ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছে উঠে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, 'রাজা শব নিয়ে স্বর্গে যাওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু শব নিয়ে নরকে যাওয়ার কথা কি কখনো কানে গেছে? আমি শুনেছি। আমি সেই কাহিনি শোনাতে চাই। শুনলে তোমার পথ হাঁটার পরিশ্রম লাঘব হবে।' এই কথা বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল
হেমন্ত দেশে এক বিধবা ছিল। তার কুসুমাবতী নামে এক কন্যা ছিল। কন্যাটি যখন শিশু তখনই তার বাবা মারা যায়। ওদের বিষয়সম্পত্তি কিছু ছিল না। ফলে বিধবাকে ভিক্ষে করে বাঁচার চেষ্টা করতে হয়। বিধবা কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যায়নি। কোনো একটি লোকের ঘাড়ে চাপেনি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে যা পেত তাই খেয়ে মেয়েকে বাঁচাত এবং নিজেও বাঁচত। মেয়ে যখন বড়ো হল তখন বিধবা বুড়ি হল। বাড়ি বাড়ি ঘোরার ক্ষমতা তার রইল না। মার এই অবস্থা দেখে কুসুমাবতী বলল, 'মা, আমার ছোটোবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করছ। আমি এখন বড়ো হয়েছি। আমার শরীরে খাটার মতো শক্তি আছে। তুমি আর এইভাবে ঘোরাঘুরি করো না। তার চেয়ে এক কাজ কর আমাকে কোনো বাড়িতে থেকে কাজ করার ব্যবস্থা করে দাও। সারাদিন আমি ওদের বাড়িতে থাকব। কাজ করব, খাব। এখন থেকে তোমার খাওয়ার পরার ভার আমার।'
মেয়ের এই কথায় বিধবা রাজি হল। ওরা কাজের জন্য বাড়ি বাড়ি খোঁজ করল। শেষে অনেক বড়োলোকের বাড়িতে খোঁজ করেও কাজ পেল না। ঘুরতে ঘুরতে অন্য গ্রামে চলে গেল। রাত হয়ে গেল। এক বড়ো বাড়ি দেখে বাড়ির বড়ো গিন্নিকে ডেকে বলল, 'মা, অনেক রাত হয়ে গেছে। আমরা মেয়েমানুষ। এই রাত্রে বাড়ি ফিরতে পারছি না। রাতটা আপনার দাওয়ায় কাটিয়ে দিতে চাই। দয়া করে থাকতে দিন।'
বাড়ির বড়ো গিন্নি বুড়ি এবং মেয়ের কথায় শুধু যে রাজি হল তাই নয় ওদের পেট ভরে খেতেও দিল। তারপর ভালো জায়গায় ওদের ঘুমোতে দিল।
পরের দিন কুসুমাবতী ওই বাড়ির বড়ো গিন্নিকে বলল, 'মা, আপনার বাড়িতে যদি কাজের লোকের দরকার থাকে তবে আমাকে রাখতে পারেন। আমি আপনার সমস্ত কাজ করতে পারব। যখন যে কাজ বলবেন করব। টাকাপয়সা কিছু চাই না। আপনার বাড়িতে আমি এবং মা শুধু দু-বেলা দু-মুঠো খেতে চাই।'
'এ বাড়িতে কাজের কি অভাব আছে মা। তোমার মতো ভালো মেয়ে আমিও খুঁজছিলাম। আজ থেকে তুমি এবং তোমার মা এখানেই থেকে যাবে।' বলল বড়ো গিন্নি।
ওদের বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি ঘর ছিল। ওই ঘরেই মা আর মেয়েকে থাকতে দিল। মেয়ে সারাদিন ওই বাড়ির কাজ করত। মাঝে একবার আসত মাকে খাবার দিতে। মেয়ে যত বার আসত তত বারই মাকে জিজ্ঞেস করত, 'কেমন আছ মা?' মা খুব খুশি হত।
এদিকে ওই বাড়ির বড়ো গিন্নি কুসুমাবতীর কাজে খুব সন্তুষ্ট ছিল। ওরা, বিশেষ করে বড়ো গিন্নি কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির সব কথা কুসুমাবতীকে বলত।
এভাবে দু-মাস কেটে গেল। একদিন সন্ধ্যার সময় কুসুমাবতী যখন জল আনছিল তখন তাকে এক বলিষ্ঠ যুবক সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি তো এ পাড়ার মেয়ে নও। তুমি কাদের জন্য জল নিয়ে যাচ্ছ?'
'ঠিকই বলেছেন। আমি এ পাড়ার মেয়ে নই। ওই বাড়ির জল নিয়ে যাচ্ছি। তবে আপনিও বোধ হয় এ পাড়ার লোক নন। তাই না?' কুসুমাবতী বলল।
'মাঝে কিছুদিন আমি এখানে ছিলাম না। আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে। একটি বছর গোপনে থাকতে হবে। তা না হলে আমার কপালে নরকবাস আছে। আর এই একটি বছর কেটে গেলে, আমি সারাজীবন আর চারজনের মতো বাঁচতে পারব। তবে গোপনে থাকতে হলেও অন্তত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলে বাঁচতে পারব না। তাই এই একটি বছর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাই।' ওই যুবক বলল।
'আপনার খবর গোপন রাখব। কিন্তু আপনাকে কীভাবে সাহায্য করব ভেবে পাচ্ছি না।' কুসুমাবতী বলল।
'ওই বাড়ির যিনি বড়ো গিন্নি উনিই আমার মা। আমি যেদিন থেকে গা-ঢাকা দিয়ে আছি সেদিন থেকেই উনি আমার ঘরে তালা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছেন। তুমি ওই ঘর খুলতে বলবে। আর যদি খুলতে না চায়, তুমি কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার ভয় দেখাবে। বুঝেছ? এবার যাই। আবার দেখা হবে।' বলে যুবক চলে গেল।

কুসুমাবতী বাড়িতে ঢুকে বড়ো গিন্নিকে বলল, 'আচ্ছা মা, এই ঘরটা তো খালি খালি পড়ে আছে। আমার আসার পর থেকেই দেখছি এই ঘর ব্যবহার হচ্ছে না। এটাকে খুলে দিন। এই ঘরে আমি ঘুমাব। রাত্রে ভালো ঘুম হলে দিনে বেশি করে কাজ করতে পারব।'
বড়ো গিন্নির খুব রাগ হল। সে বলল, 'তোর সাহস তো কম নয়। ওই ঘর আমার ছেলের। ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে ওই ঘর আমি বন্ধ রেখেছি। ওর মৃতদেহ বাইরে আনার পর থেকে আমি ওই ঘরে আর কাউকে ঢুকতে দিইনি। কারণ সৎকারের আগে মৃতদেহ হাওয়া হয়ে গেছে। নিশ্চয় ভূতপ্রেতের কাজ। তাই সেদিন থেকে ঘর বন্ধ রেখেছি।'
'ওই ঘরে না ঘুমোতে দিলে আপনার বাড়িতে কাজ করব না।' কুসুমাবতী বলল।
তার কথা শুনে গিন্নি একটু নরম হয়ে বলল, 'একদিন না একদিন ওই ঘর খুলতেই হবে। তবে তোর শোওয়ার জন্য এই ঘর ছাড়ার ইচ্ছে করছে না।' পরে চাবি এনে কুসুমাবতীর হাতে দিল।
কুসুমাবতী ঘরের তালা খুলে, দরজা, জানলা, দেয়াল সব ঝাড়পোঁছ করে ঘরটাকে পরিষ্কার করল।
ওই ঘরে খাট ছিল, বিছানা ছিল। সেই রাত্রে কুসুমাবতী ওই ঘরে ঘুমাল। মাঝ রাতে দরজা ঠেলে ওই যুবক ঘরে ঢুকল। দু-জনের মধ্যে কথা হল। সে তাকে জানাল তার দেহ হাওয়া হয়ে যাওয়ার কাহিনি। কুসুমাবতী বুঝল, যুবকটির মারা যাওয়ার কথা, যা শুনেছে তা সত্য নয়। অন্য কোনো কারণ ছিল। পিশাচরা ওর দেহটাকে মৃতদেহের মতো করে ফেলেছিল। ওকে এখন নরকে পিশাচদের সেবা করতে হয়। এক ঘণ্টা করে ছুটি পায়। ওই এক ঘণ্টা সে যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে। আত্মীয় ছাড়া যেকোনো লোকের সঙ্গে দেখা করতে পারে।
সেই রাত্রে যুবকটি কুসুমাবতীর সঙ্গে গল্প করে এক ঘণ্টা কাটিয়ে চলে গেল।
তারপর থেকে প্রত্যেক দিন রাত্রে যুবকটি আসত। কুসুমাবতীর সঙ্গে গল্প করে আবার পিশাচদের সঙ্গে ফিরে যেত। ক্রমশ ওদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠল।
কিছুদিন পরে কুসুমাবতী বুঝল যে সে মা হবে। ওই বাড়ির গিন্নিও লক্ষ করল যে কুসুমাবতী মা হতে চলেছে। কিন্তু কুসুমাবতীর স্বামী যে কে তা জানার কৌতূহল তার মনে জাগল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না।
এর মধ্যে একদিন কুসুমাবতী কাজে এল না। বেরুলই না। বড়ো গিন্নি ঘরের কাছে গিয়ে কান খাড়া করে শুনল। কার সঙ্গে যেন কথা বলছে কুসুমাবতী। দরজাটা একটু ঠেলে দেখল, কুসুমাবতী একটি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। আর তার চেয়ে অবাক হল তার সামনে বসে রয়েছে তারই ছেলে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে আর সেখানে বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেল।
কিছুদিন পরে কুসুমাবতী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কাজ করতে লাগল। তখন বাড়ির একজন এসে বলল, 'মার হুকুম তোমার ঘরে এই বড়ো বাক্সটা রাখতে হবে। এই বাক্সে নাকি অনেক সোনা-রূপা আছে।'
কুসুমাবতী তাতে রাজি হল। সন্ধ্যের আগেই ওই বাক্স কুসুমাবতীর ঘরে ঢুকল। সেই বাক্সের ভেতরে বড়ো গিন্নি বসেছিল। ফুটো দিয়ে সে সব লক্ষ করতে লাগল।
মাঝরাত্রে তার ছেলে এল। আর থাকতে না পেরে বাক্সর ঢাকনা খুলে বড়ো গিন্নি বেরিয়ে এসে বলল, 'বাবা এসেছিস!' বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।
ছেলে খুশি হওয়ার পরিবর্তে বিরক্ত হয়ে বলল, 'তুমি আমার কী যে সর্বনাশ করলে মা! আর একটি মাস কেটে গেলে সারাজীবন আমি তোমার কাছে থাকতে পারতাম। এই যে তুমি আমাকে দেখে ফেললে এর ফলে আমাকে আরও সাত বছর নরকে কাজ করতে হবে।'
'তোকে যেতে দেবে কে? প্রাণ থাকতে আর আমি তোকে যেতে দেব না। এখন থেকে তোকে সবসময় চোখে চোখে রাখব।' তার মা বলল।
'পিশাচদের তুমি ঠেকাতে পারবে কি মা? কেউ পারে না। ওরা যা করতে চাইবে তা করবেই। তুমি ওদের কোনো বাধা দিতে পারবে না।' ছেলে বলল।
তার মা ঘরের বাইরে দাঁড়াল। উদ্দেশ্য পিশাচদের ঘরে ঢুকতে দেবে না। কিছুক্ষণ পরে ছেলের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু শুনতে পেল না। তখন ঘরে ঢুকে দেখল ছেলে নেই।
ওকে পিশাচরা নিয়ে যাওয়ার সময় কুসুমাবতী বলল, 'আমার মাকে আর আমার কোলের এই বাচ্চাটিকে দেখাশোনার ভার নিলে তোমার পরিবর্তে আমি নরকে কাজ করতে পারি।'
'আমি শপথ করছি, আমি সেই দায়িত্ব নেব।' বলল কুসুমাবতীর স্বামী।
পিশাচদের বলে-কয়ে রাজি করাল, যাতে ওরা তার পরিবর্তে কুসুমাবতীকে নিয়ে যায়। কুসুমাবতী কোলের ছেলেকে আদর করে পিশাচদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হল। পিশাচরা সানন্দে কুসুমাবতীকে নিয়ে গেল। কুসুমাবতীর এই ত্যাগের ফলে নিজের ছেলেকে ফিরে পাওয়ায় বড়ো গিন্নি খুব খুশি হল।
নরকে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই কুসুমাবতী বুঝল, নরকযন্ত্রণা কী জিনিস! তবু সে মনে মনে খুশি যে তার স্বামীকে সাত বছরের নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পেরেছে। এই কথা ভাবতে ভাবতে সে দিনের পর দিন নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে লাগল।
সাত বছর পরে সে নরক থেকে মুক্তি পেল। পিশাচরা তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিল। স্বামীর বাড়িতে এসে দেখল অনেক লোকজন বাড়িতে ভিড় করে আছে। সানাই বাজছে। জানতে পারল তার স্বামী সাত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আর একটি মেয়েকে বিয়ে করার ব্যবস্থা করছে। সে আরও জানতে পারল তার মা কিছুদিন আগে মারা গেছে। সে দূর থেকে লক্ষ করল, তার স্বামী এবং শাশুড়ি ও তার সাত বছরের ছেলে লোকজনকে নানা রকমের উপহার দিচ্ছে। এসব দেখে কুসুমাবতীর চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল। সে ভিড় ঠেলে স্বামী ও শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ছেলের তো প্রশ্নই ওঠে না। স্বামী বা শাশুড়ি কেউই কুসুমাবতীকে একেবারেই চিনতে পারল না।
রাগে, ক্ষোভে, অপমানে ও দুঃখে কুসুমাবতী তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে একবার স্বামীর দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, স্বামীর পরিবর্তে কুসুমাবতী নরকে গেল কেন? স্বামীর প্রতি ভালোবাসার জন্য? নাকি সে ভেবেছিল ওইভাবে যাওয়াই স্ত্রীর কর্তব্য। যে স্ত্রী এত বড়ো একটা ত্যাগ স্বীকার করল সেই স্ত্রীই বা বিয়েতে বাধা দিল না কেন? অন্য মেয়েকে তার স্বামী বিয়ে করছে দেখেও সরে গেল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বিক্রমাদিত্য বললেন, 'কুসুমাবতী আজীবন কষ্ট পেয়েছে। তার পক্ষে কোনো কষ্টই আর কষ্ট নয়। সে চিরকাল অন্যকে সুখ দিতে চেয়েছে। স্বামীর প্রতি দয়াবশতই সে নরকে গেছে স্বামীর কষ্ট তার অসহ্য। মা যাতে ছেলেকে আবার নিজের কাছে ফিরে পায় তারজন্যও সে স্বামীর পরিবর্তে নরকে গেছে। অন্যদিকে কুসুমাবতীকে তার স্বামী নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কুসুমাবতীর মনে একটা ভয় ছিল কোলের ছেলে ও বুড়ি মায়ের ব্যাপারে। কিন্তু মা যখন মারা গেল, ছেলে যখন বড়ো হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্বামী যখন সাত বছর পূর্ণ হতে-না-হতেই বিয়ে করতে বসেছে তখন তার আর সেখানে থাকতে ইচ্ছে করল না। তাই চলে গেল।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন