পরিবর্তন

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে চুপচাপ শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, আমি জানি না কীসের আশায় এই মাঝ রাতে তুমি এত পরিশ্রম করছ। এই পৃথিবীতে কিন্তু বিনা কারণেই বন্ধু শত্রু হয়ে যায় আবার শত্রু বন্ধু হয়। আমার বক্তব্য বুঝতে পারবে একটি কাহিনি শুনে। গল্প শুনলে তােমার পরিশ্রমও কমতে পারে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমবর্মা শাসন কাজে খুব দক্ষ ছিল। প্রজাদের সুখ-সুবিধের দিকে খুব নজর ছিল তার। ফলে তার উপর প্রজাদের ছিল অগাধ বিশ্বাস। রাজার আদেশে, এমনকী, তারা আগুনে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত ছিল।

রাজা বিক্রমবর্মার এই সুখ্যাতি পাশের দেশের রাজা দেবরাজের কাছে অসহ্য ছিল। দেবরাজের প্রজারা তার উপর রেগে ছিল। তারা বিক্রমবর্মাকে প্রশংসা করত। কারণ তারা দেবরাজের অত্যাচারের জ্বালায় জর্জরিত ছিল। দেবরাজ যুদ্ধ করে বিক্রমবর্মাকে হারাতে পারে না। বিক্রমপুরে যতদিন না অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ছে ততদিন সে বিক্রমবর্মাকে পরাস্ত করতে পারে না।

অনেক ভেবে দেবরাজ একটা চক্রান্ত করল। দেবরাজ এবং বিক্রমবর্মার রাজ্যের মাঝে অনেক ঘন বন ছিল। সেই বনে ছিল অনেক উপজাতি। তারা থাকত ছােটো ছােটো দলে। অনেকগুলাে অঞ্চলে ভাগ হয়ে থাকত তারা। তারা শান্তিতে নিজেরা নিজেদের মতাে বাস করত। একদিন দেবরাজ গােপনে বনের উপজাতির দলের নেতাদের ডেকে পাঠিয়ে তাদের বলল, 'তােমরা যেভাবে আছ তা দেখে আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। বনের জানােয়ারও এত কষ্টে থাকে না। বিক্রমপুর স্বর্গের মতাে একটা দেশ। তােমরা সবাই জোট বেঁধে ঢুকতে পার না বিক্রমপুর রাজ্যে ? তােমাদের বাধা দেবার ক্ষমতা আছে ওই বিক্রমবর্মার? ওর শক্তি কতটুকু! তােমরা ইচ্ছে করলে হেলায় বিক্রমপুর থেকে ধনসম্পত্তি লুঠ করে আনতে পার। বিক্রমপুরের সেনারা যদি তেমন আক্রমণ করতে আসে, তােমাদের ভয় কী? তােমরা চলে আসবে আমার রাজ্যে। আমি তােমাদের আশ্রয় দেব। আর দেরি নয়। এবার তােমরা যাও। আক্রমণ কর বিক্রমপুর। খেয়ে-পরে আনন্দে থাক। মানুষের মতাে বাঁচতে শেখ।'

দেবরাজের কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে বনের বাসিন্দারা বিরাট বাহিনী গঠন করে বিক্রমপুর আক্রমণ ও লুঠ করতে লাগল।

বিক্রমবর্মা তার দেশের উপর আক্রমণ যে পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে তা লক্ষ করল। লুণ্ঠনকারীদের ধরার ভার দিল প্রজাদের উপর। জনতা লুণ্ঠনকারীদের ধরার উদ্যোগ নিল। রাতদিন পাহারা দিতে লাগল। বহু লুণ্ঠনকারীকে ধরল। জনতা যাদের ধরল বিক্রমবর্মা তাদের দেশদ্রোহী বলে ঘােষণা করে ফাঁসি দিল।

তারপর রাজা বিক্রমবর্মা বনের ওই অধিবাসীদের কাছে খবর পাঠাল, 'আমি তােমাদের স্বাধীনতায় কোনাে হস্তক্ষেপ করিনি, করব না। তােমরা ইচ্ছে করলে আমার রাজ্যে এসে বাস করতে পার। কিন্তু যদি চুরি করতে আসাে তাহলে ফাঁসি দেব।'

যে লুণ্ঠন শুরু হয়েছিল তা ঘােষণার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। দেবরাজ আশা করেছিল বিক্রমপুরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বনের অধিবাসীরা বিক্রমবর্মার ঘােষণা সঠিক বলে গ্রহণ করল।

কিন্তু ওদের মধ্যে একজন অন্য কথা মনে মনে ভেবে রাখল। তার নাম ভীম। বিক্রমপুরের কাছাকাছি একটা বনে ভীম আর তার দাদা রাম বাস করত। রাম বনের আর দশজন অধিবাসীদের সঙ্গে মিলেমিশে থেকে ওদের মতােই কাজ করে জীবনযাপন করত। ভীম কাঠ কাটত আর সেই কাঠ বিক্রমপুরে বিক্রি করে পয়সাকড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরত। ফলে শহরের জীবনের সাথে সে ভালােভাবেই পরিচিত ছিল। শহরের বেশ কিছু লােকের সাথে তার চেনাজানা এমনকী বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল। বিক্রমপুরে যারা লুণ্ঠন করতে গিয়েছিল তাদের দলে ছিল রাম। অন্যদের মতাে সে-ও ধরা পড়েছিল। ফলে তার ফাঁসি হল। ভীমের কাছে ব্যাপারটা ভীষণ খারাপ লাগল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে রাজা তাকে ফাঁসি দিয়েছে তাকে বধ করে তার দাদার আত্মাকে শান্তি দেবে।

প্রতিবেশী রাজা দেবরাজও বিক্রমবর্মাকে শেষ করে ফেলবে ঠিক করল। সে বুঝতে পারল যে কোনােক্রমে বিক্রমবর্মার রাজ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তারপর সে একটা ছােটো সেনাবাহিনীকে বিক্রমবর্মা যে বনে শিকার করে সেই বনে পাঠিয়ে দিল। সৈনিকদের কাজ হবে বিক্রমবর্মার অপেক্ষায় ওত পেতে বসে থাকা। একদিন বিক্রমবর্মা সদলে শিকার করতে ওই বনে এল। দেরবারজের সেনারা বিক্রমবর্মার দলের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। ওই সেনাদের নেতা বিক্রমবর্মাকে আক্রমণ করল। উভয় পক্ষের তরবারি যুদ্ধ হল অনেকক্ষণ।

বিক্রমবর্মার শিকার করতে বনে আসার খবর ভীমও পেয়েছিল। সে-ও তির-ধনুক নিয়ে বনের ওই জায়গায় পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়ে দেখে বিক্রমবর্মা তরবারি যুদ্ধে মেতে রয়েছে। তখন সেই যুদ্ধ কিছুক্ষণ দেখে বিক্রমবর্মার দিকে তাক করে ভীম তির ছুঁড়ল। কিন্তু সেই তির লাগল গিয়ে বিক্রমবর্মার সঙ্গে যুদ্ধরত সৈন্যবাহিনীর নেতার গায়ে। সে তক্ষুনি মারা গেল। নেতার মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখে দেবরাজের সেনারা ছুটে পালাল।

বিক্রমবর্মা ভাবল ভীম সেনা-নেতাকে তাক করেই তির ছুঁড়েছে। তাই সে ভীমের কাছে তার উপকারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাল। ভীমকে নিজের সঙ্গে রাজধানীতে নিয়ে গিয়ে নিজের দেহরক্ষক করে নিল। ভীম মনে মনে ভাবল দেহরক্ষকের চাকরি নিলে ভালােই হবে। বিক্রমবর্মাকে বধ করা খুব সহজ হবে। এ-কথা ভেবে ভীম দেহরক্ষকের চাকরি নিল। দেবরাজ যখন দেখল যে তার দ্বিতীয় চালও খাটল না তখন সে আর একটা চক্রান্ত করল। সে বিক্রমবর্মার সেনাপতির কাছে গােপনে দূত পাঠাল। দূত ওই সেনাপতিকে বলল, 'আপনি বিক্রমবর্মাকে বধ করলে আপনাকে বিক্রমপুরের রাজ সিংহাসনে বসাব। বিক্রমবর্মার মারা যাওয়ার পর যদি দেশবাসী বিদ্রোহ করে তখন সেই বিদ্রোহ আপনার এবং আমার সেনারা একযােগে দমন করবে। আপনাকে সিংহাসনে বসানাের পর দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হবে।'

রাজা হওয়ার লােভ পেয়ে বসল বিক্রমবর্মার সেনাপতির। দেবরাজের টোপ সে চমকার খেল। ঠিক করল নিজের রাজাকে বধ করবে। একদিন রাত্রে রাজার শােওয়ার ঘরে সেনাপতি গিয়ে জরুরি কথা সারতে চাইল। রাজা সরল বিশ্বাসে সেনাপতির সাথে কথা বলতে বসল।

ভীমও বিক্রমবর্মাকে বধ করার সুযােগের অপেক্ষায় ছিল। কিছুতেই ঠিক সুযােগ পাচ্ছিল না। শেষে সে ঠিক করল শােওয়ার ঘরেই রাজাকে হত্যা করবে। তক্কে তক্কে ছিল ভীম। সেনাপতির রাজার শােওয়ার ঘরে ঢুকে বেরুতে দেরি হচ্ছে দেখে ভীমও পা টিপে টিপে ঢুকল। একবার রাজাকে যে লােকটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে তার অঙ্গরক্ষকের পদ পেয়েছে তাকে আটকাতে সাহস করেনি ওই ঘরের পাহারাদার।

বিক্রমবর্মার শােওয়ার ঘরে ঢুকেই ভীম চমকে উঠল। সে দেখতে পেল রাজা সেনাপতির হাত শক্ত করে ধরে রয়েছে। সেনাপতির হাতে মস্তবড়াে ছােরা। সেটাকেই সুবর্ণ সুযােগ ভেবে ভীম তরবারি ছুঁড়ে দিল রাজার দিকে। কিন্তু তরবারি সােজা বিঁধল গিয়ে সেনাপতির বুকে।

রাজা ভীমকে আন্তরিকভাবে প্রশংসা করল। পরের দিন তাকে নতুন সেনাপতির পদে নিযুক্ত করার কথা ঘােষণা করল।

এই ঘটনার পর ভাইকে ফাঁসি দেওয়ার প্রতিশােধ নেবার ইচ্ছে ভীমের মন থেকে একেবারে লােপ পেল। ক্রমে ভীম রাজার অত্যন্ত বিশ্বাসী ভক্তে রূপান্তরিত হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, ভীম প্রতিশােধ নেবার প্রতিজ্ঞা কেন পালন করল না? কারণটা কি এই যে রাজা তাকে উচ্চ পদে বসিয়েছিল? নাকি রাজার প্রতি ঈশ্বরের অপার করুণা ছিল। এই প্রশ্নের সমাধান জানা সত্ত্বেও না বললে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এ-কথায় বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘ভীমের মনে পরির্তন আসার কারণ এগুলাে নয়। আস্তে আস্তে ভীম বুঝেছিল তার দাদা রামকে ফাঁসি দেওয়ার রাজার ইচ্ছে ছিল না। রাজার একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাজত্ব রক্ষা করা। এমনকী বনের অধিবাসীরাও বলেনি যে রাজা ফাঁসি দিয়ে অন্যায় কাজ করেছে। অতএব, মানতেই হবে যে রাজার কাজের প্রতি কারও মনে অবিশ্বাস জাগেনি। ভীমের মনেও সেই বিশ্বাসই দানা বেঁধে উঠতে লাগল।

রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ঝুলে পড়ল ওই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%