সাধুর দণ্ড

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে আগের মতো এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, ভুলেও তুমি দুষ্টকে সাহায্য করো না। চোরকে সাহায্য করতে গিয়ে সাধু নিজের প্রাণ হারিয়েছিল। আমি তার কাহিনি বলছি। শুনলে পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে কোনো এক রাজার দেশে হঠাৎ এক সাধু এসেছিল। দেশের এক প্রান্তে ছিল এক মন্দির। সাধু সেই মন্দিরে থাকতে লাগল। প্রজারা সাধুর কাছে যেত। সুখ-দুঃখের কথা বলত। সাধু তাদের নানা ধরনের উপদেশ দিত, সমস্যার সমাধান করত। তার কথামতো চলে অনেকে সুফল পেয়েছিল।

কিছুদিনের মধ্যেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। একদিন এক চোর অন্ধকারে এসে সাধুকে বলল, 'প্রভু, আজ রাত্রে আমি একটা কাজ করব ভেবেছি। ঠিক কোন মুহূর্তে বেরুলে সেই কাজে সফল হব তা দয়া করে জানান। সফল হলে আমি তার অর্ধেক আপনাকে দেব।' বলে চোর সাধুকে প্রণাম করল।

সাধু কিছুক্ষণ ভেবে শুভমুহূর্ত জানিয়ে দিল। চোর ঠিক সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এক ধনীর বাড়িতে চুরি করতে গেল এবং কোনোরকম বাধা না পেয়ে চুরি করে ফিরে এল।

পরের দিন সকালে চোর সাধুর কাছে গিয়ে বলল, 'প্রভু, আপনি যে মুহূর্তে বেরোতে বলেছিলেন সেই মুহূর্তে বেরিয়ে সফল হয়েছি। আপনাকে যে ভাগ দেব বলেছিলাম এই নিন সেই ভাগ।' বলে চোর সাধুকে কিছু অর্থ দিয়ে দিল। সাধু সেই অর্থ গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দিল।

কিছুদিন পরে চোর আবার এল ওই সাধুর কাছে। আগের মতোই শুভমুহূর্ত জানতে চাইল। সাধু তাকে শুভমুহূর্ত বলল। রাত্রে সে সোজা চলে গেল রাজার কোষাগার থেকে চুরি করতে। যত মোহর বইতে পারল তত মোহর মাথায় করে বাড়ি ফিরল। যথারীতি অর্ধেক মোহর সাধুকে এনে দিল।

সাধু চোরের কাছ থেকে মোহরগুলো নিয়ে গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিল। রাজার কোষাগারে চুরি হয়েছে— এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রাজার লোক চোর ধরার জন্য কড়া নজর রেখেছিল। ওরা গরিবদের হাতে রাজার মোহর দেখে ধরল। কোথায় পেল, কার কাছ থেকে পেল ইত্যাদি প্রশ্ন করে ওদের কাছ থেকে জানতে পারল যে সাধু দিয়েছে।

রাজার লোক এই খবর রাজাকে বলল। রাজা সাধুকে ডেকে পাঠিয়ে বলল, 'তুমি ভিখিরিদের মধ্যে মোহর বণ্টন করেছ?'

'করেছি।' সাধু বলল।

'কোথায় পেলে?' রাজা বলল।

সাধু নীরব রইল। রাজা রেগে গিয়ে বলল, 'সাধুর বেশ ধরে চুরি করছ?'

এই কথার জবাবেও সাধু নীরব রইল। রাজা আরও রেগে গিয়ে বলল, 'এই কে আছিস, এক্ষুনি এর গর্দান দিয়ে নে।'

রাজার লোক সাধুকে বধ করল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, একটা সাধুকে এভাবে মেরে ফেলা কি ওই রাজার উচিত হয়েছিল? রাজা যে প্রশ্ন করেছিল তার জবাব না দিয়ে সাধু নীরব রইল কেন? সাধু কি জানতে পেরেছিল যে সে চুরির ভাগ নিয়েছিল? নাকি চোরকে বাঁচানোর জন্য সে নীরব রইল? অত বড়ো সাধু যখন, তখন সে নিশ্চয় জানতে পেরেছিল যে তার মৃত্যু আসন্ন। আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

রাজা বিক্রমাদিত্য জবাবে বললেন, 'রাজার বিচার আর সাধুর বিচার এক হয় না। তাদের বিচারের ধারা আলাদা। মানুষকে সাহায্য করাই সাধুর ধর্ম। মানুষের সমস্যাগুলো ধর্মের পথে চলার ফলে হয়েছে না অধর্মের পথে চলার ফলে হয়েছে তাও বিচার সে করে না। সমাধান করাকেই সে নিজের কাজ মনে করে। তাই সে সহজেই গরিব ও ভিখিরিদের মধ্যে মোহরগুলো বণ্টন করতে পেরেছে। চোরকে ধরিয়ে দেওয়া সে নিজের কাজ মনে করে না। পৃথিবীর কোনো কিছুর প্রতি সাধুর আসক্তি নেই। তাই সাধুর মৃত্যুভয়ও নেই। আবার রাজার বিচারে চুরি করা অপরাধ। রাজার কোষাগারের মোহর বণ্টন করা আরও বড়ো অপরাধ।'

রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%