ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে এসে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, তুমি হয়তো কোনো আশা পূরণ করার জন্য এত পরিশ্রম করছ কিন্তু মনে রেখো অনেক সময় আশা পূরণ হওয়ার পরিবর্তে অনেক বিপদ-আপদ দেখা দেয়। আমার কথার প্রমাণ স্বরূপ তোমাকে সুবর্ণকুমারীর বিবাহের ঘটনা বলব। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথ চলার পরিশ্রমও কমে যাবে।' তারপর বেতাল কাহিনি শুরু করল
প্রাচীন কালে চন্দ্রগিরির রাজা ছিল রবিবর্মা। সন্তান বলতে তার ছিল মাত্র একটি কন্যা। তার নাম সুবর্ণকুমার। রবিবর্মা মেয়েটিকে ঠিক মেয়ের মতো ঘরকুনো করে না রেখে ছেলের মতো বেড়ে উঠতে সাহায্য করল। দেখতে দেখতে সুবর্ণকুমার নানা ধরনের অস্ত্র চালনায় পোক্ত হয়ে গেল। সহজে কেউ তাকে হারিয়ে দিতে পারত না। গোটা চন্দ্রগিরি দেশে এমন কেউ ছিল না যে তাকে অস্ত্রচালনায় পরাজিত করতে পারে। অতি অল্পবয়স থেকেই সুবর্ণকুমারী বাপের সঙ্গে যুদ্ধে যেত। ফলে তার সাহস ভীষণভাবে বেড়ে গিয়েছিল। শেষের দিকে এমন হল যে সে যুদ্ধ করতে এসেছে শুনে শত্রুপক্ষের বড়ো বড়ো যোদ্ধারাও ভয়ে কাঁপত। শুধু যোদ্ধা হিসেবেই নয়, সুন্দরী হিসেবেও সুবর্ণকুমারীর নাম হয়েছিল।
সুবর্ণকুমারী বড়ো হল। তার বিয়ের বয়স হল। রাজা রবিবর্মা বুঝলেন রাজকুমারীর সঙ্গে দুর্বল কোনো কুমারের বিয়ে হলে ভালো হবে না। অস্ত্রচালনায় যে সুবর্ণকুমারীকে পরাজিত করতে পারবে তার সঙ্গেই বিয়ে হওয়া উচিত। এই কথা তিনি ঘোষণাও করে দিলেন।
এই ধরনের একটা কিছু যে ঘটবে তা বহু রাজকুমার আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিল। কিছু কিছু রাজকুমার আগে থেকেই সুবর্ণকুমারীকে বিয়ে করার জন্য মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল। শুধু রূপবতী সুবর্ণকুমারীকে পাওয়াই নয়, ভবিষ্যতে সুবর্ণকুমারীর স্বামীই হবে চন্দ্রগিরির রাজা।
রাজা ঘোষণা করে দিলেন, অমুক দিনে প্রতিযোগিতা হবে। প্রতিযোগী এল না তবে অসংখ্য দর্শক এল।
এদিকে রাজকুমারী প্রস্তুত ছিল। প্রত্যেকের মুখে এক প্রশ্ন, 'কী হল? এত বড়ো প্রতিযোগিতায় কেউ এল না।'
অনেকক্ষণ পরে দর্শকদের ভেতর থেকে একজন শিকারি এগিয়ে এসে রাজাকে বলল, 'মহারাজ, আমি রাজকুমারীর সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে রাজি আছি।'
শিকারির ছদ্মবেশে যে এসেছিল সে ছিল এক রাজকুমার। নাম সুধীর। প্রসন্নদেশের যুবরাজ সে।
সুবর্ণকুমারী সদম্ভে তাকে বলল, 'আমি যখন যে ধরনের অস্ত্র চালনা করব তখন আপনাকেও সে ধরনের অস্ত্র চালনা করতে হবে।' বলে রাজকুমারী আকাশের দিকে দুটো তির নিক্ষেপ করল। কিছুক্ষণ পরে একটি তিরকে আর একটি তির বিদ্ধ করে দুটোই একসঙ্গে মাটিতে পড়ল। দর্শক অবাক।
তারপর সুবর্ণকুমারী নিজের তির-ধনুক সুধীরের হাতে দিল। সে একটার পর একটা তিনটে তির আকাশের দিকে ছুড়ল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল একটার গায়ে আর একটা বিদ্ধ হয়ে তিনটে তির একসঙ্গে মাটিতে পড়ল। দর্শকরা আরও অবাক হয়ে গেল।
তারপর শুরু হল তরবারির যুদ্ধ। সুবর্ণকুমারীর দুই হাতে দুটো তরবারি। সুধীরেরও দু-হাতে দুটি তরবারি। দু-জনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সুধীর সুবর্ণকুমারীর দু-হাতের দুটো তরবারিই উড়িয়ে দিল। তারপর নিজের তরবারি মাটিতে পুতে দাঁড়িয়ে রইল।
জয় যে সুধীরের হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ রইল না। রাজা খুব খুশি হয়ে ঘোষণা করার মতো সুধীরকে বলল, 'আমার ঘোষণা অনুযায়ী তোমার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে হবে। আমার মৃত্যুর পর তুমিই হবে এ দেশের রাজা।'
সুধীর জবাবে রাজা রবিবর্মাকে বলল, 'আমি বিয়ে করার উদ্দেশ্যে আসিনি। আপনার মেয়েকে পরাজিত করতে এসেছি। পরাজিত রাজকুমারীকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।' বলে সে হাতির পিঠে চেপে চলে গেল। রাজা রবিবর্মা হতাশ হল।
কিছুদিন পরে প্রসন্নদেশের রাজকুমার সুধীর সুবর্ণকুমারীকে বিয়ে করার প্রস্তাব রবিবর্মার কাছে পাঠাল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'রাজা কাহিনি শোনালাম, এখন আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। সুধীর রাজকুমার হিসেবে না এসে শিকারির ছদ্মবেশে এল কেন? ওর মনে কি পরাজিত হওয়ার ভয় ছিল? নাকি জয়ী হলে রাজকুমারী এক শিকারিকে বিয়ে করতে রাজি হবে কি না, সেটা পরীক্ষা করে দেখা উদ্দেশ্য ছিল? রাজকুমারীর রূপ কি সুধীরের পছন্দ হয়নি? তাই যদি হয় কিছুদিন পরে সুধীর সুবর্ণকুমারীকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠাল কেন? অন্য রাজকুমাররা সুবর্ণকুমারীকে বিয়ে করতে রাজি হল না কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও, তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'এসব কিছুর জন্য দায়ী রবিবর্মার ঘোষণা। এই পদ্ধতিতে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যে ভুল, বিবেকহীনের কাজ তা সুধীর শিকারির ছদ্মবেশে এসে প্রমাণ করে দিল। রাজকুমাররা আসেনি বলেই সুধীর ছদ্মবেশে এল। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যখন মেয়ের বিয়ে হল না, তখন রাজা বিভিন্ন রাজকুমারদের ডেকে পাঠাতে লাগলেন। কিন্তু রাজকুমাররা এল না। কারণ তাদের ধারণা ধর্মত রাজকুমারী শিকারির স্ত্রী হয়ে গেছে। যে মুহূর্তে রাজা রাজকুমারদের ডেকে পাঠালেন সেই মুহূর্তে সেও সুবর্ণকুমারীকে বিয়ে করবে ঠিক করে নিল।'
এইভাবে রাজা বিক্রমাদিত্যের মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন