ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে এলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, এই গভীর অন্ধকারে এইভাবে যে কেন পরিশ্রম করছ আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি কি জান না যে ঠিক এইসময় এই কাজ করার ফলে তুমি অন্যদিকে বিরাট সুযােগ হারাচ্ছ? ঠিক যেভাবে দয়ানিধি হারিয়েছিল। দয়ানিধির কাহিনি শুনলে তােমার পরিশ্রম লাঘব হবে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল : দয়ানিধির বাবা ছিল এক বিখ্যাত নৌকা ব্যবসায়ী। সারাজীবন দেশে-বিদেশে ব্যাবসা করে কোটি কোটি টাকা রােজগার করতে পেরেছিল। দয়ানিধিই ছিল তার একমাত্র পুত্র। তাই তার বাবা ভেবেছিল দয়ানিধিও একদিন মস্তবড়াে নৌকা ব্যবসায়ী হবে।
কিন্তু দয়ানিধি যত বড়াে হতে লাগল তত তার আচার-আচরণ অন্য ধরনের হয়ে উঠল। ব্যাবসার প্রতি তার কোনাে আকর্ষণ ছিল না। তার মনে একটা দুশ্চিন্তা ঢুকেছিল, বাবা যে কোটি কোটি টাকা রােজগার করছে তা দিয়ে কী করা যায়। বাচ্চা বয়স থেকেই দয়ানিধির বৈদ্যশাস্ত্রের প্রতি আকর্ষণ দেখা দিয়েছিল। মানুষের শরীরে কোথায় কী আছে, কেন অসুখ করে, কোন অসুখে কী ওষধ দেওয়া যায় প্রভুতি বিষয়ে পড়াশােনা করল সে। শেকড়, বাকল এনে নিজেই ওষুধ বানাত। দয়ানিধির এই হাবভাব দেখে তার বাবা তাকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু দয়ানিধির মন ব্যাবসায় বসতে চাইল না। চিন্তায় চিন্তায় দয়ানিধির বাবা শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। অবশেষে মারা গেল।
বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দয়ানিধি এক বিরাট চিকিৎসালয় তৈরি করল। বিনা পয়সায় ওষুধ বণ্টন করতে লাগল। তারজন্য তার হাজার ভাগের এক ভাগ অর্থও খরচ করে উঠতে পারত না। দয়ানিধি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারত না তার বাবা তাকে নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তায় পড়েছিল।
বিনা পয়সায় চিকিৎসা করার সুযােগ পেয়ে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন রােগ সারাতে আসত আর ওষুধ নিয়ে যেত। এক জনের রােগ সারলে সে দশ জনের কাছে প্রচার করত। প্রতিদিন রােগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে লাগল এবং চিকিৎসালয়ের সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল দেশে-বিদেশে।
কিন্তু দয়ানিধির এইভাবে এত বড়াে চিকিৎসালয় গঠন বিনা পয়সায় ওষুধ বণ্টন প্রভৃতি বিষয়ে দু-ধরনের লােক চটে গিয়েছিল। এক হল চিকিৎসক। কারণ তাদের কাছে রােগীরা যেত না। বিনা পয়সায় রােগ সারাতে পারলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পয়সা দেবে কেন? অন্য জন ছিল ধনীরা। ওদের রােগ যখন কোনাে চিকিৎসকের কাছে সারত না, তখন তাদের যেতে হত দয়ানিধির কাছে। হাজার হাজার দরিদ্র মানুষের সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়িয়ে দয়ানিধির কাছ থেকে ওষুধ নিতে হত। এতে ধনীরা ভীষণ অপমান বােধ করত। কিন্তু অন্য উপায়ও ছিল না। আর একটা কারণেও ধনীদের কাছে দয়ানিধির আচরণ ভালাে লাগল না। তারা ধনসম্পত্তি সংগ্রহ করে দেশে খ্যাতি ও সম্মান অর্জন করেছিল। দয়ানিধির চিকিৎসালয় হওয়ার পর থেকে সারা দেশে দয়ানিধির নামই প্রচারিত হত।
কীভাবে যে তার খ্যাতি নষ্ট করা যায় তা নিয়ে তাদের চিন্তার আর শেষ ছিল না।
কিছু ধনী ভাবতে লাগল অন্য কোনােভাবে উপকার করে নাম করার কথা। বৈদ্যরাও মাথা ঘামাল। কেউ ভাবল তাকে ইহজগত থেকে সরানাের কথা। ঠিক এরকম একটা সময়ে সেই দেশের রাজার মৃত্যু হল। রাজার মৃত্যুর পর রাজপুত্র সিংহাসনে বসল। নতুন রাজা যে হল সে গরিব-দুঃখীদের দিকে একেবারে নজর দিত না। সে ছিল ভীষণ লােভী। চারদিক থেকে ধনসম্পত্তি সংগ্রহ করাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। বৈদ্যরা ওই রাজাকে জানাল যে দয়ানিধি ধনী। প্রতিদিন সে চিকিৎসা করার নামে হাজার হাজার রােগীকে জড়াে করছে আত্মপ্রচারের জন্য।
রাজা লােক পাঠিয়ে দয়ানিধির কাছে কত অর্থ আছে, কী কী ধনসম্পত্তি আছে খোঁজ নিল। নানা অজুহাতে দয়ানিধির চিকিৎসালয় ও সমস্ত সম্পত্তি রাজা অন্যায়ভাবে দখল করে নিল।
এত নিয়েও রাজার শান্তি ছিল না। প্রতিদিন যেহেতু বহু গরিব মানুষ দয়ানিধির কাছে আসত, দয়ানিধির কাছে শুনত যে রাজা দাতব্য চিকিৎসালয় দখল করে নিয়েছে সেহেতু রাজার প্রতি ঘৃণা পােষণ করত। ক্রমশ রাজার প্রতি গরিবদের ঘৃণা বাড়তে লাগল। তখন রাজা দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে। দয়ানিধিকে দেশ থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল।
অগত্যা দয়ানিধিকে দেশ ছাড়ার জন্য দেশের প্রান্তে, সমুদ্রের তীরে গিয়ে দাঁড়াতে হল। সমুদ্রতীরে এক সওদাগরের নৌকা ছিল। ওই সওদাগর দয়ানিধির বাবাকে চিনত। তৎক্ষণাৎ দয়ানিধিকে নিজের নৌকায় তুলে নিল। যেতে যেতে ওই সওদাগর দয়ানিধিকে অনেক উপদেশ দিল। দুঃখ না করে ব্যাবসায় মন দিতে বলল।
কিন্তু দয়ানিধির মত প্রকাশের আগেই সমুদ্রে ঝড় তুফান উঠল। ওই নৌকা ডুবে গেল। কাঠের গুড়িতে দয়ানিধি ভাসল।
পরে দয়ানিধির চেতনা লােপ পেল। অজ্ঞান অবস্থায় দ্বীপের কিনারে পৌছে গেল।
সেই দ্বীপে আদিবাসীদের বসতি। দয়ানিধিকে অচেতন হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পেল এক আদিবাসী যুবতী। সে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। জ্ঞান ফেরার পর তাকে খেতে দিল। দয়ানিধি ভালােভাবে সেরে উঠল। তাকে ঘিরে বহু আদিবাসী যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ভিড়।
তাদের চোখে-মুখে দয়ানিধি সম্পর্কে কৌতুহলের ছাপ। ওই দ্বীপের আদিবাসীরা ওখানকার জমিতে চাষ করে। ওখানকার বনে শিকার করে। বাকল আর গাছের পাতা তাদের পরিধানে। ওদের মধ্যে উচ্চ নীচের কোনাে মনােভাব নেই। খেতের ফসল আর শিকার করা পশুর মাংস খেয়ে তাদের পেট ভরে।
দয়ানিধি আদিবাসীদের ভাষা শিখে নিল। যে আদিবাসী যুবতী তাকে সমুদ্রতীরে দেখেছিল, এবং সুস্থ করে তুলেছিল, তাকেই দয়ানিধি বিয়ে করে ফেলল।
ওই দ্বীপের অধিবাসীদের একটা মারাত্মক রােগ হত। চোখের দৃষ্টি দ্রুত কমে যেত। অন্ধ হয়ে যেত। দয়ানিধি এই মারাত্মক রােগ কবে থেকে শুরু হল তা জানল।
‘সাবধান! তুমিও অন্ধ হয়ে যেতে পার!’ দয়ানিধির বউ বলল।
'তাতে ভয় পাই না। যে পরিবেশে অসুখ করে সেই পরিবেশে ওষুধও পাওয়া যায়।' দয়ানিধি বলল।
দয়ানিধি আর তার আদিবাসী বউ জঙ্গলে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরতে লাগল। দয়ানিধি যা খুঁজছিল তা পেল।
ওষুধ তৈরি করে যার চোখে রােগ ধরে দয়ানিধি তাকে সেই ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তােলে। দয়ানিধির চিকিৎসার ফলে সেখানে আর কেউ অন্ধ হল না।

এত বড়াে উপকার করায় সেই দ্বীপের অধিবাসীরা দয়ানিধিকে দেবতার মতাে দেখতে লাগল। আস্তে আস্তে দয়ানিধি নানা রােগের চিকিৎসা করতে লাগল। দেখতে দেখতে সে দ্বীপে রােগ বলে কোনাে কিছু ছিল না।
একদিন দয়ানিধি ও তার বউ খেতের কাজ করছিল। এমন সময় একটি নৌকা সেই সমুদ্রতটে পৌছাল। একজন সওদাগর সেই নৌকা থেকে নেমে দয়ানিধিকে দেখতে পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'তুমি এখনও বেঁচে আছ? আমরা তাে তােমার সম্পর্কে কত কথা শুনলাম। ওই নৌকা ডুবির পর আর কি কেউ বাঁচতে পেরেছে?’ দয়ানিধি যা যা ঘটেছিল বিস্তারিতভাবে বলল। তার কথা শুনে সওদাগর বন্ধুটি বলল, 'তােমার দেশত্যাগ করার পর দেশে অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমরা যাকে রাজা মনে করতাম সে তাে আসলে ছিল এক বিরাট সম্রাটের অধীনস্থ রাজা। সম্রাট তার লােভ তার অত্যাচার সম্পর্কে গােপনে সব জানতে পারল। তারপর তাকে একদিন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করল। সেই সম্রাট তােমার মতাে যাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল সব শাস্তি মকব করেছে। অতএব তুমি এখন আর দেশদ্রোহী নও। তুমি এখন দেশে ফিরে এসাে। যে ধনসম্পত্তি ওই লােভী রাজা দখল করে নিয়েছিল সে সমস্তই তুমি ফেরত পাবে। আগের মতাে তুমি তােমার সম্পত্তি নিয়ে সুখে জীবনযাপন করতে পারবে। তােমার চিকিৎসালয় আবার চালু করতে পারবে। দেশের মানুষ এখনও তােমায় ভােলেনি। ওরা তােমার কথা বলে। চল, আমার নৌকায় ফিরে চল দেশে।'
দয়ানিধি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে সওদাগরের সব কথা শুনল। দেশের কথা। দেশের মানুষের কথা। তারপর দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, 'না বন্ধু এই দ্বীপ ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যাব না। দাঁড়াও, তােমার খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'
সওদাগর বন্ধুটি দয়ানিধির কথা শুনে ভাবল, নৌকাডুবির ফলে দয়ানিধির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তা না হলে কি আর দয়ানিধি নিজের দেশে ফিরে যেতে চাইত না? ধনসম্পত্তি ফেরত পেতে চাইত না?
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, দয়ানিধি তাে সহজেই দেশে ফিরে যেতে পারত? অগাধ ধনসম্পত্তি নিয়ে শেষের জীবনটা সুখেই কাটাতে পারত। এত বড়াে সুযােগ পেয়েও কেন সে ফিরে গেল না? সে কি নিজের দেশকে ভালােবাসত না? আদিবাসীদের ওই অসভ্য জীবনযাত্রা রাতারাতি তার এত ভালাে লেগে গেল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘দয়ানিধির ধনসম্পত্তি বা সুখী জীবনের প্রতি টান ছিল না। তার জীবনে যে দুঃখদুর্দশা এল তার মূলে ছিল ধনসম্পত্তি। একমাত্র রােগীদের রােগ সারিয়ে সে আনন্দ পেত। ওর ধনসম্পত্তি যে রাজা দখল করে নিয়েছিল সে রাজা মারা গেলেও যেসব বৈদ্যরা তার বিরােধী ছিল তারা তখনও বর্তমান ছিল। যেসব ধনী দয়ানিধির বিরুদ্ধে ছিল তারাও বহাল তবিয়তে সেই দেশে বেঁচে ছিল। তাই তার মাতৃভূমি তার মনের ভূমি ছিল না। তাই দেশের মাটি তাকে টানতে পারেনি। অপর পক্ষে আদিবাসীদের মধ্যে কোনাে ধনী-গরিব ছিল না। সে যাদের রােগ সারাত তারা দু-হাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করত। সেই দ্বীপে কোনাে রাজা ছিল না। কোনাে সম্রাটের অধীনে ছিল না সেই দ্বীপ। ওখানকার মানুষ যে যতটা পারে পরিশ্রম করত। ফল যা পেত ভাগ করে খেত। এসব দয়ানিধির ভালাে লেগেছিল। তাই দয়ানিধি ওই দ্বীপেই রয়ে গেল। ' রাজার এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল ওই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন