ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছে উঠে শব নাবিয়ে। কাঁধে ফেলে চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। বেতাল বলে উঠল, ‘রাজা, তুমি ধর্মাধর্ম রক্ষার কাজে এগিয়ে যাচ্ছ? মনে রেখ ধর্ম রক্ষা করা অত সহজ ব্যাপার নয়। গণ্ডের কাহিনি শুনলেই বুঝতে পারবে আমার কথা কতখানি সত্য। শুনতে শুনতে পথ হাঁটার পরিশ্রমও তুমি টের পাবে না।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীনকালে বসন্ত নগরের রাজা ছিলেন মদনবর্মা। লােকটা খুব আরামে কাটাত। রাজা হয়েও রাজ্যের কোনাে কাজকর্ম নিজে দেখাশােনা করত না। সবসময় মদ্যপান করত আর বহু নারীকে কাছে রাখত। আনন্দ উপভােগ করত।
দেশ দেখাশােনার ভার মন্ত্রী ও সেনাপতিদের উপর ছেড়ে দিয়েছিল। তারা স্বেচ্ছাচারী হয়ে গিয়েছিল।
এইসব সত্ত্বেও মদনবর্মার নাম অন্য দেশে মহা ধর্মাত্মা হিসেবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। তার কারণ হল সেই রাজা বছরে দু-বার খুব ঘটা করে যজ্ঞ করত। এই উপলক্ষে ব্রাহ্মণ বিদায় করত অনেক কিছু দিয়ে। ব্রাহ্মণেরা নানান মূল্যবান জিনিস পেয়ে রাজাকে ভালাে কথা বলে প্রশংসা করত। তাকে বুকভরা আশীর্বাদ জানাত। এই যজ্ঞ উপলক্ষে প্রচুর অর্থ খরচ করত। কোনাে হিসেব থাকত না। যজ্ঞের জন্য যা লাগত সব দেশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে আনা হত। দেশবাসীকে ফতুর করে দিয়েও জিনিস সংগ্রহ করত। যজ্ঞ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে আকাল দেখা দিত।
দেখতে দেখতে দেশবাসীর অবস্থা ভয়াল রূপ ধারণ করল। এই ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতিতে গণ্ড নামে এক চোরের উপদ্রব ভীষণ বেড়ে গেল। নতুন নতুন পদ্ধতিতে সে চুরি করত। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গণ্ডের নামে ভয়ে কাঁপত।
অন্য বছরের মতাে সে-বছরেও রাজা মদনবর্মা খুব খরচ করে যজ্ঞের ব্যবস্থা করল। দূর দূর থেকে ব্রাহ্মণেরা এসে রাজার কাছ থেকে সােনাদানা নিয়ে বনপথে নিজের দেশে ফিরে যেতে লাগল।
রমশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ বনপথে চলার সময় ভয় পেয়ে জোরে জোরে শ্লোক উচ্চারণ করছিল। গণ্ড হঠাৎ তার সামনে হাজির হয়ে বলল, 'দেশবাসী খেতে পাচ্ছে না, পরতে পাচ্ছে না, আর তােমরা যজ্ঞ করাচ্ছ? যজ্ঞ ? বলি কার অর্থে এসব করছে রাজা? কার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্থে এসব করছে রাজা? তােমরা কি প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা অর্থে ভাগ বসাচ্ছ না? একটা অকর্মণ্য অপদার্থ, ভােগী রাজাকে তােমরা প্রশংসা করতে এসেছ? সমস্ত সােনাদানা যা কিছু পেয়েছ ওখানে রেখে নিজের পথে চলে যাও। যাও! এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলে। ফের যদি আসাে প্রাণে মারা পড়বে।'
‘বাবা তুমি যা বলছ আমি মেনে নিচ্ছি। তবে তােমরাও একবার ভেবে দেখ যা করছ ঠিক করছ কি না। একটু চিন্তা করাে।' বলল রামশর্মা।
‘আমি অধর্ম দূর করছি। তাই আমি যা করছি তা অবশ্যই ধর্ম। এই রাজা কোনাে কাজ করে না। এর মন্ত্রী ও সেনাপতিরা প্রজাদের লটেপটে খাচ্ছে। ব্যাবসাদাররা ইচ্ছেমতাে শােষণ করছে। আমি যতটা পারি এই রাজা ততটাও সক্ষম নয়।' বলল নাম করা চোর গণ্ড। ‘তাহলে তােমরা এদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ধর্মস্থাপনা করছ না কেন?’ রামশর্মা গণ্ডকে প্রশ্ন করল।
'ধর্মস্থাপনা করতে গেলে গােটা দেশের ক্ষমতা হাতে পাওয়া চাই। তা আমার একার পক্ষে এই কাজ কি করা সম্ভব?’ বলল গণ্ড।
‘কেন সম্ভব নয়? চেষ্টা করলেই সম্ভব হবে। ভাবতে হবে। ভেবে ঠিক করতে হবে কীভাবে কী করা যায়। কত বড়াে বড়াে রাজারা কি এক-একটা চোর ডাকাত ছিল না প্রথম জীবনে চোর ডাকাতে যা ক্ষমতা থাকে তাতে
সে ইচ্ছা করলেই রাজা হতে পারে।' বলল রামশর্মা।
রামশর্মার কথা গণ্ডের মনে ধরল। এর আগে কোনােদিন তার মাথায় এই ধরনের কথা তাে খেলেনি। তুমি আমাকে ভালাে পরামর্শ দিয়েছ রাজা হয়ে ধর্মস্থাপনার। তুমি খুব গরিব ব্রাহ্মণ। তােমার জিনিস নিয়ে যাও।' বলল গণ্ড।
রামশর্মা বিরাট ফাড়া কেটে যাওয়ার মতাে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে চলে গেল।
গণ্ড সেই দিনই বসে গেল পরিকল্পনা করতে। দেশের অন্যান্য চোর ডাকাতদের নানা কৌশল প্রয়ােগ করে মস্তবড়াে একটা দল তৈরি করল। কেউ ভয়ে এল গণ্ডের অধীনে আবার কেউ এল কোনাে লােভে। গণ্ড সেনাবাহিনী গঠন করল তাদের দিয়ে।
তারপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আক্রমণ করে একের-পর-এক গ্রাম দখল করতে লাগল গণ্ড। দখল করা গ্রামের লােককে আশ্বাস দিল। তাদের কোনাে কিছুর অভাব থাকবে না। রাজকর্মচারীদের ভরসা দিল এই বলে যে তাদের চাকরি বহাল থাকবে। যে যে পদে আছে সে সেই পদেই থাকবে। এইভাবে রাজার প্রভাব থেকে ওই সব গ্রাম মুক্ত করল।
দেখতে দেখতে গণ্ড একটা ছােটোখাটো রাজা হয়ে গেল। মদনবর্মার কর্মচারীরা দেখল গণ্ডরাজা তাে মন্দ নয়। ওরা আগে যা করত তাই করতে পারছে।
এদিকে মদনবর্মা যখন জানতে পারল যে তার রাজ্যের বেশ কিছু অংশে রাজা হয়ে বসে আছে গণ্ড। কী করে যে এত বড়াে একটা সর্বনাশ হল তা মদনবর্মা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না।
অনেক ভেবে-চিন্তে শেষে মদনবর্মা নিজের সমস্ত সেনা নিয়ে গণ্ডের বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। গণ্ড জানত যে একদিন তাকে রাজার প্রচণ্ড আক্রমণের মােকাবিলা করতে হবে। তাই সে তার সৈন্যকে বনেই সুসজ্জিত রাখত। গাছের উপর থেকে, গাছের আড়াল থেকে কীভাবে শত্রুকে পরাজিত করতে হয় তার কৌশল নিজের সেনাকে শিখিয়ে দিল গণ্ড! গণ্ডের বাহিনী চারদিক থেকে রাজার বাহিনীকে আক্রমণ করল। তির ছুঁড়ে, আগুনের তিরে বিদ্ধ করে ছড়িয়ে দিল রাজার সেনাকে। তারপর এক-এক সেনার উপর এক-এক ধরনের অস্ত্র চালাতে লাগল গণ্ডের সেনারা। মদনবর্মার পরাজয় ঘটল ওই বনের যুদ্ধে। তার বহু সৈন্য মারা গেল, হয় শিবিরেই নয় শিবিরের বাইরে। আর কালমাত্র বিলম্ব না করে পরের দিন ভােরেই গণ্ড রাজধানী আক্রমণ করে মদনবর্মার ছেলেকে বন্দি করে অনুষ্ঠান করে সিংহাসনে বসল। কারা যেন প্রশ্ন করল, ‘গণ্ড কোন জাতের লােক? ক্ষত্রিয় না হলে কি রাজ সিংহাসনে বসতে পারে?’
এ-কথা কানে যেতেই রাজপুরােহিত বলল, 'বীর গণ্ড হলেন অতি উত্তম স্তরের ক্ষত্রিয়। এঁর বংশ হল সূর্য বংশ। ইনি শ্রীরামচন্দ্রের এক-শাে আট সংখ্যক বংশধর। এঁর বংশ পরিচিতি আমার কাছে ছিল।' বলেই পুরােহিত তৈরি করে রাখা বংশসূচী পড়তে লাগল।
রাজপুরােহিতের কথা শুনে গণ্ড মনে মনে খুব খুশি হল। তার মনে হল সে সত্যি ক্ষত্রিয়। গােটা অনুষ্ঠানে ভালাে ভালাে কথা শুনে গণ্ডের মনে হল এই সিংহাসন ন্যায়সংগতভাবে তারই প্রাপ্য।
তারপর গণ্ড তার ক্ষত্রিয় সেনাপতি ও মন্ত্রীদের কথামতাে চলতে লাগল।
পাশের দেশের রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের রাজ্যের কিছু কিছু অংশ দখল করে নিল।

‘মহারাজ, এ-বছর আপনার এমন এক মহাযজ্ঞ করা উচিত যা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি।' রাজপুরােহিত গণ্ডকে বলল। গণ্ড রাজ্যে যজ্ঞ করার অনুমতি দিল।
রাজকর্মচারীরা সারা দেশ জুড়ে জোগাড় করতে লাগল যজ্ঞের প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র। গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের শেষ সম্বল কেড়ে আনল ওরা। হাজার হাজার ব্রাহ্মণ খেয়ে-দেয়ে উপহার নিয়ে ভালাে ভালাে শব্দ উচ্চারণ করে গণ্ডরাজাকে আশীর্বাদ করল। প্রশংসা শুনতে কার না ভালাে লাগে? গণ্ডরাজারও ভালাে লাগল।
ওই সব ব্রাহ্মণদের মধ্যে রামশর্মাও ছিল। গণ্ডের মনে হল লােকটাকে কোথায় যেন দেখেছে। চেনা চেনা লাগছে। রামশর্মা এগিয়ে এসে গণ্ডরাজাকে বলল, 'মহারাজ, আমাকে চিনতে পারছেন? আপনি আপনার কথা রেখে ধর্ম রক্ষা করেছেন। আপনি যুগ যুগ ধরে রাজত্ব করুন। আমরা যেন আপনার ছত্রছায়ায় থাকতে পারি।'
রামশর্মার কথা শুনে গণ্ডরাজার মুখ ঝুলে গেল। সােজা অন্তঃপুরে ঢুকে গেল তাড়াতাড়ি উপহার বণ্টনের পালা শেষ করে। সেই রাত্রেই মদনবর্মার ছেলেকে সিংহাসনে বসানাের আদেশ মন্ত্রীকে দিয়ে কালাে রাত্রের অন্ধকারে একটা ঘােড়ায় চলে গণ্ড চলে গেল। পরের দিন মন্ত্রী ঘােষণা করল যে গণ্ডরাজা বিরক্ত হয়ে বনে গেছেন। মদনবর্মার ছেলেকে সিংহাসনে বসানাের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। মদনবর্মার ছেলেকে সিংহাসনে বসানাে হল।
কিছু দিনের মধ্যে আবার একটা খবর বেরুলাে। বনে এক ভয়ংকর ডাকাতের আবির্ভাব ঘটেছে। বড়ােলােকদের ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে গরিবদের মধ্যে নাকি তা বণ্টন করবে। কথা রটতে লাগল। আরও জানা গেল যে সিংহাসন ছেড়ে যে গণ্ড বনে গেছে সেই এই লুণ্ঠনের কাজ করছে।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞেস করল, 'মহারাজ, যে গণ্ড ধর্মস্থাপনার জন্য সিংহাসনে বসতে চেয়েছিল সে সিংহাসনে বসে ধর্মস্থাপনা করল না কেন? কেন আবার লুণ্ঠনকারী হয়ে গেল? যে গণ্ড যজ্ঞের অত বিরােধী ছিল সে নিজে রাজা হয়ে কেন যজ্ঞ করল? এই প্রশ্নগুলাের সমাধান জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথায় বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অধর্ম রাখা বলবানের পক্ষে খুব সহজ কাজ। ধর্ম রক্ষা করতে হলে জনসাধারণের সহযােগিতা অবশ্যই প্রয়ােজন।
সবার সাহায্য ছাড়া ধর্ম রক্ষা কোনােক্রমেই সম্ভব নয়। গণ্ড অধর্মের মােকাবিলা করতে পারত। সে ভেবেছিল রাজা হয়ে অধর্ম দূর করে ধর্ম রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু রাজা হওয়ার পর বুঝল যে রাজা কোনাে কাজ স্বাধীনভাবে করতে পারে না। তাকে নির্ভর করতে হয় সেনাপতি, মন্ত্রী, পুরােহিত এবং আরও অনেকের উপর। তারা যতক্ষণ না কোনাে কিছুর বিরােধিতা করছে। ততক্ষণ রাজার একার কোনাে কিছু করার মুরােদ নেই। তাই গণ্ড বুঝল যে তার পক্ষে ধর্মস্থাপনা করা সম্ভব নয়। এই সত্য উপলব্ধির পর সে আর একমুহূর্ত সিংহাসনে বসেনি। সবাই মিলে একে বুঝিয়ে দিল যজ্ঞ ঘটা করে করা উচিত। এই যজ্ঞের বিরােধিতা করা তার পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। গণ্ড তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে রাজা স্বাধীন নয়। তাই শেষে সে স্বাধীনভাবে বাঁচার পথ বেছে নিল।'
রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে উধাও হয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন