যখন যা হওয়ার

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছের উপরে উঠে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগোতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'মহারাজ, কপালের লিখন মুছে ফেলার জন্য অনেকে অনেক রকমের চেষ্টা করে থাকে। তাদের চেষ্টায় ফাঁকিও থাকে না। কিন্তু এটাও ঠিক যে সেই লিখন মুছে ফেলার চেষ্টা ফলবতী হয় না। অতএব চেষ্টা করারও কোনো মানে হয় না। নিরর্থক প্রয়াস। আমার কথা যে মিথ্যা নয় তার প্রমাণ স্বরূপ আমি একটি কাহিনি বলছি। শুনলে বুঝতে পারবে যে তোমার মতো অতীতেও কোনে কোনো লোক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হতে পারেনি।' বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে চন্দনপুরের রাজা ছিলেন নন্দনবর্মা। অনেক বছর পরে, হয় না, হয় না, শেষে তাঁর একটি ছেলে হল। রাজা নিজের জ্যোতিষীকে ডেকে ছেলের ঠিকুজি তৈরি করালেন।

জ্যোতিষী রাজার কাছ থেকে বাড়ি ফিরে আসতেই দেখে তার স্ত্রীও আঁতুড়ঘরে। তার একটি ছেলে হল। জ্যোতিষী রাজার ছেলের ভবিষ্যৎ এবং নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ গণনা করে ঠিকুজি লিখে পাশাপাশি রেখে বিচার করতে লাগল। ঠিকুজি অনুসারে তার ছেলের কুড়ি বছর বয়সে রাজযোগ আছে। সেইসময় রাজার ছেলের দুটো সাংঘাতিক ফাঁড়া আছে।

প্রথমে জ্যোতষী ভাবল, যা সত্য তাই বলে দেবে। কিন্তু পরে ভেবে দেখল, তা করা ঠিক হবে না। অপ্রিয় সত্য কথা বলার বিপদ আছে। নিজের ছেলে রাজা হবে আর ঠিক সেইসময় রাজার ছেলের দুটো ফাঁড়া আছে। বিষয়টি রাজা যখন খতিয়ে বিচার করবেন তখন কী ভাববেন কে জানে! আবার রাজা সত্য ঘটনা জেনে কুড়ি বছরের আগেই যজ্ঞ করে ফাঁড়া কাটিয়ে দিতে পারেন। কুড়ি বছরের আগেই ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে দিতে পারেন।

অনেক ভেবে জ্যোতিষী ঠিক করল রাজাকে মিথ্যা কথাই বলবে। সে রাজাকে বলল, 'মহারাজ, আপনার পুত্রের ভাগ্য খুব ভালো। তবে কুড়ি বছর বয়সের আগে তাকে কোনোক্রমেই সিংহাসনে বসানো উচিত হবে না।'

রাজা নিজের ছেলের নাম রাখল আনন্দবর্মা। জ্যোতিষীর ছেলের নাম হল সুন্দরসেন। দু-জনে একই শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া শুরু করল। দু-জনের গুরু এক। দু-জনেই একই সময় কুড়ি বছর বয়সে পা রাখল। একদিন জ্যোতিষীর ছেলে সুন্দরসেন বাবাকে বলল, 'বাবা, আমি যা শিখেছি তা সম্পূর্ণ করতে হলে দেশে দেশে ঘুরতে হবে। তাই দেশান্তরে যাওয়ার অনুমতি চাইছি।'

'অনুমতি আমি দিতে পারি। তবে একটা শর্তে। ছ-মাসের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে। আর তা যদি না পার যেতে দেব না।' জ্যোতিষী বলল।

সুন্দরসেন বাবার কথামতো ছ-মাসের মধ্যে ফিরে আসতে রাজি হল। রওনা হয়ে গেল সেই দিনেই।

ছ-মাস হয়ে গেল। কিন্তু সুন্দরসেন ফিরে এল না। জ্যোতিষী খুব দুর্ভাবনায় পড়ল। ছ-মাস পরে প্রতিটি দিন ছেলের আসার অপেক্ষায় কাটাতে লাগল জ্যোতিষী। একমাস দু-মাস করে পাঁচ মাস কেটে গেল। কিন্তু সুন্দরসেন আসেনি। এদিকে রাজার ছেলের যে দুটো ফাঁড়া ছিল তারও কোনো হদিশ পেল না। ছেলের কিছুই হল না। তার দু-মাসের মধ্যে আনন্দবর্মাকে সিংহাসনে বসানোর কথা। রাজা নন্দনবর্মা ঘোষণা করে দিলেন। ঘোষণার পর জ্যোতিষীর মনে আরও চাঞ্চল্য দেখা দিল।

কিছুতেই কিছু যখন হল না জ্যোতিষী ঠিক করল, রাজার ছেলে সন্ধের সময় যখন গাছের নীচে বসবে তখন তার মাথায় একটি পাথর ফেলে দেবে। সে একটি বড়ো পাথর এমনভাবে গাছে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখল যাতে দূর থেকে দড়ি টেনে পাথরটা আনন্দবর্মার মাথায় ফেলা যায়।

সব ঠিকঠাক। আনন্দবর্মা যথাসময়ে সেই গাছের নীচে এল। বসল। জ্যোতিষী দূর থেকে দড়িতে টান দেওয়ার পূর্বমুহূর্তে অদূরের একটি ফুল তুলে আনার জন্য আনন্দবর্মা উঠে গেল। তার উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বড়ো পাথর পড়ার শব্দ হল। আনন্দবর্মা ফিরে দেখে, সে যেখানে বসেছিল সেখানেই পাথরটা পড়ে আছে। অবস্থা দেখে আনন্দবর্মা অবাক হল। কাছে গিয়ে দেখে, পাথরের সঙ্গে একটি দড়ি বাঁধা আছে। বুঝল, তাকে মেরে ফেলার জন্য কেউ এসব করেছে। কিন্তু সে কাউকে বলল না। সে ভাবতেও পারল না।

আনন্দবর্মা বিস্ময়ে বলে উঠল, 'আজ সন্ধ্যায় পাথর মাথায় ফেলে আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা তুমিই তাহলে করেছিলে। আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঘটবে আমার জীবনে। তাই আজ রাত্রে পাহারাদারকে বলেছিলাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার মতো অভিনয় করতে। পাহারাদার কাঠ হয়ে পড়েছিল। তুমি ভাবলে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।'

জ্যোতিষী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, গত কুড়ি বছরের ঘটনা সংক্ষেপে আনন্দবর্মাকে বলল। শুনে আনন্দবর্মা হো হো করে হেসে উঠল, 'এ তো আনন্দের কথা। তোমার গণনার মতোই তো সব কিছু ফলেছে। আমার জীবনে দুটো ফাঁড়া ছিল। দুটোই তো ফলে গেল। আর তোমার ছেলে যে এই দেশেরই রাজা হবে সেটা তো আর তোমার গণনায় ছিল না। অন্য দেশেও তো হতে পারে।'

আনন্দবর্মা যা অনুমান করেছিল তাই হল। সুন্দরসেন দেশে দেশে ঘোরার সময় সে এক রাজাকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। রাজা প্রাণে বেঁচে সুন্দরসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। সেই রাজা ছিল বৃদ্ধ। তার কোনো ছেলে ছিল না। খবরটা চন্দনপুরের রাজার কাছেও পৌঁছাল। হঠাৎ রাজা হওয়ার ফলেই সুন্দরসেন ছ-মাসের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারেনি। বাপকে যে কথা দিয়েছিল তা রাখতে পারেনি। এত বড়ো ঘটনার পরেও আনন্দবর্মা জ্যোতিষীর উপর কোনো প্রতিশোধ নেয়নি। তাকে তার ছেলের কাছেও পাঠিয়ে দেয়নি। বরং নিজের কাছেই জ্যোতিষীকে রেখে দিল। কিন্তু জ্যোতিষী সে দেশে থাকতে আর চাইল না। আনন্দবর্মার সামনে সে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারত না। তাই একদিন স্বেচ্ছায় সে সপরিবারে ছেলে যে দেশের রাজা হয়েছে সেই দেশে চলে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, যে জ্যোতিষী দু-দু-বার তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করল সেই জ্যোতিষীকে আনন্দবর্মা ক্ষমা করল কেন? লোকে যে বলে বিধাতার লিখন মানুষের মাধ্যমেই ফলবতী হয় তাহলে জ্যোতিষীর চেষ্টা বিফল হল কেন? জ্যোতিষী এত চেষ্টা করেও যখন পারল না, বিধাতার ইচ্ছা অনুযায়ী আনন্দবর্মা যখন বেঁচেই গেল তখন আমাদের বুঝতে হবে মানুষের চেষ্টা বৃথা। তাই না? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই কথার জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'আনন্দবর্মা বুঝেছিল যে জ্যোতিষীর গণনা সঠিক। তাই জ্যোতিষীকে তার কাছেই থাকতে বলল। জ্যোতিষী মনে মনে আনন্দবর্মাকে স্নেহ করত। একদিন সে যা করল তা তার মতিভ্রমের ফল। তারপর যখন ধরা পড়ল, আনন্দবর্মা যখন ক্ষমা করল তখন সে মনে মনে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। তাই সে একদিন আর থাকতে না পেরে স্বেচ্ছায় সপরিবারে মাথা নীচু করে নিজের ছেলের রাজত্বে চলে গেল।

রাজার এভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%