ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
জেদি বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে গেল। গাছে উঠে শব নামিয়ে কাধে ফেলে হাঁটতে লাগল। মুখে কোনাে কথা নেই। শব থেকে বেতাল বলল, 'মহারাজ, স্বর্গসুখ পাওয়ার আশাতেই তুমি যদি এত পরিশ্রম করে থাক তাহলে তােমার এই চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। কারণ অত্যন্ত খারাপ লােকও স্বর্গে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ আমি একটা ছােট্ট কাহিনি বলছি। শুনলে হয়তাে হাঁটার পরিশ্রম কমে যাবে।'
বেতাল বলতে শুরু করল : কাশীতে এক গুরুকুল ছিল। সেই গুরুকুল বা আশ্রমে পড়ার জন্য নানান দেশের ব্রহ্মচারী ছাত্র আসত। একবার ওই আশ্রমে পড়তে এল তেজ সিং নামে এক দশ বছরের ছেলে। হুশিয়ার ছেলে। পড়া সেরে প্রত্যেক দিন সে যজ্ঞের কাঠ আনত দূরের জঙ্গল থেকে।
সেই জঙ্গলে অঘােরদাস নামক এক ছেলের সাথে তেজ সিং-এর আলাপ হল। প্রত্যেক দিন অঘােরদাস সেই জঙ্গলের নানান কাহিনি তেজ সিংকে বলত। অঘােরদাসের বাবা সেই জঙ্গলের নেতা। সে ছিল নিপুণ লুণ্ঠনকারী। গােটা নগরে ডাকাত হিসেবেও তার নামডাক ছিল। অঘােরদাসের বাবা লুটপাট করে যা আনত তা সেই জঙ্গলবাসীদের মধ্যে বণ্টন করে দিত।
অঘােরদাসের বাবা ও তার দলের লােকের কাজকর্ম তেজ সিং-এর ভালাে লাগল না। সে তার বন্ধু অঘােরদাসকে বলল, 'বন্ধু, বড়াে হয়ে তুমিও কি তােমার বাবার মতাে ডাকাত হবে? সামাজিক জীবন তােমার ভালাে লাগে না?’
'কত পুরুষ ধরে আমরা নাকি এই জঙ্গলে ডাকাতি আর লুটপাট করে আসছি। আমি হঠাৎ এসব বদলাতে পারব? তােমার শিক্ষা, তােমার পরিবেশ আলাদা। আমার পরিবেশের কথা তাে তােমাকে বললাম। এখন তােমাকে যদি বলি, তুমি আমাদের মতাে জীবনযাপন কর, পারবে? আমার বেলাতেও একই অবস্থা।' অঘােরদাস জবাবে বলল।

ওই দুই বন্ধুর মধ্যে আচার-আচরণের অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের বন্ধুত্ব একটুও ক্ষুন্ন হয়নি।
কয়েক বছর পর তেজ সিং লেখাপড়া শেষ করে বাড়ি ফেরার আগে অঘােরদাসের সাথে দেখা করল ওই জঙ্গলে। তার কাছ থেকে বিদায় নিল।
তারপর একদিন কাশীরাজের দরবারে তেজ সিং চাকরি পেল। ওদিকে ওই জঙ্গলের ডাকাত অঘােরদাসের বাবা মারা গেল। জঙ্গলবাসী অঘােরদাসকে তাদের নেতা করল। অঘােরদাস লুটপাট আর ডাকাতিতে অল্পদিনের মধ্যেই বাপকে ছাড়িয়ে গেল।
অঘােরদাসের দুঃসাহসিক ডাকাতি আর লুটপাটের ফলে যেসব ব্যবসায়ীরা কাশী যাতায়াত করত তারা অঘােরদাসের নামে ভয়ে কাঁপতে লাগল। তাকে ধরার জন্য কাশীরাজ অনেক বার নানান ধরনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। জঙ্গলবাসীরা জানপ্রাণ দিয়ে অঘােরদাসকে বাঁচাত। কাশীরাজের লােক কোনােক্রমেই তাদের কাছে পেরে উঠত না। শেষে কাশীরাজ পুরস্কার ঘােষণা করল: যে অঘােরদাসকে ধরে দেবে তার সাথে রাজকন্যার বিয়ে হবে এবং তাকেই সিংহাসনে বসানাে হবে। এই ঘােষণা শুনে বহু যােদ্ধা অঘােরদাসকে ধরতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হল।
বাল্যবন্ধুর লুটপাটের কথা শুনে তেজ সিং ভীষণ দুঃখ পেল। তার মনে হল খুব জোর দিয়ে চেষ্টা করলে সে হয়তাে অঘােরদাসকে সামাজিক জীবনে টেনে আনতে পারত। উঠে-পড়ে চেষ্টা করলে হয়তাে অঘােরদাস বদলে যেত। এখন অঘােরদাসকে সে বাদে আর কেউ ধরতে পারবে না। ওই জঙ্গলের অনাচেকানাচে তার ঘােরা আছে। তবু বহুকাল তেজ সিং অঘােরদাসকে ধরার কোনাে চেষ্টা করল না।
চোখের সামনে তেজ সিং দেখতে পেল রাজধানীর ব্যবসায়ীরা বাইরে যেতে ভীষণ ভয় পাচ্ছে। বাইরের ব্যাবসাদারও ভয়ে কাশীতে আসতে পারছে না ফলে কাশীবাসীর জীবনে দারুণ অভাব অনটন দেখা দিল।
এই অবস্থায় দেশের মানুষকে দুর্দশার হাত থেকে বাঁচানাের জন্য তেস সিং ঠিক করল, বাল্যবন্ধু অঘােরদাসকে বন্দি করবে। অল্প সংখ্যক সেনাদের নিয়ে তেজ সিং ওই জঙ্গলে ঢুকল। ঠিক সেইসময়ে অঘােরদাস মহাশক্তির পূজা সারতে ব্যস্ত। তাকে বন্দি করে তেজ সিং তাকে কাশীরাজের সামনে হাজির করল। রাজাও নিজের ঘােষিত কথা অনুসারে তেজ সিং-এর সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিল এবং রাজ্যাভিষেকের ব্যবস্থা করল।
তেজ সিং অঘােরদাসের আজীবন কারাবাসের শাস্তি দিল। অঘােরদাস যাতে ভালাে খাবার এবং ভদ্র ব্যবহার পায় তার ব্যবস্থা করল। অঘােরদাসের বন্দি হওয়ার পর ওই অঞ্চলে লুটপাটও বন্ধ হয়ে গেল। বহু বছর পরে বুড়াে হয়ে অঘােরদাস মারা গেল।
তেজ সিং রাজা হিসেবে বেশ নাম করল। প্রজারাও তার শাসনে ভালােই ছিল। তেজ সিং রাজা হিসেবে যতটা পারল প্রজাদের উপকার করল।
কয়েক বছর পরে তেজ সিংও মারা গেল। তেজ সিং মারা গিয়ে স্বর্গে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, স্বর্গে গিয়ে তেজ সিং তার বাল্যবন্ধু অঘােরদাসকে পেয়ে খুব খুশি হল। স্বর্গে ওদের বন্ধুত্ব দিনকে দিন আরও গভীর এবং মধুর হতে লাগল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, অঘােরদাস ডাকাত, লুণ্ঠনকারী, পাপী আবার তেজ সিং বাল্যবন্ধুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সেও পাপী হয়ে গেল। এহেন দু-জন পাপীর কীভাবে স্বর্গপ্রাপ্তি হল? তেজ সিং-এর শিক্ষা শেষ হবার পর এ বন্ধু দু-জনের পথ আলাদা হয়েছিল, স্বর্গে গিয়ে আবার ওই দু-পথের মিল হল কী করে? ওদের বন্ধুত্ব কেন নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হল? এসব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি উত্তর না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বলল : তেজ সিং এবং অঘােরদাস আলাদা দুটো পথের পথিক ছিল। ওদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং জীবনধারাও ছিল ভিন্ন। নিজের নিজের পথে চলা পাপ নয়। জঙ্গলবাসীর নেতা হিসাবে অঘােরদাস লুটপাট আর ডাকাতি করে নিজের দল বা জাতের লােকের মধ্যে ওই সব লুণ্ঠিত সম্পত্তি ভাগ করে, সেই লােকগুলােকে বাঁচিয়ে, পূণ্য কাজ করেছে। একইভাবে তেজ সিং অঘােরদাসকে বন্দি করে সমাজে লুটপাট এবং ডাকাতি। বন্ধ করে পূণ্য কাজ করেছে। সে রাজকুমারীকে পাওয়ার জন্য অথবা রাজত্ব। পাওয়ার জন্য অঘােরদাসকে বন্দি করেনি। তাই, দু-জনের স্বর্গপ্রাপ্তি হল। বাকি রইল বন্ধুত্বের প্রশ্ন। বন্ধুত্ব ওই দু-জনের নিজেদের ব্যাপার। তার সাথে সমাজের কোনাে সম্পর্ক নেই। নেই বলেই ছাত্রজীবনেই তেজ সিং-এর সাথে অঘােরদাসের বন্ধুত্ব হল। এই লােক ছেড়ে যাওয়ার পর শুধু ব্যক্তিগত প্রশ্নই থাকে। সামাজিক কোনাে ব্যাপার থাকে না। সেই কারণেই স্বর্গে ওদের বন্ধুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হল। এবং দিনকে দিন তা গভীর হতে লাগল।
রাজার মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সাথে সাথে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে আবার ওই গাছে গিয়ে উঠল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন