তিন জন তিরন্দাজ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছে উঠে শবদেহ নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, তোমার প্রতিভার তুলনা নেই। তবে তোমার প্রতিভাই শেষ নয়। তুমি শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান নাও হতে পার। মনে রেখো, জগতে সব্যসাচীর মতো লোকও আছে। তুমি হয়তো তার কাহিনি শোনোনি। শোনো, বলছি। এই কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রমও কমে যাবে।' তারপর বেতাল কাহিনি শুরু করল

এক দেশে এক তিরন্দাজ ছিল। সে ডান হাতে এবং বাঁ-হাতে তির চালাতে পারত। উড়ন্ত পাখিকে যে-কোনো হাতে তির চালিয়ে মেরে ফেলত। তার এই গুণ থাকায় সে সব্যসাচী উপাধি পেল। প্রত্যেকে তার তির চালানোর দক্ষতার প্রশংসা করতে লাগল। সব্যসাচী বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে লাগল তার চেয়ে দক্ষ তিরন্দাজ আছে কি না খোঁজ করতে।

বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় সে বহু লোককে আনন্দ উৎসব করতে দেখল। ওদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল যে সেখানে দুর্গা পূজা হচ্ছে। এবং এই দুর্গা পূজা উপলক্ষ্যে তির চালানোর প্রদর্শনীও হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গার নামকরা ও পটু তিরন্দাজরা সেখানে উপস্থিত হয়েছে। সব্যসাচী ঠিক করল সেও এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করবে। বহু লোক সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। একজন অন্ধ তিরন্দাজকেও সব্যসাচী দেখতে পেল।

তির চালানো শুরু হল। একের-পর-এক তিরন্দাজ আসছে। তির চালাচ্ছে। একবার করে ঘণ্টা পড়ে নতুন নতুন তিরন্দাজ আসে। তির চালায়। দূরে একটি ঘণ্টা রাখা আছে। সেই ঘণ্টা বেজে উঠল। মুহূর্তে অন্ধের চালানো তির সেই ঘণ্টায় গিয়ে লাগল। দর্শকরা মহানন্দে হাততালি দিল। এই দৃশ্য দেখে সব্যসাচী হতবাক হয়ে গেল।

সব্যসাচী অন্ধ তিরন্দাজের কাছে গিয়ে বলল, 'দাদা, আমি উড়ন্ত পাখিকে ডান হাতে অথবা বাঁ-হাতে তির চালিয়ে ফেলে দিতে পারি। কিন্তু তোমার ক্ষমতা দেখে আমি তো আশ্চর্য হয়ে গেছি। আমি তো ধ্বনি শুনে লক্ষ্যভেদ করতে পারি না। অনেক পেছিয়ে আছি।'

তার কথা শুনে অন্ধ তিরন্দাজ বলল, 'তুমি হয়তো ঠিক কথাই বলেছ। আমি শব্দ শুনে তির চালাই বলে আমাকে শব্দভেদী বলে লোকে জানে। যারা আমার মতো অন্ধ তাদের তো প্রশ্নই ওঠে না। যাদের চোখ আছে তারা চোখে কাপড় বেঁধে তির চালায়। জন্মান্ধ শব্দভেদী তিরন্দাজ পৃথিবীতে আর নেই বলেই জানি।

'তোমার মতো দক্ষ তিরন্দাজের খোঁজেই আমি বেরিয়েছি। তির চালানোর যত রকম কৌশল আছে সবগুলি আমার শেখার ইচ্ছে আছে।' সব্যসাচী বলল।

'চল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।' অন্ধ তিরন্দাজ বলল।

দু-জনে রওনা হল। যেতে যেতে ওরা ধর্মপুরের অরণ্যে পৌঁছাল। সেখানে পৌঁছে ওরা যা জানল তাতে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। গাছের আড়ালে হাত বিহীন একটি লোক চুপচাপ বসে আছে। সে বাঁ-পায়ে ধরেছিল ধনুক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিরটাকে মুখে ধরে ছুড়ে দিল। চোখের পলকে একটি গাছ থেকে এক জোড়া পায়রা মাটিতে পড়ে গেল। সব্যসাচী যা দেখল তাতে তার আশ্চর্যের সীমা রইল না। সে ব্যাপারটা অন্ধ তিরন্দাজকেও বলল।

অন্ধ তিরন্দাজ বলল, 'তাহলে তো এই তিরন্দাজ আমাদের দু-জনের চেয়ে অনেক বেশি পটু।'

ওরা দু-জনে ওই হাত বিহীন তিরন্দাজের কাছে গিয়ে তার প্রশংসা করে বলল, 'তোমার মতো হাত বিহীন পাকা তিরন্দাজকে আমরা কোথাও দেখিনি। তা ছাড়া তোমার লক্ষ অভ্রান্ত।' তারপর ওরা নিজেদের পরিচয় দিল।

'আমি শুনেছি আমার মতো দক্ষ পায়ে ধনুক আর তির চালানোর লোক আর নাকি কেউ নেই। সেইজন্যই আপনারা হয়তো দেখেননি আমার মতো তিরন্দাজ।' হাত বিহীন তিরন্দাজ বলল।

তারপর সব্যসাচী অন্ধ ও হাত বিহীন তিরন্দাজকে বলল, 'আমরা তিন জনেই তির চালানোর ব্যাপারে যথেষ্ট কুশলী। রাজাকে বলে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে পারি এবং সেই প্রদর্শনীতে আমরা আমাদের ক্ষমতার পরিচয় দিতে পারি। তার ফলে বহু পুরস্কারও পেতে পারি।'

'তা তো ঠিক। কিন্তু রাজা যদি তিন জনকে পুরস্কার দেন তখন সেই পুরস্কার আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেব কী করে?' বলল হাত বিহীন লোকটা।

'কেন তিন জনের মধ্যে সমান ভাগ হয়ে যাবে। এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে কেন?' সব্যসাচী বলল।

এই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বলল হাত বিহীন তিরন্দাজ, 'আমাদের তিন জনকে যদি রাজা আলাদা আলাদা পুরস্কার দিতেন তাহলে রাজা নিশ্চয়ই আমাকে বেশি পুরস্কার দিতেন। তোমরা দু-জন তো হাত দিয়ে তির চালিয়ে দিতে পার। আমার অবস্থা রাজার নজরে পড়বে না?'

'কী যে বললে বুঝলাম না। চোখটাই তো আসল। চোখ থাকলে লক্ষ্যভেদ করার অসুবিধা কোথায়? আমি জন্ম থেকেই অন্ধ। রাজা আমার তির চালানো দেখেই আমাকে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার দিতেন। অন্ধ তিরন্দাজ বলল।

এসব তর্কবিতর্ক সব্যসাচীর ভালো লাগল না। সে বলল, 'আগে যাই তো রাজার কাছে। বিচারের ভার না হয় আমরা রাজার উপরেই ছেড়ে দেব।'

অদূর থেকে ওদের কথাবার্তা শুনে এক পাহাড়ি মেয়ে বলল, 'ধর্মপুরের রাজা তোমাদের পুরস্কার আলাদা আলাদা ভাবে দেবেন না। একসঙ্গেই দেবেন। তোমরা কীভাবে ভাগ করে নেবে সে কৌশল আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।'

সব্যসাচী বিরক্ত হয়ে বলল, 'আমাদের মধ্যে তোমার নাক গলানোর কোনো দরকার নেই। তুমি এমনভাবে বলছ যেন রাজা আমাদের উপহার দিয়ে দিয়েছেন।'

তাতে সে খিলখিল করে হাসল।

'অমন করে হাসছ কেন?' শব্দভেদী তাকে জিজ্ঞেস করল। তখন সে হাসতে হাসতে বলল, 'কেন আবার। তুমি তো অন্ধ। আর ওর তো হাত নেই। তোমাদের দু-জনকে ঠকিয়ে এই লোকটা রাজার সব পুরস্কার মেরে দেওয়ার তালে আছে।'

তার কথায় হাত বিহীন লোকটা বলল, 'ঠিক বলেছ। আমাদের দোষ-গুণের বিচার আমরা এতক্ষণ করতে পারিনি। তুমি ঠিক সময়ে ধরিয়ে দিয়েছ। এতই যখন উপকার করলে তখন কার কত পাওয়া উচিত ঠিক করে দাও।'

'তার আগে তোমাদের তিন জনের ক্ষমতা আমি নিজের চোখে দেখতে চাই।' পাহাড়ি মেয়ে বলল।

তার এই প্রস্তাবে তিন জনই রাজি হল। প্রথমে হাত বিহীন লোকটা তির ছুড়ে গাছের ডালে বসা একটা পাখিকে মেরে ফেলল। অন্ধ তিরন্দাজ অদূরে যে পাখি ডাকছিল তাকে তিরবিদ্ধ করল। আর সব্যসাচী উড়ন্ত দুই পাখিকে দুই হাতে মেরে ফেলে দিল।

সব দেখে-শুনে সে সব্যসাচীকেই সবচেয়ে বড়ো তিরন্দাজ বলে ঘোষণা করল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দিল যথাক্রমে শব্দভেদী এবং হাত বিহীন তিরন্দাজকে।

'আমার বিচার না মানলে আমার কিছু যাবে আসবে না। তোমরাই আমার কাছে বিচার চেয়েছ। আমি বিচার করে দিলাম। আর তির-ধনুকের ব্যাপার বলছ? তোমার হাতের তির-ধনুক আমাকে দাও আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।' বলে হাত বিহীন তিরন্দাজের তির-ধনুক নিয়ে নিল।

একটি গাছে এক জোড়া পাখি বসেছিল। ওদের দিকে তির ধরে সে বলল, 'ওই এক জোড়া পাখির দিকে তাকাও। ওদের দু-জনের মধ্যে কতটুকু ফাঁক আছে।'

'আহা পাখি দুটো বুঝি স্বামী-স্ত্রী। ওদের একটিকে মেরে অন্যটির অভিশাপ কুড়োবে?' হাত বিহীন তিরন্দাজ বলল।

'দেখ, কী করি!' বলতে বলতে সে তির ছুড়ল। মুহূর্তে তির বসে থাকা এক জোড়া পাখির মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেল। পাখি দুটো নড়লও না। তা দেখে হাত বিহীন লোকটা অবাক হয়ে গেল।

যা ঘটল তা শুনে শব্দভেদী অত্যন্ত অবাক হয়ে গেল। ওরা রাজার কাছে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, পাহাড়ি যুবতী নিজেই তির ছোড়ার ব্যাপারে অতখানি দক্ষ হয়ে ওদের মধ্যে সব্যসাচীকেই প্রণাম করল কেন? আর ওরাই বা শেষে রাজার কাছে যাবার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই কথা শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'পাহাড়ি কন্যার বিচারে কোনো ভুল ছিল না। ওদের মধ্যে সব্যসাচী যে শ্রেষ্ঠ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ইচ্ছে করলে সে বাকি দু-জনের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু ওরা সব্যসাচীর মতো দু-হাতে তির চালাতে পারবে না। অন্ধ তিরন্দাজ শব্দ না শুনে তির চালাতে পারে না। হাত বিহীন লোকটা পা এবং মুখ দিয়ে তির চালানো ছাড়া অন্য কোনোভাবে তির চালাতে পারে না। সব্যসাচী বাদে অন্য দু-জন লক্ষ্যভেদকারী হলেও পাকা তিরন্দাজ হতে পারে না। ওরা কাজের তিরন্দাজ নয়। ওরা রাজার কাছে যে গেল না তার একটা কারণ অছে। যে তির-ধনুক না নিয়ে বেড়াচ্ছিল তার যদি এতটা ক্ষমতা থেকে থাকে তাহলে আশেপাশে ওদের স্বজাতি যেসব ব্যাটাছেলেরা তির-ধনুক নিয়ে ঘুরছে তারা যে কত বড়ো দক্ষ তিরন্দাজ সেটা অনুমান করা যায়। তাই সব্যসাচী এবং অন্য দু-জনের সন্দেহ জাগল যে ওরা আদৌ রাজাকে খুশি করে পুরস্কার আনতে পারবে কি না।' রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গিয়ে গাছে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%