ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছােড়বান্দা রাজা বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতােই নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটা দিলেন। তখন শব থেকে বেতাল বলল, 'মহারাজ আপনি কোনাে অপরাধ না করে এইভাবে কষ্ট করছেন; এই জগতে কোনাে আক্রমণ করেনি এমন লােককেও আক্রান্ত হতে হয় এক-এক বার। উদাহরণস্বরূপ আপনাকে যজ্ঞ সুন্দরের কাহিনি বলছি। বিরক্ত না হয়ে শুনুন। বেতাল শুরু করল :
যজ্ঞস্থল নামে এক গ্রামে যজ্ঞ সুন্দর নামে এক ধনী ব্রাহ্মণ ছিলেন। ওঁর হরি সুন্দর এবং দেব সুন্দর নামে দুই ছেলে ছিল। ওই ছেলেদের কৈশাের পেরােতে-না-পেরােতেই যজ্ঞ সুন্দরের সমস্ত অর্থ খরচ হয়ে গেল। তারপর তার স্ত্রী মারা গেলেন। এবং পরে তিনিও মারা গেলেন।
এইভাবে যজ্ঞসুন্দরের ছেলেরা অভিশপ্ত জীবন পেল। অনাথ হয়ে গেল। তাদের আত্মীয়স্বজনরা তাদের এড়িয়ে যেতে লাগল। অবশেষে ভিক্ষে করা ছাড়া ওদের সামনে আর অন্য কোনাে পথ খােলা ছিল না।
ওদের মামার বাড়ি অনেক দূরে। তা সত্ত্বেও নিজেদের গ্রামে থাকতে না পেরে ওরা মামার বাড়ির গ্রামের দিকে রওনা দিল। অনেক পথ। পথে ভিক্ষে করতে করতে তারা এগােতে লাগল। ওই গ্রামে পা রেখেই জানতে পারল যে ওদের দাদু-দিদিমা মারা গেছেন। তবু, তাদের মামারা যজ্ঞদেব এবং কৃতদেব তাদের যথেষ্ট আদরযত্নে রেখে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে লাগল।
কিছুদিনের মধ্যে ওদের অবস্থাও পড়ে যেতে লাগল। ওরা ভাগনেদের বলল, 'ওরে ভাগনেরা, গােরু ছাগল চরাতে যে লােক রেখেছিলাম তাদেরও আর পুষতে পারছি না। এক কাজ কর, তােমরাই চরাও।
দুঃখে বাচ্চাদের গলা ধরে এল। অন্য কোনাে উপায় না থাকায় তাতেই ওরা রাজি হয়ে গেল। প্রত্যেক দিন গােরু ছাগল চরাতে নিয়ে যেত আর সন্ধের সময় নিয়ে ফিরত। এইভাবে ওদের দিন কাটছিল। একদিন একটা গােরু বাঘে নিয়ে গেল। আর একদিন একটা ছাগল চোরে নিয়ে পালাল। অবস্থা যখন খারাপ তখন গােরু ছাগল হারিয়ে মামারা ভাগনেদের উপর চটেছিল এমন সময় আরও মারাত্মক কাণ্ড ঘটে গেল। মামারা যে গােরু এবং পাঁঠাকে যজ্ঞের কাজের জন্য রেখেছিল, একদিন ওই দুটোই হারিয়ে গেল।
'এটা লক্ষ করে ভাগনেরা আর কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ বাকি গােরু ছাগল নিয়ে বাড়ি ফিরে ওদের যথাস্থানে রেখে ওই দুটোকে খুজতে বেরুলাে। বনে অনেক দূরে যাওয়ার পর ওদের নজর পড়ল ওই পাঁঠার একটা অংশের উপর। ওই পাঁঠাটার অর্ধেক বাঘে ফেলে গেছে।
‘এটা আমাদের মামার যজ্ঞের পাঁঠা। এটাও বাঘের পেটে গেছে জানতে পারলে মামারা তেলেবেগুনে চটে যাবে। এটাকে পুড়িয়ে যতটা পারা যায় খেয়ে বাকিটা নিয়ে কোথাও চলে যাওয়া ভালাে। দুই ভাই ওখানেই আগুন ধরিয়ে বাঘের ফেলে যাওয়া পাঁঠাটার অংশকে পােড়াতে লাগল।
ইতিমধ্যে ভরা দুপুরে গােরু ছাগলের ঘরে ফেরা দেখে মামারা ভাগনেদের উপর ভীষণ চটে গেল। ওদের খোঁজে বেরিয়ে বনে এসে দেখে বলল, 'যজ্ঞের জন্য রাখা পাঁঠাটাকে মেরে খাচ্ছিস! তােরা ব্রহ্মরাক্ষস হয়ে যা!’ বলে অভিশাপ দিল মামারা।
মামাদের অতদূর থেকে দেখতে পেয়েই দুই ভাই টেনে ছুটতে লাগল। ওরা ছুটতে ছুটতেই অভিশপ্ত হল। ব্রহ্মরাক্ষসে রূপান্তরিত হল।
ওরা বনে বাদাড়ে ব্রহ্মরাক্ষস হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। একবার এক যােগীকে ওরা খেতে গেল। সেই যােগীর অভিশাপে ওরা পিশাচ হল।
ওরা পিশাচ হয়ে দিন কাটাচ্ছে। এমন সময় একদিন ওরা এক ব্রাহ্মণের গােরু পােড়ানাের চেষ্টা করল। তখন ওই ব্রাহ্মণ ওদের চণ্ডাল হওয়ার অভিশাপ দিল। তারপর, ওরা বল্লম আর তির-ধনুক নিয়ে চণ্ডালদের মতাে ঘুরতে ঘুরতে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে অবশেষে এক ডাকাতদের গ্রামে পৌঁছে গেল। পাহারায় যারা ছিল তারা ওই দুই ভাইকে ধরে মেরে বেঁধে নিয়ে গেল তাদের নেতাদের কাছে।
ডাকাতদের নেতা ওদের কথা শুনে ওদের বাঁধন খােলার হুকুম দিল। ওদের খাইয়ে বলল, 'তােমরাও আমাদের সঙ্গে থাক। তােমাদের কোনাে ভয় নেই।' বলে ওদের প্রতি সমবেদনা জানাল।
তারপর থেকে ওই দুই ভাই, হরি সুন্দর এবং দেব সুন্দর ডাকাতদের সাথে থেকে চুরি ডাকাতি করে নিজেদের যােগ্যতাবলে একদিন ডাকাতদের নেতা হয়ে গেল।

তার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘সামাজিক ধর্মবােধের মধ্যে স্বার্থ আছে। ওই স্বার্থ বুদ্ধিই যেখানে আসন গেড়ে বসে থাকে সেখানে মানুষ স্বার্থ বুদ্ধি দিয়েই সব কিছুর বিচার করে। স্বার্থবাদীরা নিজেদের স্বার্থের কথাই বেশি করে ভাবে। যজ্ঞ সুন্দরের ছেলেদের কপালে যে এত দুঃখকষ্ট জুটল তার মূল কারণও তাই। মামারা যে ভাগনেদের ভালােবাসত না তা নয় কিন্তু তাদের স্বার্থ হানি হওয়ার সাথে সাথে ওরা ভাগনেদের উপর ভয়ংকর হয়ে উঠল। অভিশাপ দিল। দুই ভাই ব্রহ্মরাক্ষস হয়ে গেল। যােগী ওদের পিশাচ, আর ব্রাহ্মণ ওদের চণ্ডাল হতে যে অভিশাপ দিল তা ওদের শাপে বর হল। ব্রহ্মরাক্ষসের চেয়ে পিশাচ ভালাে, পিশাচের চেয়ে চণ্ডাল ভালাে। এরপর আসে ডাকাতদের কথা। ওরা একসাথে থাকে। ওদের মধ্যে একজনের স্বার্থের কোনাে ব্যাপার নেই। দলের স্বার্থই বড়াে। যজ্ঞ সুন্দরের ছেলেরা চোর ডাকাতদের সাথে চুরি ডাকাতি করে সুখেই ছিল।' বললেন বিক্রমাদিত্য।
রাজা উত্তর দিতেই বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন