চোর ধরা

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজা বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে আবার গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতো নীরবে হাঁটতে লাগলেন শ্মশানের দিকে। শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কাকে কথা দিয়ে এত পরিশ্রম করছ আমি তা জানি না। কথা রাখার জন্য মাঝে মাঝে অধর্মের পথে চলতে হয়। প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে বিক্রমসেনের কাহিনি শোনাচ্ছি। শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম কমে যাবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে ভবন দেশের রাজা ছিলেন বিক্রমসেন। তিনি সেকালের খুব ভালো রাজা ছিলেন। কোনোদিন যুদ্ধে পরাজিত হননি। তাঁর দেশের আশেপাশে যত দেশ ছিল তার শাসকরা রাজা বিক্রমসেনের কাছে অবনত থাকত। বিক্রমসেনকে ওরা প্রত্যেক বছর সেলামি দিত।

কয়েক বছর পরে রাজা লক্ষ করলেন, কোষাগারের অর্থ দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। রাজা বুঝতে পারলেন যে কোনো লোক তার চোখে ধুলো দিয়ে দিনের পর দিন অর্থ সরাচ্ছে। তিনি অনেক চেষ্টা করেও চোর ধরতে পারেননি। দিনে রাত্রেও চোর ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন।

শেষে রাজা বিক্রমসেন চারদিকে ঘোষণা করলেন যে, যে চোর ধরাতে পারবে তাকে তিনি অর্ধেক রাজত্ব দেবেন এবং তার সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ে দেবেন। এই ঘোষণা শুনে বহু লোক চোর ধরার চেষ্টা করল কিন্তু কেউ চোর ধরতে পারল না। শেষে এক যুবক রাজার কাছে এল। যুবকটির চেহারা যেমন সুন্দর তেমনি বলিষ্ঠ। সে রাজাকে বলল, 'মহারাজ আমি আপনার ঘোষণা শুনে এসেছি। চোর ধরার ব্যাপারে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।'

'তোমার যত লোক দরকার, চোর ধরার জন্য, তত লোক তুমি নিয়ে যেতে পার। চোর ধরে আনলে তোমার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে হবে। যথাসময়ে তুমি অর্ধেক রাজত্ব পাবে।' রাজা বিক্রমসেন বললেন।

'মহারাজ, আমি কারও সাহায্য চাই না; শুধু চাই আপনার সাহায্য। আমার যখন দরকার হবে তখন আপনি একটু সাহায্য করলেই আমি চোর ধরতে পারব বলে আমার ধারণা। আপনার যদি কোনো অসুবিধা এই ব্যাপারে না থাকে তাহলে অনুগ্রহ করে বলুন। তবে মহারাজ, আমার সঙ্গে আপনাকে যেখানে যেতে বলব সেখানে একা যেতে হবে। রাজি থাকলে বলুন।' যুবক বলল।

রাজা বিক্রমসেন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, 'ঠিক আছে চল, এক্ষুনি আমি তোমার সঙ্গে যেতে রাজি আছি।'

'এক্ষুনি যেতে হবে না মহারাজ। আমি আবার আপনার কাছে এসে জানাব।' বলে যুবকটি ফিরে গেল।

দু-দিন পরে ওই যুবক এক রাত্রে এসে রাজার সাথে গোপনে দেখা করে বলল, 'মহারাজ আজ রাত্রেই ছদ্মবেশে আপনাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে। চলুন, দেরি করলে হয়তো চোর ধরা যাবে না।'

রাজা বিক্রমসেন ওই যুবকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এসে এক ঘন বনে ঢুকলেন। যুবকটি রাজাকে বনের মাঝের একটি পাহাড়ের উপরে নিয়ে গেল। আস্তে আস্তে রাজাকে বলল, 'মহারাজ আর একটু এগিয়ে গেলেই আমরা একটি বড়ো গুহা দেখতে পাব। ওই গুহায় চোর থাকে। ওরা ওই গুহার ভেতরে নাচ-গান করে। মদ খেয়ে হইচই করে কিন্তু আমি আপনাকে ওসব দেখাব না।'

ঠিক সেইসময় ঘুঙুরের শব্দ শোনা গেল। যুবক মুখের উপর তর্জনি রেখে রাজাকে চুপ করার ইশারা করল। কিছুক্ষণ পরে যুবকটি নিজেই ফিসফিস করে বলল, 'মহারাজ ঘুঙুরের শব্দ শুনছেন, ওটা এক যুবতীর। যুবতীটিকে লক্ষ করবেন। ওই চোরদের মধ্যমণি।

রাজা দেখলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ষোলো বছরের যুবতী গুহার ভিতরে ঢুকল। তার পেছনে ও দু-দিকে ছিল দু-জন মশাল ও অস্ত্রধারী। পেছনে যারা ছিল তাদের কাঁধে ছিল কয়েকটি থলে ভরতি। রাজা ও যুবকটির চোখের সামনে দিয়ে যেন ওরা এল আর ভেতরে ঢুকে গেল। রাজা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলেননি।

রাজার নীরবতা দেখে যুবকটি রাজাকে বলল, 'মহারাজ কী ভাবছেন?'

রাজা বিক্রমসেন বললেন, 'ভাবছি কী করে তুমি এদের সন্ধান পেলে। ভাবছি, কে তোমাকে এখানে নিয়ে এল।'

যুবক রাজাকে বলল, 'মহারাজ, আমি বাচ্ছা বয়স থেকেই মা-বাবার অবাধ্য ছিলাম। আমি কোনো কিছু ভয় করতাম না। যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতাম। একদিন রাত্রে ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে এসেছিলাম। বাইরে খুব হইচই শুনে পা টিপে টিপে এসে উঁকি মারলাম। দেখি গুহার ভেতরে চোর আছে। ওরা তখন মা কালীর পুজো করছিল আর কিছু লোক মদ খাচ্ছিল। ওদের নেতা ছিল এক যুবক। ওই যুবকের কাছে বসেছিল এই যুবতী। তাদের সামনে পড়েছিল অনেক অর্থ। অত অর্থ দেখে আমার কৌতূহল জাগল। এত অর্থ এল কোথা থেকে? এরা কি কোনো ধনীর বাড়িতে চুরি করে এনেছে? এই ঘটনার কিছুদিন পরে আপনার ঘোষণা শুনলাম। তখন আমার ধারণা হল ওরা আপনার কোষাগার থেকেই চুরি করেছে। তাই আপনাকে নিয়ে এখানে এসেছি, মহারাজ।'

রাজা বিক্রমসেন কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে পরে বললেন, 'যে যুবতীকে আমরা এখন দেখেছি সে কে জানো? আমার একমাত্র মেয়ে। এখন বুঝতে পারছ আমি কেন নীরব ছিলাম?'

যুবকটি উদবিগ্ন হয়ে বলল, 'মহারাজ কি বলছেন আপনি? এ কি সত্য না স্বপ্ন? এ যদি আমি জানতাম তাহলে আপনাকে এখানে এনে এতটা বিব্রত করতাম না। আমার এই অপরাধের জন্য আপনি আমাকে ক্ষমা করুন মহারাজ।'

'পাগল ছেলে! তুমি অত ভাবছ কেন? আমার মেয়েই হোক আর অন্য কেউ হোক, অন্যায় করলে শাস্তি পাবেই। আমার মেয়ে বলে ক্ষমা করব না।'

রাজা অন্দরমহলে গিয়ে সোজা রাজকুমারীর ঘরে গেলেন। পরিচারিকারা রাজাকে অত রাত্রে দেখে অবাক হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। রাজা ওদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'মেয়ে কোথায়? আমার মেয়ে কোথায়?' প্রত্যেকে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

রাজা ওই ঘরে রাত্রের বাকি সময়টা মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ভোরে রাজকুমারী পা টিপে টিপে রাজমহলে ঢুকল। এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে নিজের ঘরে ঢুকেই পাথর প্রতিমার মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।

'সারারাত কোথায় ছিলে? জবাব দাও। কোথায় ছিলে সারারাত?' রাজকুমারী কোনো জবাব দিল না। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

পরের দিন রাজদরবারে রাজা ঘোষণা করলেন, 'আমি ঘোষণা করেছিলাম চোরকে শাস্তি দেব। আমি ঘোষণা করছি, রাজকোষাগার থেকে যে চুরি করেছে তাকে আমি কঠোরতম শাস্তি দেব। এক্ষেত্রে চোর আমার নিজের মেয়ে বলে রেহাই পাবে না। ক্ষমা করব না।'

ঠিক সেইসময়ে রাজপ্রাসাদে দর্শকদের মধ্য থেকে ওই যুবক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'মহারাজ আপনার ঘোষণা অনুযায়ী চোরের সন্ধান যে দেবে তার সঙ্গে আপনার মেয়ের বিয়ে হবার কথা। আপনি কি আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন?'

রাজা সবদিক ভেবে ওই যুবকের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বিক্রমসেন নিজের মেয়েকে কঠোরতম শাস্তি দিল না কেন? প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে? নাকি নিজের মেয়েকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যুবকটির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন? রাজা ওই যুবকটিকে পরের দিনই রাজপ্রাসাদে এসে দেখা করতে বললেন কেন? আমার এ প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

রাজা বিক্রমাদিত্য প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'সমস্যাটি অত সহজ ছিল না। আমরা যুবকের জীবনী তত ভালো জানতে পারিনি। একটা চোরের শৈশব কৈশোর যেভাবে কাটে যুবকটিও সেভাবে কাটিয়েছে তার শৈশব এবং কৈশোর জীবন। শুধু চোর ধরা তার উদ্দেশ্য ছিল না। তাহলে তো সে সহজেই রাজার কাছ থেকে কিছু লোক নিয়ে ওই গুহায় গিয়ে চোরের দলকে ধরে নিয়ে আসতে পারত কিন্তু সে তা করল না। সে দু-দিন সময় নিল। তারপর রাজাকে নিয়ে গিয়ে একটি দৃশ্য দেখাল। রাজার মনে যুবকের প্রতি সন্দেহ জেগেছিল। রাজা নিজের মেয়েকে দেখল কিন্তু তাঁর মেয়ে যে যুবকের সঙ্গে ওই গুহায় ঢোকে, যে যুবক ওই চোরদের নেতা সেই যুবককে রাজা বিক্রমসেন দেখতে পাননি। আবার রাজপ্রাসাদে এসে সঠিক সময়ে ওই যুবকটি যেভাবে তার মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করল তাতে বোঝা যায় যে ওই যুবকটি চোরদের নেতা। রাজাও বুঝেছিলেন। তাই ওই যুবকের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন। এর ফলে রাজা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলেন এবং নিজের মেয়ের প্রাণও বাঁচাতে পারলেন।'

রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ওই গাছে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%