শাসক

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার সেই শমীবৃক্ষের কাছে গিয়ে, গাছে উঠে, শব নাবিয়ে, শব কাঁধে ফেলে নীরবে শ্মশানের দিকে এগােতে লাগলেন। শবে স্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা তুমি জনতার প্রশংসা পাবার আশায় এই মাঝরাতে এত পরিশ্রম করছ কিন্তু মনে রেখ জনতা অত তাড়াতাড়ি প্রশংসা করে না। বরং অনেক সময় যা-তা মন্তব্য করে, নিন্দেও করে। প্রমাণ স্বরূপ আমি তােমাকে হিমশেখরের কাহিনি বলছি, শুনলে তােমার পরিশ্রম লাঘব হবে।'

বেতাল বলল : প্রাচীনকালে সুবর্ণদেশে হিমশেখর নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। জনতাকে সুখে রাখার জন্য তিনি সদা ব্যস্ত ছিলেন। কোন কাজ করলে যে প্রজাদের সুখ বৃদ্ধি হবে, আনন্দ বাড়বে সেই কাজ করার জন্য তিনি আগ্রহী থাকতেন। দেশের নানান স্থানে তিনি কূপ এবং পুকুর খনন করালেন, রাস্তা বানালেন, রাস্তার ধারে গাছ পোঁতালেন, এ ছাড়া সরাইখানা ও মন্দির নির্মাণ করালেন। বড়াে বড়াে ফুলের বাগানও তৈরি করালেন। এই ধরনের অনেক কাজ করার পরেও তিনি ভাবতেন আর কোন কাজ করা যায়, আর কী করলে দেশবাসীর সুবিধা হবে।

একবার হিমশেখর গুপ্তচরদের মাধ্যমে খবর নেবার চেষ্টা করলেন, দেশের মানুষ তার কাজ সম্পর্কে কী ভাবছে তা জানবার। গুপ্তচররা বলল, 'মহারাজ, জনতা ভাবছে আপনার শাসনে তাদের আর কোনাে কিছুর অভাব রইল না। আপনার শাসনে সুবর্ণর্দেশ পৃথিবীর স্বর্গ হয়ে গেছে। তাই, দেশবাসী আপনার শাসনকাল যাতে হাজার বছর স্থায়ী হয় তারজন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন।'

রাজা গুপ্তচরদের মুখে শুনে ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। নিজের কানে শুনতে চাইলেন দেশবাসীর কথা। তাদের আর কোনাে কিছুর অভাব আছে কি না তা জানার জন্য তার আগ্রহ ছিল প্রবল। তিনি একদিন ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়লেন রাজধানীতে। ঘুরে ঘুরে লােকের কথা তিনি শােনার চেষ্টা করলেন।

রাজা ঘুরে ঘুরে দেখতে পেলেন লােকে যে-যার কাজে ব্যস্ত। তারা যে কী চায় তার কোনাে আলােচনা করছে না। ঘুরে ঘুরে অবশেষে এক জায়গায় দেখতে পেলেন চার পাঁচ জন দেশের কথা আলােচনা করছে। রাজা তাদের কাছে গিয়ে আড়ি পেতে শােনার চেষ্টা করলেন।

তাদের মধ্যে একজন বলল, 'অন্য দেশের লােক আমাদের দেশের সব কিছুর খুব প্রশংসা করছে। ওরা বলছে আমাদের দেশের প্রত্যেকে নাকি এক-একটা রাজা।'

‘ওরা আমাদের রাজার রাজপ্রাসাদ একবার দেখে নিলে আর কোনােদিন ওই ধরনের কথা বলবে না। আমাদের রাজার ভােগ বিলাসের কথা আর কী বলব। কেমন ঠাটে থাকেন। দু-চারটে পুকুর খোঁড়ালেই আমরা সবাই রাজা হয়ে যাব নাকি? রাজারা কেন পুকুর খোঁড়ে, সরাইখানা গড়ে তােলে জানেন? শুধু দেশবাসীর প্রশংসা পাবার জন্য।' অন্য জন বলল।

অন্যেরা মাথা নেড়ে বলল, 'তােমাদের কথাই ঠিক!’

এসব কথা শুনে রাজা মাথা নীচু করে সেখান থেকে চলে গেলেন। রাজা মনে মনে বললেন, দেশবাসী আমার কাজের বিচার এভাবে করছে! আমি শুধু নিজের প্রশংসা পাওয়ার আশাতেই এসব করছি! তাহলে আমি যা কিছু করছি, যে পরিশ্রম করছি, সব বৃথা! আমি তাে দেশবাসীর মনে সুখ এনে দিতে পারিনি। ওদের আনন্দ দিতে পারিনি। অতএব, দেশবাসীর জন্য আর কোনাে কাজ করা উচিত নয়।

কয়েক বছর কেটে গেল। টানা একটি বছর এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়নি। খেতের মাটি শুকিয়ে যেন পাথর হয়ে গেছে। খাদ্যের অভাবে সুবর্ণদেশের মানুষ মরতে বসেছিল। চারদিকে হাহাকার। পথে-ঘাটে মানুষ ধুকছিল।

রাজা দেশবাসীর এই দুরবস্থা আর সহ্য করতে পারলেন না। রাজা ভাণ্ডার উজাড় করে দেশবাসীকে খেতে দিলেন। সমস্ত খাদ্য বণ্টন করলেন। খাজানা থেকে অগাধ ধন খরচ করে দূর থেকে খাদ্য এনে দেশের মানুষকে খাওয়ালেন।

রাজকর্মচারী দেশবাসীর মধ্যে খাদ্য ঠিকমতাে বণ্টন করছে কি না তা নিজের চোখে পরীক্ষা করে দেখার জন্য রাজা ছদ্মবেশে নানান জায়গায় ঘুরতে লাগলেন। এবারে রাজা লােকের মুখে যা শুনে ছিলেন তাতে তিনি অবাক হয়েছিলেন। তিনি শুনলেন, 'আমাদের রাজার মতাে মানুষ কোটিতে একজনও নেই। ইনি শুধু রাজাই নন, আমাদের ভাগ্যেরও বিধাতা।' এই ধরনের ভালাে ভালাে কথা রাজা অনেকের মুখে শুনেছিলেন।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, “মহারাজ, হিমশেখর শুরু থেকেই দেশবাসীর সেবা করে আসছিলেন, প্রথমে লােকে কেন তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করল? পরে তাঁকেই আবার লােকে কেন একেবারে আকশে তুলল? আমার এই প্রশ্নের উত্তর জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে!’

এ-প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বলল, ‘হিমশেখর হয়তাে দেশবাসীর উপকার করেছিলেন। কিন্তু সেই উপকার জনতার কাম্য ছিল না। ওই সব কাজ করে রাজা হয়তাে তাদের চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ করেননি। যার যা প্রয়ােজন থাকে না সে তা পেয়ে ঠিক উপকৃত হয় না। সহজে কোনাে জিনিস পেয়ে কেউ ততটা আনন্দ পায় না। তার মর্ম বােঝে না। কিন্তু আকালের সময়ে মানুষ খাদ্যের অভাবে হাহাকার করছিল। তাদের সেই অভাব অনটনের দিনে রাজা খাদ্য দ্রব্য বণ্টন করায় দেশবাসী দু-হাত তুলে পঞ্চমুখে রাজার প্রশংসা করল। তাকে আকাশে তুলল। এতে আশ্চর্য হওয়ার তাে কিছু নেই।'

রাজার মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সাথে সাথে বেতাল শব নিয়ে পালাল। আবার উঠে বসল সেই শমীবৃক্ষে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%