পুরুষদ্বেষিণী

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে এগােতে থাকেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, তােমার পরিশ্রম দেখে আমার মনে হচ্ছে। তুমিও বিশ্বমিত্রের মতাে কোনাে নারীর হিংসার শিকার হয়ে গেছ। বিশ্বমিত্রের কাহিনি শুনলে তােমার পরিশ্রম লাঘব হবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে শ্রীপুরে বিশ্বমিত্র নামে এক ধনী যুবক ছিল। তার স্বভাব ছিল উদার, মন ছিল প্রশান্ত। কিশাের বয়সেই তার মা-বাবা মারা গেল। ফলে তার নিকট আত্মীয়রা তাকে লালনপালন করে বড়াে করল এবং বিয়ে দিল পাশের গাঁয়ের এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে।

বিশ্বমিত্রের স্ত্রী মিত্রবিন্দু খুব সুন্দরী ছিল বটে তবে ওদের দুজনের মধ্যে বনিবনা ছিল না। কথায় কথায় ওদের দুজনের মধ্যে ঝগড়া লাগত। বিশ্বমিত্র মিত্রবিন্দুর গায়ে হাত দিলে তার মনে হত তার গায়ে যেন সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথম প্রথম বউয়ের আচরণ দেখে তার মনে হত তার বাবা-মা বুঝি জোর করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বমিত্রের এই ধারণা যে ভুল তা সে টের পেল। মিত্রবিন্দু শুধু যে তার স্বামীকেই ঘৃণা করে তাই নয় গােটা পুরুষ জাতিকেই ঘৃণা করে।

একবার কথায় কথায় মিত্রবিন্দু বলল, 'পুরুষ মাত্রেই ভূতের মতাে লেগে থাকে। কোনাে বুদ্ধিমতীর উচিত নয় বিয়ে করা। নেহাত বাবা-মা দুঃখ পাবে তাই, না হলে আমি বিয়ে করতাম না।'

যথাসময়ে মিত্ৰবিন্দুর যমজ সন্তান হল। যমজ সন্তান হওয়ার পরে মিত্রবিন্দুর মনে পরিবর্তন দেখা দেওয়া দূরে থাক সে বিশ্বমিত্রের প্রতি আরও বেশি ঘৃণা পােষণ করতে লাগল। সে খালি ভাবত বিশ্বমিত্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে আরও অসুবিধেয় ফেলতে চায়। সে স্বামীকে দেখেই চটে যা মুখে আসত তাই বলত।

স্ত্রীর কাছ থেকে এতটা রুক্ষ ব্যবহার পেয়ে বিশ্বমিত্র বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ঠিক করল। ভাবল সে বাড়ি থেকে চলে গেলে হয়তাে মিত্রবিন্দুর মনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ভেবে ভেবে শেষে একদিন বিশ্বমিত্র বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

যেতে যেতে অরণ্যের এক প্রান্তে এক সিদ্ধ যােগীর সাক্ষাৎ পেল। সেই যােগী বিশ্বমিত্রকে বলল, 'বাবা, তােমার যদি তাড়া না থাকে আমার কাছে একটু দাঁড়াও। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি দেহত্যাগ করব। কিন্তু তার আগে আমি তােমাকে কামরূপ বিদ্যা দান করে যেতে চাই। এই বিদ্যা শিখে আমার দেহত্যাগের পর এই দেহটাকে পুড়িয়ে তুমি তােমার পথে চলে যাবে।'

বিশ্বমিত্র সিদ্ধ যােগীর কথামতাে কাজ করতে রাজি হল। যােগী খুশি হয়ে বিশ্বমিত্রকে কামরূপ বিদ্যা দান করে প্রাণত্যাগ করল। বিশ্বমিত্র সেখানেই কাঠ সাজিয়ে চিতা তৈরি করে যােগীর মৃতদেহ দহন করল। তারপর বিশ্বমিত্র বিলম্ব না করে শ্রীপুরে ফিরে এল।

বিশ্বমিত্র নিজের গাঁয়ে যখন ফিরল তখন রাত গভীর হয়ে গিয়েছিল। সে তখন কামরূপ বিদ্যার প্রয়ােগ করে নারী রূপ ধারণ করল। নারী রূপ ধরে তার বাড়ির সামনের বাড়ি কড়া নাড়ল। সে বাড়িতে থাকত দেবদত্ত নামে এক যুবক।

দেবদত্তের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেবদত্ত দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অপ্সরা, অপূর্ব সুন্দরী এক যুবতীকে দেখে দেবদত্তের ঘুম ছুটে গেল।

‘আমার নাম সুমিত্রা। আমি দূর দেশ থেকে পথ হারিয়ে এখানে এসেছি। মা-বাবা থাকলে পথ হারাতাম না। কিন্তু আমাদের উপর হঠাৎ ডাকাত দল ঝাঁপিয়ে পড়ায় এই অবস্থায় পড়েছি। ডাকাতরা বড়াে নিষ্ঠুর। আমার বাবা-মাকে আমারই চোখের সামনে মেরে ফেলেছে। আমাকে মেরে ফেললেই পারত। এই রাত্রে আপনাকে বিরক্ত করতাম না। এই রাতের মতাে দয়া করে আপনি আমাকে থাকতে দিন কাল সকালেই চলে যাব।' নারী রূপ ধারণকারী বিশ্বমিত্র বলল।

‘এখানে এসে আপনি ভালাে করেছেন। নিরাপদে থাকতে পারবেন। কোনাে ভয় নেই আপনার। নিশ্চয়ই আপনি থাকুন। রাতটা কাটিয়ে যান। কিন্তু আমি ভাবছি, কাল আপনি কোথায় যাবেন। আবার কোনাে খারাপ খপ্পরে পড়ে যাবেন। এবার হয়তাে ডাকাতরা আপনাকেই ধরে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে আপত্তি না থাকলে আমাকে বিয়ে করতে পারেন।' দেবদত্ত ভদ্রভাবে নিবেদন করল।

সুমিত্রা রাজি হল। পরের দিন শাস্ত্রসম্মত ভাবে দুজনের বিয়ে হল। কিছু দিনের মধ্যেই মিত্রবিন্দু ও সুমিত্রার মধ্যে বন্ধুত্ব হল। সুমিত্রা মিত্রবিন্দুর বাচ্চাদের খুব ভালােবাসত। সবসময় ওই দুটি বাচ্চাকে আদর করত, খেলাত, খাইয়ে দিত। ওই বাচ্চারাও নিজের মার কাছে থাকার চেয়ে সুমিত্রার কাছেই থাকতে বেশি ভালােবাসত।

সুমিত্রা মিত্রবিন্দুকে কথায় কথায় নিজের স্বামী দেবদত্তের কথা বলত। স্বামীর সুখ-সুবিধার দিকে যে সতর্ক দৃষ্টি রাখে সে-কথাও মিত্রবিন্দুকে বলত। সুমিত্রার রূপ ধারণকারী বিশ্বমিত্র লক্ষ করল, মিত্রবিন্দুর মধ্যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে দেখে সে খুশি হল।

একবার মিত্রবিন্দু সুমিত্রাকে বলল, 'তুমি বেশ সুখে আছ। আমি বােধ হয় যা হারিয়েছি তা আর ফিরে পাব না।'

এই কথার জবাবে সুমিত্রা বলল, 'ক-দিন ধরে জিজ্ঞাসা করব করব ভাবছি কিন্তু পাছে তুমি ভুল বােঝাে তাই আমি জিজ্ঞেস করিনি। আচ্ছা এই বাচ্চাদের বাবা কোথায় গেছেন? কবে ফিরবেন?

মিত্রবিন্দুর চোখ জলে ভরে গেল। সে বলল, 'উনি যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন তারজন্য আমিই দায়ী। ফিরবেন কি না কে জানে।'

মিত্রবিন্দু আনন্দে দুঃখে অনুতাপে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল, 'সত্যি আমার জন্য আপনার কষ্টের সীমা নেই। আপনি যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন তারজন্য আমিই দায়ী। আপনি এত কষ্ট করতে গেলেন কেন? ইচ্ছে করলে তাে আপনি আমার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দরীকে বিয়ে করতে পারতেন।’

‘অন্যকে বিয়ে করার ইচ্ছে থাকলে আমি বাড়ি ছেড়ে বনে যেতাম কেন? আমার মনে জিদ চেপেছিল যেকোনাে ভাবে তােমার মনের পরিবর্তন করতে হবে। এখানে থেকে আমি অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি। তাই নিজের উপর বিরক্তি জেগেছিল। চলে গিয়েছিলাম বনে। তারপর যা ঘটল সব তাে বলেছি।' বলল বিশ্বমিত্র।

এর পর থেকে বিশ্বমিত্র ও মিত্রবিন্দু বাকি জীবন একসঙ্গে সুখে কাটাল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, এই বিশ্বসংসারে অনেক জীব আছে। বিশ্বমিত্র অন্য কোনাে রূপ ধারণ না করে একটি নারীর রূপ ধারণ করল কেন? নারীর রূপ ধারণ করে একেবারে নিজের বাড়ির কাছে গেল কেন? অন্য পুরুষের সাহচর্য না পেয়েই মিত্রবিন্দুর মনে পুরুষের প্রতি মতের পরিবর্তন দেখা দিল কেন? এই সব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তবে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'নারী ও পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। পুরুষকে ছেড়ে নারী, নারীকে ছেড়ে পুরুষ যদি থাকে তাহলে তাদের জীবন পূর্ণ হয় না। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত জীবনযাপনের ফলেই সৃষ্টির অনুবর্তন। মিত্রবিন্দুর মনে শুধু যে পুরুষের প্রতি হিংসা বা দ্বেষ ছিল তা নয়। নারীর প্রতিও ছিল। নারীর জীবন তার কাছে একটি বিরক্তিকর জীবন ছিল। তাই সে বিয়ে করতে চায়নি। আর এই কারণেই তার মধ্যে স্ত্রীর জীবনের রােমাঞ্চ অথবা মাতৃত্বের অনুভূতি জাগেনি। বিশ্বমিত্র জানত না যে মিত্রবিন্দু যেকোনাে পুরুষের মতাে যেকোনাে নারীকেও ঘৃণা করে। তাই সে নারীর রূপ ধারণ করে মিত্রবিন্দুর মনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হতে পারেনি। তারপর সে বাচ্চাদের মায়ের মতাে স্নেহ করল, সবসময় মিত্রবিন্দুর কাছে তার স্বামীর গল্প করতে লাগল। এইভাবে আস্তে আস্তে সে মিত্রবিন্দুর মনে নিজের সন্তান ও স্বামীর প্রতি স্নেহ ও ভালােবাসা জাগাতে পারল। দিনের পর দিন চেষ্টা করে সে মিত্রবিন্দুর মন থেকে নারীর প্রতি ও পুরুষের প্রতি ঘৃণার বীজ উৎপাটিত করতে সফল হল।

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ করার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ওই গাছে চলে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%