ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
বেতাল বলল : কলিঙ্গ দেশে বীণাবন্ত নামে এক বৈদ্য রােগীদের সেবা করত। উনি অনেক অদ্ভুত রকমের চিকিৎসা করে ধন্বন্তরি নামে অভিহিত হয়েছিলেন। উনি পরম শিবভক্ত ছিলেন। উনি প্রায় সবসময় শিবালয়ে থাকতেন। কী রাত্রে কী দিনে যারা ওঁর সাথে দেখা করতে চাইত তারা ওই শিব মন্দিরে গিয়ে ওকে ঠিক পেয়ে যেত।
বীণাবন্তের ঘরবাড়ি স্ত্রী-পুত্র পরিবার যে ছিল না তা নয়। কিন্তু উনি নিজের বাড়িতে ছ-মাসে ন-মাসে যেত। সংসারের প্রতি তার কোনােদিনই টান ছিল না একবার এক ধনী ব্যক্তিকে চিকিৎসা করে মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচিয়ে তুলল। সেই ধনী ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা বশত তাঁর সাথে নিজের মেয়ে যশােধরার বিয়ে দেয়, ওদের থাকার জন্য একটি বাড়িও তুলে দিয়েছিল।
স্ত্রীর প্রতি বীণাবন্তের টান যে ছিল না তা নয়। তার সন্তানও হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পরও তার চরিত্রে তেমন কোনাে পরিবর্তন দেখা দিল না। শিবালয়ে পড়ে থাকত রাতদিন। ওখানেই রুগিদের দেখত। অর্থও রােজগার হত। কিন্তু টাকা বাড়িতে আসত না। শিব মন্দিরে গরিব শিবভক্তদের ওই অর্থ দিয়ে দিত। মাঝে মাঝে স্ত্রী খবর পাঠাত : সংসার চালানাে যাচ্ছে না টাকার অভাবে। তখন বীণাবন্ত হাতে যে টাকা থাকত তা পাঠিয়ে দিত।
যশােধরা অভিমানী ছিল। মুখে কিছু বলত না। সংসারের সব কাজ নিজের বিচারবিবেচনা করে সামলে নিত। কিন্তু কাহাতক আর একা বেচারা সামাল দিতে পারে। তাই একদিন নিজের বাড়ি যশােবন্ত নামে এক ধনীর কাছে বিক্রি করে দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। সব চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল এত বড়াে যে একটা ঘটনা ঘটে গেল তাতে বীণাবন্তের মনে কোনাে চাঞ্চল্য ছিল না।
যশােধরার কাছে যে যশােবন্ত বাড়ি কিনেছিল সে ছিল খুব নাস্তিক। কোনাে দেবতাকে প্রণাম না করেই সে অনেক টাকা রােজগার করেছিল। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বীণাবন্তের হাতযশ যেমন ছিল ব্যাবসার ক্ষেত্রে যশােবন্তেরও তেমনি হাতযশ ছিল।

যশােবন্তের দুই বউ একের-পর-এক মারা গেল। কোনাে বউ-এর একটাও বাচ্চা হল না। ওর তৃতীয় বউ গর্ভবতী হল। যশােবন্তের আনন্দের সীমা নেই। ওর বউ বলল, 'ঈশ্বরের অশেষ করুণায় আমি মা হতে চলেছি।' ওর কথা শুনে যশােবন্ত বলল, 'যা ইচ্ছে ভাবতে পার, বলতে পার, আমি কিন্তু ভগবানের করুণা-রুনা বলে মনে করি না।'
যশােবন্তের স্ত্রী নয় মাস পর এক পুত্র সন্তান প্রসব করল। কিন্তু ওই সন্তান নড়ে না চড়ে না। ডাকে না কাঁদে না। যেন মৃত। চামড়া হাড্ডিসার দেহ। কিন্তু ও বুকের উপর কান রেখে ভালাে করে শুনলে ঢিপ ঢিপ শব্দ শােনা যায়।
‘এই বাচ্চাকে একমাত্র বীণাবন্ত ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারে না।' বলল যশােবন্তের বন্ধুরা।
বীণাবন্তের প্রতি যশােবন্তের একটা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভাব ছিল লােকটা একটা আকাট। নিজের পরিবার দেখাশােনার যার ক্ষমতা নেই সে আবার কেমনতরাে মানুষ।
এই ধরণের মনােভাব থাকা সত্ত্বেও অনেক সাধ্য সাধনার পর যে সন্তান হল তাকে বাঁচানাের আশায় বন্ধুদের কাছে যশােবন্ত বলল, 'তাহলে ওকে এখানে ডেকে পাঠানাে হােক।'
ওর বন্ধুরা শিবালয়ে গিয়ে বীণাবন্তকে সব বলে ওদের সাথে আসতে বলল।
‘ওই নাস্তিকের কাছে আমি যাব না। ও এই শিবালয়ে এসে শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে অপরাধ স্বীকার করে নিলে ওর বাচ্চার চিকিৎসা করব। তারপর যা শিবের ইচ্ছা তাই হবে।' বলল বীণাবন্ত।
যশােবন্ত তার বাচ্চাকে নিয়ে শিবালয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে বীণাবন্তের কাছে রেখে, শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। যশােবন্ত এসব করল নিতান্তই বীণাবন্তকে খুশি করার জন্য। শিবের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বা তার প্রতি বিশ্বাস থাকার জন্য নয়।
বীণাবন্ত তার থলে থেকে একটা বড়ি বের করে অল্প ভিজিয়ে বাচ্চার ঠোঁটে ঘষে দিল। তৎক্ষণাৎ বাচ্চাটা নড়েচড়ে উঠে কাঁদতে শুরু করে দিল। এই ব্যাপার দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে যশােধরা তার কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শিবালয়ে এসে, 'ওগাে আমাদের বাচ্চাটাকে বাঁচাও।' বলে কোলের বাচ্চাটাকে স্বামীর সামনে শুইয়ে দিল।
বীণাবন্ত বাচ্চাটার নাড়ি পরীক্ষা করে বাচ্চাটার মুখে একমাত্রা ওষুধ দিল। ওই বাচ্চাটা একবার চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণে মারা গেল।
বীণাবন্ত সটান শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টাঙ্গে পড়ে প্রণাম করে প্রার্থনা করল বাচ্চাটাকে বাঁচানাের। কিন্তু কোনাে ফল হল না।
বীণাবন্ত তার ওষুধের পোঁটলা শিবলিঙ্গের মাথায় ছুড়ে কোথায় চলে গেল। আর কোনােদিন মন্দিরের ত্রিসীমানায় পা রাখেনি। অনেকদিন পর শিবের বাৎসরিক উৎসবের দিনে এসে শিবের উপর দূর থেকে ঢিল ছুড়তে লাগল। সবাই ভাবল বীণাবন্ত পাগল হয়ে গেছে।
বেতাল এই গল্প বলে বলল, ‘রাজা, পরমভক্ত বীণাবন্ত বেশ তাে ছিল কিন্তু হঠাৎ চরম নাস্তিক হয়ে গেল কেন? আর চরম নাস্তিক যশােবন্ত রাতারাতি পরমভক্ত হয়ে গেল কেন? মানুষ যে ভগবানকে বিশ্বাস করে সেটা কি শুধু নিজের স্বার্থরক্ষার্থেই? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না বল তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
ওই কথা শুনে বিক্রমাদিত্য বলল, মানুষ স্বার্থ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করে না। যশােবন্তের সন্তান বেঁচে গেছে বলেই সে ভগবানের ভক্ত হয়েছে। ঠিক ওই ধরনের স্বার্থের কারণেই বীণাবন্তও ভগবানের উপর বিশ্বাস রেখে ছিল। নিজের ওষুধের উপর তার কোনােদিনই বিশ্বাস ছিল না। উনি বরাবর নিজের নিমিত্ত ভাবতেন। ওঁর ওষুধে কিছু হয় না। যা করেন ভগবান করেন। এত গভীর বিশ্বাসের জন্যই নিজের সন্তান মারা যাওয়াতে অমন চট করে সেই বিশ্বাস উবে গেল। চিকিৎসার ত্রুটির জন্যই যে সন্তান মারা গেছে সে-কথা বীণাবন্ত ভাবতে পারেননি। ভেবেছেন শিব মেরে ফেলেছেন। এইভাবে রুগি এবং ওষুধের মধ্যে শিবকে শিখণ্ডী রাখার ফলেই তার অত বড়াে চিকিৎসা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে পাগল হল।
রাজার মুখ খুলতেই বেতাল শবসহ পালিয়ে গিয়ে উঠে বসল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন