গরিবের দম্ভ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতাে নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, ‘রাজা, তােমার জিদ দেখে আমি খুশি হয়েছি কিন্তু জানাে তাে জিদ মাঝে মাঝে জীবন নিয়ে টানাটানি করে। কিংশুকের কাহিনি শুনিয়ে আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করছি। শুনলে অবশ্য তােমার কষ্ট লাঘব হবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : মণিপুর রাজ্যে অত্যন্ত গরিব একটা লােক বাস করত। তার কোনাে ঘরবাড়ি ছিল না। ছিল না কোনাে আপনজন। এই ধরনের লােক সাধারণত ভিক্ষে করে অথবা খেটে খুটে দিন আনে দিন খায়। কিন্তু কিংশুকের স্বভাব ছিল অদ্ভুত। সে খেটে রােজগার করত না আবার ভিক্ষেও করত না। কেউ তাকে ডেকে খাবার দিলে খেত। আর যেদিন কেউ খেতে দিত না সেদিন সে পুকুরের জল খেয়ে গাছের নীচে শুয়ে পড়ে থাকত।

তার কথা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। তার মেজাজের ব্যাপার নিয়ে অনেকে আলােচনা করত। অনেকে বলত, 'যে খেতে পায় না তার অত দেমাগ কীসের!’ যার দয়া হয় সে কিছু এনে তাকে খেতে দিত। সারাদিন কিংশুক ঘােরাঘুরি করত লােকালয়ে। খেতে পেলে খেত, না পেলে না। নিজে কোনােদিন কারাে কাছে হাত পেতে চাইত না।

কিংশুকের কথা মণিপুরের রাজার কানেও গেল। রাজমহল থেকে রাজা বেরুলে তার অনুচররা তাকে দেখিয়ে বলল, 'মহারাজ, এই সেই দাম্ভিক ভিখিরি কিংশুক। রাজা মনে মনে ঠিক করল সময়মতাে একবার লােকটাকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

একদিন সন্ধ্যার সময় রাজা প্রাসাদের ছাদে বেড়াচ্ছিল। রাজা দেখতে পেল উদ্যানের এক কোণে ভিখিরি কিংশুক শুয়ে ছিল। দেখে মনে হয় যেন সে দু-তিন দিন খেতে পায়নি। তার শরীরে যেন উঠার ক্ষমতাও নেই।

রাজা এক চাকরকে ডেকে বলল, 'ওই উদ্যানে যে লােকটা শুয়ে পড়ে আছে তাকে খাবার এবং দুধ দিয়ে এসাে।'

চাকর এক থালায় খাবার আর এক গেলাসে দুধ নিয়ে গিয়ে কিংশুককে বলল, 'তুমি এই খাবার আর দুধ খেয়ে নাও।'

কিংশুকের পেটে প্রচণ্ড খিদে কিন্তু তার দেমাগ ঠিক আছে। সে খাবার দেখে মনে মনে খুশি হলেও দম্ভভরে চাকরকে জিজ্ঞেস করল, 'এই খাবার কে পাঠিয়েছেন?’

‘রাজা পাঠিয়েছেন?’ চাকর রাজপ্রাসাদের ছাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে জবাব দিল। কিংশুক মাথা তুলে রাজপ্রাসাদের ছাদের দিকে তাকাল। কিন্তু তখন সেখানে রাজাকে দেখতে পেল না।

ভেতরে ভেতরে খিদের জ্বালায় সে ছটফট করছিল। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে খাবার এবং দুধ খেয়ে নিয়ে বলল, 'রাজাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবে।'

চাকর থালা আর গেলাস নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে ফিরতে ফিরতে বলল, 'কাল থেকে তােমাকে আর খিদের জ্বালা সহ্য করতে হবে না। তােমার উপর রাজার নজর পড়েছে। যখনই তােমার খিদে পাবে সােজা এখানে চলে আসবে। পেট ভরে খেতে পাবে।'

রাজার চাকর কিংশুককে ভিখিরি ভেবে নিয়েছিল। কথাটা শুনে কিংশুকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল কিন্তু সে কোনাে জবাব দিল না। এতদিন সে যত লােকের অতিথি হয়েছে তারা সব সাধারণ লােক। আজ থেকে সে রাজার অতিথি।

পরের দিন কিংশুক সারা শহরে পাগলা কুকুরের মতাে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তাকে সেদিন কেউ ডেকে খেতে দিল না। তৃতীয় দিনও সন্ধ্যা পর্যন্ত। ঘুরে দেখল কেউ তাকে খেতে ডাকছে না। অগত্যা সে আবার সেই রাজার উদ্যানে গিয়ে গাছের নীচে শুয়ে পড়ল।

সেদিন সন্ধ্যায়ও রাজার চাকর খাবার, মাংস, ফল, ক্ষীর এনে কিংশুকের সামনে রেখে তাকে বলল, 'তােমাকে তাে আমি বলেছিলাম তুমি এখানে প্রত্যেক দিন ভালাে ভালাে খাবার পাবে। তবু তুমি এলে না কেন? কোথায় ছিল এ দু-দিন?’

