ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তোমাকে ভক্তি করে এমন লোক অনেক থাকতে পারে। কিন্তু রাজভক্তি কখন যে কীভাবে কার মনে জাগে তা বোঝা যায় না। আবার সেই রাজভক্তি কখন যে ঝট করে চলে যায় তাও আগে থেকে বলা শক্ত। একটি কাহিনি বললে আমি যা বলতে চাই তা আরও পরিষ্কার হবে। আমি স্বর্ণসিংহের কাহিনি শোনাচ্ছি। বেতাল কাহিনি শুরু করল
প্রাচীন কালে জয়পুরের রাজা ছিল নাগবর্মা। যথেষ্ট যোগ্যতার সঙ্গে দেশের শাসন করত। প্রজারাও তার শাসনকালে সুখে ছিল। প্রজারা উৎসাহের সঙ্গে কাজ করত। ফসল পেত।
রাজার একটা দুঃখ ছিল। বিয়ের অনেক বছর পরেও রাজার কোনো ছেলে-মেয়ে হয়নি। এরজন্য প্রজারাও দুঃখ পাচ্ছিল। কারণ তাদের ইচ্ছা, রাজার ছেলে হোক এবং সে ছেলে এই রাজার মতো যোগ্য রাজা হোক।
যত ভালো রাজাই হোক সব প্রজা যে সমান হবে এমন কথা বলা যায় না।
সন্তান কামনা করে নাগবর্মা পুজোপাঠ শুরু করে দিল। রাজার মন পুজোপাঠে পড়ে থাকত। ফলে দেশের শাসনকার্য দেখাশোনা করত মন্ত্রীরা। এই সুযোগে রাজার বিরুদ্ধে যারা ছিল তারা আরও কাছাকাছি এল। গোপনে পরামর্শ চলল। ওদের নেতা ছিল রজত সিংহ।
রজত সিংহ সাধারণ প্রজা ছিল না। সে ছিল নাগবর্মার সেনাপতি। সে সবসময় অপেক্ষা করছিল রাজার মৃত্যুর জন্য। সিংহাসনের দিকে তার নজর ছিল।
পাশাপাশি মন্ত্রী ধর্মদত্ত অন্য পরিকল্পনা করছিল। রাজার যদি সন্তান না হয়, রাজা যদি মারা যায় কীভাবে কী করা হবে তা চিন্তা করছিল।
রাজা যখন পুজোপাঠে মেতেছিল তখন ধর্মদত্ত শক্ত হাতে হাল ধরল। সেনাপতি রজত সিংহ কখন কী করে তা চটপট জেনে নেওয়ার জন্য লোক লাগিয়েছিল। মন্ত্রী ধর্মদত্ত অবশ্য এও ভেবেছিল যে রাজার মৃত্যুর পর বিদেশি কোনো রাজা দখল করার চেয়ে সেনাপতির রাজা হওয়া অনেক ভালো।
কিন্তু সেনাপতির ইচ্ছা, মন্ত্রীর হিসেবনিকেশ সব ওলটপালট হয়ে গেল। কোনো কিছুরই দরকার হল না। কারণ নাগবর্মার ছেলে হল।
প্রধানমন্ত্রী ধর্মদত্তও আগের মতো সতর্কতার সঙ্গে দেশ শাসনের কাজ করত না। আগে একদিকে দেশের শাসনকাজ দেখত আর অন্যদিকে দেখত রাজার জীবন। এখন আর সে ভাবনা নেই। এখন ধর্মদত্তের মনে ঢুকল অন্য চিন্তা। কীভাবে উত্তরাধিকারীকে বড়ো করা যায়।
ছেলে জন্মানোর কয়েক বছর পরে মন্ত্রী ধর্মদত্ত রাজা নাগবর্মাকে সেনাপতির গতিবিধি, পরিকল্পনা সম্পর্কে জানাল। এই প্রথম মন্ত্রী সেনাপতির বিরুদ্ধে জানাল।
রাজা নাগবর্মা ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, 'এত কিছু জানা সত্ত্বেও তাকে এখনও বন্দি করা হয়নি। এই ধরনের দেশদ্রোহী সেনাপতিকে বন্দি করা হোক।'
'সেনাপতিকে ঝট করে প্রকাশ্যে বন্দি করা উচিত হবে বলে মনে হচ্ছে না মহারাজ। সেনাপতি বহু বছর ধরে ওই সিংহাসনের দিকে নজর রেখে তার পরিকল্পনার জাল বিস্তার করে চলেছে। শুনে আপনি হয়তো ক্ষিপ্ত হবেন কিন্তু এটা সত্য ঘটনা যে সেনাপতি রজত সিংহ যেকোনো মুহূর্তে আপনার সিংহাসন দখল করে নিতে পারে। তলে তলে সে অনেক আগে থেকেই এই ব্যবস্থা করে রেখেছে। এখন আমাদের সিংহাসন রক্ষাই একমাত্র কাজ নয়, এই শিশুর প্রাণরক্ষা করা তার চেয়ে বড়ো কাজ।'
'যা শুনছি সব অদ্ভুত ঠেকছে। কী ব্যাপার? তলে তলে এত কিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ আমি কিছু জানি না!' রাজা নাগবর্মা বলল। তারপর ধর্মদত্ত নিজের পরিকল্পনা রাজাকে বলল। রাজা মন্ত্রীর সব কথা শুনে রাজি হল।
ধর্মদত্ত যা ভেবেছিল তাই হল। রাজার ছেলে হওয়ার পর ধর্মদত্ত বুঝেছিল রজত সিংহ এবার রাজার ছেলের প্রাণনাশের চেষ্টা করবে। রজত সিংহও সেইরকম পরিকল্পনাই করছিল। কিন্তু তার সে গুড়েও বালি পড়ল। হঠাৎ একদিন রাজার ছেলে উধাও হয়ে গেল। এই খবর রটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দেশবাসী দুঃখে ভেঙে পড়ল।
এদিকে রজত সিংহ যখন দেখল যে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে তখন এমন ভাব করতে লাগল যেন ওই ধরনের চিন্তা তার মনে কোনোদিন ছিল না। একদিন রাজার কাছে এসে সে বলল, 'মহারাজ, আপনি অত ভাববেন না। আপনার ছেলেকে, আমাদের যুবরাজকে যে কে লুকিয়ে রেখেছে তা আমি জানি। তাকে আমি কঠোর শাস্তি দেব।'

রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কে সেই দেশদ্রোহী? আমার বিরুদ্ধে কে এই ধরনের পাপ কাজ করছে?'
'মহারাজ, যে আপনার নুন খাচ্ছে সেই করছে।' সেনাপতি বলল।
'কে সে?' রাজা বলল।
'আপনার সবচেয়ে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী, ধর্মদত্ত। যেহেতু তার নাম ধর্মদত্ত সেইহেতু তার অধর্মের কাজগুলো নজরে পড়ে না।' বলল সেনাপতি রজত সিংহ।
নাগবর্মা আর কোনো কথা বলল না।
রাজা কোনো কথা বলুক আর না বলুক সেনাপতি নিজের কর্তব্যে অটল। চারদিকে লোক পাঠাল, যুবরাজকে খুঁজে আনার জন্য। কিছুদিন পরে ওরা ফিরে এল। কোনো ফল হল না।
সেনাপতি রজত সিংহ দেখল, আর যুবরাজের ফিরে আসার কোনো আশঙ্কা নেই। যে মন্ত্রী তার পথের কাঁটা ছিল তারও পাত্তা নেই। এই অবস্থায় সহজেই সিংহাসন দখল করা যায়। হঠাৎ এক দিন সে রাজাকে বন্দি করে সিংহাসন দখল করল।
রাজা হয়ে রজত সিংহ শাসনকাজের অনেক অদলবদল করল। যাদের রজত সিংহ দু-চোখে দেখতে পারত না তাদের সরিয়ে দিল। নিজের পছন্দসই লোককে বিভিন্ন রাজপদে বসাল। আত্মীয়স্বজন মনের মতো কাজ করে যত ইচ্ছা রোজগার করতে লাগল। ফলে প্রজাদের জীবন বিপন্ন হল। ওদের জীবনে দুঃখের ছায়া নেমে এল। কিছু প্রজা মারা গেল। কিছু প্রজা ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে রইল। বাকি প্রজা বিদেশে পালিয়ে গেল।
না জানি কেন ধর্মদত্তের ছেলে স্বর্ণসিংহ কিন্তু রজত সিংহের সুনজরে ছিল। অনেক আগে থেকেই রজত সিংহের প্রতিটি কাজ স্বর্ণসিংহ সমর্থন করত। রজত সিংহ বলতে স্বর্ণসিংহ অজ্ঞান। এ ছাড়া যোগ্যতার দিক থেকেও স্বর্ণসিংহ তার বাপকে পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই রজত সিংহ স্বর্ণসিংহকে নিজের সেনাপতির পদে নিয়োগ করল।
সিংহাসনে বসেও রজত সিংহ ধর্মদত্তের কথা ভাবত। কারণ সে জানত যে ধর্মদত্ত তাকে ঘৃণা করে। সে কীভাবে কী করতে চায় তা ধর্মদত্ত টের পায়। যদি ধর্মদত্ত বেঁচে থাকে তাহলে একদিন না একদিন তাকে বিপদে পড়তেই হবে। আবার এমনও হতে পারে যে ধর্মদত্ত যুবরাজকে নিয়েই পালিয়েছে। তাই যতদিন না এই দু-জনকে শেষ করা যাচ্ছে ততদিন শান্তিতে সিংহাসনে বসে থাকা যাবে না। ওদের মেরে ফেললে রজত সিংহ শান্তিতে রাজ্যশাসন করতে পারে। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে হবে রাজা।
একদিন রজত সিংহ সেনাপতি স্বর্ণসিংহকে বলল, 'দেখ স্বর্ণসিংহ, আমার বড়ো ইচ্ছা যে আমার মৃত্যুর পর তোমাকে রাজা করি। তবে তার আগে আমার মেয়েকে তোমায় বিয়ে করতে হবে। আর এই বিয়ের আগে তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। কাজটি জরুরি। এবং প্রকৃত রাজভক্ত ছাড়া অন্য কেউ এ কাজ করতে পারে না। তোমার মধ্যে আমি সেই রাজভক্তি দেখেছি। আর দেখেছি বলেই বলছি। তুমি যেকোনোভাবে তোমার বাবা আর যুবরাজকে ধরে এনে দাও। তারপরেই তোমার বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।'
স্বর্ণসিংহ হেসে বলল, 'মহারাজ, আপনার নির্দেশই যথেষ্ট। তারজন্য আমার নিজের কোনো সুখ আমি চাই না।'
তারপর স্বর্ণসিংহ কিছু লোক নিয়ে যুবরাজ ও বাবার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। স্বর্ণসিংহের খোঁজা ব্যর্থ হয়নি। বাবার খোঁজ পেল সে। অরণ্যের মাঝে দুই পাহাড়ের মধ্যিখানে ওরা ছিল। যুবরাজ অস্ত্রচালনা শিখছিল। কয়েক জন অরণ্যবাসীও ছিল ওদের সঙ্গে।
কয়েক জন অরণ্যবাসী জয়পুরে এসে গোপনে প্রচার করল যে যুবরাজ বেঁচে আছে। ওরা জানাল যে ওরা কোনো এক সাধুর কাছে শুনেছে। ওদের প্রচারের পরে, কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল কিছু কিছু প্রজা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
গোপন পথে ওরা ধর্মদত্ত যেখানে ছিল সেখানে এসে হাজির হচ্ছিল।
স্বর্ণসিংহ এসে দেখল রাজার ছেলে বড়ো হয়েছে। তার বাবার নেতৃত্বে বিরাট সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছে।
ধর্মদত্ত ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, 'দেশের সবাই ভালো আছে?'
'কিন্তু আমি তো বাবা ভালো-মন্দ জানাতে আসিনি। আমি এসেছি...' স্বর্ণসিংহ কথা শেষ করতে পারল না।
ধর্মদত্ত বলল, 'আমি জানি তুমি কেন এসেছ। তুমি এসেছ আমাকে এবং যুবরাজকে বন্দি করে নিয়ে যেতে। কিন্তু তার আগে জেনে রাখ যে তুমি আর তোমার লোকজন ইতিমধ্যেই এখানে বন্দি হয়ে গেছ।'
বাবার কথা শুনে স্বর্ণসিংহ ভীষণ রেগে গেল। চিৎকার করে তার লোকজনদের বলল, 'এঁকে তোমরা বন্দি কর।'
পরমুহূর্তে অরণ্যবাসী স্বর্ণসিংহকে আঘাত করল। স্বর্ণসিংহ মূর্ছা গেল।
ধর্মদত্ত ছেলের চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। জ্ঞান হওয়ার পর স্বর্ণসিংহ বাপের কাছ ক্ষমা চাইল। পরে বাবাকে বলল, 'বাবা আমি আর ফিরে যাব না। তোমার কাছেই থাকব।'
ধর্মদত্ত বলল, 'তোমার এখানে থাকার কোনো দরকার নেই। তোমাকে যে স্নেহ করে তার কপালে অনেক দুঃখ আছে। কিছুদিনের মধ্যে তাকে যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হবে। যাও, রজত সিংহকে খবর দাও যে দেশবাসী তাকে শেষ করবে।'
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, রাজভক্ত স্বর্ণসিংহের ভক্তি অরণ্যবাসীর এক আঘাতে উবে গেল কী করে? সে কি সত্যি বদলে গিয়েছিল? নাকি সেটা তার অভিনয় ছিল? সে থাকতে চাইলেও বাপ হয়ে ধর্মদত্ত তাকে রাখল না কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'স্বর্ণসিংহের মধ্যে সত্যিকারের রাজভক্তি ছিল এমন কোনো প্রমাণ আমি পাইনি। ওর বাবা যখন ছিল না, ওর আত্মীয়স্বজন যখন খারাপ অবস্থায় পড়ে গেল তখন সে রজত সিংহের সুনজরে আসার চেষ্টা করেছিল। খালি হাতে ফিরে গেলে রজত সিংহ যে তাকে কঠোর শাস্তি দেবে এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। তাই সে বাবার কাছে থেকে যেতে চাইল। অপরপক্ষে ধর্মদত্ত ছেলের এই দুর্বল ভূমিকা পছন্দ করেনি। গোপনে যে বাহিনী গঠিত হয়েছে, তা নষ্ট হয়ে যেত।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন