প্রস্তাব

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের নীচে। গাছ থেকে শবদেহ নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতোই শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি কোন লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে এত পরিশ্রম করছ আমি তা জানি না। তবে লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেই যে মনের আশা মিটে যাবে, এমন নাও হতে পারে। প্রমাণ স্বরূপ তোমাকে চন্দ্রবর্মার কাহিনি বলছি। শুনতে ভালোই লাগবে। পথ চলার পরিশ্রমও লাঘব হতে পারে।'

তারপর বেতাল কাহিনি শুরু করল

চন্দ্রবর্মা ছিল এক ক্ষত্রিয় যুবক। সৌন্দর্যই তার কাছে প্রধান বিচার্য ছিল। সুন্দর জিনিস দেখতে সে ভালোবাসত। প্রকৃতির সুন্দর রূপ দেখতে তার খুব ভালো লাগত। সুন্দর মানুষকে দেখে তার মন আনন্দে ভরে যেত।

সে বড়ো হল। মা-বাবা তার বিয়ের কথা ভাবল। কিন্তু চন্দ্রবর্মা, মা-বাবাকে সবিনয়ে বলল, 'আমার বিয়ের জন্য তোমরা তড়িঘড়ি করো না। আমি নিজেই খোঁজ করে ভালো মেয়ে পেলে বলব।'

একদিন সে বনপথে গেল। বনের সৌন্দর্য, গাছপালা, ফুল, ফল দেখে সে খুব খুশি হল। সেখানে ছিল একটি পুকুর। পুকুর ভরতি ছিল পদ্মফুল। পুকুরের ধারে একটি সুন্দর ঘোড়া চরছিল। আর লোভ সামলাতে পারল না। চন্দ্রবর্মা তাড়াতাড়ি গিয়ে ওই ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল। পরমুহূর্তে তীব্রবেগে ঘোড়া ছুটতে লাগল। গভীর বনে সে ঢুকে গেল। পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে ঘোড়াটা গভীর অরণ্যে চন্দ্রবর্মাকে ফেলে কোথায় চলে গেল। চন্দ্রবর্মা মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল। ধারে-কাছে কেউ ছিল না।

চন্দ্রবর্মার যখন জ্ঞান হল তখন সকাল। সমস্ত পরিবেশ তার কাছে নতুন লাগল। কাছেই একটি ঝরনা বইছিল এবং আরও অবাক কাণ্ড, নারীকণ্ঠে গান শোনা যাচ্ছিল।

গান শুনতে শুনতে চন্দ্রবর্মা এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। শেষে দেখতে পেল ফুলে ভরা সুন্দর এক উদ্যানে, সাদা পোশাক পরে বেণি দোলাতে দোলাতে একটি সুন্দরী মেয়ে ফুল তুলছে আর গান গাইছে।

এক-পা এক-পা করে চন্দ্রবর্মা সেই উদ্যানের কাছে পৌঁছে গেল। যুবতীর গান শেষ হতেই চন্দ্রবর্মা হাততালি দিতে দিতে বলল, 'অপূর্ব, অপূর্ব।'

চমকে উঠে যুবতী বলল, 'কী অপূর্ব? কীসের অপূর্ব?'

'তোমার গান অপূর্ব। তোমার সুন্দর রূপ অপূর্ব।' আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে চন্দ্রবর্মা বলল।

চন্দ্রবর্মার কথা শুনে যুবতী একটু হেসে বলল, 'আমাকে দেখেই আপনি এত অবাক হচ্ছেন, ওই পাহাড়ের কোলে যিনি আছেন তাঁকে দেখলে তো আপনি মূর্ছা যাবেন।' বলে সে একটি পর্ণকুটিরে ঢুকে গেল।

চন্দ্রবর্মা যুবতীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করল কিন্তু তার মন পড়ে রইল সেই পাহাড়ের কোলে। তার মনে বার বার প্রশ্ন জাগল, 'কে আছে ওই পাহাড়ের কোলে? আমাকে যেতেই হবে। কোথায় সে?' আপন মনে বলতে বলতে সে ওই পাহাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল।

পাহাড়ের কাছে পৌঁছোতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেখানেও ছিল মনোরম একটি সুন্দর উদ্যান। উদ্যানের মাঝে সুন্দর পর্ণকুটির। সেই কুটিরে যেন এক অপ্সরা আলো জ্বালছিল।

চন্দ্রবর্মা এক পা এক পা করে কুটিরের কাছে গিয়ে অপ্সরির দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি যখন আছ, আলোর কী দরকার? তোমার মতো সুন্দরী তরুণী আমি জীবনে দেখিনি।'

তরুণী চন্দ্রবর্মাকে অতিথি হিসাবে গ্রহণ করল। খেতে দিল। ঘুমানোর জন্য ভালো বিছানা দিল। শেষে ওই তরুণী বলল, 'আমাকে দেখে আপনি এত ভালো ভালো কথা বললেন, আমার রূপ দেখে আপনি এত মুগ্ধ হলেন, আমি ভেবে পাচ্ছি না পাহাড়ের উপরে যে অপূর্ব সুন্দরী আছে তাকে দেখে আপনার অবস্থা কী হবে! অনেক রাত হল। এখন ঘুমোন।' বলে ওই সুন্দরী তরুণী অন্য ঘরে চলে গেল।

এই কথা শোনার পর চন্দ্রবর্মার চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। তার মনে হল, যতক্ষণ না ওই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ওই অপরূপা সুন্দরীকে দেখতে পাচ্ছি ততক্ষণ আমার শান্তি হবে না। নিঃশব্দে দরজা খুলে চন্দ্রবর্মা গভীর রাত্রে বেরিয়ে পড়ল। একে পাহাড় তার উপর বনজঙ্গল। ঘন অন্ধকার। তারই মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে, কাঁটার খোঁচা খেতে খেতে রক্তাক্ত হয়ে চন্দ্রবর্মা পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগল। পাহাড়ের চূড়ায় যখন উঠল তখন দিগন্তে সূর্য উঠছে।

সেই পাহাড়ের চূড়ায় ছিল এক অপূর্ব সুন্দর উদ্যান। ফুলে, ফলে ভরে ছিল সেই উদ্যান। উদ্যানের মাঝে ছিল একটি ভবন। যে ঝরনাকে সে ফাঁকে ফাঁকে দেখে এসেছে সেই ঝরনার উৎস ছিল সেই ভবন। সেই উৎসে জলের ফোয়ারায় স্নান করছিল সেই অপরূপা সুন্দরী।

চন্দ্রবর্মা অপলক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য দেখল। সে তার কাছে গেল।

অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে চন্দ্রবর্মা সেই অপরূপাকে বলল, 'এতদিন আমি স্ত্রী হিসেবে যার স্বপ্ন দেখেছি তুমিই সেই। স্বর্গ, মর্ত, পাতালে তোমার মতো সুন্দরী আর নেই। আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই।'

'তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাও। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না।' এই কথা বলে ওই অপরূপা চলে গেল।

চন্দ্রবর্মা হতাশ হয়ে পাহাড় থেকে নেমে, সেখানে আগে যে সুন্দরীকে দেখেছিল তাকে খুঁজল। কিন্তু তার দেখা পেল না। প্রথমে যে সুন্দরীকে দেখতে পেয়েছিল তার খোঁজে কত ঘোরাঘুরি করল, তাকেও পেল না। শেষে চন্দ্রবর্মা বাড়ি ফিরে এল। পরে বাবা-মা যে মেয়েকে পছন্দ করল সেই মেয়েকেই চন্দ্রবর্মা বিয়ে করল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'মহারাজ, তিন-তিনটি সুন্দরীকে দেখার পর চন্দ্রবর্মার মন থেকে সুন্দরী দেখার ইচ্ছা লোপ পেল কেন? প্রথম ও দ্বিতীয় সুন্দরী চন্দ্রবর্মাকে আমন্ত্রণ করে খাওয়াল আর তৃতীয় সুন্দরী চলে যেতে বলল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব তোমার জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'সুন্দরী দেখা নয়, সুন্দরের প্রতি তার টান, তার আগ্রহ আগে যেমন ছিল, পরেও সেটা তেমনি ছিল, লোপ পায়নি। তৃতীয় সুন্দরীর কাছে সে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ওই সুন্দরী চন্দ্রবর্মাকে বিয়ে করতে চায়নি। প্রথম ও দ্বিতীয় সুন্দরীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব চন্দ্রবর্মা করেনি। শুধু তাদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিল; চন্দ্রবর্মা ঠেকে শিখল যে সে যে সুন্দরীকে বিয়ে করতে চাইবে সেই সুন্দরী তাকে বিয়ে করতে নাও চাইতে পারে। তার এই বোধ জাগার পর সে বাড়ি ফিরে এল। তার মেয়ে খোঁজার শখ মিটে গেল। শেষে সে বাবা-মার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করল।'

রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%