রাক্ষস বিবাহ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

বদ্ধপরিকর বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে নামিয়ে মড়াটাকে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে হাঁটতে লাগলেন।

শবে-লগ্ন বেতাল বলল, ‘রাজা, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না কেন তুমি এভাবে খাটছ। কেন তুমি এই মাঝরাতে এভাবে পরিশ্রম করছ। মনে রেখ সিংহপুরীর রাজা বিজয়বসন্তের মতাে নিজের প্রতিজ্ঞা শেষ পর্যন্ত রক্ষা না করার লােকও জগতে আছে। তােমার এই পরিশ্রম ভােলানাের জন্য তােমাকে একটি গল্প শােনাচ্ছি, শােনাে।'

বেতাল নিজের কাহিনি শুরু করল : বিজয়বসন্ত অসাধারণ পরাক্রমী এবং শক্তিশালী ছিল। যুদ্ধবিদ্যায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। তার অরুণকুমারী নামে এক কন্যা ছিল। তার কন্যার রূপের প্রশংশা তার বাবার অসাধারণ ক্ষমতার মতাে চারদিকে ছড়িয়ে গেল।

অরুণকুমারী বড়াে হল। রাজদরবারে রাজকন্যার বিয়ে দেবার ব্যাপারে আলােচনা হল। রাজা ঘােষণা করল, ‘যুদ্ধবিদ্যায় যে রাজকুমার সবার চেয়ে ক্ষমতাশালী প্রমাণিত হবে তার সাথেই আমার মেয়ের বিয়ে হবে।'

এই ঘােষণার ভিত্তিতে মন্ত্রীরা অরুণকুমারীর স্বয়ংবর সভার ব্যবস্থা করল। চারদিকে প্রচার করে দিল : যে সমস্ত রকমের যুদ্ধবিদ্যায় সবাইকে পরাজিত করতে পারবে তার সাথেই রাজকন্যার বিয়ে হবে। এই ঘােষণা সমস্ত দেশেই করানাে হয়েছিল। হয়নি শুধু শালপুরীতে। কারণ শাকলপুরী এবং সিংহপুরীর মধ্যে বহুদিনের শত্রুতা ছিল।

কিন্তু শাকপুরীর রাজকুমার কমলশেখর অরুণকুমারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা বহুদিন ধরে গােপনে করেছিল। অন্য দেশের রাজকুমারের মাধ্যমে সে অরুণকুমারীর স্বয়ংবরের খবর পেল। তখন সেই রাজকুমারের বন্ধু হিসেবে কমলশেখর স্বয়ংবর সভায় যােগদান করল।

স্বয়ংবর সভার দিন অন্য রাজকুমারদের মতাে কমলশেখরও ঘােড়ায় চড়া, গদাযুদ্ধ, এবং তির চালনায় অংশগ্রহণ করল এবং পরিশেষে অস্ত্র চালনায় সবার সেরা প্রমাণিত হল।

অরুণকুমারী কমলশেখরের গলায় মালা দিতে যাচ্ছে এমন সময় হঠাৎ বিজয়বসন্ত কমলশেখরকে আলিঙ্গন করে প্রশ্ন করল, 'কুমার, আমি তােমার যুদ্ধ কৌশলে মুগ্ধ হয়েছি। তুমি কোন দেশের রাজকুমার। তােমার নাম কী?’

‘আমি শাকপুরীর রাজকুমার। নাম আমার কমলশেখর।'কমলশেখর বলল।

রাজা বিজয়বসন্ত ক্রোধে গর্জে উঠে বলল, 'পাজি, এক্ষুনি তুমি এখান থেকে চলে যাও। এবারের মতাে আমি তােমাকে প্রাণে না মেরে ছেড়ে দিচ্ছি।'

কমলশেখরের রাগ হল। একইরকমের কঠোর কণ্ঠস্বরে সে বলল, 'যে মুহূর্তে আপনার ঘােষণা অনুসারে আমি জয়ী হয়েছি সেই মুহূর্তেই আপনার মেয়ে আমার স্ত্রী হয়ে গেছে। আমিও দেখতে চাই আমার বিয়ের ব্যাপারে আপনি কীভাবে বাধা দেন।'

এই কথা বলে কমলশেখর খাপ থেকে তরবারি বের করল।

বিজয়বসন্তও তরবারি বের করল। দুজনের মাঝে প্রচণ্ড যুদ্ধ হল। সেই যুদ্ধের সময় বিজয়বসন্তের হাতে মারাত্মক আঘাত লাগল।

পরক্ষণেই কমলশেখর অরুণকুমারীকে ঘােড়ায় চড়িয়ে নিজের দেশের দিকে রওনা হয়ে গেল। বিজয়বসন্ত যুদ্ধ-ভেরি বাজাল। নিজের সমস্ত সেনা নিয়ে শাকলপুরীর দিকে এগিয়ে গেল।

পরের দিন সকালে শাকপুরীর সেনা যুদ্ধে নামল। সেনাদের সামনে ছিল কমলশেখরের সাথে স্বয়ং অরুণকুমারী।

নিজের কন্যাকে দেখেই বিজয়বসন্ত নিজের সেনাকে যুদ্ধ করতে বারণ করে দিল। নিজের কন্যা এবং জামাতাকে আশীর্বাদ করে ওদের শাকপুরীতে ঢুকল। কমলশেখরের বাবার সাথে মৈত্রী স্থাপন করল। নিজের কন্যার বিয়ে ঘটা করে সম্পন্ন করিয়ে বিজয়বসন্ত নিজের দেশে ফিরল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করল, ‘রাজা, অত বড়াে পরাক্রমশালী রাজা বিজয়বসন্তের এই ধরনের কাজের উদ্দেশ্য কী ? নিজের ঘােষণা অনুযায়ী যে রাজকুমার জয়ী হল তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইল না কেন? তাকে মেরে ফেলার জন্য অস্ত্র বের করল কেন? পরে তার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমস্ত সেনা নিয়ে গেল কেন? এই প্রশ্নগুলাের জবার জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এককথায় বিক্রমাদিত্য বলল, ‘অরুণকুমারীর স্বয়ংবর সভায় কমলশেখরকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। তাই, ওই স্বয়ংবর সভায় তার অংশগ্রহণ করার অধিকার ছিল না। কমলশেখর বিজয়বসন্তের শত্রুর ছেলে। অতএব সে-ও শত্রু। তা সত্ত্বেও বিজয়বসন্ত কমলশেখরকে প্রাণে না মেরে ছেড়ে দিতে রাজি ছিল। কিন্তু কমলশেখরই প্রথমে তরবারি বের করল। আক্রমণ যে করে তাকে আক্রমণ করা অপরাধ নয়। বিজয়বসন্তের যুদ্ধ করতে যাওয়াও যুক্তিসংগত। নিজের কন্যাকে স্বয়ংবর সভা থেকে হঠাৎ কমলশেখরের ঘােড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে ওই বিয়ে রাক্ষস বিয়েতে পরিণত হয়েছিল। তাই বিজয়বসন্ত নিজের কন্যাকে উদ্ধার করতে যুদ্ধ করতে এগিয়ে গেল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কমলশেখরের পাশে নিজের কন্যাকে দেখে বিজয়বসন্ত পরিষ্কার বুঝল যে এ বিয়েতে মেয়ের পুরাে মত আছে। যে কুমার জোর করে নিয়ে গেছে তাকেই নিজের মেয়ের পছন্দ। সেক্ষেত্রে ওই বিয়ে আর রাক্ষস বিয়ে হিসেবে ধরা যায় না। সেইজন্য, বিজয়বসন্ত সানন্দে মেয়ের বিয়ের মত দিল। আর জামাইয়ের সাথে শত্রুতার সম্পর্ক রাখা অনুচিত ভেবে তার বাবার সাথে মৈত্রী স্থাপন করল।'

রাজা মৌনভাব ভঙ্গ করার সাথে সাথে বেতাল শব উধাও হয়ে আবার সেই গাছে উঠে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%