়েছে কঙ্কাল। সেই কঙ্কাল দেখে প্রদীপের অসহ্য লাগল। সে ওই কঙ্কাল ছুড়ে ফেলে দিল দূরে। তারপর নিজের ঘোড়ায় উঠে দেশের দিকে রওনা হল। পেছন দিক থেকে কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু যুবরাজ প্রদীপকুমার পেছনের দিকে ফিরে তাকাল না। তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, প্রমোদ আর যুবরাজ প্রদীপের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তবু প্রমোদ চলে গেল কেন? সুন্দরীকে প্রদীপ বিয়ে করতে যাচ্ছে দেখে কি তার মনে ঈর্ষা জেগেছিল? নাকি, যুবরাজ তার কথা শোনেনি বলে অভিমানে চলে গেল? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'প্রমোদের মনে ঈর্ষার কোনো প্রশ্নই ছিল না। তা যদি থাকত তাহলে সে ওই অরণ্যে যুবরাজকে নিয়ে যেত না। অন্য অরণ্যে নিয়ে যেত। প্রদীপ তার কথা শোনেনি বলেও সে অভিমানে চলে যায়নি। প্রমোদ গোড়া থেকেই নটীকে সন্দেহ করেছিল। সে অবাস্তব চিত্র এঁকেছে বটে কিন্তু সে মনে-প্রাণে জানত যে সেটা অবাস্তব। যুবরাজ সত্যি যদি সুন্দরী নটীকে আনত তাহলে শেষপর্যন্ত প্রমোদকেই দায়ী হতে হত। তাই এই দায়িত্বের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই প্রমোদ চলে গিয়েছিল।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন