ক্ষত্রিয়ের ধর্ম

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছে উঠে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, তুমি যে চেষ্টা করছ এই চেষ্টা যে সফল হবেই এমন কথা মনে রেখো না। বিফলও হতে পার। তবে বিফল হয়েও অনেক সময় সফল হওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে আমি একটি কাহিনি বলছি। আমার ওই কাহিনি শুনলে বুঝতে পারবে যে আমার কথা কত সঠিক। আমি কণকপুরের মানিকের কাহিনি শোনাচ্ছি।'

প্রাচীন কালে মণিপুরের রাজা ছিল সিংহভূপাল। তার ছিল এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। নাম মন্দারবলী। শুধু যে সুন্দরী ছিল তাই নয় তার জ্ঞানও ছিল অসীম। বহু বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল তর্কাতীত। বিয়ের বয়স হলে রাজা সিংহভূপাল মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিল। উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান শুরু হল।

অনেক রাজকুমারকে পরীক্ষা করে দেখা গেল। কিন্তু কোনো রাজকুমারকেই মন্দারবলীর উপযুক্ত স্বামী হিসাবে যোগ্য মনে হল না। খুঁজে খুঁজে শেষে কণকপুরের রাজকুমার মানিককেই উপযুক্ত এবং যোগ্য পাত্র মনে হল।

তবে মানিককে বাছাই করার ক্ষেত্রে একটা অসুবিধা ছিল। দেশ হিসাবে কণকপুর বড়ো ছিল না। ছোট্ট দেশ। মানিক ভবিষ্যতে রাজা হলে একটি ছোট্ট দেশের রাজা হবে। ছোটো একটি দেশের রাজার কাছে মেয়েকে দেওয়ার প্রস্তাব করতে খুব একটা ইচ্ছা করল না। আবার মানিকের মতো অত ভালো পাত্র পাওয়াও দুষ্কর ছিল। কি করা যায় তা রাজা ভেবে পাচ্ছিল না।

রাজার সমস্যার কথা শুনে মন্ত্রী একটি উপায় বলল। সেটি হল, সিংহভূপাল মানিকের দেশ আক্রমণ করবে, জোর করে তাদের দেশ দখল করে নেবে। তারপর দুই দেশের মধ্যে সন্ধি হবে। সন্ধির শর্ত হিসাবে মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ থাকবে এবং মানিকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হবে।

মন্ত্রীর পরামর্শমতো রাজা সিংহভূপাল সেনাদের প্রস্তুত হতে বলল। কণকপুর আক্রমণ করতে বলল। কণকপুরের রাজা হতবাক হল। ঘটনাক্রমে মানিকই কণকপুরের রাজা হয়েছিল মাত্র কিছুদিন আগে। মণিপুরের রাজার সঙ্গে যে তার দেশের কোনো শত্রুতা ছিল তা সে জানত না। হঠাৎ কেন যে মণিপুরের রাজা আক্রমণ করল তা সে ভেবেই পেল না। পালটা আক্রমণ করা উচিত কি না সে বিষয়ে মানিক মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করল। মন্ত্রীরা বলল, 'যুদ্ধের আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। এখন যুদ্ধ করতে যাওয়ার অর্থ আমাদের বহু সেনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। আমাদের দেশের মানুষ মারা যাবে। আমাদের অনেক অর্থও নষ্ট হবে। অতএব অবিলম্বে সন্ধি করাই ভালো।'

মন্ত্রীদের পরামর্শমতো মানিক সিংহভূপালের কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠাল। রাজা সিংহভূপাল তৎক্ষণাৎ সন্ধির প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হল। সন্ধির সময় মানিককে দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হল রাজা সিংহভূপাল। মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ সন্ধির শর্ত হিসাবে রাখতে চাইল। শুনে রাজা মানিকের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক লাগল। তবু দেশের স্বার্থে, প্রজাদের জীবনরক্ষার্থে রাজা মানিক সিংহভূপালের মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হল।

সিংহভূপাল খুব খুশি। যা করব ভেবেছিল করতে পেরেছে। ফিরে এল নিজের দেশে। এদিকে মন্দারবলীর কানেও সন্ধির শর্তের কথা গেল। সেও যুবরাজ মানিকের কথা অনেকদিন আগেই শুনেছিল। হঠাৎ তার বাবা মানিকের দেশ আক্রমণ করতে গেলে সে খুব দুঃখ পেয়েছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাবাকে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য সে বলেছিল কিন্তু লক্ষ করল বাবা মানিকের রাজ্য আক্রমণ করতে বদ্ধপরিকর। মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সিংহভূপাল খুব খুশি হল। তবে কেন যে আক্রমণ করতে যাচ্ছে তা খুলে বলল না। অপরপক্ষে আর একটি কারণেও খুশি হল। নিজে যে রাজকুমারকে যোগ্য পাত্র হিসাবে মনে মনে বাছাই করেছে তার প্রতি মন্দারবলীর দুর্বলতা আছে দেখে। যুদ্ধ শেষ করে ফিরে এসে সন্ধির শর্ত মেয়ে মন্দারবলীকে রাজা জানাল।

সন্ধির শর্তের কথা শুনে মন্দারবলীর গালে হাত পড়ল। এদিকে রাজা মেয়েকে শুধু জানিয়ে দিয়ে তার বিয়ের তোড়জোড় করতে লাগল। এমন সময় মেয়ে মানিক রাজাকে বিয়ে করতে রাজি হল না। তার বাবা কত করে বোঝাল কিন্তু কিছুতেই মন্দারবলীকে রাজি করানো গেল না। তখন বাধ্য হয়ে সিংহভূপাল বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবার খবর রাজা মানিককে জানিয়ে দিল। রাজা ভেবে পেল না মন্দারবলীর বিয়ে কার সঙ্গে হবে।

বিয়ে ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে রাজা মানিক ভীষণ রেগে গেল। তার কাছে এই খবরটা আরও অপমানজনক লাগল। ক্ষমতা থাকলে সিংহভূপালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু সে জানে হঠাৎ একবার সিংহভূপালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া যায় কিন্তু জয়ী হওয়া যাবে না। তার সৈন্যশক্তি অত্যন্ত কম। কিন্তু মনে কিছুতেই রাজা মানিক শান্তি পাচ্ছিল না। তাই সে তার ক্ষুদ্র ক্ষমতা নিয়েই ওই সিংহভূপালের দেশ আক্রমণ করল। এই অতর্কিত আক্রমণের ফলে সিংহভূপাল প্রথমে হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পরে পালটা আক্রমণ করে রাজা মানিককে বন্দি করল। তবে সিংহভূপাল রাজা মানিকের সাহস দেখে অবাক হল। রাজা মানিক এবং তার সেনাদের যুদ্ধকৌশল ও সাহস দেখে সিংহভূপাল তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ হল।

রাজা মানিককে পরাজিত ও বন্দি করে সিংহভূপালের কোনো আনন্দ হল না। এখন তার ভাবনা হল রাজা মানিকের রাজ্যটি কি সে নিয়ে নেবে। নাকি তাকে ছেড়ে দেবে। তখন মন্দারবলী বাবা সিংহভূপালকে বলল, 'বাবা, এখন আমি রাজা মানিককে বিয়ে করতে রাজি আছি।' শুনে রাজা সিংহভূপাল খুব খুশি হল। তৎক্ষণাৎ সে ঘটা করে মন্দারবলীর বিয়ে রাজা মানিকের সঙ্গে দিল। এতদিনে সিংহভূপালের ঘাড় থেকে যেন একটা বোঝা নামল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বাবা সিংহভূপাল যুদ্ধ করে মানিককে বন্দি করার পর প্রথমে মন্দারবলী তাকে বিয়ে করতে রাজি হল না কেন? আবার পরে সেই রাজা মানিক সিংহভূপালের দেশ আক্রমণ করে বন্দি হলে মন্দারবলী এগিয়ে এসে তাকেই বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করল কেন? দু-দিন আগে যে মেয়ে গররাজি হয়েছিল যাকে বিয়ে করতে তাকেই দু-দিন পরে বিয়ে করতে রাজি হল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বিক্রমাদিত্য বেতালের প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'মন্দারবলী সুশিক্ষিতা। সে বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বহু বিষয়েই গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিল। মানিকের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। তবে সে জানত না যে রাজা মানিকের দুর্বলতা তার প্রতি আছে কি না। তার অজানা ছিল মানিক তাকে ভালোবাসে কি না। সেইজন্যই সে বিয়ের ব্যাপারে আগে থেকেই কোনো আগ্রহ প্রকাশ করল না। তবে বাবা রাজা মানিকের রাজ্য আক্রমণ করবে শুনে দুঃখ পেয়েছিল। পরাজিত ও বন্দি রাজা মানিককে বিয়ে করার ইচ্ছে করল না মন্দারবলীর। আরও একটি কারণে তার এই অনিচ্ছা ছিল। বিয়ের শর্তে মুক্তি পাওয়া। এতে রাজা মানিকের সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা। তাই অপমানিত ও সম্মানহীন রাজা মানিককে বিয়ে করতে সে রাজি হল না। তবে সেই রাজা মানিক যখন তাদের দেশ আক্রমণ করল তখন তার মন থেকে দুটো সন্দেহ দূর হয়ে গেল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল মানিক তাদের দেশ জয় করার জন্য আক্রমণ করেনি করেছে তাকে পাওয়ার জন্য। আর পরাজিত হলে বন্দি হতেই হবে। রাজা মানিক ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম যুদ্ধ করা। যুগ যুগ ধরে, বহু পুরুষ ধরে, সাহসে বুক বেঁধে ক্ষত্রিয় যুদ্ধ করে এসেছে। জয়-পরাজয় নিয়ে অত মাথা ঘামানো তার ধর্ম নয়। সেইজন্যই মন্দারবলী বন্দি মানিক রাজাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গিয়ে সেই গাছে ঝুলে পড়ল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%