‘এই বাগানে শুতে আমার খুব ভালাে লাগে। তাই বলে খিদে পেলেই যে আমি এই বাগানে আসি তা নয়। আবার যখন-তখন আসলে রাজা হয়তাে ভাববেন আমি এখানে খাবার লােভেই আসি।' কিংশুক বলল।

তারপর সমস্ত খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে সেখান থেকে সে চলে গেল। আবার পর পর সাত দিন ধরে তার আর কোনাে পাত্তা নেই।

সাত দিন পরে রাজা কিংশুককে দেখে অবাক হয়ে গেল। বাগানে তার হাঁটা দেখে রাজার মনে হল যেন কঙ্কাল চলেছে। রাজা ডেকে পাঠাল। নিজের চাকরকে। নিজে যে খাবার খায় সেই খাবার তাকে দিয়ে আসতে বলল রাজা। দূর থেকে খাবারের সুগন্ধ পেয়ে কিংশুক মনে মনে খুশি হল। ঢাকনা খুলে দেখে তাতে রাবড়ি মালাই প্রভৃতি দামি খাবার রয়েছে।

সেই খাবার খেয়ে কিংশুক সেই যে গেল আর দশ দিনের মধ্যে সে ওই মুখাে হল না। রাজার মনে আশঙ্কা জাগল কিংশুক মারা গেছে কি না। রাজা অনুচরদের পাঠাল তার খোঁজ করতে।

মৃত্যুপথযাত্রী কিংশুককে অনুচরেরা ধরে এনে রাজার সামনে হাজির করল। তার অবস্থা দেখে কারও চোখে পলক পড়ল না।

তার অবস্থা দেখে রাজার চোখ জলে ভরে গেল। রাজা বলল, ‘কিংশুক আমাকে ক্ষমা কর।'

‘মহারাজ, দোষ তাে আমার। আপনার কোনাে দোষ নেই।' কথাটা শেষ হতেই কিংশুকের ঘাড় কাত হয়ে গেল। সে মারা গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'মহারাজ, কিংশুক রাজার সুস্বাদু খাবার খেয়েও মরতে বসল কেন? কিংশুকই বা বলল কেন যে দোষ তার নিজের? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও উত্তর না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এ-কথায় বিক্রমাদিত্য বললেন, যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে কিংশুক আগে যা পেত তাই খেত। তাতে তার কোনাে অসুবিধা হত না। কিন্তু রাজার দেওয়া খাবার খাওয়ার পর থেকে সে অন্যের দেওয়া খাবার খেতে পারত না। তাই সে দিনের পর দিন দুর্বল হয়ে যেতে লাগল। রাজা কিংশুককে খেতে দিয়েছিল পরীক্ষা করতে। তার প্রতি দয়া দেখানাের জন্য নয়। রাজা ভেবেছিল কিংশুক তার খাবারের লােভে প্রত্যেক দিন তার উদ্যানে আসবে। ফলে তার অহংকার বা দম্ভ চূর্ণ হবে। প্রথম প্রথম মনে হল রাজার পরিকল্পনা সফল হতে চলেছে। কারণ কিংশুক দু-বার শুধু খাবার লােভেই উদ্যানে গিয়েছিল। কিন্তু যখন সে টের পেল যে তার দম্ভের খুঁটি নড়ে যাচ্ছে তখন সে দম্ভ ঠিক রাখার জন্য বদ্ধপরিকর হল। ফলে মৃত্যুর দিকে ছুটে গেল। রাজা ভাবতেই পারেনি যে সে নিজের জীবন নিয়ে এভাবে খেলা করবে। কিংশুকের মৃত্যুর কারণ রাজার পরীক্ষা। এই কথা বুঝে রাজা তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। আবার কিংশুক নিজের দোষ স্বীকার করার কারণ সেও ভেবেছিল যে পর পর দু-বার রাজা দয়া করেছেন ভেবে উদ্যানে না এলে সে বেঁচে থাকতে পারত। আসাটাই তার অন্যায় হয়েছে। রাজার মতলব বুঝতে না পারা তার ভুল হয়েছে। রাজা যে তার দম্ভ চূর্ণ করার পরিকল্পনা করেছে এটা বুঝতে না পারাটাই কিংশুকের মস্তবড়াে দোষ হয়েছে।'

রাজার এইভাবে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবের সাথে হাওয়া হয়ে গেল। ঝুলে পড়ল আবার সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%