ঘুমন্ত রাক্ষস

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার ওই গাছের কাছে ফিরে এলেন। কাঁধে তুলে নিলেন শব। নীরবে এগিয়ে গেলেন শ্মশানের দিকে। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা যে লােকটা তােমাকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে সে তােমার প্রশংসা করবে কি নিন্দা করবে তা বােধ হয় তুমি অনুমান করতে পারছ না। সাধারণ লােকের নিজস্ব কোনাে মতামত থাকে না। আমার কথার প্রমাণ শঙ্কুর একটি কাহিনির মাধ্যমে দিচ্ছি। নিজের পরিশ্রম অনেকখানি কমে যাবে এই গল্প শুনলে।

বেতাল বলতে লাগল : হাজার বছর আগে গােদাবরীর তীরে একটি পাহাড়ি অঞ্চলে এক রাক্ষসী থাকত। তার শঙ্কু নামে এক ছেলে ছিল। তার বড়াে হওয়ার পর তার মা বলল, 'বাবা, আমি সারাটা জীবন এই বনে কাটিয়েছি। লােকে আমার কোনাে ক্ষতি করেনি আর আমিও লােকের কোনাে ক্ষতি করিনি। আমার বয়স হয়েছে। আমি এবার তপস্যা করে শিবের মধ্যে লীন হয়ে যাব। তুমি একা বনে থেকে জীবন কাটাতে পারবে না। তাই তুমি বরং মানুষের সমাজে যাও। তাদের ধমক দিয়ে, ভয় দেখিয়ে অথবা তাদের কাছে নত হয়ে জীবন কাটাও।

তার মার তপস্যা করতে যাওয়ার পর শঙ্কু বন থেকে বেরিয়ে এক পাহাড়ে উঠে অদূরের গ্রামের দিকে তাকাল। অনেক মানুষ সে দেখতে পেল। তার মার কথা মনে পড়ল। মানুষের মধ্যে থেকে জীবনযাপনের কথা। সে ভাবল মানুষের সাথে মেশার ব্যাপারটা পরে হবে। আগে বিশ্রাম করে নি। তারপরে সে এক গুহার ভিতর ঢুকল। সেখানে ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। শঙ্কু সেখানেই পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল।

শঙ্কু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বিচিত্র ঢং-এ যখন নগরের দিকে তাকাচ্ছিল তখন কিছু লােক তাকে দেখতে পেল। দেখেই ‘ওরে বাবারে, রাক্ষস!' বলে চিৎকার করে ছােটাছুটি করতে লাগল। ওরা চারিদিকে দৌড়ে গিয়ে খবর দিয়ে এল। ওদের কথা শুনে বহু লােক দূর থেকে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানাে রাক্ষসকে দেখল।

সবাই ভাবল রাক্ষসটা একদিন ওদের উপর ঝাপিয়ে পড়বে। সবার ঘার মটকাবে। বহু লােককে সাবাড় করে ফেলবে। মাস ছয়েকের মধ্যে নগরে আর লােকজন কেউ থাকবে না। নগরের রাজা সবাইকে বল্লম ও তরবারি দেবেন কথা দিলেন। পাহাড় থেকে নাবার সাথে সাথে রাক্ষসটাকে হত্যা করার জন্য নানা ধরনের পন্থা লােকে ভেবে রাখল।

শুধু তাই নয়, সেদিন রাতে কেউ ঘুমােল না। ভয়ে ভয়ে কেউ ঘরে আলােও জ্বালালাে না। বহু লােক সারারাত ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।

কিন্তু রাক্ষস নগরে এল না। দিনের পর দিন যায় কিন্তু রাক্ষসের আর কোনাে পাত্তা নেই। লােকের ভয়ও কেটে যেতে থাকে। কিছু লােকের ধারণা হল রাক্ষস অন্য কোথাও চলে গেছে। যারা সাহসী তারা খেতের কাজকর্ম করতে লাগল।

তারপর বহুদিন কেটে গেল কিন্তু রাক্ষসের পাত্তা নেই। কয়েক জন সাহসী যুবক, কুড়ুল, বল্লম তরবারি নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠল। ওরা সেখানে একটা গুহা দেখতে পেল। সেই গুহার ভিতর থেকে ভয়ংকর একটা শব্দ ভেসে আসছিল। মুহূর্তে এই খবর দাবানলের মতাে গােটা নগরে ছড়িয়ে পড়ল।

পণ্ডিতরা বললেন, ‘রাক্ষসদের শক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় অনেক বেড়ে যায় তার ঘুম ভাঙার সাথে সাথে তাকে কেউ হারাতে পারে না।' এ-কথা শুনে লােকের ভয় আরও বেড়ে গেল।

রাজা মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, 'খবর পেয়েছি রাক্ষস গুহার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে। তাই ঘুমন্ত অবস্থাতেই রাক্ষসটাকে মারা হবে কি না ভেবে দেখতে হবে। কারণ পণ্ডিতরা বলেছেন যে জাগার পর রাক্ষসের শরীরে ভীষণ শক্তি থাকে।'

কয়েক জন মন্ত্রী বলল, রাক্ষসকে বাঁচিয়ে না রেখে সুযােগ পাওয়া মাত্র তাকে মেরে ফেলা উচিত।

কিন্তু এই পরামর্শ প্রধান মন্ত্রীর ভালাে লাগল না। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, আমরা সিংহ, বাঘ, মত্ত হাতি প্রভৃতিকে পুষে থাকি। ওরা ভীষণ হিংস্র জানােয়ার। আমরা ইচ্ছে করলে তাে রাক্ষসকে পুষতে পারি। রাক্ষস খুব জোর এক-শাে-টা মানুষের খাবার খায়। কিন্তু একটা রাক্ষস হাজারটা সৈনিকের সমান। রাক্ষস শুধু খেতে জানে। সে ধােকা দিতে জানে না। চক্রান্ত কীভাবে করতে হয় তা-ও সে জানে না। তাকে ঠিকমতাে পুষতে পারলে সে মানুষের চেয়ে বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠবে। তাই তাকে ঘুম থেকে জেগে উঠতে দিন, আস্তে আস্তে তাকে পােষ মানান। তারপর দেখবেন আমাদের শত্রু-ভয় বলতে আর কিছু থাকবে না। আমরা তাকে পুষে তার কাছ থেকে অনেক কাজ আদায় করতে পারব। ফলে আমাদের ভালােই হবে।

এই প্রস্তাব রাজা ও অন্য মন্ত্রীদের কাছে ভালােই লাগল। মুখে মুখে এই কথা ছড়িয়ে পড়ল। লােকেও রাক্ষসকে মারার পরিবর্তে তাকে পােষার কথা ভাবতে লাগল। পরে সে দেশে আকাল দেখা দিল।

‘রাক্ষস পাহাড় থেকে নামে না কেন? সে তাে নদীর পথ পরিবর্তন করতে পারে। এদিকে জল এলে চাষ-আবাদ হবে। ইচ্ছে করলে পাতালের জলও সে এনে দিতে পারে। আমাদের কপালে শুধু নামেই একটা রাক্ষস আছে, কোনাে কম্মের নয়।'

এই সব নানা কথা নগরের বুড়ােরা বলাবলি করতে লাগল।

আকালের ফলে চোর ডাকাতের সংখ্যা বেড়ে গেল। প্রত্যেক দিন রাত্রে শয়ে শয়ে চোর ডাকাত যারা তাদের বাধা দিতে এগুতাে তাদের প্রাণে মেরে ফেলত, এবং তরিতরকারি যা পেত তাই নিয়ে পালাত।

বুড়ােরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল, ঠিক এই সময় রাক্ষসটাকে আনতে পারলে কাজের কাজ হত। যাদের সাহস আছে তারা সব জোট বেঁধে রাক্ষসটাকে জাগিয়ে নিয়ে এসাে।'

ঘুমন্ত রাক্ষসকে জাগানাে খুব বিপদের ব্যাপার। ঘুম ঘুম চোখে কী শুনবে, কী বুঝবে তারপর হয়তাে যাকে সামনে পাবে তাকেই সাবাড় করে ফেলবে।' যুবকেরা ভয় পেয়ে বলল।

এর এক বছর পরে শত্রুপক্ষের রাজা ওই নগর আক্রমণ করল। এখন আর অপেক্ষা করা চলে না ভেবে কিছু যুবককে সঙ্গে নিয়ে সেনাপতি পাহাড়ের উপর উঠে গেল। রাক্ষস যে গুহায় ছিল সেই গুহার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখল। কিন্তু গুহার ভিতরে রাক্ষস ছিল না। কবে কোথায় সে। চলে গেছে। শত্রুরাজা ওই দেশ দখল করে নিল। দেশের লােক মনে মনে রাক্ষসকে গালাগাল দিতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, নগরবাসী প্রথমে রাক্ষস দেখে ভয় পেল। তারপর তাকে পাবার জন্য হাঁকপাঁক করতে লাগল। তাকে না পেয়ে গালাগাল দিতে লাগল। তাহলে রাক্ষসটার ব্যাপারে লােকের মত আসলে কোনটা ? লােকে কি তাকে ভালােবাসত না ঘৃণা করত? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এ-কথায় বিক্রমাদিত্য জবাব দিলেন, ‘জনতা ও রাক্ষসের মধ্যে ভালােবাসার কোনাে প্রশ্নই উঠতে পারে না। জনতার চোখে রাক্ষস একটা বিরাট শক্তিশালী জীব। প্রচণ্ড শক্তিধরকে কেউ ভালােবাসে না। যখন বুঝবে যে তার কাছ থেকে কোনাে বিপদের আশঙ্কা আছে তখনই তারা তাকে দেখে ভীষণ ভয় পায়। আবার যখন বােঝে যে তার মাধ্যমে কোনাে উপকারের আশা আছে তখনই তারা লােভে পড়ে যায়। ঠিক সময়ে যখন কোনাে উপকার পায় না তখন তার নিন্দা করে।'

রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ হবার সাথে সাথে বেতাল শব নিয়ে কেটে পড়ে আবার সেই গাছে উঠে পড়ল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%