ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে আগের মতােই ফিরে এলেন। গাছ থেকে শব নাবিয়ে কঁাধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, ‘রাজা, তুমি ধনী তাই তুমি হয়তাে ধনের আশায় এই পরিশ্রম না করতে পার, তবু মনে রেখাে ধন হল অত্যন্ত পাপপূর্ণ একটি জিনিস। ধন স্নেহ বােঝে না, ভালােবাসা বােঝে না। আমার কথা আরও ভালাে করে বুঝতে পারবে যদি একটি গল্প শােনাে। তােমার পথ হাঁটার পরিশ্রম লাঘব হবে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল : সাকেতপুরে এক ছিল খুব গরিব লােক। একদিন সে অন্যান্য দিনের মতােই কাঠ কাটতে গেল বনে। কাঠ কেটেই সে পরিবারের খরচ চালাত। সেদিন শুনতে পেল এক কাতর আর্তনাদ।
গরিব লােকটার নাম ছিল গােপ। সে তাড়াতাড়ি যে দিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেই দিকে গেল। গিয়ে দেখে একজন গর্তে পড়ে ছটফট করছে। গােপ তাকে তুলে দেখে লােকটা পাশের গাঁয়ের লােক। নাম রামভদ্র। বিরাট ধনী।
‘আমাকে ডাকাতরা লুঠ করে এনে এই গর্তে ফেলে রেখে গেছে। দু-দিন ধরে আমার পেটে একমুঠো ভাত পড়েনি। আমি ক্ষুধার্ত। তৃষ্ণার্ত। তুমি উদ্ধার করতে এসেছ।' রামভদ্র বলল।
গােপ রামভদ্রকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। অল্পদিনের মধ্যেই রামভদ্র সেরে উঠল। একদিন রামভদ্র গােপকে ডেকে বলল, 'আমি তােমার জন্য এ-যাত্রা বেঁচে গেলাম। তুমি উদ্ধার না করলে আর কে উদ্ধার করত।' বলে রামভদ্র তাকে কিছু টাকা দিতে চাইল। গােপ বলল, 'মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে তারজন্য আবার টাকা নেবে! এ ভালাে নয়।'
দু-জনের মধ্যে ভাব-ভালােবাসা ক্রমশ বাড়তে লাগল। গােপের যখন অভাব অনটন দেখা দিত তখন সে অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার নিত। সে রামভদ্রের কাছ থেকে ধার নেবার কথা ভাবতে পারত না। কথাটা রামভদ্রের কানেও গেল যে গােপ ধার করে বেড়ায়। তার দিন কাটে না। এসব জানার ফলে রামভদ্র এমনভাবে মেলামেশা করত যেন সেও গরিব।

দু-জনের বন্ধুত্ব এত গভীর এবং নিবিড় হয়ে গেল যে সারা গাঁয়ের লােকের কাছে ওদের বন্ধুত্ব প্রবাদ বাক্যে দাঁড়িয়ে গেল।
এভাবে অনেক বছর কেটে গেল।
গােপের স্ত্রী অসুখে পড়ে গেল। সাধারণ তাে দূরের কথা ভালাে বৈদ্যের পক্ষেও তার অসুখ সারানাে সহজ ছিল না।
‘এরকম কঠিন রােগ দেবশর্মা ছাড়া অন্য কেউ সারাতে পারে না।' যারা দেখতে এসেছিল তারা বলল।
গােপ চমকে উঠল। সে তার বউয়ের বাঁচার আশা ছেড়েই দিল। কারণ দেবশর্মা পাথরে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে কিন্তু তার মন পাথরের চেয়ে কঠিন। তাকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে হলে শত শত টাকা দরকার।
এ-কথা কানে যেতেই রামভদ্র নিজেই দেবশর্মাকে ডেকে আনল। দেবশর্মা এসে গােপের স্ত্রীকে পরীক্ষা করে দেখে বলল, ‘এ রােগ সারানাে যাবে। তবে তিরিশ দিন ওষুধ খেতে হবে। প্রত্যেক দিনের জন্য খরচ পড়বে পঞ্চাশ টাকা।'
‘ঠিক আছে আপনি চিকিৎসা শুরু করুন।' রামভদ্র বৈদ্যকে বলল।
টানা একমাস গােপের স্ত্রীর চিকিৎসা চলল। গােপের স্ত্রী দেবশর্মার কথামতাে ঠিক এক মাসেই সেরে উঠল। রামভদ্র দেবশর্মাকে পনেরাে-শাে টাকা দিয়ে দিল। গােপের মনে আনন্দ হল। যাই হােক তার বউ অত বড়াে রােগ থেকে সেরে উঠেছে। কিন্তু তার মনে দুঃখও হল। ভাবল বন্ধুত্বের মধ্যে টাকার আদান-প্রদান উচিত নয়।
এই ঋণের বােঝা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য গােপ দিনরাত পরিশ্রম করতে লাগল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যেকোনাে ভাবে সে রামভদ্রের টাকা ফেরত দেবেই। কিন্তু যত দিন যায় ততই অবস্থা খারাপ হতে থাকে। গােপ বুঝতে পারে যে সে যত সহজে টাকা শােধ দেবার কথা ভেবেছিল তার পক্ষে কাজটা তত সহজ হবে না। পরিশ্রম বাড়িয়ে খাওয়া কমিয়েও তার টাকা জমানাে সম্ভব হচ্ছিল না। পনেরাে-শাে তাে দূরের কথা পনেরাে টাকাও সে জমাতে পারল না।
টাকা জমানাের জন্য স্বামীকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে দেখে গােপের স্ত্রী বলত, ‘এতদিন তুমি বলতে রামভদ্র তােমার বন্ধু। বন্ধুকে সাহায্য করে কি কেউ ফেরত নেয়? ওর মতাে ধনী লােকের পক্ষে পনেরাে-শাে টাকা তাে কিছুই নয়। বিপদে বন্ধু খরচ করবে না। তােমার বন্ধু কি জানে না যে তুমি যতই পরিশ্রম কর না কেন কোনােক্রমেই তােমার পক্ষে অত টাকা জমানাে সম্ভব নয় ?’
গােপের স্ত্রী আশেপাশের মহিলাদের এই কথাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলত। প্রত্যেক দিন এককথা শুনতে শুনতে গােপেরও মনে হল তার স্ত্রীর কথাই ঠিক। যত সে ওই টাকার কথা ভাবে ততই রামভদ্রের বিরুদ্ধে তার মনে প্রচ্ছন্ন রাগ যেন জমতে লাগল। হঠাৎ তার মনে হল অতীতের কথা। তাকে সে গর্ত থেকে তুলে বাঁচিয়েছে। তারজন্য সে কি পেল। শুধু দুটো মিষ্টি কথা। রামভদ্রের কথা ভাবলেই গােপের মাথা গরম হয়ে যেত।
আস্তে আস্তে সে রামভদ্রের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ কমিয়ে দিল। তাকে দেখলেই তার মনে পড়ত সেই পনেরাে-শাে টাকার কথা। আর টাকার কথা মনে পড়লেই রামভদ্রকে যেন শত্রুর মতাে লাগত।
এরকম অবস্থায় গােপের স্ত্রী যে কথা প্রতিবেশিনীদের কাছে বলে বেড়াত সে-কথা ঘুরতে ঘুরতে রামভদ্রের কানেও গেল। সবাই তাে অন্যের মঙ্গল কামনা করে না। তাই যারা গােপ ও রামভদ্রের বন্ধুত্ব ভালাে চোখে দেখত
না তারা এই অবস্থার সুযােগ নিল। কয়েক জন রামভদ্রকে বলল, 'আপনার ধার শােধ করার জন্য গােপ প্রাণপাত পরিশ্রম করছে আর আপনি দেখেও না দেখার ভান করছেন। এ আপনার উচিত হচ্ছে না।'
রামভদ্র লােকের মুখ থেকে এইসব কথা শুনে ভাবল সে তাে গােপকে কোনােদিন টাকা শােধ করার কথা বলেনি। তবু কেন লােকের মুখে মুখে এ-কথা ঘুরছে। গােপ নিজেই তাে শােধ করে দেবে বলেছে। সে তাতে কোনাে কথা বলেনি। কারণ শােধ দিতে হবে না বললে গােপ হয়তাে মনে দুঃখ পেত। অন্যদিক থেকে গােপ যদি বলত, 'আমি তােমার টাকা কোনােদিনই বােধ হয় শােধ দিতে পারব না।' তাহলে কি আমি তার কাছে হাত পেতে চাইতাম। বরং আমার কত ভালাে লাগত। সামনাসামনি কিছুই বলল না অথচ পিছনে এইসব কথা প্রচার হচ্ছে। এইভাবে ভাবতে ভাবতে নিজেদের অজান্তেই কবে যে একে অন্যের শত্রু হয়ে গেল তারা নিজেরাই টের পেল না।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, গােপ ও রামভদ্রের মধ্যকার অমন নিবিড় বন্ধুত্বে চিড় ধরল কেন? গােপের দারিদ্রই কি এরজন্য দায়ী? নাকি রামভদ্রের ব্যস্ততা? অথবা রামভদ্রের টাকাপয়সাই দায়ী? রাজা আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি তুমি জবাব না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
‘ওদের বন্ধুত্বে চিড় ধরার মূলে ছিল শুধু টাকা। ওদের দুজনেই একথা ভালােভাবেই জানত যে টাকার আদান-প্রদানের ফলে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ওরা সবসময় টাকাপয়সার ব্যাপারে সতর্ক থাকত। টাকার ব্যাপারে ওদের ওই ধারণার ফলেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরতে ধরতে পরিণতি অত খারাপ হয়ে গেল। টাকার ব্যাপারে অত গুরুত্ব না দিয়ে ওরা বন্ধুত্ব দৃঢ়তর করার চেষ্টা করলে ওদের বন্ধুত্ব অটুট থাকত।'
রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে। হাওয়া হয়ে গেল। পরক্ষণেই গিয়ে উঠল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন