ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার এলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নাবিয়ে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, এত যে পরিশ্রম করছ শেষে তােমার অবস্থা মধুসূদনের মতাে না হয়ে যায়। সেও বেচারা পরিশ্রম করে গেছে কিন্তু ফল ভােগ করতে পারেনি। আমি এখন তার কাহিনি শােনাচ্ছি। শুনলে তােমার পরিশ্রম লাঘব হবে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল :
সেকালে অমরাবতী গ্রামে মধুসূদন নামে এক চাষি ছিল। তার পরিবারে ছিল তার স্ত্রী ও দুটি ছেলে। চার জনে রাতদিন খেটে-খুটে পেট চালাত।
একদিন বারান্দায় বসে বসে ভাবছিল এইভাবে আমরা সারাজীবন খেটে গেলেও যা পাব তাতে আমাদের শুধু খাওয়া-পরাই জুটবে। এক পয়সা জমানাে যাবে না। একটুও জমি কেনা যাবে না। কোনাে জায়গা থেকে হঠাৎ দুসের সােনা পেয়ে গেলে খুব ভালাে হত। আমাদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা মেটানাে যেত। আমরা খুব সুখে জীবন কাটাতে পারতাম।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে সে একদিন তার বাড়ির ঠাকুরের কাছে গিয়ে বসল। ঠাকুরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে মনে মনে ঠাকুরকে বলতে লাগল, 'ঠাকুর আমাদের অবস্থা কি আর কোনােদিন ফিরবে না ! আমরা কি চিরকালই দিন এনে দিন খাব?’
সে যখন চোখ বন্ধ করে ঠাকুরের সামনে বসে এসব কথা ভাবছিল ঠিক তখনই কোথা থেকে হঠাৎ তার সামনে একটা পোঁটলা পড়ল। সে চমকে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে পোঁটলাটা খুলে ফেলল। তাতে দু-সের ওজনের সােনার অলংকার ছিল। মধুসূদন অবাক হয়ে গেল। এত সােনা! এত অলংকার! তার ধারণা হল তার বাড়ির জাগ্রত দেবতাই ওই সােনার পোঁটলা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে।

মধুসূদন চারদিকে তাকাল কেউ আছে কি না। কেউ নেই। কেউ দেখেনি। বউ রান্নাঘরে। ছেলেরা নেই। সে ওই পোঁটলা নিয়ে নিজেদের নিম গাছের গােড়ায় মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিল ওই পোঁটলা। তারপর ভাবতে লাগল ওই সােনা দিয়ে কী করবে। ছেলে বউকে সােনার ব্যাপারটা বলবে কি না। অলংকার নিয়ে কোথায় বিক্রি করবে, কীভাবে খরচ করবে, কতটা জমি কিনবে, ব্যাবসা করবে কি না, কত সােনা জমিয়ে রাখবে। এক-একটা জিনিস করার কথা ভাবে। সে কাজের সুফল কুফলের কথাও ভাবে। শেষে ওই কুফল বেশি আছে ভেবে সে কাজ বাতিল করে। ঠিক করল যতদিন না ওই সােনা কীভাবে খরচ করবে ঠিক করছে ততদিন অলংকারের কথা ছেলে বউকে জানাবে না।
মধূসূদন মনে মনে নানা কথা ভাবতে ভাবতে পাড়ায় বেরুল। কিছুটা যেতেই সে দেখতে পেল পাড়ায় বহু লােক জড়াে হয়ে দুটো লােককে ধরে প্রচণ্ডভাবে মারধাের করছে। কয়কে জনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে তারা চুরি করেছে। একজন বলল, 'আরে মশাই, দু-সের ওজনের সােনার অলংকার চুরি করেছে এরা মার খাবে না তাে কি রসগােল্লা খাবে? যেমন কর্ম তেমনি ফল।'
কথাটা কানে যেতেই মধুসূদনের বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল। তাহলে, সে যে অলংকার দেবীর কাছ থেকে পেয়েছে সেগুলি কি চুরি করা? তাই যদি হয় তাহলে সে ওই অলংকার কোথায় বিক্রি করবে? খুঁজতে খুঁজতে ওরা যদি নিম গাছের তলা থেকে ওই সােনার অলংকার পেয়ে যায় তাহলে সর্বনাশ। অলংকার তাে যাবেই আর সেইসঙ্গে আমার মানসম্মানও যাবে। ভাবতে ভাবতে সে বিষন্ন মনে বাড়ি গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সােনা পাওয়ার ব্যাপারটা তার কাছে স্বপ্নের মতাে লাগল। সে ছুটে গিয়ে নিম গাছতলা খুঁড়ে পোঁটলা আছে কি না দেখে নিল। না স্বপ্ন নয়। এই তাে অলংকার। তারপর থেকে মধুসূদনের মাথায় সবসময় দুশ্চিন্তা জাকিয়ে বসেছিল। রাত্রে ঘুম হত না। সারারাত স্বপ্ন দেখত। স্বপ্নে সে চমকে উঠত, চিৎকার করে উঠত। রাত্রে ঘুম না হওয়ায় তার। খিদে হত না। সারাদিন সে মনমরা হয়ে থাকত। কারও সঙ্গে সে ভালাে করে কথা বলত না। কেউ কোনাে কথা বলতে এলে সে দাঁত মুখ খিচিয়ে উঠত। রাত নেই দিন নেই তার মনের মধ্যে শুধু এক চিন্তা।
কিছুদিনের মধ্যে তার শরীর ভীষণ ভেঙে গেল। তার চালচলনে কথাবার্তায় পরিবর্তন দেখা দিল। তার বউ তাকে এরজন্য প্রশ্ন করতে লাগল। কিন্তু মধুসূদন তেমন কোনাে জবাব দিত না। তার ছেলেরা মাকে বাবার শরীর ভেঙে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করত। কোনাে সদুত্তর পেত না।
মধুসূদন শেষে শয্যাশায়ী হল। কী যে রােগ বােঝা গেল না। কেন যে তার এত চিন্তা তা কেউ বুঝতে পারল না। তার চোখে ঘুম নেই, পেটে খিদে নেই। দিনরাত চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। বউ আর ছেলেরা অনেক চেষ্টা করেও তার কারণ বুঝে উঠতে পারল না। শেষে তারা হতাশ হয়ে পড়ল।
একদিন বউ এবং ছেলেরা যখন কাছে ছিল তখন সে ঘুমের ঘােরে ‘সােনা, অলংকার’ বলে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
এই কথা শুনে তার বউ মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই তার জন্য কিছু সােনা লুকিয়ে রাখা আছে। ছেলেরা ভাবল, বাবা নিশ্চয়ই তাদের জন্য সােনা জমিয়ে রেখেছেন। তারা সকলেই মনে মনে ঠিক করে রাখল যে বাবার জ্ঞান ফিরলেই তারা জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে কোথায় সেই সােনা লুকানাে আছে। তাদের যেন আর তর সইছিল না। তারা বাবার জ্ঞান ফেরানাের জন্য সেব শুশ্রুষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে এল।

জ্ঞান ফিরে আসার পর মধুসূদনের কানের কাছে মুখ রেখে ছেলেরা জিজ্ঞেস করল, 'বাবা, সােনা অলংকার কীসব বলছিলেন, কোথায় লুকিয়ে রেখেছ ওসব?’
মধুসূদন আস্তে আস্তে চোখ খুলে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বড়াে ছেলেকে কাছে ডেকে আস্তে আস্তে বলল, 'বাবা, যা বলছি, অক্ষরে অক্ষরে পালন করবি। তাের ভাইকে, তাের মাকে রেখে গেলাম। ওদের দেখবি।' পরক্ষণেই মধুসূদন মারা গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, মারা যাওয়ার আগে মধুসূদন হাসল কেন? যে সােনার অলংকার নিজে বিক্রি করতে পারল না সেই সােনার সন্ধান বউ ছেলেদের দিল না কেন? কেন সে আজীবন গােপন রেখে গেল। এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘মধুসূদন ছিল এক সাধারণ চাষি। তার কাছে দু-সের সােনার অলংকার এক কল্পনাতীত ঘটনা, একটি স্বপ্ন। গরিবের বড়ােলােক হওয়ার কয়েকটা পথ সমাজে আছে। কিছু লােক সমাজে চুরি-ডাকাতি। করে বড়ােলােক হয়। কোনাে কোনাে ভাগ্যবান কোনাে আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে সােনা পেতে পারে। সম্পত্তির মালিক হতে পারে। কিন্তু মধুসূদন চুরি করে অথবা উত্তরাধিকারী হয়ে সােনা পায়নি। সে নিজেও জানত না কীভাবে সােনা পেয়েছে। ওই অলংকার নিয়ে বিক্রি করতে বেরুলে সে ধরা পড়ে মারধাের খাবে ভেবেছিল। ওই সােনা সে রাখতেও পারছিল না বিক্রিও করতে পারছিল না। সােনা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সে অসুখে পড়ল। মৃত্যুর আগে ছেলে বউদের দেখে হাসল। কারণ যেহেতু ওরা সােনা পায়নি সেইহেতু ওরা বেশ শান্তিতেই জীবনযাপন করতে পারবে। মধুসূদনও সােনা পাওয়ার আগে শান্তিতেই তাে ছিল।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল ওই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন