সাক্ষী

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে এগিয়ে যেতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, সুবুদ্ধি অনেক সময় বিনা কারণে হঠাৎ ভ্রষ্ট হয়। ঠিক সেইরকম দুর্বুদ্ধিও বিনাকারণে পরিবর্তিত হয়ে সুবুদ্ধিতে পরিণত হতে পারে। আমার কথা পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য আমি প্রসূনের কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বেতাল কাহিনি শুরু করল

কোশাম্বি নগরে ধনী পরিবারে প্রসূনের জন্ম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে ব্যবসায়ে মার খেল। চারদিকেই তার ধারদেনা হয়ে গেল। এমন অবস্থায় সে পড়ে গেল যে ছেলে-মেয়ে বউকে খাওয়াতেও পারছিল না। সেই নগরে দীপক নামে আর এক ব্যাবসাদার ছিল। প্রসূনের এই অবস্থা দেখে সে দুঃখ পেল। তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে সে তাকে খাতা লেখার চাকরি দিল।

এইভাবে দিন চলছিল। কিছুদিন পরে দীপকের বাড়িতে চুরি হল। দীপক তার এক চাকরকে সন্দেহ করল। চাকরকে সে খুব মারল। সে ভেবেছিল বেশি মারলে চাকর নিশ্চয় মৃত্যুভয়ে সব স্বীকার করবে। কিন্তু চাকর দোষ স্বীকার করছিল না। শেষে মার খেতে খেতে সে মরে গেল। হঠাৎ চাকরটাকে এভাবে মরে যেতে দেখে সে তার মৃত্যুর জন্য তার অন্য এক চাকর মৈনাকের উপর দোষ চাপিয়ে দিল। এসব কিছুই ঘটল প্রসূনের চোখের সামনে।

যথারীতি রাজার লোক এসে দীপকের চাকরকে হত্যার অপরাধে তৎক্ষণাৎ ধরে নিয়ে গেল। মৈনাক শাস্তি পাওয়ার মুখে বলল, 'চাকরটি যে ঠিক কীভাবে মরেছে তা প্রসূন দেখেছে। আমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষি। প্রসূন যদি বলে আমি দোষী, তাহলে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি।'

খবরটা জানতে পেরে দীপক বুঝল, এখন সব কিছুই নির্ভর করছে প্রসূনের সাক্ষ্যদানের উপর। তাই সে প্রসূনকে বলল, 'তুমি কিন্তু মৈনাককেই দোষী বলে বিচারকের কাছে বলবে। মৈনাক শাস্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তোমাকে প্রচুর টাকা দেব। তুমি ওই টাকা দিয়ে বিরাট ব্যাবসা শুরু করে দিতে পারবে।' প্রসূন মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।

প্রসূন রাজি হলেও তার উপর দীপকের ঠিক বিশ্বাস হল না। সে তার অন্য এক চাকরকে প্রসূনের বাড়িতে পাঠাল তাকে পরীক্ষা করার জন্য। সেই চাকরটা প্রসূনের বাড়িতে গিয়ে তাকে বলল, 'আপনি কত বড়োলোকের ছেলে সামান্য ক-টা টাকার লোভে আপনি মৈনাকের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবেন? আপনি এত বড়ো পাপ কাজ করবেন? রাজা তাকে ফাঁসি দিলে তার কাচ্চাবাচ্চা বউ পথে বসবে।'

'দেখ কোনটা পাপ কোনটা পুণ্য অতশত আমার দেখার দরকার নেই। আমার মালিক যা করতে বলবে তা করাই আমার ধর্ম। তা ছাড়া দুটি কথা মালিকের ইচ্ছামতো বলতে পারলে আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে।' প্রসূন বলল।

চাকর ফিরে গেল। প্রসূনের সঙ্গে যে কথাগুলো হয়েছিল সেই কথা দীপককে জানাল। শুনে সে খুব খুশি হল।

পরের দিন রাত্রে দীপক গেল প্রসূনের বাড়ির দিকে। উদ্দেশ্য প্রসূনের মনের অবস্থা ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখা। দরজার কাছে দাঁড়াইতেই তার মনে হল কোনো এক মহিলা কথা বলছে।

ভেতরে মৈনাকের বউ প্রসূনকে বলছিল, 'আমার স্বামীকে একমাত্র আপনি বাঁচাতে পারেন।'

'আমাকে ক্ষমা করতে হবে। আমি এখন দীপকের চাকর। মালিকের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই চাকরের কর্তব্য।' প্রসূন বলল।

মৈনাকের বউ ভীষণ রেগে গেল। প্রসূনকে গালাগাল দিতে দিতে চলে গেল। পরক্ষণেই দীপক ঘরে ঢুকে প্রসূনকে সানন্দে জড়িয়ে ধরল। মনে মনে দীপক নিশ্চিত যে প্রসূন মৈনাকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

পরের দিন রাজার লোক প্রসূনকে নিয়ে গেল বিচারকের কাছে। মৈনাক আবার রাজার সামনে বলল, 'প্রভু চাকরের মৃত্যুর ব্যাপারে যা যা ঘটেছে তা প্রসূনের চোখের সামনেই ঘটেছে। প্রসূন যদি বলে যে চাকরটাকে আমিই হত্যা করেছি তাহলে আমি মাথা পেতে শাস্তি নেব।'

রাজার নির্দেশে প্রসূন সাক্ষী দিতে দাঁড়িয়ে বলল, মহামান্য রাজা, চাকরের মৃত্যুর জন্য দায়ী একমাত্র দীপক। এই মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে মৈনাকের কোনো সম্পর্ক নেই।'

অগত্যা দীপককে নিজের দোষ স্বীকার করতে হল। পরক্ষণেই তার মৃত্যুদণ্ড হল এবং মৈনাক মুক্তি পেল।

বিক্রমাদিত্য এই প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'প্রসূনের মনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে সত্যবাদী বলেই দীপক বার বার তাকে নানাভাবে পরীক্ষা করছিল। প্রসূন কী করবে তা আগে জানাতে চাইল না। কারণ জানিয়ে দিলেই দীপকের কানে চলে যেত। তখন দীপক নানাভাবে চেষ্টা করবে নিজেকে বিপদ থেকে মুক্ত করার। সে মনের কথা প্রকাশ করেনি। সে মৈনাকের স্ত্রীর কাছেও প্রকাশ করল না। তার আশঙ্কা ছিল মৈনাকের স্ত্রী কোনো কিছু গোপন রাখতে পারবে না। দীপকের তৎক্ষণাৎ অপরাধ মেনে নেওয়ার কারণ একটাই। সে সবচেয়ে বেশি যে চাকরের উপর নির্ভর করেছিল সেই যখন সত্য কথা প্রকাশ করে ফেলল তখন অন্যের উপর নির্ভর করা নিষ্প্রয়োজন ভাবল। তাই সে মেনে নিল।'

রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%