ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে তিনি যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তোমার আশা পূরণ না হওয়ার কারণ হিসেবে তুমি হয়তো ভাবছ তোমার অলৌকিক শক্তি নেই। সেটা কিন্তু ঠিক নয়। মৈত্রেয়ের কাহিনি শুনলে আমি যা বলতে চাইছি তা তোমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমার এই কাহিনি শুনলে পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করে দিল
উজ্জয়িনী নগরের রাজা ছিলেন সুধীর। তাঁর প্রাসাদে বীরদাস নামে এক নামকরা শিল্পী ছিল। মৈত্রেয় নামে তার এক ভাই ছিল। মৈত্রেয় হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করে বহু সিদ্ধপুরুষকে সেবা করে এক অলৌকিক শক্তি অর্জন করেছিল। সেই শক্তি হল শিল্পে প্রাণ সঞ্চার।
মৈত্রেয় তার অলৌকিক শক্তি রাজাকে দেখাতে চাইল। তার দাদাকে দুটো নারীমূর্তি তৈরি করতে বলল। ভরা রাজসভায় সে ওই দুটি নারীমূর্তিতে প্রাণ সঞ্চার করল। তা দেখে রাজা এবং অন্যান্য সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। মহারাজ সুধীর, তারপর মৈত্রেয়কে তাঁর প্রাসাদে থাকতে অনুরোধ করলেন। মৈত্রেয় রাজার অনুরোধে প্রাসাদে থেকে গেলেন। কিছুকালের মধ্যে সুধীর ও মৈত্রেয়র মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠল। একবার সুধীরের ইচ্ছে করল নিজের বিকল্প রূপ ও আকৃতি দেখার। মনের এই ইচ্ছা রাজা সুধীর মৈত্রেয়ের কাছে প্রকাশ করলেন। মৈত্রেয় তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতে রাজি হল।
মৈত্রেয় রাত্রে তার দাদা বীরদাসকে রাজা সুধীরের মূর্তি তৈরি করতে বলল। বীরদাস পাথর দিয়ে সুধীরের মূর্তি তৈরি করল। মধ্যরাত্রে সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে নকল সুধীরকে নিয়ে মৈত্রেয় রাজভবনের দিকে গেল।

তারপর মুখে মুখে আবার প্রচারিত হল যে আসল রাজার মৃত্যু হয়নি, নকল রাজার হয়েছে। এই খবর শুনে প্রজাদের উদবেগ কমে গেল। কিন্তু দেশে দুষ্ট শক্তিগুলো ব্যাপারটাকে ওইখানেই শেষ করল না। ওরা সম্পূর্ণ উলটো ঘটনা প্রচার করল। ওদের প্রচার ছিল, 'আসল রাজাই মারা গেছে। এখন যে রাজা আছে সেই রাজা মৈত্রেয়ের তৈরি নকল রাজা। রাতারাতি হঠাৎ শত্রুর হাতে রাজা নিহত হওয়ায় মৈত্রেয় তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে নকল রাজা তৈরি করল।'
এই প্রচার যারা শুনল তারা সহজে তা অস্বীকার করতে পারল না। কারণ ওরা জানত রাজা সুধীরের সঙ্গে মৈত্রেয়ের সম্পর্ক গভীর ছিল।
শুধু যে প্রজাদের মধ্যেই এই প্রচার ছড়িয়ে পড়েছিল তা নয়, অন্তঃপুরের দাস-দাসী এমনকী রানির মনেও এই প্রচারের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। সকলেরই মনে সন্দেহ ঢুকেছিল।
স্বভাবতই, এই অবস্থা রাজা সুধীরের মনে ব্যথা দিয়েছিল। কীভাবে যে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তা তিনি ভেবে উঠতে পারলেন না। তখন তিনি মৈত্রেয়কে এই সমস্যার সমাধান করতে বললেন। ইতিমধ্যেই মৈত্রেয় এই সমস্যা নিয়ে ভাবছিল। তার সামনে একটিমাত্র উপায় ছিল।
মৈত্রেয় সেদিন রাত্রে তার নিজের চেহারার মতো একটি মূর্তি গড়তে তার দাদাকে বলল। শিল্পী বীরদাস মৈত্রেয়ের মূর্তি তৈরি করল। সেই মূর্তিতে প্রাণ সঞ্চার করে এক রাত্রে মৈত্রেয় গোপনে রাজার সামনে গিয়ে হাজির হল। রাজা সুধীর দুই মৈত্রেয়কে দেখে অবাক হয়ে বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কে যে আসল মৈত্রেয় বুঝতে পারছি না।'

তখন মৈত্রেয় বলল, 'মহারাজ, আমি আসল মৈত্রেয়। আর এটি হল নকল মৈত্রেয়। আপনি কাল প্রকাশ্য রাজসভায় দেশদ্রোহী ঘোষণা করে এই নকল মৈত্রেয়কে মৃত্যুদণ্ড দিন।'
'তারপর তোমার অবস্থা কী হবে?'
'আমি গোপনে হিমালয়ের দিকে পাড়ি দেব মহারাজ।' মৈত্রেয় বলল।
পরের দিন সকালে ভরা রাজসভায় রাজা নকল মৈত্রেয়কে মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে আবার বলল, 'রাজা, মৈত্রেয় যে সমাধান বার করল সেটা যে সঠিক সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অত কষ্ট করে যে অলৌকিক শক্তি অর্জন করেছিল সেই অলৌকিক শক্তি পেয়েও বেচারাকে হিমালয়ে ফিরে যেতে হল কেন? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অলৌকিক শক্তি ব্যবহারিক জীবনে কতটা যে কাজ দেয় তা কেউ বলতে পারে না। আসলে ওইসব শক্তির উপর মানুষের ক্ষমতা থাকে না। যে মৈত্রেয় অত বড়ো অলৌকিক ক্ষমতা পেয়েছিল তার পক্ষে আর চারজনের মতো ঘোরাফেরা করা সম্ভব নয়। সেটা সে টের পেয়েছিল দেরিতে। টের পেয়েই সে আর রাজধানীতে থাকতে পারল না।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন