ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজা বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে গাছের উপর থেকে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, ‘রাজা, লক্ষ্যে পৌঁছানাের জন্য তুমি আপ্রাণ চেষ্টা করছ বটে, তবে মনে রেখ, অনেক সময় শত চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ আমি তােমাকে অমরধ্বজের কাহিনি শােনাব। শুনে আনন্দ পাবে এবং পথা চলার শ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল তার কাহিনি শুরু করল :
অমরাবতী নগরের যুবরাজ একবার শিকার করতে করতে গভীর অরণ্যে চলে গেল। শিকারি হিসেবে যুবরাজ অমরধ্বজের খুব নাম ছিল। কিন্তু সেদিন তার শিকার করা হয়ে উঠল না। এক অরণ্যকন্যার অপরূপ রূপ দেখে সে অবাক হয়ে গেল। তার মন পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তার মন যখন পেল তখন বাধা দিল এক অরণ্যযুবক। তাকে পরাজিত করে, একরকম জোর করে, ওই অরণ্যকন্যাকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরল যুবরাজ অমরধ্বজ।
অরণ্যকন্যাকে যুবরাজ অমরধ্বজ বিয়ে করল।
কিন্তু অরণ্যকন্যা রাজ পরিবারের কোনাে কিছুর সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তাই কোনাে মানুষ অথবা জিনিসের সঙ্গে সে খাপ খাওয়াতে পারছিল না। সে যে পরিবেশে বড়াে হয়েছে তার সঙ্গে রাজ পরিবারের কোনাে মিল নেই। তাই পদে পদে তাকে এক অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছিল। ফলে বাইরের কারও সঙ্গে তার আলাপ হত না। তার এই বন্দি জীবনের একমাত্র সাথী তার স্বামী যুবরাজ অমরধ্বজ। তাই, অরণ্যকন্যা চাইত যুবরাজ যেন সবসময় তার কাছে থাকে। সে সহজে অমরধ্বজকে কোথাও যেতে দিতে চাইত না।
যুবরাজ অমরধ্বজ রাজা হল। রাজা হয়ে সবসময় অরণ্যকন্যার কাছে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হত না। তার ফলে অরণ্যকন্যার সঙ্গে তার সূক্ষ্ম বিরােধ দেখা দিল। তবু অমরধ্বজ ধৈর্য ধরে আশা করত, অরণ্যকন্যা একদিন-না-একদিন রানি হিসেবে চলবে। তার আচার-আচরণে রানির ভূমিকা ফুটে উঠবেই।

এমন সময় অরণ্যকন্যা আলােচনার ঘরে ঢুকে রাজার হাত ধরে টানল।
এই অবস্থা দেখে মন্ত্রী ও সেনাপতি অবাক হয়ে গেল। কিন্তু রাজার সামনে কেউ কোনাে কথা বলল না। রাজা খুব অপমান বােধ করল। কিন্তু নিরুপায়। ওই সভা ছেড়ে রাজাকে উঠতেই হল। সেদিন রাজা অমরধবজ মনের রাগ আর চেপে রাখতে পারল না। অরণ্যকন্যাকেও রেগে গিয়ে বলল, 'এতদিন আমি চেষ্টা করছিলাম তােমাকে বদলানাের। তােমার মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু আজ তুমি যা করলে তাতে আমার সমস্ত আশা ধুলােয় মিশে গেছে। তােমাকে অরণ্য থেকে ভালােবেসে এই রাজপ্রাসাদে এনে খুব ভুল করেছি। তােমাকে পরিবর্তন করার, তােমার মধ্যে রানির গাম্ভীর্য আনার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি পারিনি। বিফল হয়েছি।'
অরণ্যকন্যা রাজার কথাগুলাে হাঁ করে শুনছিল। সব কথা সে ঠিক বুঝতে পারছিল না। সে বুঝতেই পারল না তার উপর রাজা কেন এত রেগে গেল। রাজার এত রাগ সে কোনােদিন দেখেনি।
তারপর থেকে রাজা অমরধ্বজ সারাদিন রাজ কাজে জড়িয়ে থাকত। শুধু রাত্রে অন্দরমহলে রাজা আসত। রাত্রেও রাজার ভালােভাবে ঘুম হত না । সবসময় শত্রুকে কীভাবে পরাজিত করা যায় সেই চিন্তা করত।

রাজা অমরধ্বজ শত্রুকে পরাজিত করল। যুদ্ধ শেষ করার পর রাজার নজর পড়ল রানির উপর। লক্ষ করল রানির শরীর ভীষণ ভেঙে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই অমরধ্বজ জানতে পারল যে রানি গর্ভবতী।
প্রত্যেক বছর অমরাবতীতে দুর্গা পূজার সময় সারা দেশে ঘটা করে উৎসব হত। এই উৎসবের সময় নানা ধরনের প্রতিযােগিতা ও প্রদর্শনী হত। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল অমরধ্বজের হাতি মারা। অমরধ্বজ মস্ত বড়াে পাথরের গদা দিয়ে হাতিকে আক্রমণ করত এবং মেরে ফেলত। যে পাথরের গদা তুলে অমরধবজ হাতিকে মেরে ফেলত সে গদাটা ছিল খুব ভারী। অমরধ্বজ ছাড়া আর কেউ ওই পাথরের গদা তুলতে পারত না।
সে বছর অমরধ্বজ প্রদর্শনীর জায়গায় রানিকে নিয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ লােক ওই প্রদর্শনী দেখার জন্য এসেছিল। অত লােক দেখে অরণ্যকন্যা রাজাকে বলল, 'আমরাও এই ধরনের প্রদর্শনী করে থাকি তবে এত লােক হয় না।'
‘এত লােক যে এসেছে তার একটা কারণ আছে। ওরা সব আমার প্রদর্শনী দেখতে এসেছে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে এমন এক কাণ্ড করব যা তুমি কোনােদিন দেখােনি।' অমরধ্বজ বলল।
রাজা অমরধ্বজ আসরে নাবার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষ জয়ধ্বনি করে উঠল। রাজা মস্তবড়াে এক পাথরের গদা তুলল। গদা দিয়ে রাজা অমরধ্বজ হাতিটাকে মেরে ফেলল। সমস্ত দর্শক আনন্দে অনেকক্ষণ ধরে হাততালি দিতে লাগল। লক্ষ লক্ষ মানুষের হাততালি ও হর্ষধ্বনিতে গােটা অঞ্চল গম গম করতে লাগল। চারদিক থেকে রাজা অমরধ্বজের উপর অজস্র ফুল ঝরে পড়তে লাগল। ঠিক সেইসময় রাজা অমরধ্বজ একবার রানির দিকে তাকাল। দেখল রানি শুধু হাসছে। রাজা কিছুটা অবাক হয়ে তার কাছে এসে বলল, ‘হাসছ কেন?’
‘ভাবছি তুমি এমন কোন বড়াে কাজ করেছ যে এত লােক হাততালি দিচ্ছে আর ফুল ছুঁড়ছে?’ অরণ্যকন্যা বলল। ‘ওই পাথরের গদা আমি ছাড়া এখানকার কেউ তুলতে পারে না। আমি যে ওটাকে সহজেই তুলতে পেরেছি তাই নয় অতবড়াে হাতিটাকে গদা দিয়ে মেরে ফেলেছি।
‘ওই পাথরের গদা কেউ তুলতে পারে না বলছ? যদি পারে কী হবে তাহলে?’ অরণ্যকন্যা বলল।
‘যে ওই পাথরের গদা তুলতে পারবে তাকে আমি আমার রাজ্য দিয়ে দেব।' বলল রাজা।
অরণ্যকন্যা হাসতে হাসতে বলল, 'এই পাথরের গদা তাে আমার বাপের বাড়ির দেশের যেকোনাে লােকই তুলতে পারে।'
'তাই নাকি? তাই যদি হয় তাহলে তুমি এক্ষুনি তােমার বাপের বাড়ি ফিরে গিয়ে তাকে নিয়ে এসাে। আমার সামনে ওই পাথরের গদা যদি তুলতে পারে তাহলে আমি তাকে আমার রাজ্য দিয়ে দেব। আর একটা কথা, যদি না আনতে পার তাহলে তুমিও আর আসবে না।' অমরধ্বজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল।
রাজা লােকলস্কর দিয়ে রানিকে সােজা অরণ্যে, তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।
পরের বছর দুর্গা পূজার সময় রাজা ভেবেছিল অরণ্যকন্যা লােক নিয়ে আসবে কিন্তু এল না। এইভাবে প্রত্যেক বছর দুর্গা পূজার সময় প্রদর্শনী হত, রাজ ভাবত অরণ্যকন্যা লােক নিয়ে আসবে কিন্তু কাউকে দেখতে পেত না। এক বছর দু-বছর করে পনেরােটি বছর কেটে গেল। পনেরাে বছর পরে সে বছরও যথারীতি প্রদর্শনী হল। রাজার গদা দিয়ে হাতিকে মেরে ফেলার পর এক তরুণ হঠাৎ বেরিয়ে এসে রাজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মহারাজ ওই গদাটাকে আমি তুলে দেখাব?’
অমরধ্বজ বলল, 'দেখ, তুলতে পারলে তােমাকে আমার রাজ্য দিয়ে দেব।'
হঠাৎ ওই অরণ্যযুবক পাথরের গদাটা ধরে তুলে ঘােরাতে লাগল। ছেলেটার শক্তি দেখে রাজা অবাক হয়ে গেল। তখন ওই অরণ্যকন্যা ভিড়ের ভেতর থেকে এগিয়ে এসে বলল, বলেছিলাম না আমার বাপের বাড়িতে এই গদা তােলার মতাে লােক আছে, তার প্রমাণ দিলাম।' তখন রাজা অমরধ্বজ অরণ্যকন্যাকে চিনতে পেরে তাকে ও পুত্রকে নিয়ে অন্দরমহলে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অরণ্যকন্যা তাে বলেছিল, ওই গদা তার বাপের বাড়ির সবাই তুলতে পারে। তাহলে পনেরাে বছর দেরি করল কেন? তাহলে কি অরণ্যকন্যা মিথ্যা কথা বলেছিল? আর রাজাই-বা। পনেরাে বছর যার খোঁজ করল না তাকে আবার রানি হিসেবে গ্রহণ করল কেন? রাজা কি এত বছর রানির অপেক্ষা করছিল ? এইসব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নগুলাের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘অরণ্যবাসীরা মিথ্যা কথা বলে না। অন্যদের শক্তির প্রশংসা করার ক্ষমতা তাদের থাকে। তাই অরণ্যকন্যা মিথ্যা কথা বলেনি। বাপের বাড়ি গিয়ে সে ভেবে দেখল যেকোনাে লােককে নিয়ে গেলে সে পাথর তুলতে পারবে বটে তবে তার স্বামী রাজা থাকবে না। তাকে রাজত্ব হারাতে হবে। বাপের বাড়ির লােক রাজা হবে আর তার নিজের স্বামী রাজা থাকবে না এটা তার কাম্য ছিল না, তাই সে নিজের ছেলে যতদিন না বড়াে হয়েছে ততদিন অপেক্ষা করেছে। উদ্দেশ্য তার স্বামীর পরে যেন তার ছেলেই রাজা হয়। অন্যদিকে রাজা অমরধ্বজও খুশি। তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন রাজত্ব করে যেতে পারবেন আর তার পরে তারই ছেলে রাজা হবে। সিংহাসনে অন্য কারও বসার সুযােগ নেই। এই আনন্দে রাজা অমরধ্বজ স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে গেলেন।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল ওই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন