চোরের সম্মান

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য ওই গাছে উঠে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে অন্যান্য বারের মতাে মৌনভাবে শ্মশানের দিকে হাঁটা দিল। তখন শব থেকে বেতাল বলল, ‘রাজা আমার সন্দেহ হচ্ছে একটা ব্যাপারে। আপনি সজ্জনদের জন্য পরিশ্রম করছেন না দুর্জনদের জন্য? চন্দ্রসেন রাজার মতাে কয়েক জন রাজা আছেন যাঁরা দুর্জনদের শাস্তি দেবার পরিবর্তে সম্মানিত করেন। উদাহরণস্বরূপ আমি মহারাজা চন্দ্রসেনের কাহিনি বলছি, শুনলে পরিশ্রম কমবে, শুনুন।'

বেতাল বলল : কোনাে এক কালে চন্দ্রাবতী নগরে মহারাজ চন্দ্রসেন রাজত্ব করতেন। ওই দেশে বহু কোটিপতি ব্যাবসাদার থাকত কিন্তু দেশ সমৃদ্ধ ছিল না। বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র ছিল। আসলে ওই দেশের সমস্ত সম্পত্তি ব্যাবসাদারদের কবলে ছিল। তাই রাজা ব্যাবসাদারদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। তাদের সুখ-সুবিধা দেখাশােনা করাই তার প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য ছিল। ধনী আরও ধনী হত, গরিব আরও গরিব।

কিন্তু ওদের সামনে একটা সমস্যা দেখা দিল, একজন ডাকাতের উপদ্রব। আগেভাগে জানিয়ে সে ডাকাতি করত। ওই ডাকাতকে ধরা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার কারণ ও নিজের দলে অন্য কাউকে নেয়নি। তার ডাকাতির সময় তাকে কেউ চিনতে বা চেনাতে পারত না। এ ছাড়া ডাকাতি করার পরক্ষণেই সে যা পেত তাই গরিবদের মধ্যে ভাগ করে দিত। যাদের সাহায্য করত তারাও টের পেত না কে বা কারা সাহায্য করছে। ব্যাবসাদাররা নিজেদের রক্ষা করতে পারল না। ওই ডাকাতটাকে ধরার সমস্ত চেষ্টাই যখন ব্যর্থ হল তখন তারা রাজার কাছে গিয়ে বলল, ‘রাজা ডাকাতটাকে না ধরে হাত গুটিয়ে বসে থাকা আপনার পক্ষে ভালাে হচ্ছে না। আমাদের রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব।'

‘আমি প্রহরী নিযুক্ত করেছি ওই ডাকাতটাকে ধরতে। ডাকাতটা একদিন ধরা পড়বেই।' রাজা বলল।

‘আপনার ওই ডাকাত ধরার আগে আমরা সবাই ভিখারি হয়ে যাব। এখন আপনি ঘােষণা করিয়ে দিন : যে ধরবে তাকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হবে। ওই ডাকাতের সাথী কেউ-না-কেউ ওকে ধরিয়ে দেবে।' ব্যাবসাদাররা বলল।

রাজা ব্যাবসাদারদের কথামতাে ঢাক পিটিয়ে ঘােষণা করিয়ে দিলেন। কিন্তু তাতে কোনাে ফল হল না। কেউ ডাকাতটাকে ধরিয়ে দিল না। ডাকাত যথারীতি ডাকাতি করে যেতে লাগল।

ওই ডাকাতের নাম গঙ্গাদাস। সে খুব গরিব লােক। ডাকাতি করা ছাড়া অন্য কোনাে কাজ সে করত না। সে লক্ষ করল যে বিভিন্ন দক্ষ লােক বেকার হয়ে বসে আছে। কাজ পাচ্ছে না। না খেতে পেয়ে মরছে। তাই, সে আর কোনাে কাজ না পেয়ে চুরি করার কাজটাকেই বেছে নিল জীবিকা হিসেবে। একদিন গঙ্গাদাস গভীর জঙ্গলের এক পাহাড়ি গ্রাম থেকে ফিরছিল। ইতিমধ্যে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছানাের উদ্দেশ্যে সে জোরে পা চালিয়ে হাঁটল। পথে সে ওই ঘন বন থেকে মানুষের গােঙানি শুনতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। ঝােপঝাডের মধ্যে একটা লােক পড়ে পড়ে গােঙাচ্ছে।

'কী হয়েছে ভাই, তুমি কে?’ গঙ্গাদাস সেই লােকটাকে প্রশ্ন করল। ‘আমার নাম রামদত্ত। আমি রাজগিরির নিবাসী। ব্যাবসার কাজে আমি চন্দ্রাবতী নগরে যাচ্ছিলাম। পথে ভালুক আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। আচ্ছা

তুমি কে ভাই?’ এত রাত্রে, এখানে?

সেই ব্যাবসাদার জিজ্ঞেস করল।

গঙ্গাদাস নিজের নাম বদলে বলল, 'আমার নাম ধর্মদাস। আমি এক গরিব লােক।'

গঙ্গাদাস রামদত্তকে নিজের বাড়িতে তুলে আনল। তার শরীরে ওষুধ লাগিয়ে সেবা করতে লাগল গঙ্গাদাস।রাত্রে গঙ্গাদাসকে যখন-তখন বেরিয়ে যেতে দেখে রামদত্ত তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি রাত্রে কোথায় যাও বল তাে?’

জবাবে গঙ্গাদাস অন্য কথা বুঝিয়ে বলে দিল। রামদত্তের ভালাে ভাবে সেরে উঠতে অনেক দিন সময় লাগল। ইতিমধ্যে দুজনের মধ্যে বেশ ভালাে সম্পর্ক গড়ে উঠল। রামদত্ত একদিন গঙ্গাদাসকে বিশেষ ভাবে প্রশ্ন করল, 'তােমার এমনকী পেশা? কীভাবে তােমার দিন চলে?

রামদত্তের উপর গঙ্গাদাসের বিশ্বাস জন্মে উঠে ছিল। তাই গঙ্গাদাস রামদত্তকে নিজের সত্য কথা জানিয়ে দিল।

রামদত্ত যেদিন জানতে পারল যে গঙ্গাদাসই ডাকাত সেদিন থেকে গঙ্গাদাসের প্রতি তার টান কমে যেতে লাগল। সে জানতে পেরেছিল যে গঙ্গাদাসকে যে ধরিয়ে দেবে তাকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হবে। রামদত্তের মনে দশ হাজার। টাকার লােভ পেয়ে বসল। সে মনে মনে ভাবল ওই দশ হাজার টাকা দিয়ে সে লক্ষ লক্ষ টাকা করতে পারবে।

একদিন গঙ্গাদাস পাশের গ্রামে অন্য এক কাজে গেল। রামদত্ত ওই ফাকে রাজার কাছে গিয়ে বলল যে সে গঙ্গাদাসকে ধরিয়ে দেবে তাকে যেন দশ হাজার টাকা পুরষ্কার দেওয়া হয়!

‘কোনাে এক অজুহাতে ডাকাতকে কাল দুপুরে রাজপ্রাসাদের কাছে নিয়ে এসাে। আমার প্রহরী তাকে ধরে ফেলবে।' রাজা বললেন।

রামদত্তের আনন্দ আর ধরে না। সে আবার গঙ্গাদাসের বাড়িতে এল। সে গঙ্গাদাসকে বলল, 'ভাই গঙ্গাদাস, আমি আজ পর্যন্ত কোনােদিন শহর দেখিনি। কালকে তুমি আমাকে সারা শহর দেখাবে?’ গঙ্গাদাস রাজি হল। কারণ রামদত্তকে সে সন্দেহ করেনি।

দু-জনে খাবারদাবার বেঁধে পরের দিন সকালে শহর দেখতে চলল। দুপুরের সময় ওরা রাজপ্রাসাদের কাছে গেল। সেখানকার এক পুকুরের পাশে, গাছের নীচে বসে খাবার খেতে লাগল।

ঠিক তখনই কোখেকে এক কুকুর তাদের কাছে এল। রামদত্ত সেই কুকুরটাকে তাড়া করল কিন্তু গঙ্গাদাস কুকুরটাকে একটু খাবার খেতে দিল।

খাবার খাওয়ার পর রামদত্ত গঙ্গাদাসকে বলল, 'চল, রাজপ্রাসাদের কাছে আমাকে ঘুরিয়ে আনবে।'

কুকুরটাও গঙ্গাদাসের পিছনে চলল। ওরা দু-জনে রাজপ্রাসাদের সামনে পৌছাল। রামদত্ত প্রাসাদের সামনের প্রহরীর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু ওরা গঙ্গাদাসকে ধরার কোনােরকম চেষ্টা করল না।

তখন অগত্যা রামদত্ত চিৎকার করে বলল, 'এখন তুমি আমার কবলে। এখন পালাবে কী করে।'

রামদত্তের বিশ্বাসঘাতকতা দেখে গঙ্গাদাসের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে তৎক্ষণাৎ রামদত্তকে মারার জন্য কোমর থেকে ছােরা বের করল। কিন্তু আগে থেকেই রামদত্ত প্রস্তুত থাকায় সে-ই আগে ছােরা ছুড়ে মারল। হঠাৎ সেই কুকুর ছােরার সামনে লাফিয়ে পড়ল। ছােরা কুকুরের গায়ে বিদ্ধ হল। কুকুর তক্ষুনি মারা গেল।

পরক্ষণেই গঙ্গাদাস নিজের তরবারি বের করে রামদত্তের মাথায় আঘাত করল। তখন প্রহরীরা এগিয়ে গিয়ে গঙ্গাদাসকে ধরে ফেলল।

গঙ্গাদাস রামদত্তের মৃত দেহের উপর লাথি মেরে বলল, ‘পাজি বদমাইস! তাের চেয়ে ওই রাস্তার কুকুরটা ঢের ভালাে। প্রহরী গঙ্গাদাসকে রাজার সামনে হাজির করল। রাজা গঙ্গাদাসের সাথে অনেকক্ষণ গােপনে আলােচনা করলেন।

পরের দিন দেশের সমস্ত বড়াে বড়াে নামকরা ব্যাবসাদারদের ডেকে পাঠালেন। সবার সামনে গঙ্গাদাসকে হাজির করে রাজা বললেন, ‘এই গরিব লােকটা আমাদের দেশের বিরাট উপকার করেছেন। এর পর আর কোনাে চুরি-ডাকাতি হবে না। প্রত্যেকে দশ দশ হাজার করে এই লােকটাকে দিলেও এর উপকারের ঋণ শােধ হবে না।'

ব্যাবসাদাররা রাজার কথামতাে গঙ্গাদাসকে পুরস্কৃত করল। তারপর গঙ্গাদাস রাজার পরামর্শদাতার পদে নিযুক্ত হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, মহারাজ চন্দ্রসেনের এই ধরনের ব্যবহারের কারণ কী? তাঁর প্রহরীরা গঙ্গাদাসকে দেখার সাথে সাথে ধরল না কেন? ডাকাতের ধরা পড়ার পর তাকে শাস্তি না দিয়ে ব্যাবসাদারদের দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করালেন কেন? তাকে নিজের পরামর্শদাতা নিযুক্ত করলেন কেন? গঙ্গাদাস কি রাজাকে বলে ছিল যে সেই ডাকাতটাকে মেরে ফেলেছে? তার আগের দিন রাজা রামদত্তকে দেখে ছিলেন না? রাজা কি গঙ্গাদাসকেই রামদত্ত ভেবে ছিলেন ? এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দেন তাে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

তারপর বিক্রমাদিত্য বলল, 'ওই ডাকাতের জন্য রাজার কোনাে ক্ষতি হচ্ছিল বলে তাে আমার মনে হচ্ছে না। রাজা ছিলেন ব্যাবসাদারদের হাতের পুতুল। ব্যাবসাদারদের ক্ষতির ফলে রাজার কোনাে দুঃখ ছিল না। তাই ডাকাতটাকে ধরার ব্যাপারে রাজা হয়তাে তত ব্যস্ত ছিলেন না। উলটে রাজা যখন গরিবদের উপকার করতে পারছিলেন না তখন ওই ডাকাতই উপকার করছিল। এইভাবে হয়তাে ডাকাতটা রাজার ইচ্ছাই পূরণ করছিল। ডাকাতটাকে ধরানাের জন্যে যে লােকটা এগিয়ে এল সে বিশ্বাসঘাতক ছাড়া আর কিছু নয়। তাই বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি রাজা ডাকাতকে দিয়েই দেওয়ালেন। গঙ্গাদাস রাজাকে হয়তাে সমস্ত সত্য কথাই জানিয়েছে। মিথ্যা কথা বলে দশ হাজার টাকা রােজগার করার লােভ গঙ্গাদাসের মনে ছিল না। তাই রাজা তাকে শাস্তি দিলেন না। রাজা জানতেন। যে ব্যাবসাদারদের কাছ থেকে গঙ্গাদাসকে যে পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছেন তা গরিবদের হাতেই পৌঁছে যাবে। তাকে পরামর্শদাতার পদে নিযুক্ত করার পেছনেও কারণ ছিল। রাজা হয়তাে তার মাধ্যমে ব্যাবসাদারদের রহস্য জেনে তাদের হাত থেকে নিজেকে ক্রমশ মুক্ত করতে চেয়েছেন।'

রাজার মুখ খােলার সাথে সাথে মৌন ভাব ভঙ্গ হল। তৎক্ষণাৎ বেতাল শব নিয়ে উঠে বসল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%