ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেকে প্রতিজ্ঞা করে কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেদের প্রতিজ্ঞা পালন করতে পারে না। অনেকে নাগপালের মতো, কারণ থাক বা না থাক, মত বদলে ফেলে। আমি তোমাকে এখন নাগপালের কাহিনি শোনাচ্ছি। শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বেতাল নাগপালের কাহিনি শুরু করল
চন্দ্রাবর্ত নামে এক দেশ ছিল। সেই দেশে দেবশ্রেষ্ঠী নামে এক ব্যাবসাদার ছিল। তার ছিল একটি ভালো জাতের ঘোড়া। ঘোড়ার নাম শ্বেতবদন। ওই ঘোড়াকে চরাতে আর ওই ঘোড়ার গাড়ি চালাতে দেবশ্রেষ্ঠী একটি ছেলেকে রেখেছিল। তার নাম নাগপাল। নাগপাল সবসময় ঘোড়ার সঙ্গেই থাকত। ঘোড়া আর নাগপাল যেন দুই বন্ধু। তা লক্ষ করে মরার আগে দেবশ্রেষ্ঠী ঘোড়াটিকে নাগপালকে গাড়ি সহ দিয়ে দিল। নাগপাল ওই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে রোজগার করত এবং ঘোড়াটিকে সবসময় ভালো খাবার খাওয়াত।
নাগপালের প্রতিবেশী ছিল এক বুড়ো। সেও ঘোড়ার গাড়ি চালাত। ওই বুড়োকে লোকে 'দাদু' বলত। নাগপাল দাদুর বাড়িতে যেত। দাদুর ছিল এক নাতনি। নাতনির সঙ্গে নাগপালের আলাপ হল। কিছুদিনের মধ্যে দাদুর নাতনি ও নাগপালের মধ্যে বিয়ের কথা উঠল।
শ্বেতবদন ঘোড়াটি যেন বুড়ো হতে চলল। গাড়ি টানতে সে আর পারছিল না। ফলে তাকে বসিয়ে খাওয়াতে হত এবং নাগপালের গাড়ি আর চলত না। তা লক্ষ করে দাদু তাকে বলল, 'দেখ, আমি বুড়ো হয়ে গেছি, গাড়ি চালাতে আর পারছি না। এখন থেকে তুমি আমার গাড়ি চালাতে পার।' বলে দাদু ভাবল, দু-দিন পরে তো নাগপাল আমার নাতনিকে বিয়ে করবেই। এখন আমার গাড়ি চালাক। তেমন দুর্দিন এলে ও নিশ্চয়ই আমাকে দেখবে।

দাদুর নাতনির নাম সুলোচনা। নাগপালকে গাড়ি দেওয়ায় সুলোচনা খুশি হল। গাড়ি চালিয়ে নাপগাল যা পেত তার অনেকখানি ভাগ সুলোচনার হাতে দিয়ে বলত, 'যতদিন আমাদের বিয়ে না হচ্ছে ততদিন তোমরা এই ভাগ রাখ।'
রোজগারের বেশিরভাগ অর্থ সুলোচনাকে দিয়ে দেওয়ার ফলে বাকি যা থাকত কোনোরকমে তাতে নাগপালের পেট চলত। কিন্তু সে পুরোটা নিজের জন্য খরচ না করে শ্বেতবদন ঘোড়ার জন্যও করত।
এইভাবে কিছুদিন চলার পর দাদু বিয়ের কথা পাড়লে নাগপাল বলল, 'আমার হাতে তো টাকাপয়সা নেই।'
দাদুর পাশে নাতনি দাঁড়িয়েছিল। নাগপালের কথা শুনে সে বলে উঠল, 'তোমার গাড়িটা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ওটাকে বিক্রি করে দিলেই তো পার। আর তোমার ওই শ্বেতবদন ঘোড়াটিকে বসিয়ে খাওয়াচ্ছ কেন? বিক্রি করলে পঞ্চাশ টাকা পাবে।'
পরের দিন, সাতসকালে উঠে, নাগপাল নিজের গাড়িটাকে বিক্রি করে দিল। তারপর শ্বেতবদন ঘোড়াটি নিয়ে অনেক দূরের গ্রামে সে চলে গেল। সেখানে গাড়ি বিক্রির টাকায় জমি কিনে চাষ-আবাদ করতে লাগল। ওই গ্রামেরই মেয়েকে সে বিয়ে করল। শ্বেতবদন ঘোড়াটিকে সে আজীবন নিজের কাছেই রেখেছিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, নাগপাল সুলোচনাকে কেন ছেড়ে গেল? কেন সে তাকে বিয়ে করল না? সুলোচনার চেয়ে তার কাছে শ্বেতবদন ঘোড়াটাই কি বড়ো হল? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'নাগপাল ও সুলোচনার মধ্যে বাঁধন সৃষ্টি হওয়ার আগে থেকেই নাগপালের দুটি বাঁধন ছিল। একটি ছিল শ্বেতবদন ঘোড়ার সঙ্গে আর একটি ছিল ওই গাড়ি এবং ঘোড়া যে দেবশ্রেষ্ঠী দিয়েছিল তার সঙ্গে। সুলোচনার চোখে টাকা বড়ো। অকেজো গাড়ি আর ঘোড়া তার মতে বিক্রি করে ফেলা উচিত। কিন্তু নাগপাল দেবশ্রেষ্ঠীর দেওয়া গাড়ি বিক্রি করতে চায়নি। জমি কিনে চাষ-আবাদ করে সে তার মালিক দেবশ্রেষ্ঠীকে স্মরণ করত। এবং সে আমৃত্যু ঘোড়াটিকেও নিজের কাছেই রেখেছিল।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল ফিরে গেল সেই গাছে শবদেহ নিয়ে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন