ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে ফিরে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, তুমি যে পরিশ্রম করছ তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু মনে রেখাে রাজ্য শাসন করা এর চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রমের। উদাহরণস্বরূপ আমি এক যুবরাজের কাহিনি তােমাকে শােনাচ্ছি, শুনলে তােমার পরিশ্রম লাঘব হবে।
বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে যবন দেশে এক সুন্দর রাজ্য ছিল। সেই দেশের রাজাকে প্রজারা আদর্শ রাজা বলে মনে করত।
তার শাসনকালে দেশবাসী অত্যন্ত সুখে ছিল। সেই রাজার ছিল দুটো ছেলে রাজার ইচ্ছে হল তার মৃত্যুর পরও দেশে ভালাে শাসন যেন থাকে। প্রজারা যেন এখনকার মতােই সুখে থাকে। রাজার ইচ্ছে হল তার দুই ছেলের মধ্যে। ভালাে শাসনকার্য চালানাের জন্য উপযুক্ত ছেলে যে কে, তা একবার যাচাই করে দেখা। তাই সে ঠিক করল তার দুই ছেলের মধ্যে প্রজারা কাকে চায় তা নির্বাচন করার ভার প্রজাদের হাতেই তুলে দেবে। প্রত্যেক বছর নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রজাদের মধ্যে রাজার ছাপ দেওয়া পত্র বণ্টন করা হবে। নির্বাচনের দিন প্রত্যেক গ্রামে দুটো করে বাক্স থাকবে। তার মধ্যে একটা বাক্স হবে বড়াে রাজকুমারের, অন্যটা ছােটোর। প্রজারা নিজের ইচ্ছেমতাে গােপনে সেই মুদ্রাঙ্কিত পত্র যেকোনাে বাক্সে পুরে দেবে।
কিন্তু কোন বাক্স যে কার তা চেনা যাবে কী করে? ঠিক হল এক-একটা বাক্সে এক-এক ধরনের চিহ্ন অঙ্কিত থাকবে। প্রথম নির্বাচনের সময় বড়াে রাজকুমারের বাক্সের উপর সিংহের চিহ্ন আঁকানাের ব্যবস্থা হয়েছিল।
নির্বাচনের আগে রাজা দুই কুমারকে অনুমতি দিল দেশে ঘুরে ঘুরে নিজেদের বক্তব্য প্রচার করতে।
বড়াে রাজকুমার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে প্রচার করল যে সে রাজা হতে পারলে দেশে চাষ-আবাদের সুবিধে করে দেবে, জলসেচের সুবিধে করে দেবে, পুকুর খোঁড়াবে, প্রজাদের জীবিকার উন্নতি ঘটাবে। আর প্রত্যেক গ্রামে হাসপাতাল ও পাঠশালা তৈরি করবে। তার বাবা জনতাকে সুখে রাখার জন্য যেভাবে কাজ করে থাকে সে-ও সেইভাবে কাজ করে যাবে।

দ্বিতীয় রাজকুমার প্রজাদের কাছে অন্য কথা প্রচার করল। সে বলল সে আশপাশে কোনাে শত্রু-রাজাকে রাখবে না। ওদের পরাজিত করে ওদের রাজ্য কেড়ে নেবে। নিজের রাজ্যের বিস্তার করবে। এইভাবে রাজ্যের যশ বৃদ্ধি করবে।
যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে নির্বাচন হল। দেখা গেল দেশবাসী বড়াে রাজকুমারকেই পছন্দ করে।
ছােটো রাজকুমার বাবাকে বলল, 'আপনি আমার বাক্সে যদি সিংহের চিহ্ন আঁকিয়ে দিতেন তাহলে দেশবাসী আমাকেই বেশি পছন্দ করত। দাদা যে সবার সমর্থন পেয়েছেন তার কারণ ওই চিহ্ন।'
‘ওরে পাগলা, চিহ্নে কী এসে যায়! তােমার দাদা প্রজাদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাতেই প্রজারা তােমার দাদাকে পছন্দ করেছে। বেশ তাে, তােমার যদি ইচ্ছে হয়, আগামী বছর তােমার বাক্সে সিংহের চিহ্ন আঁকা হবে। তখন বুঝতে পারবে কার জয় হবে।' রাজা ছােটো রাজকুমারকে ভালােভাবে বুঝিয়ে বলল।
নির্বাচনে জয়লাভ করে বড়াে রাজকুমার এক বছর রাজত্ব করল। নির্বাচনের আগে প্রজাদের কাছে সে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। প্রজারা তার শাসনে খুশি।
এক বছর পরে আবার রাজা নির্বাচনের তােড়জোড় শুরু হয়ে গেল। সে-বছর রাজার নিদের্শমতাে দ্বিতীয় রাজকুমারের বাক্সে সিংহের চিহ্ন আঁকা হল। আগের মতাে সে-বছরও দুই রাজকুমার সারা দেশে ঘুরে ঘুরে নিজের নিজের কথা প্রচার করতে লাগল।
নির্বাচন হয়ে গেল। প্রজারা সে-বছর দ্বিতীয় রাজকুমারকে নির্বাচন করল। দ্বিতীয় রাজকুমার সিংহাসনে বসে আশেপাশের দেশের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ করল। বিভিন্ন পেশায় যারা জড়িত তাদের টেনে নিল সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়ােজনীয় জিনিস তৈরি করার কাজে। খেতখামারের অসুবিধাগুলাে দেখার জন্য লােক রইল না। বিরাট এক সর্বনাশের আগেই আবার নির্বাচন এসে গেল।
রাজ সেই বছর সিংহের চিহ্ন বড়াে রাজকুমারের বাক্সে লাগাতে চাইল। কিন্তু দ্বিতীয় রাজকুমার কিছুতেই তাতে রাজি হল না।
বড়াে রাজকুমার রাজাকে বলল, 'ন্যায়সংগতভাবে সিংহের চিহ্ন এ বছর আমারই পাওয়া উচিত।'
তখন রাজা বড়াে রাজকুমারকে কাছে ডেকে বুঝিয়ে বলল, 'ওরে পাগলা, চিহ্নে কী এসে যায়? প্রথমবারে দেশবাসী নির্বাচনে তােমাকেই নির্বাচিত করেছিল। কারণ ওদের ধারণা ছিল সিংহাসনের তুমিই উত্তরাধিকারী। কিন্তু দ্বিতীয় বার ওদের ইচ্ছে হল ছােটো রাজকুমারের হাতে শাসন ক্ষমতা দিয়ে একবার পরখ করে দেখার। এখন ওরা দুই রাজকুমারেরই শাসন দেখে নিয়েছে। আর চিহ্ন নিয়ে মাথা ঘামানাের কোনাে দরকার নেই। আমার ধারণা এ-বছর প্রজারা তােমাকেই বেছে নেবে। আর যাই হােক প্রজাদের অত বােকা ভেব না।'
বাবার কথা মন দিয়ে শুনে বড়াে রাজকুমার চিহ্ন নিয়ে মাথা ঘামালাে , আর এ-বিষয়ে কোনাে কথাও সে বলল । ফলে সেবারেও সিংহের চিহ্ন পেল দ্বিতীয় রাজকুমার।

তৃতীয় নির্বাচনেও দ্বিতীয় রাজকুমারেরই জয় হল। তৎক্ষণাৎ রাজা দেশটাকে দু-ভাগ করে দুই রাজপুত্রের মধ্যে ভাগ করে দিল। আর নিজে সন্ন্যাসীর পােশাকে মঠে চলে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, এখন আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে। তৃতীয়বারের নির্বাচনেও প্রজারা কেন অযােগ্য দ্বিতীয় রাজকুমারকে নির্বাচন করল? রাজা তাে শুধু বড়াে রাজকুমারকে রাজত্ব দিতে পারত। রাজ্যটাকে ভাগ করতে গেল কেন? আর সন্ন্যাসীর পােশাক পরেই-বা মঠে চলে গেল কেন? আমার এই প্রশ্নের সমাধান জানা সত্ত্বেও যদি না জানাও, তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
তারপর বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘প্রজারা শুধু ভালাে শাসন কাকে বলে তাই জানত। খারাপ শাসনের ফলে যে কি হয় সে ব্যাপারে তাদের কোনাে অভিজ্ঞতা ছিল না। ওদের কাছে সিংহ চিহ্ন ভীষণভাবে ভালাে লেগে গেল। মনে হয় যেন ওই সিংহ চিহ্নের জন্যই ছােটো রাজকুমার বার বার নির্বাচিত হয়ে যেত। এই ধরনের একটা আশঙ্কা করেই রাজার মাথা ঘুরে গেল। রাজার যে ধারণা ছিল। প্রজারা বােকা নয়, সে ধারণা তার বদলে গেল। তার মনে হল জনতা যে কী চায় তা বড়াে রাজকুমারের চেয়ে ছােটো রাজকুমার বেশি বুঝেছে। এহেন ছােটো রাজকুমারকে একেবারে রাজত্ব না দিয়ে বঞ্চিত করা ভুল হবে। আবার বড়াে রাজকুমারকে বঞ্চিত করা অন্যায় হবে ভেবে রাজা রাজ্যকে দু-ভাগ করে দুই রাজকুমারকে দিয়ে দিলেন। তারপর তার আর ইচ্ছে করল না এই রাজ্য শাসন পদ্ধতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখার। কারণ তার ধারণা হল, সুশাসন বলতে কী বােঝায় তা তিনি প্রজাদের মধ্যে ভালােভাবে প্রচার করতে পারেননি। কুশাসনের বিরুদ্ধে প্রজাদের মুখর হতে শেখাননি। এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।'
রাজা বিক্রমাদিত্যর মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন