ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি এই শব বহনের কাজ কোনো চাকরকে দিয়ে না করিয়ে নিজেই যে করছ তারজন্য আমি তোমাকে প্রশংসা করি। কারণ যত বিশ্বাসী চাকরই হোক না কেন, অনেক সময় চাকরও রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। প্রমাণ স্বরূপ বিষ্ণুগুপ্তের কাহিনি বলব।' বেতাল কাহিনি শুরু করল
প্রাচীন কালে পঞ্চাল দেশে গুণসিংহ নামে রাজা ছিল। সে নিষ্ঠুর শাসক ছিল।
গুণসিংহ মাঝে মাঝে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াত। শুনতে পেল ধনগুপ্ত ঘুষ খায়।
পরিকল্পনা অনুসারে গুণসিংহ এবং তার মন্ত্রী ছদ্মবেশে ধনগুপ্তের কাছে গেল। ওদের দু-জনের মধ্যে বিরাট বিরোধ আছে বলে জানাল। ঘটনা শুনে মনে হল বিচারের রায় মন্ত্রীর দিকেই যাবে। অর্থাৎ মন্ত্রী নিরপরাধ, দোষী রাজা। ধনগুপ্ত সব কথা শুনে পরের দিন বিচারের রায় জানাবে বলে দিল। সেদিন রাত্রে রাজা গোপনে ধনগুপ্তের সঙ্গে দেখা করল। রাজা তাকে বলল, 'আমাকে নির্দোষি হিসেবে রায় দেবেন। আপনাকে এক-শোটি মোহর উপহার দেব।' বলে রাজা চলে গেল।
পরের দিন যথারীতি রাজা ও মন্ত্রী ছদ্মবেশে গেল। ধনগুপ্ত মন্ত্রীকে অপরাধী বলে ঘোষণা করল।
এই রায় ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে রাজা ও মন্ত্রী নিজেদের ছদ্মবেশ খুলে ফেলল। রাজার নির্দেশে তার লোক ধনগুপ্তকে বন্দি করে নিয়ে গেল। বিচারে ধনগুপ্তের ফাঁসি হল।
প্রজাদের মতে ধনগুপ্তকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ওরা রাজাকে দোষ দিল। তাদের মতে ছোট্ট অপরাধের জন্য ধনগুপ্তকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
ধনগুপ্তের ছেলের নাম বিষ্ণুগুপ্ত। বিষ্ণুগুপ্ত অনেক লেখাপড়া করেছিল। সেও রাজার এই কাজে তীব্র সমালোচনা করল। তার কথা ছিল, 'যে রাজা সত্যিকারের শাসন করতে পারেন তিনি যদি কঠোরতম শাস্তিও দেন মাথা পেতে নেওয়া যায় কিন্তু দুর্বল শাসক এই ধরনের শাস্তি দিলে মানা যায় না।'

কিছুদিন পরে দেখা গেল বিষ্ণুগুপ্ত রাজার কাছাকাছি পৌঁছাল। গুণসিংহ তার কাজ দেখে মুগ্ধ হত। বিষ্ণুগুপ্ত যেটাকে গোপন রাখতে বলত সেটা সে গোপন রাখত।
আরও কিছুদিন পরে পঞ্চালদেশ আক্রমণ করল অন্য দেশের রাজা। বোঝা গেল পঞ্চালদের পরাজয় ঘটবে।
সেইসময় গুণসিংহ, আর কোনো উপায় না পেয়ে শত্রুকে কৌশলে পরাজিত করার চেষ্টা করল। রাজা বিষ্ণুগুপ্তকে গোপনে বলল, 'শোনো বিষ্ণুগুপ্ত, অঘটন কিছু না ঘটলে পরাজয় এড়ানো যাবে না। তোমার হাতে এক লক্ষ মোহর দিচ্ছি। এই মোহর নিয়ে তুমি গোপনে, রাজার অঙ্গরক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। একমাত্র সেই-ই পারবে রাজাকে মেরে ফেলতে। মেরে ফেললেই তার হাতে এই মোহর দেবে।'
সেই রাত্রে এক লক্ষ মোহর নিয়ে বিষ্ণুগুপ্ত সোজা বাড়ি চলে গেল। এক লক্ষ মোহর বাড়িতে রেখে সে শত্রু শিবিরে গেল। শত্রুপক্ষের রাজার সঙ্গে গোপনে দেখা করল। তাকে হত্যার চক্রান্ত যে চলছে তা জানিয়ে দিল। শত্রু খুব সহজেই গুণসিংহকে পরাজিত করল।
যুদ্ধের চরম মুহূর্তে গুণসিংহ হঠাৎ যেন ভূত দেখল। বিষ্ণুগুপ্ত তাকে আক্রমণ করতে এগিয়ে এল। হত্যা করার পূর্বমুহূর্তে বিষ্ণুগুপ্ত বলল, 'গুণসিংহ, আমি পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিচ্ছি।'
গুণসিংহের মারা যাওয়ার পর শত্রু-রাজা বিষ্ণুগুপ্তকেই পঞ্চালদেশের রাজা করে দিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা বিষ্ণুগুপ্ত কি প্রথম থেকেই রাজদ্রোহী ছিল, না পরে হল? হত্যা করার আগে সে কি হঠাৎ প্রতিশোধের কথা ভেবেছিল, নাকি গোটা ব্যাপারটাই পরিকল্পিত? হত্যার করার উদ্দেশ্যই যখন ছিল তখন আগে করল না কেন? আগে তো সে রাজার কাছেই থাকত। কেন যে রাজাকে হত্যা করার জন্য বিষ্ণুগুপ্ত এতদিন অপেক্ষা করল আমি তা বুঝতে পারলাম না। রাজা, আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'বিষ্ণুগুপ্ত গোড়ায় রাজভক্ত ছিল। তার বাবাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে অন্য যেকোনো শাস্তি দিলে হয়তো সে রাজার বিরুদ্ধে কোনো মনোভাব পোষণ করত না। তারও মতে ঘুষখোরকে শাস্তি দেওয়া উচিত। তবে তার আর একটি মতও ছিল। সে মত হল, যে ঘুষ দেয় সেও অপরাধী। তাই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে গুণসিংহ যখন ঘুষ দিয়ে শত্রুরাজাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করল তখন সে মনে মনে রাজার বিরুদ্ধে দাঁড়াল। এবং সময় ও সুযোগ পেয়েই সে তাকে হত্যা করল।'
রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন