পিতার ধর্ম

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে এলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতাে আবার নীরবে শ্মশানের দিকে এগােতে লাগলেন। শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, এই অসময়ে তুমি ভীষণ পরিশ্রম করছ। কিন্তু কেন যে করছ বুঝতে পারছি না। নিজের জন্য না পরের জন্য? কার জন্য এই পরিশ্রম? তােমার পরিশ্রম কমানাের জন্য তােমাকে রামশাস্ত্রীর কাহিনি শােনাচ্ছি শােনাে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে পার্বতীপতি নামে এক নাম করা পণ্ডিত ছিল। পণ্ডিতের পরিচয় জেনে সেই দেশের রাজা তাকে একটি গ্রাম উপহার দিয়ে দেয়।

পার্বতীপতির ধনসম্পত্তি অথবা খ্যাতির অভাব ছিল না। কিন্তু তার মনে শান্তি ছিল না। কারণ তার ছিল না কোনাে সন্তান। সেটাই তার দুঃখ। অনেক জপতপ তীর্থ দর্শন প্রভৃতির ফলে তার একটি পুত্র সন্তান হল। ছেলের নাম রাখা হল রামশাস্ত্রী।

প্রত্যেক পিতাই চান তার পুত্র তার চেয়ে খ্যাতিমান হােক। পার্বতীপতিও চেয়েছিল তার ছেলে বিরাট পণ্ডিত হােক। তার চেয়ে বেশি যশ ও খ্যাতি পাক। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হল না। কারণ রামশাস্ত্রীর একদম লেখাপড়ায় মন ছিল না।

রামশাস্ত্রীর স্বভাব চরিত্রও খুব ভালাে ছিল। বাবা-মার প্রতি তার ভক্তি শ্রদ্ধাও ছিল। কিন্তু লেখাপড়ার নাম করলেই তার জ্বর আসত। যা শিখত পরক্ষণেই তা ভুলে যেত। কিছুই তার মাথায় ঢুকত না। তার মাথায় যেন গােবর ভরা ছিল।

পার্বতীপতির মনে নতুন এক দুঃখ দেখা দিল ছেলের এই অবস্থা দেখে। ছেলে যে পড়তে বসত না তা নয়। বসত। কিন্তু অনেক বার পড়লেও সে কিছুই মনে রাখতে পারত না। পড়ত আর ভুলত। দিনে দিনে বেড়ে উঠতে লাগল রামশাস্ত্রী।

একবার পার্বতীপতির এক ছেলেবেলার বন্ধু তার সাথে দেখা করতে এল। নাম তার চন্দ্ৰভট্ট। চন্দ্রভট্ট পাশের রাজ্যের দরবারের পণ্ডিত ছিল। চন্দ্ৰভট্ট যখন এল পার্বতীপতি তখন বাড়িতে ছিল না। রামশাস্ত্রী ছিল। তার সাথেই চন্দ্ৰভট্টের কথাবার্তা হল।

'তুমিই পার্বতীপতির ছেলে?’ চন্দ্ৰভট্ট প্রশ্ন করল। রামশাস্ত্রী দিল নিজের পরিচয়। বাবা কোথায় গেছে তা-ও জানাল। দুজনের মধ্যে অনেক কথা হল।

এত কথা হওয়ায় চন্দ্রভট্ট বুঝতে পারল যে রামশাস্ত্রীর বুদ্ধিসুদ্ধির একেবারেই অভাব। ইতিমধ্যে পার্বতীপতি বাড়ি ফিরল। অনেকদিন পরে ছেলেবেলার বন্ধুকে দেখে পার্বতীপতির খুব আনন্দ হল। চন্দ্ৰভট্টকে কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করল। চন্দ্ৰভট্ট বলল, 'পার্বতীপতি, আমার এখন আর কোনাে চিন্তাভাবনা নেই। এবার ছুটি নেব সব কাজ থেকে।'

‘কেন? কী হয়েছে?’ পার্বতীপতি প্রশ্ন করল।

‘আমার চেয়ে যােগ্য পণ্ডিত যখন আছে। তখন আর ওই পদ আঁকড়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে না।' চন্দ্ৰভট্ট জবাবে বলল।

‘তােমার চেয়ে যােগ্য পণ্ডিত আবার কে আছে?’ পার্বতীপতি প্রশ্ন করল। ‘আর কে থাকবে আমার ছেলেই আছে।' সগর্বে চন্দ্রভট্ট বলল।

এই কথা শােনার পর সূক্ষ্ম অপমানের জ্বালায় পার্বতীপতি মাথা নীচু করে ফেলল। চন্দ্ৰভট্ট আগেই জেনেছিল পার্বতীপতির ছেলের বিদ্যের দৌড়। পরক্ষণে সহানুভূতির সাথে চন্দ্ৰভট্ট বলল, 'অনেক সাধ্যসাধনা করার পর ছেলে হয়েছে তাে তাই আদর দিয়ে ছেলের মাথা খেয়েছ। এখন আর দুঃখ করে কী হবে।'

পার্বতীপতির মুখে কথা নেই। গম্ভীরভাবে চুপ করে বসে রইল।

সেই দিন রাত্রে খেতে বসে পার্বতীপতি বউকে বলল, 'এমন মূর্খ ছেলে জন্মানাের চেয়ে আমাদের কোনাে ছেলে না হলেই ভালাে হত। ছি। এ-রকম ছেলে থাকলে অপমানের বােঝাই বাড়ে। কোনাে দরকার ছিল না এ-রকম অপগণ্ড, এ-রকম মূর্খ ছেলের।'

রামশাস্ত্রী আড়ি পেতে মা-বাবার কথা শুনে বড়াে দুঃখ পেল। সেই রাত্রেই রামশাস্ত্রী বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। প্রতিজ্ঞা করল যতদিন না পণ্ডিত হবে ততদিন সে বাড়ি ফিরে আসবে না।

বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেও কিছুতেই সে ভেবে পেল না কেমন করে পণ্ডিত হবে। শেষে ঠিক করল সরস্বতীর কৃপা প্রার্থনা করবে। তার কাছে বর পেতে হলে তপস্যা করতে হবে। তাই, রামশাস্ত্রী তপস্যায় বসল।

অনেকদিন পরে রামশাস্ত্রীর তপস্যা সার্থক হল। সরস্বতী দর্শন দিয়ে বললেন, 'বৎস, তুমি মহাপণ্ডিত হতে চাইছ? তুমি যদি এইরকম বােকা থাক তােমার ছেলে মহাপণ্ডিত হবে। আর তুমি যদি মহাপণ্ডিত হতে চাও তবে তােমার ছেলে হবে মূর্খ ও দুষ্ট। এই দুটোর মধ্যে তুমি কোন বর চাও?’

এই কথা শুনে রামশাস্ত্রী অবাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'মা, আমি মহাপণ্ডিত হতে চাই মা।'

'তথাস্তু।' বলে সরস্বতী অদৃশ্য হলেন।

বাড়ি ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই রামশাস্ত্রীর বিয়ে হল। দু-বছর পরে রামশাস্ত্রীর একটা ছেলে হল। ছেলে যত বড়াে হতে লাগল সরস্বতীর কথা তত ফলতে লাগল। রামশাস্ত্রীর ছেলে যে গণ্ডমূর্খ ও দুষ্ট হবে তার লক্ষণ ফুটে উঠল। ছেলের জন্যে বার বার রামশাস্ত্রীকে অপমানিত হতে হত। তার বােকামি দুষ্টামির জন্য তাকে অনেক কথা শুনতে হত। ক্রমশ রামশাস্ত্রীর মনে নানা চিন্তাভাবনা বাড়তে লাগল। সে ভাবল তার ছেলেকে কী করে পণ্ডিত করে তুলবে। কারণ তার ছেলের মুখ হওয়ার জন্যে সেই তাে দায়ী।

অনেক ভেবে রামশাস্ত্রী আবার সরস্বতীর তপস্যায় বসল। এবারের তপস্যার উদ্দেশ্য নিজে পণ্ডিত হওয়া নয়। ছেলে যাতে পণ্ডিত হয় তার জন্য বর প্রার্থনা করা। কিছুদিন পরে সরস্বতীর দর্শন পেয়ে বলল, “মা, আমার ছেলে কি এইরকমই থাকবে?’

'তুমি যদি তােমার পুণ্য কাজ ও পাণ্ডিত্য ছেলের জন্য ত্যাগ করতে পার তাহলে তােমার ছেলে পণ্ডিত হয়ে উঠবে।' এ-কথা বলে সরস্বতী অদৃশ্য হলেন।

রামশাস্ত্রী তাই করল। তার ছেলে এক মহাপণ্ডিত হয়ে গেল। যশ পেল। পেল খ্যাতি।

রামশাস্ত্রী মূর্খ ও দুষ্ট হয়ে উঠল। তার সুনাম ক্ষুণ্ণ হল। সবাই তার নিন্দা করতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, রামশাস্ত্রী স্বার্থপরের মতাে কাজ করল না ত্যাগীর মতাে? রামশাস্ত্রী নিজের ছেলেকে মহাপণ্ডিত হিসেবে দেখার জন্য আগে থেকে নিজে মুখ থাকলেই পারত। জেনে-শুনে নিজে পণ্ডিত হল। ছেলেকে মূর্খ ও দুষ্টু করে রাখল কিছুদিন। তারপর সরস্বতীর কাছে বর চেয়ে নিজে মূর্খ হল আর ছেলেকে পণ্ডিত করল। এই ধরনের পরস্পর বিরােধী কাজ রামশাস্ত্রী করল কেন? আমার প্রশ্নের উত্তর জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই কথায় বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘রামশাস্ত্রী নিজের পিতার প্রতি কর্তব্য পালন করল নিজে মহাপণ্ডিত হয়ে। আবার নিজের পুত্রের প্রতি কর্তব্য পালন করল নিজে মূর্খ হয়ে। এরজন্য তাকে যথেষ্ট নিন্দা ও অপযশের ভাগী হতে হয়েছিল। আপত দৃষ্টিতে দেখলে তার চরিত্রের মধ্যে এই পরস্পর বিরােধী গুণ ছিল। এইভাবে রামশাস্ত্রী নিজের পুত্রধর্ম ও পিতৃধর্ম পালন করল। অর্থাৎ নিজের পিতার প্রতি এবং পুত্রের প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করল। এতে পরস্পর বিরােধিতা নেই৷'

বিক্রমাদিত্যের মুখ খােলার সাথে সাথে বেতাল শবসহ উধাও হয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%