ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছোড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে ফিরে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কোন দিকের পক্ষপাতিত্বের ফলে এত পরিশ্রম করছ আমি তা জানি না। তবে এটুকু জানি সাংসারিক সমস্ত কিছু ছেড়ে দিয়ে যারা অরণ্যে তপস্যা করে তারাও পক্ষপাতহীন নয়। আমার বক্তব্যের সাক্ষী স্বরূপ একটি কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হতে পারে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল
এক সময় ধনবর্মা ও ধীরবর্মা নামে দুই রাজা পাশাপাশি রাজত্ব করছিল দুই দেশে। দুটো দেশের মাঝখানে একটা অরণ্য ছিল। সেই অরণ্যে জ্ঞানশেখর নামে এক সাধুর কুটির ছিল। সাধু তপস্যা করত। দু-দেশেরই প্রজা ওই সাধুর কাছে আসত। নিজেদের সমস্যার কথা বলত। শুনে সাধু যে পরামর্শ দিত সেই পরামর্শ অনুসারে ওরা কাজ করত।
সে বছর বর্ষা ভালোভাবে না হওয়ায় আকালের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। দুটো দেশেরই একই অবস্থা। একদিন ধনবর্মা ও ধীরবর্মা সাধুর কাছে পরামর্শ নিতে এল। ওদের বক্তব্য শুনে সাধু জ্ঞানশেখর বলল, 'দেখ বাবা, তোমাদের দু-জনকেই একটা করে কৌটো দিচ্ছি। যখনই তোমরা বিপদে পড়বে কৌটো খুলে দেখবে। তোমাদের সমস্যার সমাধান তোমরা তাতে খুঁজে পাবে। তবে একটু বুদ্ধি খাটাতে হবে। খুব ছোটো ছোটো সমস্যার সমাধান এতে খুঁজে পাবে না। এখন আমি কিছুকালের জন্য সমাধিস্থ হব।'
এইভাবে বলে সাধু দুই রাজাকে দুটো কৌটো দিয়ে দিল। রাজারা যে-যার কৌটো নিয়ে নিজের নিজের দেশে ফিরে গেল।

কিন্তু ধীরবর্মা তা করল না। অভাব বা আকালের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য সে কয়েকটা কাজ হাতে নিল। সেই কাজ করে ফল না পাওয়া গেলে তখন কৌটো খুলে দেখা যাবে ভাবল। প্রথমেই সে চেষ্টা করল যাতে দেশের ধান দেশের বাইরে কেউ নিয়ে না যায়। ব্যাবসাদারদের কাছে যত ধান ছিল সব ধান রাজা নিয়ে নিল। নিয়ে প্রজাদের মধ্যে বণ্টন করে দিল। ফলে সে বছর প্রজারা না খেতে পেয়ে মরেনি।
ধীরবর্মার চেয়ে সে বছর ধনবর্মা তার প্রজাদের অনেক ভালো খাইয়েছিল। তাই সে সগর্বে বলল, 'আমার দেশের প্রজা এই বছর সবচেয়ে ভালো খেতে পেয়েছে। আশেপাশের কোনো প্রজা এত খেতে পায়নি। কোনো রাজা প্রজাদের এত ধান খেতে দেয়নি। আগামী বছর আমি প্রজাদের আরও বেশি করে খাওয়াতে চাই আরও ভালো রাখতে চাই। মন্ত্রীগণ, বলুন, কীভাবে তা সম্ভব হবে।' মন্ত্রীরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'মহারাজ, গত বছরের মতো আপনি সাধু জ্ঞানশেখরের ওই কৌটো খুলুন।'
ধনবর্মা মন্ত্রীদের পরামর্শে সেটা খুলে দেখতে পেল একটি কাগজ তাতে শুধু লেখা আছে, 'জাগো, দেখ।'
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই এক সাধু ধনবর্মার সঙ্গে দেখা করতে এসে তাকে বলল, 'মহারাজ, আমার কাছে একটি যন্ত্র আছে। ওই যন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভে কোথায় কত সম্পদ আছে তা জানা যাবে। আমি এই যন্ত্র দিয়ে যেখানে দেখাব সেখানে খুঁড়ে দেখুন সম্পদ পাবেন। এভাবে খুঁড়ে খুঁড়ে আপনি আপনার দেশে অনেক সম্পদ মাটির তলা থেকে তুলতে পারবেন। তবে যত সম্পদ উঠবে তা বিক্রি করে যত পাবেন তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে।' রাজা তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। তারপর ওই সাধুর যন্ত্রের সাহায্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁড়া শুরু হয়ে গেল। মাটির তলা থেকে অনেক সোনা, রূপা, তামা, লোহা প্রভৃতি পাওয়া গেল। বিক্রি করে অর্ধেক দাম সাধুকে রাজা দিয়ে দিল।
দেখাদেখি বীরবর্মার মন্ত্রীরা রাজাকে উপদেশ দিল জ্ঞানশেখরের কাছে আনা কৌটোটা খুলতে। কারণ ওই কৌটো খুলে পাশের দেশের রাজা ধনবর্মা নিজের দেশের অনেক উন্নতি করেছে।
কিছুদিন পরে যে সাধু যন্ত্র নিয়ে ধনবর্মার দেশে গিয়েছিল সেই সাধু ধীরবর্মার কাছেও এল। ধনবর্মাকে যেভাবে যা বলেছিল বীরবর্মাকেও তাই বলল। তার কথা শুনে বীরবর্মা বলল, 'দেখুন, আপনি যদি আপনার যন্ত্র বিক্রি করতে চান আমি সানন্দে আপনার যন্ত্র কিনে নিতে পারি। কিন্তু আপনাকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গার মাটি খুঁড়ে, দেশের সমস্ত সম্পদ বের করে আপনাকে তার অর্ধেক দিতে রাজি নই।'
এই ধরনের যন্ত্র আমার কাছে ছাড়া পৃথিবীতে আর কারও কাছে নেই। তাই এটা আমি বিক্রি করতে চাই না। আমার স্বার্থে আপনি রাজি হলেন না; তবে মনে রাখুন, এই যন্ত্র ছাড়া মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বিভিন্ন জায়গার সম্পদ বের করতে আপনার পঞ্চাশ বছর লেগে যাবে। আপনার দেশ পেছিয়ে যাবে।'
কিছুকাল পরে জ্ঞানশেখর সমাধি থেকে উঠে আশেপাশের কোন দেশের কী অবস্থা জানার জন্য বেরিয়ে পড়ল। বীরবর্মা জ্ঞানশেখরকে জানাল, 'নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে যতটা পেরেছি সমস্যার সমাধান করেছি। আপনার কৌটো আমি এখনও খুলিনি।'
তারপর জ্ঞানশেখর গেল ধনবর্মার কাছে। সে বলল, 'দেখুন, আমি আমার প্রজাদের কত ভালো রেখেছি। যখনই প্রয়োজন বোধ করেছি কৌটো খুলেছি।'
জ্ঞানশেখর ধীরবর্মার কাছ থেকে কৌটোটা ফিরিয়ে নেয়নি। কিন্তু ধনবর্মার কাছ থেকে কৌটোটা ফিরিয়ে নিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'রাজা, জ্ঞানশেখর এক রাজার কাছ থেকে কৌটোটা ফেরত নিল অন্য রাজার কাছ থেকে নিল না। এর কারণ কী? নিশ্চয় ধীরবর্মার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব ছিল। ওই কৌটোর ক্ষমতা কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'জ্ঞানশেখর কৌটো ফেরত নিল ধনবর্মার কাছ থেকে। কারণ ধনবর্মা সাধুর দুটো কথাই রাখলেন না। তিনি পর পর দু-বার ওই কৌটোটি খুলেছিলেন। যে সমস্যা দেখা দিল তার সমাধান করার উপায় রাজা ভাবেননি। কৌটো খুলে সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ধান কিনে অপচয় করেছিলেন। দ্বিতীয় অপরাধ করেছিলেন মাটির তলার সমস্ত সম্পদ তুলে, শেষ করে, ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য মাটির তলায় কিছুই রাখলেন না। কিন্তু ধীরবর্মা ওই কৌটো বা যন্ত্রের উপর নির্ভর করেননি। বুদ্ধি খাটিয়ে সমাধান করেছেন। তাই সাধু তা রেখে দিল।'
রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন